তলবকার উপনিষদের কাহিনীতে যে শিব-শক্তি, যক্ষ ও যক্ষিণীরূপের উল্লেখ করা হয়েছে সে বিষয়ে আধ্যাত্মিকভাবনা দুটি সমান্তরাল পথ গ্রহণ করেছিল অর্থাৎ একই দেবদেবী ভিন্ন প্রাকৃতিক সংস্থানে ভিন্নরূপ নিয়েছিল। হিমালয়ে অর্থাৎ শীতপ্রধান পাহাড়ী অঞ্চলে শিব-শক্তি হয়েছিলেন যথাক্রমে গিরিশ-পার্বতী। এইরূপেই তাঁরা পৌরাণিক সাহিত্যে বর্ণিত হয়েছেন। তবে এঁদের যুক্তপূজার কোনোই বিধান পাওয়া যায় না পুরোনো ঐতিহ্যে। শুধু পার্বতীর একলারই পূজা প্রচলিত হয়ে এসেছে ভারতীয় ঐতিহ্যে, গুপ্ত আমলের গোড়া থেকে। দুর্গাপুজোতেও শিবের কোন স্থান ছিল না। এই পুজো একলা উমা-হৈমবতীর। (পরবর্তী কালে অবশ্য আরো দু-চারটি দেবতা যুক্ত হয়েছেন)। গ্রীষ্মপ্রধান বনভূমি অঞ্চলে শিব-শক্তি দেখা দিলেন কিরাত-কিরাতী রূপে। শিব এখানে শিকারী বুনোমানুষ, শক্তি তাঁর সঙ্গিনী হলেন বৈদিক গন্ধর্ব-কালটের অরণ্যের দেবী অরণ্যানী। গিরিশ-হৈমবতীর ট্রাডিশনে যেমন, কিরাত-কিরাতীর ট্রাডিশানেও তেমনি জনসমাজে প্রচলিত পুজায় কিরাত বা পড়ে গেছেন। কিরাতী পুজিত হয়ে এসেছেন বর্গভীমা অথবা বনদুর্গা অথবা বনানী চণ্ডীরূপে। কিরাত-কিরাতী ভাবনা নিয়ে এদেশে একটি বিশেষ যোগীতান্ত্রিক সম্প্রদায়ও গড়ে উঠেছিল। এঁদের সম্প্রদায়ের কিছু গান — প্রত্নবাংলায় লেখা পাওয়া গেছে হরপ্রসাদ শাস্ত্রী কর্তৃক নেপালে আবিষ্কৃত পুঁথিতে। এ গানগুলিতে কিরাত-কিরাতীর বদলে পাওয়া যায় শবর-শবরী। এই সম্প্রদায়ের সাধনা মূলরূপে প্রবাহিত হয়ে এবং শৈব প্রভৃতি অন্যান্য তান্ত্রিক যোগী সম্প্রদায়ের সাধনার ধারা আত্মাসাৎ করে সহজ সাধনা নামে পরিচিত হয়েছিল খ্রিস্টিয় একাদশ-দ্বাদশ শতাব্দীতে। তুরুকদের আগমনের পর এই সহজসাধনা যা বরাবরই খুব গোপন সাধনা ছিল, তা বেশ কিছুকাল লোকলোচনের বাইরে চলে যায়। এমন সাধকদের লোকালয়ে দেখা গেল পঞ্চাদশ শতাব্দীতে। লোকে তাদের সাধারণ নাম দিয়েছিল “বাউল”।
বৈদিক ধর্ম ভাবনা শেষ বহার বেশ কিছুকাল আগে থেকেই যজ্ঞেশ্বর বিষ্ণু দেবতাদের শীর্ষস্থানীয় হয়েছিলেন। তারপর তিনি হয়েছিলেন পরমেশ্বর, সেইসঙ্গে আরো দুটি নতুন বৈষ্ণব ধর্মভাবনা বৈদিক যুগের অবসানে দেখা দিয়েছিল। একটি হলো যুগ্ম বীরভাবনা, অপরটি হলো যুগ্ম বীর ও সহযোগী দেবীভাবনা। শেষের ভাবনা দুটির উৎপত্তি হয়েছিল গান্ধর্ব-কালট থেকে, তবে বৈদিক ভাবনায় তাঁরা দেবতারূপেও বেশ কিছুকাল পূজা পেয়েছিলেন। তাহলে বৈদিক পরবর্তীকালে বৈষ্ণবভাবনার তিনটি রূপ পাওয়া যাচ্ছে। প্রথমটি হলো মৌলিক বৈষ্ণবভাবনা অর্থাৎ ঋগ্বেদীয় বিষ্ণু দেবতার উপাসনা। বৈদিক যজ্ঞকাণ্ডে ইনি অগ্নির মর্যাদা পেয়েছিলেন এবং পরবর্তীকালে ইনি পরমেশ্বর বা রাজা-ঈশ্বর হয়েছিলেন। এঁর ভক্তরা এঁর প্রজা বা অনুচর যোদ্ধার মতো। ইহলোকে তারা সুখে থাকে, পরলোকে তারা বৈকুণ্ঠে বা গোলোকে আশ্রয় পায়। প্রথম প্রথম বিষ্ণুপূজায় প্রতিমার ব্যবহার ছিল না, ব্যবহার ছিল এঁর অস্ত্র দুদর্শনের প্রতীকচিহ্ন স্বস্তিকের এবং চক্রের। এই চিহ্নের নাম ছিল চক্রধ্বজ, পরে হয় গরুড়ধ্বজ। দ্বিতীয়রূপ হলো বিষ্ণুর বদলে তাঁর দুই প্রতিনিধি বাসুদেব ও সঙ্কর্ষণের উপাসনা। প্রাচীন আর্ষভাষীদের সমাজচেতনায় যখন রাজন্যসমাজ ব্রহ্মণ্যসমাজের উপর প্রাধান্য পেয়েছিল, তখনই এই দেবতান দুটি — ঋগ্বেদে নাসত্যদ্বয় বা অশ্বিনীদ্বয় — দুই ভাই ঈশ্বরে পরিণত হয়। দুজনের মধ্যে প্রধান ছিলেন বাসুদেব। সঙ্কর্ষণ ছিলেন তাঁর প্রধান সহায়। এই দ্বিতীয় বৈষ্ণব ভাবনাকে বলা যেতে পারে যৌধেয় বৈষ্ণবভাবনা। খ্রীঃ পূঃ চতুর্থ শতাব্দীতে যে বাসুদেব সঙ্কর্ষণ — (নামান্তরে বাসুদেব অর্জুন) উপাসনা উত্তর-পশ্চিম ভারতে বিশেষভাবে প্রচলিত ছিল — এ তথ্য প্রকাশ পেয়েছে পাণিনির একটি সূত্র থেকে। তৃতীয় রূপ হলো দ্বিতীয় রূপেরই রূপান্তর। এখানে বাসুদেব ও সঙ্কর্ষণের অর্থাৎ কৃষ্ণ এ বলরামের সঙ্গে দেবী উষার বা সুভদ্রার উপাসনা। এই তিন দেবতার প্রাচীন ইতিহাস মিলছে গ্রীক মিথোলজিতে। সেখানে কৃষ্ণ-বলরাম হলেন “দিওস্-কুরৌ” অর্থাৎ দৈবপুত্রদ্বয়। রোমান মিথোলজিতে কাষ্টর ও পোললুকস এবং হেলেন। এই ত্রিদেবতার উপাসনা গুপ্ত আমলে চলিত হয়েছিল। মাধব দু-জনের যুগ্মনায়কত্বের স্মৃতি এখনও অক্ষুণ্ণ রয়েছে “বেণীমাধব” এই নামে।
খ্রীঃ পূঃ প্রথম শতাব্দীর দিকে এদেশে বৈষ্ণবভাবনা চলিত ছিল কি না তা জানবার কোনো উপায় নেই। তবে মনে হয় বিষ্ণুর উপাসনা উচ্চতর সমাজে অজানা ছিল না। পূর্বভারতের অন্-আর্যবর্ত অঞ্চলে পশ্চিম সীমায় খুব প্রাচীন বিষ্ণু উপাসনার প্রমাণ আছে। সে হলো গয়ায় বিষ্ণুপাদতীর্থ। গয়া নামটি প্রাচীন ইরাণীয় ধর্মগ্রন্থ আবেস্তায় উল্লিখিত গয়মর্ত্যকে স্মরণ করায়। বৈষ্ণব বাবনা এইদেশে প্রাচীনকাল থেকে থাকুক আর নাই থাকুক তা যে গুপ্ত আমল থেকে বাড়তে শুরু করেছিল তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
পশ্চিমবঙ্গের মধ্যে যে সর্বপ্রাচীন প্রত্নলেখ দেখা যায় তা চন্দ্রবর্মা নামে এক রাজা কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত বিষ্ণধ্বজের উল্লেখ। বাঁকুড়া জেলায় বাঁকুড়া শহর ও দামোদর নদীর মাঝামাঝি যে শুশুনিয়া পাহাড় আছে তার মাঝখানের একটি গুহায় বিষ্ণুচক্র উৎকীর্ণ আছে এবং আনুমানিক চতুর্থ খ্রিষ্টিয় শতাব্দীতে প্রচলিত অক্ষরে যা লেখা আছে তার থেকে জানা যায় পুষ্করণার অধিপতি রাজা চন্দ্রবর্মা বিষ্ণু পুজোর জন্য সুদর্শন চক্রচিহ্ন উৎকীর্ণ করেছিলেন। শুশুনিয়া পাহাড় থেকে সোজা দামোদরের তীরে এলে পোখরানা গ্রাম পাওয়া যায়। এই গ্রামে অনেক প্রাচীন প্রত্নবস্তু মিলেছে। সুতরাং মনে করা হয় চন্দ্রবর্মা সম্ভবত এই পোখরণা গ্রামেরই রাজা ছিলেন। যদিও এখন ভারতে বিষ্ণচক্রের কোনো পূজা হয় না। তবে সব বিষ্ণ মন্দিরের চূড়ায় এই বিষ্ণুধ্বজ লাগানো থাকে। চন্দ্রবর্মার প্রত্নলিপিতে বিষ্ণুকে ভগবান চক্রস্বামী বলা হয়েছে। বিষ্ণুপূজার দ্বিতীয় রূপে কিছুকাল পরেই সঙ্কর্ষণ পরিত্যক্ত হয়ে একলা বাসুদেব বিষ্ণুরূপে প্রতিমায় উপাসিত হতে থাকেন। বাসুদেব নামে পরিচিত হলেও, ওঁর প্রতিমা সাধারণত চতুর্ভুজ হতো। এই চতুর্ভুজ অথবা দ্বিভূজ বাসুদেব-বিষ্ণু মূর্তির পূজা এই দেশে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গিয়েছিল গুপ্ত আমলে। সেনরাজাদের আমলেও বিষ্ণুর শৈল অথবা ধাতব প্রতিমাপূজা সমাজের উচ্চতর স্তরে সাগ্রহে অনুষ্ঠিত হতো।
তৃতীয় রূপের বৈষ্ণবভাবনা পূর্ব ভারতের অন্-আর্যাবর্ত অঞ্চলে প্রবেশ করে ওড়িশায় এবং সেখানে নীলাচলে প্রতিষ্ঠিত হয়ে ভারতময় জাঁকিয়ে ওঠে। এ ব্যাপার ঘটেছিল খ্রিস্টিয় দশম-একাদশ শতাব্দীর থেকে। জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রা এই মাধব ত্রিদেব পূজা বাংলাভাষীর দেশে চলে এসেছিল ওড়িশা থেকেই এবং পঞ্চদশ শতাব্দীর পরে।
পূর্ব ভারতের অন্-আর্যাবর্ত অংশে সবাই অথবা সর্বত্র জনগণ যে ধর্মপরায়ণ ছিল তা নয়। অনেকে ধর্মপরায়ণ ছিল এবং সে ধর্ম যে কতরকম তার উপরে আলোচনা করা হচ্ছে। কোনও কোনও জনগোষ্ঠী ধর্মের কোনও ধার ধারত না। তেব ধর্মভাবুক হোক বা নাক হোক, এদেশের জনগণ গোড়া থেকেই বিশেষভাবে গানবাজনার অনুরাগী ছিল। প্রাচীনকালে এদেশে এমন একটি জনগোষ্ঠীর সন্ধান পাওয়া গেছে বে জনগোষ্ঠী ভারতবর্ষে গীতবাদ্যপরায়ণতার জন্যই অত্যন্ত প্রসিদ্ধ হয়েছিল। এই গোষ্ঠীর কয়েকটি দল খ্রিষ্টিয় প্রথম শতাব্দীর দ্বিতীয় বা তৃতীয় দশকে দেশ ত্যাগ করে ইরানে চলে যায় এবং সেখান থেকে তারা ক্রমশ পশ্চিম এশিয়ায়, মিশরে এবং ইউরোপে পরিব্যাপ্ত হয়। এরা ইংল্যান্ডেও পৌঁছে গিয়েছিল।ভারত থেকে নির্গত এই যাযাবর জাতী যেসব দেশে ছড়িয়ে পড়েছে সে সব দেশের ভাষাকে যথাসম্ভব আত্মসাৎ করেও নিজেদের মূল ভারতীয় কাঠামো একেবারে ছাড়তে পারেনি। ইংল্যান্ডের জিপসীদের পুরুষকে বলে “রোম” আর মেয়েকে বলে “রোমণী”। শব্দ দুটি এসেছে যথাক্রমে সংস্কৃত ডোম্ব (বাংলায় ডোম) ও ডোমবিনী (বাংলায় ডোমনী) থেকে। প্রত্নবাংলা একাধিক চর্যাগানে সঙ্গীতপ্রিয় এবং গান্থর্ব-অপ্সরার মতএ স্বৈরাচারী ডোম্ব-ডোম্বিনীর উল্লেখ পাওয়া যায়। এই ডোম্ব-ডোম্বিনীদের গানবাজনার রীতি তান্ত্রিক-অতান্ত্রিক জৈন ও শৈব যোগী সাধকেরা প্রহণ করেছিলেন। প্রত্নবাংলায় লেখা কিছু চর্যাগান থেকে মনে হয় কোনো কোনো তান্ত্রিক যোগীসম্প্রদায় যেমন নিজেদের শবর-শবরী বলতেন, তেমনি কোনো কোনো সম্প্রদায় নিজেদের ডোম-ডোমনী বলত। জাতি হিসেবে ডোম-ডোমনি আমাদের দেশে এখনও অনবলুপ্ত। গানে নয়, তবে ঢোলের বাজনায় ডোমেদের নৈপুণ্য এখনও বজায় আছে। এঁদের আরো এক বিশেষ শিল্পকর্মে নৈপুণ্য ছিল। বাঁশের চাঁচারি-কঞ্চি দিয়ে এঁরা চমৎকার জিনিসপত্র নির্মাণ করতে পারতেন। সে জাতিগত নৈপুণ্য এখনও বজায় আছে।
গুপ্তশাসন আরম্ভের কিছুকাল আগে থেকেই সম্ভবত পূর্বভারতের অন্-আর্যাবর্ত অঞ্চলে শিক্ষিত ব্রাহ্মণদের আগমন ঘটতে থাকে। সেকালে শিক্ষিত ব্রাহ্মণেরাই দেশের সবচেয়ে মান্যগণ্য অধিবাসী বলে সংবর্ধিত হতেন। শিক্ষিত ব্রাহ্মণদের অধিকাংশেরই ধর্মভাবনা ছিল বৈষ্ণবীয়। অতঃপর এদেশে ব্রাহ্মণের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বৈষ্ণবভাবনার প্রভাবও বাড়তে থাকে। গুপ্তশাসনের সময়ে দৈবক ব্রহ্মণদের পূর্বপুরুষ এসেছিল ইরান থেকে। তাই তাঁদের বলত ‘মগ’ ব্রাহ্মণ। এঁরা উপাসনা করতেন। সূর্যের প্রতিমা নির্মাণ করে পুজোও করতেন। দৈবক ব্রাহ্মণদের পূজিত সূর্যপ্রতিমার আইডায়াও ইরান থেকে আমদানি। এ সূর্যমূর্তি বুটপরা। কখনও কখনও সাত ঘোড়ার রথে উপবিষ্ট। সামনে অরুণ সারথি। গুপ্তশাসন সময়ে দৈবকদের পূজিত সূর্যদেব রাজকীয়ত্বের প্রতীকে পরিণত হয়ে ধর্মঠাকুরে পরিণত হয়েছিলেন।
বৈষ্ণব ভাবনার প্রভাব খুব সহজেই পড়েছিল। বিষ্ণু তো সবিতৃমণ্ডলী মধ্যবর্তী। তারপর শৈবধর্মের ওপরও পড়ে। ধীরে ধীরে কৃষ্ণলীলার ঠাট অনুসরণ করে শিবদুর্গার ঘরোয়া গল্প গড়ে ওঠে। বৈষ্ণবভাবনার যে গাঢ় ভক্তিরস তা শৈব ভাবনাকেও জারিত করে এবং রুদ্রত্বের খোলস একেবারে ঝেড়ে ফেলে শিব হয়ে পড়েন ‘সদাশিব’। এই সদাশিবই সেনরাজাদের কুলদেবতা ছিলেন। লক্ষ্ণণ সেনের অনুশাসনগুলিতে এই সদাশিবেরই বন্দনা। তিনি বর্ণিত হয়েছেন যেন ধান্যোপজীবী পূর্বভারতীয়দের প্রাণের ঠাকুর। শ্লোকটির তর্জমা এই — “ফণিপতির মণিদ্যুতি যেখানে বিদ্যুতের মতো, চন্দ্রকলা রামধনুর মতো, স্বর্গগঙ্গা জলধারার মতো, সাদা হাড়ের মালা বলাকার মতো, ধ্যান ও প্রাণায়ম যেখানে বায়ুপ্রবাহের মতো, যা সংসারের দাবদাহ জুড়িয়ে দেয় — শিবের সেই জটাজুট মেঘের মতো তোমাদের মঙ্গলরূপ ফসলের বীজ প্রস্ফূটিত করুক।”
বৈষ্ণব ও শৈবভাবনাকে কাছে টেনে এনেছিল আরো একটি নতুন ধর্মভাবনা। পুরাণে গঙ্গার মাহাত্ম্য আছে। তবে সে মাহাত্ম্য একলা গঙ্গার নয়। তার যমজ বোন যমুনারও অর্থাৎ গোড়ার দিকে আর্যাবর্তের নদীদেবীর যমজরূপ ছিল সাদা ও কালো। সাদা গঙ্গা, কালো যমুনা। যমুনা ব্রজলীলার সঙ্গে বিজড়িত হয়ে পুরোপুরি বৈষ্ণবীয় হয়ে গিয়েছিল। সাদানদী গঙ্গা কিন্তু শিব ও বিষ্ণু দুই দেবতারই যোগনদী ছিল। শিব তাকে মাথায় রাখতেন, ব্রহ্মা তাঁকে কমণ্ডুলুতে রাখতেন আর বিষ্ণু তাঁকে পদোদক করতেন। শিব আর বিষ্ণু এই দুই দেবোপাসনা সঙ্গে বিজড়িত ছিল বলে গঙ্গার জল অতিশয় পুণ্য বলে পূজিত হতে থাকে পরবর্তীকালে। অবশেষে পাল আমলে গঙ্গা স্বতন্ত্র দেবীতে পরিণত হন এবং দিন দিন তাঁর মহাত্ম্য বাড়তে থাকে। (ধর্মের দিক দিয়ে দেখতে গেলে গঙ্গা, উত্তর পশ্চিম ভারতের আর্যাবর্ত ও অন-আর্যাবর্ত অংশদুটির সংযোগ স্থাপন করেছিল।) গঙ্গাকে বিশিষ্ট দেবীরূপে কল্পনা করে তার মূর্তি নির্মাণ শুরু হয়েছিল সেনরাজাদের আমলে। কিন্তু গঙ্গার মূর্তিপূজা রীতি, জনসমাজে চালু হয়নি, তার কারণ বোধহয় মূর্তিমতী জাহ্নবীর প্রবল প্রতাপে অবস্থিতি। মুসলমানদের আগমনের পর গঙ্গার মাহাত্ম্য বিষ্ণুর মাহাত্ম্যের মধ্যে মিশে যায়। গঙ্গা হয়ে যান জলব্রহ্ম।
পূর্বভারতের অন-আর্যাবর্ত অঞ্চলে প্রচলিত মহাযান বৌদ্ধমত পালরাজাদের আমলে তান্ত্রিকতামণ্ডিত হয়ে পরিপুষ্ট হয়ে নাম নিয়েছিল “বজ্রযান”। নামটির মানে হলো কঠিন যান অর্থাৎ নিরীশ্বর তান্ত্রিক যোগীদের অবলম্বিত সহজযানের বিপরীত ভাবনা। “সহজ বড় সহজ নয়” অতএব তা কঠিন। সহজযানের নরনারীর মিলন প্রকৃতির নিয়মানুসারে স্বাভাবিক সুতরাং সহজ। এই বৌদ্ধতান্ত্রিক মতের সাধনায় যে মিলন অত্যন্ত কঠিন কেন না তা অত্যন্ত কঠোর সাধনায় প্রাপ্তব্য। মহাযান তান্ত্রিক মতে প্রথমে যা ছিল অবলোকিতেশ্বর ও প্রজ্ঞাপারমিতা বা করুণা, বজ্রযানে তা হলো হেরুক ও নৈরাত্মা (নৈরামণি)। তান্ত্রিক মহাযানে অবলোকিতেশ্বর (বোধিসত্ত্ব) ও প্রজ্ঞাপারমিতা (করুণা) আলাদা আলাদা পূজিত হতেন প্রতিমায় অথবা পটে। বজ্রযানে এরা পূজিত হতেন যুগনদ্ধরূপে প্রতিমায়। অনুমান হয় বজ্রযানের যুগনদ্ধ মূর্তিপূজার প্রভাব সমসাময়িক শৈবতান্ত্রিক পূজায়ও পড়েছিল। তার ফলে পাওয়া গেছে শিবপার্বতীর যুগল মূর্তির পূজা। বজ্রযানের যুগনদ্ধ মূর্তির ও শৈবতান্ত্রিক যুগল মূর্তির পূজার প্রভাব বৈষ্ণব ধর্মভাবনায়ও এসে গিয়েছিল সেনরাজাদের আমলে। এই বংশের প্রথম রাজা বিজয় সেন অর্ধনারীশ্বরের মতন অর্ধবিষ্ণুলক্ষ্মীর মূর্তিরও পূজা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এই দুই মূর্তির জন্য দেবালয়ও প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। (সে দেবালয় আজ নেই, তবে মন্দিরগাত্রে যে শিলালিপি ছিল তা পাওয়া গেছে, তাতেই এই সংবাদ মিলছে।)
বজ্রযানের তান্ত্রিক মহাযান বৌদ্ধমতের বোধিসত্ত্ব করুণার ভাবনায় বৈষ্ণব ভাবনায় ভক্তিরস আপনা আপনি সঞ্চারিত হয়েছিল। ক্রমশ এই রস গাঢ় হয়ে মহাযান বৌদ্ধভাবনাকে বৈষ্ণবভাবনার খুব নিকটে এনে দেয়। দ্বাদশ শতাব্দীর পর এদেশে বৌদ্ধমতের চিহ্ন যে বেশী দেখা যায়নি তার একটা কারণ অবশ্যই তুর্কি অভিযানের ফলে বৌদ্ধ বিহারগুলির ধ্বংস। কিন্তু এটাই একমাত্র কারণ নয়। বৈষ্ণব মত ও মহাযান বৌদ্ধমত ভক্তিরসের জগতে এক হয়ে এসেছিল স্বাভাবিক উপায়ে।
বৈষ্ণব অধ্যাত্মচিন্তা ঋগ্বেদে বিষ্ণুদেবতার ভাবনা থেকে এসেছিল। ঋগ্বেদে বিষ্ণুদেবতা ছিলেন দেবতা থেকে আরম্ভ করে সর্বসত্বের আশ্রয়দাতা। তবে তার নিজের নিবাস ছিল পরম ব্যোমে। সেখানে ছিল মধুর উৎস আর গরুর ছড়াছড়ি। ঋগ্বেদের পরে বিষ্ণু হয়ে পড়েন দেবতাদের প্রাণদেবতা। যজ্ঞাগ্নি এবং তাঁর রূপ কল্পিত হয়েছিল যেন শিশু। বিষ্ণুর কৃষ্ণরূপ ধারণ করবার আগেই তাঁর শিশুরূপ কল্পিত হয়েছিল যজ্ঞাগ্নি ভাবনার সূত্রেই। তখন বৈদিক আচারনিষ্ঠ গৃহস্থ মাত্রেই অগ্নিহোত্রী ছিলেন। তাঁদের যত্ন করে ঘরের আগুন (গার্হপত্য অগ্নি) স্থাপন করতে হতো। ঘরের কর্তা ও গিন্নীকে এই অগ্নিকে পোষণ করতে হতো শিশুর মতো। এই সূত্রে পরবর্তী বৈদিকযুগে ঘর-সংসার নিয়ে এই বিশেষ তিনটি শব্দ প্রচলিত ছিল, “পতির্দন” (অর্থাৎ ঘরের কর্তা), “দম্পতী” (অর্থাৎ ঘরের কর্তা-গিন্নী), ও “শিশুদন” (অর্থাৎ ঘরের ছেলে-গার্হপত্য অগ্নি)। চিরকালের সংসারের এই মূল ভূমিকা তিনটি অনেক পরবর্তীকালে কৃষ্ণলীলায় ঢুকে গিয়ে ব্রজলীলায় বাৎসল্যরসের সৃষ্টি করেছিল, নন্দ, যশোদা ও গোপাল ভূমিকায় পরিণত হয়ে। (চলবে)