পূর্বভারতের যে জনমণ্ডলী বাঙলাভাষী বলে বাঙালী নামে পরিচিত তাদের ইতিহাসে মহত্তম সংগঠন হলো বিশ্বম্ভর শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য ভারতীর আবির্ভাব। চৈতন্যের জন্ম হয়েছিল পনেরো শতকের নবম দশকের শেষের দিকে। সে সময়ে বাংলাভাষী জনমণ্ডলীর যে সাধারণ মানসিকতা ছিল তা নাবালকের সুতরাং অপক। তাতে তার প্রতিবেশী জনমণ্ডলীর থেকে মানসিকতায় পৃথক করা যেত না। চৈতন্যের আবির্ভাবের পর থেকে অল্পকালের মধ্যে বাংলাভাষী জনমণ্ডলীর মানসিকতায় সাবালকত্ব প্রাপ্তি ঘটতে শুরু করেছিল। শ্রীচৈতন্যের দ্বারাই বাঙালী মানুষ (যাকে একটি অর্বাচীন বৈদিক গ্রন্থে পাখির সঙ্গে তুলনা দেওয়া হয়েছিল, “তানী মানি বয়াংসি বঙ্গা”) পাখির মতই খোলস ভেঙে বেরিয়ে এসে দিগন্তে উড়তে শিখেছিল। বাঙালীকে চৈতন্য শুধু বাঙালী — তাঁর সময়কার ভাষায় “গৌড়ীয়া” — না রেখে দিকে তাকে মানুষ হতে শিখিয়ে ছিলেন। তাঁর সময় থেকে বাঙালী মানুষের চরিত্রে ও মানসিকতায় যা কিছু ভালো তার প্রায় সবটাই তাঁর কাছ থেকে অথবা তাঁর সূত্রে পরে পাওয়া। কিন্তু সেই সঙ্গে এটাও স্বীকার করতে হয় যে বাঙালীর চারিত্রিক দুর্বলতাও তাঁর সূত্রে সঞ্জাত। চৈতন্যের ধর্ম আমাদের মনকে নরম করে দিয়েছে। হয়ত একটু বেশী মাত্রায়ই নরম। নরম ভাবের আধিক্য থেকে যতটা না হোক, বৈষ্ণবতার আধিক্য থেকেই বোধ হয় পরবর্তীকালে বাঙালী মানুষের চরিত্রে কিছু ভীরুতার আমেজ এসেছিল। এখানে বলে রাখা প্রয়োজন চৈতন্যের ধর্ম ভীরুর ধর্ম নয়, বীরের ধর্ম। তার প্রমাণ চৈতন্য বিরচিত শিক্ষাষ্টকের চতুর্থ শ্লোকে মিলবে।

ধর্ম নিয়ে সব সভ্য দেশে নানা শাস্ত্র, অনুশাস্ত্র ও উপশাস্ত্র প্রভৃতি রচিত হয়েছে। সে সবই বিশেষ পণ্ডিতের তর্ক, ইববাদ ও আলোচনার এবং ব্যাখ্যানের বস্তু। সাধারণ মানুষ তার থেকে জীবনের সঞ্চয় অথবা প্রাণের স্ফূর্তির উপাদান বিশেষ কিছু পায় না। যেটুকু পায় তা হলো বিশ্বাসের নির্ভরতা। আসলে ধর্মের খাঁটি নির্দেশ পাওয়া যায় মহাভারতের এই অত্যন্ত পরিচিত শ্লোকার্ধ থেকে —
“ধর্মস্য তত্ত্বং নিহিতং গুহায়াং।/মহাজনো যেন গতঃ সঃ পন্থাঃ ।।”
অর্থাৎ — ‘ধর্মের খাঁটি খবর গভীর গহ্বরে গাড়া আছে। যে দিকে মহৎ ব্যক্তি গমন করেছেন এবং যে দিকে বহুলোক তাঁর অনুসরণ করেছে সেই হলো প্রকৃত ধর্মপথ।’
ধর্ম মানে মানুষের সর্বাত্মক প্রকর্ষ। ধর্ম শুধু আধ্যাত্মিক উন্নতি আনে না। সেই সঙ্গে আনে তার চিত্তেরও উন্নতি অর্থাৎ সাংস্কৃতিক উন্নতি, যাকে ইংরেজিতে বলে “কালচারাল প্রগ্রেস।” চৈতন্যের ধর্ম থেকে আধ্যাত্মিক ও সাংস্কৃতিক, স্পিরিচুয়্যাল ও কালচারাল অভ্রান্ত নির্দেশ পাওয়া যায়।
তার কারণ ভাষার শৃঙ্খল। ভারতের উত্তরাপথে পূর্ব থেকে পশ্চিম পর্যন্ত সব অঞ্চলেই ছিল আর্যভাষী এবং সে আঞ্চলিক ভাষাগুলি যথাসম্ভব নিকট-সম্বন্ধ। এই কারণেই পূর্বভারতের সঙ্গে মধ্য ও পশ্চিমভারতের ধর্মকাণ্ডে অনেকখানি সমতা ছিল। সত্যি কথা বলতে, বৈদিক ধর্মভাবনার শেষ যুগের গ্রন্থ যে উপনিষদ, সেগুলির বিবেচনা করলে স্পষ্টই বোঝা যায় যে, ধর্মভাবনার মূখ্য কেন্দ্র মধ্যভারত থেকে পূর্বভারতে সরে এসেছিল। বৃহদারণ্যকে উপনিষদের ঋষি যাজ্ঞবল্কা, যিনি উপনিষদের একজন প্রধান ব্রহ্মজ্ঞ তাঁর বিচরণ ক্ষেত্র ছিল বিদেহ অর্থাৎ গঙ্গা বিধৌত পূর্বভারত। পূর্বভারতে এই বিদেহ অঞ্চলেই উপনিষদকালের প্রায় অব্যাবহিত পরেই দুটি নতুন অধ্যাত্ম মতের উদ্ভব হয়েছিল। এ মত দুটি পরবর্তীকালে হলো জৈন ও বৌদ্ধ। এ ধর্মমত দুটির উদ্ভবক্ষেত্র যে অন্-আর্যাবর্তের বাইরে ছিল এমন কথা জোর করে বলা যায় না। এই মত দুটির প্রাচীনতম নাম ছিল আর্হত ও সৌগত। আর্হত মানে অহং অর্থাৎ সিদ্ধ বা মুক্ত পুরুষের ধর্ম। এই ধর্মমতে জগৎকর্তা যিনিই হোন, প্রত্যেক মানুষ কিন্তু ঈশ্বরের স্বরূপ। সুতরাং মানুষের কর্তব্য ছিল ঈশ্বরপ্রাপ্তি নয় ঈশ্বর হওয়া। সৌগত মানে সু-গতের অর্থাৎ উত্তম গতিপ্রাপ্তের অর্থাৎ যিনি নির্বাণলাভ করেছেন সেই শাক্যসিংহের ধর্ম। এ দুটি ধর্ম প্রচলিত ব্রাহ্মণ্য ধর্মের, যা এখন বলা হয় হিন্দু ধর্ম তার সম্পূর্ণ বিরোধী। ব্রাহ্মণ্য ধর্ম চায় বংশবৃদ্ধি। সংসারে উন্নতি এবং পরকালে স্বর্গলাভ। নতুন ধর্মদুটি চায় ব্রহ্মচর্য্য অর্থাৎ বংশবৃদ্ধি নিরোধ, ভালমন্দ কোনোরকম কর্মপ্রচেষ্টা চায় না। ইহলোকে কোনোরকমে দিন গুজরান করাই একমাত্র উদ্দেশ্য, আর মরণান্তে চায় — একমতে, ঈশ্বরত্ব প্রাপ্তি, অপরমতে নির্বাণলাভ। এই দুটি মতই কিন্তু এসেছে এমন একটি অধ্যাত্ম ভাবনা থেকে যার উল্লেখ আছে অবাচীন বৈদিক শাস্ত্র আরণ্যক — উপনিষদে এবং যার বীজ খুঁজে পাওয়া যায় ঋগ্বেদে গন্ধর্ব-অপ্সরা-মুনি কাল্টে, ছান্দোগ্য ও বৃহদারণ্যক উপনিষদে।

সেকালের পরম জ্ঞানী-গুণী অধ্যাত্মপরায়ণ ব্যক্তিদের দুভাগে ভাগ করা হয়েছে — ‘ব্রাহ্মণ’ ও ‘শ্রমণ’। ব্রাহ্মণ ঋষি হলেন বেদবিদ্যায় পরম পণ্ডিত। যাগযজ্ঞ করেন। শ্রমণ পণ্ডিত হলেও যাগযজ্ঞ করেন না। তাঁরা তার উপরে উঠে গিয়ে সংসার ত্যাগ না করেও অরণ্যে নিবাস করেন অর্থাৎ তাঁরা সংসার বিমুখ। এই শ্রমণরাই হলেন আসল ব্রহ্মজ্ঞ। এই শ্রমণ সম্প্রদায় থেকেই খ্রিস্টপূর্ব প্রথম শতাব্দীর মধ্যভাগে নূতন আধ্যাত্ম সম্প্রদায় দুটির উৎপত্তি ঘটেছিল। যে সম্প্রদায়টি জৈন বলে চিহ্নিত সে সম্প্রদায়ের যিনি মূল গুরু তাঁর জন্ম হয়েছিল আধুনিককালের মজঃফরপুর জেলায়। এই সম্প্রদায় নিরীশ্বর ছিলেন এই অর্থে যে তাঁরা একটি ঈশ্বরকে মানতেন না, তাঁর মানতেন যে প্রত্যেকেই সিদ্ধ হলে ঈশ্বর হবেন। এই জন্য এঁদের ধর্মে ঈশ্বর বলে কিছু নেই। আছে সিদ্ধিপ্রাপ্ত গুরু পরম্পরা। তাঁদের বলা হতো অর্হৎ। সেই জন্যে এই ধর্মভাবনারও নাম হয়েছিল আর্হতমত। জৈন শব্দটিরও অনুরূপ অর্থ। জৈন মানে যিনি জন্মান্তরপ্রবাহ লুপ্ত করে জিন অর্থাৎ জয়ী হয়েছিলেন। ব্রহ্মজ্ঞ হলেও অর্হৎ স্বয়ং ব্রহ্ম অর্থাৎ উপনিষদের “তৎত্বম অসি” এই মহাবাক্যের উদাহরণ। বৌদ্ধরা ব্রহ্মজ্ঞ হয়েও ব্রহ্ম হতে চাইতেন না, চাইতেন ব্রহ্মে ডুবে যেতে। এঁরা হলেন উপনিষদের সেই মহাবাক্যের উদাহরণ — “আনন্দাদ্ধ্যেব অল্বিমানি ভূতানি জায়ন্তে … তদ্ বিশন্তি”। জৈন আর বৌদ্ধদের মধ্যে একটি বড়ো তফাৎ আছে। জৈনদের একটি বড়ো সম্প্রদায় একেবারেই উলঙ্গ থাকতেন। আর একটি সম্প্রদায় সাদা কাপড় পরতেন। বৌদ্ধরা পরতেন গেরুয়া কাপড়। শ্রমণদের দুই শাখার এই ভিন্ন রুচি এদের মূল যে গন্ধর্ব কালটের মুনি তাঁদেরও এই বৈশিষ্ট্য ছিল। তাঁরা কেউ কেউ উলঙ্গ থাকতেন — আর অপরে হয় গেরুয়া ধুলো গায়ে মাখতেন অথবা গেরুয়া ধুলোয় রঙীন কাপড় পরতেন। (চলবে)