| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

ধর্ম মানে মানুষের ‘কালচারাল প্রোগ্রেস’ (শেষ পর্ব)

Reporter
পেজ ফোর, বিশেষ প্রতিনিধি / ৫২৬ জন পড়েছেন
আপডেট শুক্রবার, ২৯ এপ্রিল, ২০২২

আগেই বলা হয়েছে যে বৈদিক আমলের পরে বিষ্ণু যোদ্ধাদেবতায় পরিণত হন এবং তাঁর নাম হয় বাসুদেব অথবা কৃষ্ণ। বিষ্ণু নামটি ঢাকা পড়লেও বাসুদেবের প্রতিমা, বিশেষ করে চতুর্ভুজ প্রতিমা বিষ্ণুমূর্তি নামেই পরিচিত ছিল। এ ব্যাপারের মূলে দুটি কারণ ছিল বলে মনে হয়। প্রথমত বাসুদেব মানুষ মূর্তি সুতরাং, তাকে বিষ্ণু বলা যায় না এবং চতুর্ভুজ মূর্তিকেও বাসুদেব বলা যায় না। প্রতিমা পূজা প্রবর্তিত হবার আগে বিষ্ণুকে পূজা করা হতো তাঁর আয়ুধ প্রতীকে। এই আয়ুধ ছিল চক্র। চক্রের প্রথম চিত্ররূপ ছিল স্বস্তিক চিহ্ন। বিষ্ণুর চতুর্ভুজ স্বস্তিকেরই প্রতিফলন অর্থাৎ চতুর্ভুজ বিষ্ণুমূর্তি হলো স্বস্তিক প্রতীকেরই মানব প্রতিমা।

এর পরে প্রাচীনতর অপবৈদিক গন্ধর্ব কাল থেকে বৈদিক আমলে সাধারণ লোকসমাজে প্রচলিত গন্ধর্ব বনদেবতা কৃষ্ণের বিবিধ লীলা ধীরে ধীরে নিম্নস্তরের অনুশীলন পেতে পেতে ক্রমশ উচ্চস্তরের সাহিত্যের সামগ্রী হতে থাকে।

বর্তমানকালের পণ্ডিতদের ধারণা যে কৃষ্ণের ব্রজলীলা সম্ভবত কোনো অনআর্য ট্রাডিশান থেকে পাওয়া। এ কথা ঠিক নয় বলে অনেকের মত। ঋগ্বেদেই দেখা গেছে যে বিষ্ণুর নিবাস ছিল পরমধাম গোলকে এবং সেখানে গরুর প্রাচুর্য ছিল। তাছাড়া ঋগ্বেদে সূক্তে বর্ণিত ইন্দ্রা-বিষ্ণু যেন পরবর্তীকালের বাসুদেব-অর্জুন বা বাসুদেব-সঙ্কর্ষণ এবং আরো পরবর্তীকালের কৃষ্ণ-বলরামের মতো। ঋগ্বেদের একটি সূক্তের শেষে কবি-ঋষি এই প্রার্থনা জানিয়েছেন “তা বাংবাস্তনি উস্মসি গমধ্যৈ/যত্র গাবো ভূরিশূঙ্গা আয়াস”।

অর্থাৎ আমি কামনা করছি তোমাদের দুজনের স্থানে যাবার জন্যে, যেখানে প্রচুর শিংওয়ালা দ্রুতগামী গরু আছে।

বিষ্ণু কৃষ্ণমূর্তি ধরবার আগেই যে বৈদিক সাহিত্যে শিশুরূপ পেয়েছিলেন, সে কথা আগেই উল্লেখ করা হয়েছে। ঋগ্বেদে বিষ্ণুর ত্রিপাদ অভিযানের পৌরাণিক রূপান্তর পাই বামন অবতারের ত্রিপাদ স্থাপনে। এ হলো বিষ্ণুর শিশুমূর্তির সঙ্গে এক মিলনের প্রয়াস। শিশুমূর্তির মধ্যে দিয়েই বিষ্ণুর কৃষ্ণরূপ প্রাপ্তি ঘটেছিল। তবে এটা লক্ষণীয় যে পৌরানিক সাহিত্য এবং পরবর্তীকালে কৃষ্ণ বিষ্ণুর উপরে উঠে গেলেও বিষ্ণুভক্ত কখনও কার্ষ্ণ্য হয়নি। সে “বৈষ্ণব”ই রয়ে গেছে। কৃষ্ণের ব্রজলীলা গোড়ায় লোকসাহিত্যের বিষয় ছিল। শিশু কৃষ্ণের বীরত্বের কাহিনিগুলি সবার আগে লোকসাহিত্য থেকে গৃহীত হয়েছিল স্থাপত্যশিল্পে। তার প্রমাণ গুপ্ত আমলে কৃষ্ণের গোবর্ধন ধারণ ইত্যাদি মূর্তি। কৃষ্ণের গোপীলীলাও যে খ্রিষ্টিয় প্রথম শতাব্দীগুলিতে অজ্ঞাত ছিল না তার প্রমাণ পাওয়া যায় কালিদাসের রঘুবংশে ও মেঘদূতে। মেঘদূতে তিনি গোপবেশ বিষ্ণুর উল্লেখ করেছেন। আর রঘুবংশে তিনি যে ভাবে গোবর্ধনগিরি ও বৃন্দাবনের উল্লেখ করেছেন তাতে স্পষ্টভাবে বোঝা যায় যে কৃষ্ণের কৈশোরলীলাকাহিনি কালিদাসের অজানা ছিল না। কৃষ্ণের বাল্য ও কৈশোরলীলা ভদ্রসাহিত্যে ধীরে ধীরে স্থান করে নিল অপভ্রংস অবহট কবিতা ও গানের মধ্য দিয়ে। ইতিমধ্যে কৃষ্ণ বিষ্ণুকে আত্মসাৎ করে নিয়েছেন এবং তার ফলে তিনি ভক্তিরও পাত্র হয়েছেন। এইভাবে গানে ও ছড়ায় কৃষ্ণকাহিনি ভক্তিরস ও প্রেমরসের বাহক হয়ে বৈষ্ণবধর্মকে অত্যন্ত রুচিকর ও স্পৃহনীয় করে তুলেছিল সেনরাজাদের আমলে। দ্বাদশ শতাব্দী শেষ হতে না হতেই পশ্চিমবঙ্গে তুর্কী অভিযান শুরু হলো। তার ফলে যে সংঘাত হলো তাতে সুফল ও কুফল দুইই ফলেছিল। কুফল সম্বন্ধে সকলেরই অল্প বিস্তর ধাড়না আছে। কিন্তু সুফল কী তা অনেকেই জানেন না। সুফলের মধ্যে একটি হলো বৈষ্ণবধর্মের প্রাধান্য, ঘটনা ও তাতে ভক্তিরসের নতুন যোগান। এ যোগান এসেছিল দক্ষিণ ভারত থেকে। সে বিষয়টি আলোচনার যোগ্য —

ঋগ্বেদের ঐতিহ্যের সঙ্গে সঙ্গে এদেশে প্রাচীন অপবৈদিক (গান্ধর্ব) ঐতিহ্যও এসেছিল (সম্ভবত তা হয়ত ঋগ্বেদের ঐতিহ্যের কিছু আগেই এসেছিল)। বৈদিক যুগের অবসানের সঙ্গ সঙ্গে এই অন্তবার্হিত অপবৈদিক ঐতিহ্য বৈদিক পরবর্তী পৌরাণিক ঐতিহ্যের মধ্যে দিয়ে আত্মপ্রকাশ করেছিল। অপবৈদিক ঐতিহ্যের বেশ কিছু গল্প প্রথম প্রথম পৌরাণিক সাহিত্যে দেখা দেয়নি। তা জনগণের মধ্যে লোকসাহিত্যেই অনুশীলিত হয়ে এসেছিল দীর্ঘদিন ধরে। জনগণ অনুশীলিত গল্পগুলির মধ্যে প্রধান ছিল কৃষ্ণলীলা। আগেই বলা হয়েছে কৃষ্ণলীলার লৌকিক গল্পগুলির বীরত্বব্যঞ্জক কিছু কিছু কাহিনি উত্তরাপথে স্থাপত্যশিল্পে প্রথম উদগত হয়েছিল। কৃষ্ণের বাল্যকাহিনিগুলি ধর্মভাবনায় এবং সাহিত্যে প্রথম ব্যাপকভাবে অনুশীলিত হয়েছিল দাক্ষিণাত্যে। দক্ষিণভারতে এ বিষয়ে প্রথম রচনাগুলি বেরিয়েছিল দ্রাবিড় ভাষায়। কৃষ্ণলীলায় ভক্তিরসের অভিষেক এইভাবে হয়েছিল দ্রাবিড়ে। কথায় বলে — “উৎপন্না দ্রাবিড়ে ভক্তিঃ।”

ভক্তিরসের প্রথম অভিব্যক্তি ছিল দাস্যে, সখ্যে ও প্রেমে। সর্বশেষে আসে বাৎসল্যে। কৃষ্ণলীলায় বাৎসল্যরসের ভক্তির প্রবাহ ছোটার পিছনে খ্রিস্টান ধর্মের কিছু হাত ছিল বলে অনেকেই মনে করেন। দক্ষিণ ভারতের মালাবারে রোমান ক্যাথলিক খ্রিস্টানদির উপনিবেশ ছিল বহু শতাব্দীর। সেই ধর্মের প্রভাবে কৃষ্ণলীলার শিশু-বাৎসল্য-কথায় ভক্তিরসের বিশেষ ঢেউ এসে লেগেছিল দ্বাদশ শতাব্দীর কিছুকাল আগে। অচিরে বাৎসল্য ভক্তিরস উত্তরাপথেও প্রবাহিত হতে থাকে। বালগোপালের উপাসনা বাংলাদেশে ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়েছিল পঞ্চদশ শতাব্দীতে, চৈতন্যের জন্মের কিছুকাল আগে থেকে। এ কাজ করেছিলেন মাধবেন্দ্র পুরী। তিনি চৈতন্যের দাদাগুরু ছিলেন।

পশ্চিমবঙ্গে তুর্কি অভিযান ঘটেছিল ত্রয়োদশ শতাব্দীর ঠিক গোড়া থেকে। তখন বৃদ্ধ লক্ষ্ণণ সেন রাজাধিরাজ। তাঁর সভাসদেরা তুর্কি আক্রমণকারীদের সম্বন্ধে একমত ছিলেন না। একদল ছিলেন তুর্কিদের প্রতিকূল, আরেকদল ছিলেন তাঁদের অনুকূল। এই দ্বিধার জন্যই প্রথম তুর্কি আক্রমণেই লক্ষ্ণণ সেনের রাজ্যপাট ভেঙে যায়। তিনি পশ্চিমবঙ্গের মধ্যে লুকিয়ে পড়েন এবং অজ্ঞাতভাবে মারা যান। তুর্কিরা পশ্চিমবঙ্গ অনায়াসে অধিকার করে। লক্ষ্ণণ সেনের পুত্র এবং কিছু পাত্র-মিত্র পূর্ববঙ্গে চলে যান। ঘোড়সওয়ার তুর্কিরা যতদিন নাব্য পূর্ববঙ্গে পদার্পণ করতে পারেনি ততদিন — (প্রায় একশো বছর) পূর্ববঙ্গে স্বাধীন রাজত্ব চলেছিল। পশ্চিমবঙ্গে তুর্কি শাসকেরা রাজকার্যে গোড়া থেকেই হিন্দুর (মানে শক্তিশালী ব্রাহ্মণদের) সহায়তা পেয়েছিল, তাই দেশে মুসলমান অধিকারের ফলে খুব বেশি তাণ্ডব ঘটেনি জনপদগুলিতে। তবে বৌদ্ধবিহারে ও শৈবমঠগুলি লুণ্ঠনকারী তুর্কিদের তাণ্ডব এড়াতে পারেনি। সেগুলি বিনষ্ট হয়, এবং তার মাধ্যমে দেশের সংস্তৃতি প্রবাহের একটি ধারা প্রায় লুপ্ত হয়ে যায়। তবে ব্রাহ্মণ্য সংস্কৃতির চর্চা মঠে, বিহারে হতো না, হতো গ্রামে নিভৃত আবাসে। সুতরাং সে সংস্কৃতির ধারা আগেকার মতো সম্পূর্ণ না হোক, অনেকটা আগেকার মতোই প্রবাহিত ছিল। তুর্কি শাসনের সঙ্গে ব্রাহ্মণ সমাজের সহযোগিতার ফলে বাঙালী একটি বিষয়ে লাভবান হয়েছিল। সেটা হলো ভাষার দিক থেকে। শাসনকর্তা তুর্কি হলেও তাদের ব্যবহারিক ভাষা ছিল ফার্সি। ব্রাহ্মণরা অল্পস্বল্প ফার্সি শিখতে লাগলেন। ফার্সি ভাষাটি আরবি অক্ষরে লেখা হলেও বিজাতীয় নয়। ফার্সির মাতামহী প্রাচীন পারসিক, বাংলার মাতাময়ী সংস্কৃতের সহোদরা। তার ফলে ফার্সি ভাষার প্রভাব ধীরে ধীরে বাংলার উপর পড়তে শুরু করল, এবং বাংলা ভাষা নবীন, সরল রূপ ধারণ করল।

তুর্কি অভিযানের ফলে কিছুকালের জন্য বলতে পারা যায়, মোটামুটি ত্রয়োদশ শতাব্দীতে, পশ্চিমবঙ্গ পূর্ববঙ্গ থেকে যেন স্বতন্ত্র হয়ে গেল। আসোয়ার তুর্কিরা নাব্য সমতটে ও পূর্ববঙ্গে পা বাড়াতে অনেকদিন পর্যন্ত সাহস করেনি। এর দুটি ফল ফলেছিল। প্রথম ফল হলো এই যে পশ্চিমবঙ্গে তুর্কি শাসন ধীরে ধীরে জনগণের সহনযোগ্য হয়ে এসেছিল। দ্বিতীয় ফল হলো, দেশের সংস্কৃতির ধারাটি কিছুকালের জন্য সমতট ও পূর্ববঙ্গের দিকে প্রবাহিত হলো। সেন বংশের রাজ্যকালের আগে থেকেই সমতটের একটি বিশেষ অংশ চন্দ্রবংশের রাজাদের সময়ে বিশেষ উন্নতি লাভ করে খ্যাতিমান হয়েছিল। এই অঞ্চলের নাম ছিল শিলহট্ট (আধুনিক সিলেট), নামটির সংস্কৃত রূপ শ্রীহট্ট প্রাচীন হলেএ মূল নাম নয়। মূল নাম ছিল শিলহট্ট অর্থাৎ যে দেশ এত উর্বর ও সমৃদ্ধ যে সেখানকার হাটের ধুলোবালি থেকে শস্য কুড়িয়ে লোকে স্বচ্ছন্দে সংসার চালাতে পারে। অর্থের দিক দিয়ে “শ্রীহট্ট” কে শিলহট্টের অনুবাদ বলে নিতে পারা যায়। শ্রীহট্ট মানে লক্ষ্ণীর হাট। শ্রীচন্দ্রদেবের তাম্র শাসন থেকে জানা যায় যে এখানে প্রচুর বিহার-মঠ ছিল এবং সেখানে ধর্মের অনুষ্ঠান যেমন হতো বিদ্যার ও সংস্কৃতির চর্চাও তেমনি প্রবলভাবে হতো। সিলেটের অন্যতম প্রাচীন নাম যা অনুশাসনে পাওয়া যায়, “হরিকেল” অর্থাৎ হরির ক্রীড়া, তার থেকে সহজেন অনুমান করা যায় এ অঞ্চলে সাহিত্যে সঙ্গীতে ও শিল্পে শ্রীকৃষ্ণের কাহিনি বিশেষভাবে অনুশীলিত হতো। শিল্পে সিলেটের প্রাধান্যের একটি ভালো প্রমাণ পাওয়া গেছে, মৈথিল কবি পণ্ডিত জ্যোতিরীশ্বরের “বর্ণনরত্নাকর” বইটিতে। এই বইটিতে সিলেটি বস্ত্রের খুব প্রশংসা আছে। এখানকার “মেঘড়ম্বর”-এর (অর্থাৎ নীলাম্বরী শাড়ি) সেকালে আর্যাবর্তে খুব চাহিদা ছিল।

এহেন দেশের কালচার সেন্টার শিলহট্টে ত্রয়োদশ শতাব্দীর শেষ থেকে ধীরে ধীরে মুসলমান প্রভাবই বাড়তে লাগল। এ আগমন বিশেষ কোনো অভিযানের ধাক্কায় নয়। একজন মুসলমান পীরের পদাঙ্ক অনুসরণে। ত্রয়োদশ শতাব্দীর শেষের দিকে উত্তরপশ্চিম ভারত থেকে এক সুফী সাধকের আগমণ ঘটেছিল এদেশে। তাঁর নাম শাহ জালাল। “সেকশুভোদয়া” নামে একটি পুঁথি পাওয়া গেছে, তাতে এই পীরের অনেক মাহাত্ম্য বর্ণিত হয়েছে। সে কাহিনিগুলি স্বভাবতই সত্যমিথ্যায় বিজড়িত এবং সেগুলি লক্ষ্ণণ সেনদেবের সান্নিধ্যে উপস্থাপিত। পুঁথিটি লেখা হয়েছিল ষোড়শ শতাব্দীর শেষার্ধে। তবে বইটির বিষয়বস্তু কিছু আরো প্রাচীন গ্রন্থ থেকে সংকলিত বলে মনে হয়। পীরসাহেবের আগমন লক্ষ্ণণ সেনের সভায় ঘটেছিল বলে তথ্য পাওয়া যায় না। তথ্য বলে তাঁর কোনো পুত্র অথবা পৌত্রের সভায় শাহ জালালের আগমণ ঘটেছিল। পীর শাহ জালালের প্রবল প্রতিপত্তির বিষয়ে প্রমাণ আছে ইবন বতুতার ভ্রমণ বিবরণে। ইনি সিলেটে শাহ জালালের আস্তানায় গিয়েছিলেন চতুর্দশ শতাব্দীর পঞ্চম দশকের শেষের দিকে।

সমতট ও পূর্ববঙ্গের দিকে মুসলমান শক্তির অভিযান শুরু হয়েছিল চতুর্দশ শতাব্দীর শেষ দিক থেকে। তার ফলে পঞ্চদশ শতাব্দীর গোড়া থেকে সিলেট ও অপর সমতট ও পূববঙ্গ অঞ্চল থেকে সংস্কৃতিমান ব্রাহ্মণ-বৈদ্য-কায়স্থ পরিবার পশ্চিমবঙ্গে এসে গঙ্গাতীরে উপনিবিষ্ট হতে থাকে। আগেই উল্লেখ করা হয়েছে সেন আমলে গঙ্গাদেবী আর্যাবর্তের এক মুখ্য অধিদেবতারূপে স্বীকৃত হয়েছিলেন। গঙ্গাতীরে ব্রাহ্মণদের বাসরীতি চালু হয়েছিল বল্লাল সেনের আমল থেকে, মুসলমানদের আগমনের ফলে তা প্রায় দু-শতাব্দী যাবৎ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। পঞ্চদশ শতাব্দীর মধ্যভাগে তা আবার প্রকট হয়েছিল। এই শতাব্দীর শেষার্ধে সিলেট ও চাটিগ্রামের সংস্কৃতিমান ও সমৃদ্ধিশালী অনেক সম্ভ্রান্ত ব্রাহ্মণ, বৈদ্য ও কায়স্থ পরিবার নবদ্বীপ অঞ্চলে এসে গঙ্গাতীরে উপনিবিষ্ট হয়েছিলেন। এই উপনিবিষ্ট পরিবারদের মধ্যে যাঁরা শীর্ষস্থানীয় ছিলেন তাঁরা নিজেদের দেশ থেকে যথেষ্ট ধন এবং পুষ্ট সাংস্কৃতিক সৌরভ সঙ্গে করে নিয়ে আসতে সমর্থ হয়েছিলেন। এঁদের আনা সংস্কৃতি প্রবাহের একটি বড় স্রোত ছিল কৃষ্ণলীলা সম্বন্ধীয় গীতনটি। সিলেট ও সমতট থেকে সমাগত পণ্ডিতদের দ্বারাই মনে হয় নেপালের রাজসভার ও মিথিলার জমিদারসভার গীত এবং নাটপালা পশ্চিমবঙ্গে প্রচলিত হয়। সিলেট থেকে আগত পরিবারবর্গ এদেশের সম্ভ্রান্ত ও সাধারণ অধিবাসীদের সঙ্গে সহজেই মিশে গিয়েছিলেন। নবাগত ব্রাহ্মণ পণ্ডিতদের মধ্যে যাঁরা ধনী ছিলেন না তাঁরা এদেশের ধনীদের পোষকতা সহজেই পেয়েছিলেন।

এমনি এক নবাগত, নবদ্বীপে উপনিবিষ্ট ক্ষুদ্র ব্রাহ্মণ সংসারে শ্রীচৈতন্য জন্মগ্রহণ করেছিলেন। পরবর্তী সময়ে শ্রীচৈতন্য ‘নর রূপে নারায়ণ’ হয়ে ওঠেন ও তাঁর আবির্ভাবে বাংলায় নবজাগরণের সৃষ্টি হয়। (শেষ)

আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev