পূর্ব ভারতের অন্-আর্যাবর্ত অংশে গোড়ার থেকে অনেকদিন ধরে জনমণ্ডলীর মধ্যে জৈন ও বৌদ্ধ মতই সবচেয়ে বেশী প্রচলিত ছিল। প্রথম দিকে জৈন মতাবলম্বীদের সংখ্যা কিছু বেশী ছিল। শেষের দিকে এঁদের সংখ্যা কিছু হ্রাস পায়। প্রত্নলিপিতে এবং চীনীয় পরিব্রাজকদের বিবরণে এ দেশে বহুসংখ্যক সমৃদ্ধ জৈন ও বৌদ্ধবিহারের উল্লেখ আছে। সে সব বিহারে ব্রহ্মণ্য মতাবলম্বীরাও যেতেন। কেন না দুই সম্প্রদায়ই মঠে-বিহারে অর্হৎদের অথবা অবলোকেতিশ্বরের মূর্তি রাখতেন এবং তা পূজাও করতেন। সেকালে এই অঞ্চলে বিভিন্ন ধর্মের মধ্যে বিরোধ না হওয়ার একটি প্রধান কারণ বোধহয় প্রতিমা উপাসনা।
ব্রাহ্মন ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে সেকালে এদেশে প্রচলিত ছিল মোটামুটি সর্বভারতীয় প্রধান মত তিনটি — শৈবমত, শাক্তমত ও বৈষ্ণমত। শৈবমতে দুটি শাখা ছিল। একটি শাখায় শিব-মহেশ্বর, তিনি নারীসঙ্গ বিবর্জিত এবং নিজেও যেন যোগী। এই দেবভাবনাটি এসেছিল বৈদিক রুদ্রের ধারণা থেকে। রুদ্র একাধারে ছিলেন গন্ধর্ব-কালটের শিকারী প্রধান পুরুষ। আর বৈদিক যজ্ঞ কালটের সৃষ্ট একাধারে শিকারী ও চিকিৎসক দেবতা। এঁর রুদ্র নামটির অর্থ হচ্ছে যিনি ডাক পাড়েন অর্থাৎ শিকারী। রুদ্রদেবতার ঈশ্বররূপে পূজা জনসাধারণের মধ্যে প্রচলিত ছিলনা, তবে বিশেষভাবে প্রচলিত ছিল ধনী বণিক সমাজে। (ধনী বণিকদের শিবপূজায় নিষ্ঠা শ্রীচৈতন্যের সময় অবধি অন্তত জনশ্রুতিতে চালু ছিল, “যে জন শঙ্কর পূজে নহে ধনহীন।”) পূর্ব ভারতের অন্-আর্যাবর্ত অংশে শৈব উপাসন গোড়া থেকেই প্রচিলত ছিল কিনা তা বলবার মতো কোনো প্রমাণ নেই, তবে পরবর্তীকালে অর্থাৎ পাল ও সেন রাজাদের আমলে শৈবযোগী সম্প্রদায় বেশ জাঁকিয়ে উঠেছিল। তাঁরা জৈন ও বৌদ্ধদের মতই মঠে বা বিহারে বাস করতেন এবং জনগণমধ্যে তাঁরা প্রতিপত্তিতে বৌদ্ধমতাবলম্বীদের সমকক্ষ হয়ে উঠেছিলেন। এর প্রমাণ পাওয়া যায় দ্বাদশ শতাব্দীর পণ্ডিত বন্দ্যঘটীয় সর্বানন্দের “টীকাসর্বস্ব”-এ উদ্ধৃত একটি শ্লোকে। শ্লোকটি হলো —
“রুদ্র বিশ্বেশ্বরো দেব যুস্মাকং কুলদেবতা।/মারজিৎ ভগবান বুদ্ধঃ আস্মাকং কুলনন্দনঃ।।”
অর্থাৎ একটি লোক তার প্রতিবেশীকে বলছে, —
“স্মরজিৎ অর্থাৎ কামদেবকে ভস্মকারী দেবতা বিশ্বেশ্বর বুদ্ধ তোমাদের বংশের উপাস্য। মারকে জয়কারী ভগবান বুদ্ধ আমাদের বংশের ঠাকুর।” এই শ্লোকটির একটি গভীরতর তাৎপর্য আছে। সে হলো এই যে তখনকার দিনেই ব্রহ্মণ্য ও অব্রাহ্মণ্য ধর্মমতাবলম্বীদের মধ্যে একাত্মতার মিলন শুরু হয়ে গিয়েছিল। শৈব মতাবলম্বী মোহন্তরা জৈন ও বৌদ্ধ সাধুদের মতো মঠধারী অথবা বিহারবাসী ছিলেন। জৈন ও বৌদ্ধ সাধুদের সঙ্গে এই শৈব সাধুদের একটা বড় তফাৎ ছিল একটি বিষয়ে। জৈন ও বৌদ্ধদের মধ্যে দীক্ষা অর্থাৎ মন্ত্রদান ছিল না। তাই তাঁদের ধর্মমতে কোনো গুরু ছিল না। শৈব মোহন্তরা দীক্ষা দিতেন, উদাসীনদের যেমন, সাংসারিকদেরও তেমনি। নবম/দশম শতাব্দীর রচনা থেকে জানা যায় যে শৈব মোহন্তদের সাধারণ নাম ছিল “তাইরিয়” (অর্থাৎ সংস্কৃতে অর্থ, মানে ঈশ্বর প্রভু, গুরু। এঁদের সমসাময়িক বর্ণনাও মিলেছে। এঁরা মাথায় জটাভার রাখতেন। গায়ে ছাই মাখতেন, ঘন্টা নেড়ে পুজো করতেন, কানে ফুসফুস করেন মন্ত্র দিতেন। এঁরা শৈব যোগী নামেও পরিচিত ছিলেন)। শৈব যোগীরা লেখাপড়ার চর্চা করতেন। তাঁরাই এইদেশে প্রথম বিজ্ঞানভিক্ষু সম্প্রদায়।

দীর্ঘকাল নীরোগ ও শক্তসমর্থ হয়ে বাঁচবার জন্য এবং সম্ভব হলে পরিশেষে অক্ষয়, অব্যয়, অজর, অমর ঈশ্বর হবার জন্যে এঁরা নিজ দেহের বিষয়ে এবং বাহ্য পদার্থ নিয়েও অনুশীলন করতেন। এই প্র্যাকটিক্যাল গবেষণার জন্যই তাঁদের নাম দেওয়া হয়েছিল “তান্ত্রিক”।(তান্ত্রিক মানে যিনি তাঁত বোনেন। মানে যিনি মন্ত্র পড়েন, ধ্যান করেন অথচ দেহের কাজেও যত্ন নেন।) শৈব তান্ত্রিক যোগীরা অনেকরকম রোগ প্রতিকারক ও দৈহিক পুষ্টি ও তেজবর্ধক জড়িবুটি আরক প্রস্তুত করতেন — শুধু নিজেদের জন্য নয়, অপরকে দেবার জন্য, বিক্রী করবার জন্যেও। শৈবতান্ত্রিক যোগীদের সবচেয়ে বিশিষ্ট ঔষধ ছিল “রসায়ন”। এটি ছিল বাজীকরণ। ঔষধ ফেরি করতে করতে এঁরা ভারতবর্ষের সর্বত্র তো যেতেনই, এশিয়ারও সব সভ্যদেশে বিচরণ করতেন। সুদূর চীনদেশেও যে তান্ত্রিক যোগীদের অবাধ যাতায়াত ছিল তার প্রকৃষ্ট পরিচয় পাওয়া যায় খ্রিস্টিয় সপ্তম শতাব্দীতে বিরচিত চীনীয় উপন্যাস “গোল্ডেন লোটাস” গ্রন্থটিতে। এই উপন্যাসে ভারতীয় তান্ত্রিক সাধু একটি মুখ্য চরিত্র। তান্ত্রিক যোগীদের ওষুধ বিক্রীর কথা মুকুন্দের কবিকঙ্কণেও আছে। শৈব তান্ত্রিক যোগীরা ছিলেন নারীসঙ্গ বিবর্জিত। তেব সঙ্ঘ অর্থাৎ মঠ ও বিহার ত্যাগ করে তাঁরা কেউ কেউ সাধনসঙ্গিনী নিতেন।
গোড়ার দিকে তান্ত্রিক যোগীরা দুটি সম্পূর্ণ বিপরীতধর্ম সম্প্রদায়ে বিভক্ত ছিলেন, তবে উৎপত্তির দিক দিয়ে এঁদের বিচার করতে হলে বলতে হয় শৈব-শাক্ত যোগী সাধকমণ্ডল। এঁদের উৎপত্তিও বৈদিক আমলের গন্ধর্ব-কাল্ট থেকে। আগেই বলা হয়েছে শিব ছিলেন গান্ধর্বদের মধ্য একজন মুখ্য দেবতা, শিকারী। সেকালে শিকারের দুটি ভিন্ন উপায় ছিল। ১) জাল পেতে পাখি ও জাল ফেলে মাছধরা। বেদে রুদ্র শিবের ধনুধারী শিকারী মূর্তিই পাওয়া যায়। পরবর্তীকালে শিকারী রুদ্র ব্যাধে পরিণত হয়েছিলেন। এই ব্যাধ শিবঠাকুরের উল্লেখ পাওয়া যায় এখনকার লোকপ্রচলিত শিবরাত্রি উপাখ্যানে। আর জালন্ধর রুদ্র শিবের বিবর্তন পাওয়া যায় মৎস্যেন্দ্রনাথ-জালন্ধরী-গোরক্ষনাথ উপাখ্যানে। অর্বাচীন বৈদিক সাহিত্যে গান্ধর্ব-কালট থেকে শিবশক্তি কাহিনীর উৎপত্তির সূত্র পাওয়া যায় তলবকার (বাকেন) উপনিষদে। সে আখ্যানে রুদ্র হলেন ব্রহ্ম, অলক্ষ্য ; অদৃশ্য যক্ষরূপী। আর অপ্সরা উমা-হৈমবতী হলেন পরম রূপবতী, অলঙ্কারমণ্ডিতা যক্ষিণীরূপিণী, ব্রহ্মজ্ঞা। দেবী হৈমবতী দেবশ্রেষ্ঠ হন্দ্রকে ব্রহ্মের পরিচয় দিয়েছিলেন। মৎস্যেন্দ্রনাথ-জলন্ধরীর কাহিনীতে যে যোগী-সম্প্রদায়ের উল্লেখ আছে, তাঁরা সম্পূর্ণভাবে স্ত্রীসঙ্গবিবর্জিত, যদিও তাঁদের আদিগুরু শিব, গৌণভাবে তাঁদের শৈবসম্প্রদায় বলাই সঙ্গত। এঁদের সাধনায় শক্তির কিছুমাত্র সম্পর্ক নেই। এই সম্প্রদায়ের ট্রাডিশন থেকে শক্তি বিচ্যুত হয়ে এক স্বতন্ত্র পরমেশ্বরী দেবীতে বিবর্তিত হয়েছিলেন। কাহিনীতে তিনি শিবের কন্য মনসা। এই মনসা-কালটের বীজ অতী প্রাচীন। বৈদিক ট্রাডিশনের চেয়েও প্রাচীন। পূর্বভারতের অন্-আর্যাবর্ত অঞ্চলগুলিতে মনসাকে নিয়ে কোনো ধর্মভাবক সম্প্রদায় গড়ে উঠেছিল। সে সম্প্রদায় পরবর্তীকালে অপর যোগী তান্ত্রিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে মিশে গেছে। কিন্তু লোকব্যবহারে, বিশেষ করে নিম্নস্তরের জনগণের মধ্যে মনসার পূজা যথাসম্ভব জাঁকজমকেই প্রচলিত ছিল।
বৃন্দাবনদাস উল্লেখ করেছেন, পঞ্চদশ শতাব্দীর শেষার্ধে শ্রীচৈতন্যের জন্মকালে পশ্চিমবঙ্গে আড়ম্বরে বিষহরি মনসার পূজা হতো। কোনো কোনো অঞ্চলে বিষহরি মনসা পূজার প্রাধান্য মঙ্গলচণ্ডী পূজারও উপরে ছিল। (চলবে)