“ম্যায় জিন্দেগি কে সাথ নিভাতা চলা, হর ফিকির কো ধুঁয়ে মে উড়াতা চলা…”
হিন্দি চলচ্চিত্রের চির তরুণ রোম্যান্টিক নায়ক দেব আনন্দ। এই প্রাণবন্ত মানুষটির কাছে কাজ ছিলো নেশা ও পেশা। সর্বদাই কাজ নিয়ে এমন ব্যস্ত থাকতেন যা অনেক যুবককেও অবাক করিয়ে দেয়। অভিনয় করতেন নিজস্ব স্টাইলে। অসংখ্য ভক্ত তাঁর। একসময় তাঁর ভক্তরা গুরুদেবের পোশাক, চুলের স্টাইল, চলনবলন নকল করে ভারি আনন্দ পেত। অভিনয়, প্রযোজনা, পরিচালনা কত কিছুই না করেছেন। তাঁর নির্মিত নির্দেশিত শেষ ছবি চার্জশিট তার শেষ জন্মদিনের চারদিন পর মুক্তি পেয়েছিলো। আজকের প্রতিবেদন তাঁকে ঘিরে নানান জানা অজানা কথা নিয়ে জন্মদিনে স্মৃতিচারণ।
১৯২৩ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর, পাঞ্জাবের গুরুদাসপুর জেলার শাখরগড় তহশিলে জন্ম গ্রহণ করে ধরম দেব পিশোরিমল আনন্দ। বাবা পিশোরিমল ছিলেন গুরুদাসপুরের সবচেয়ে নামী আইনজ্ঞ। তার আর দুই পুত্রের নাম চেতন ও বিজয়, কন্যা শীলকান্তা। এই শীলকান্তাই নির্দেশক শেখর কাপুরের মা।

১৯৪৬ প্রথম সিনেমা ‘হম এক হ্যায়’, এরপর ‘আগে বাড়ো’ (নায়িকা খুরশিদ), ‘মোহন’ (নায়িকা হেমবতী)। প্রথম তিনটে ছবি ফ্লপ হয়ে গেলে দেব আনন্দ অভিনয় ছেড়ে দেবেন বলে ঠিক করেন। এই সময় অশোক কুমার দেবের বিপরীতে কামিনী কৌশলকে রেখে ‘জিদ্দি’ ছবিটি বানান। জিদ্দি হিট হাওয়ার পর দেব কে আর পিছনে তাকাতে হয়নি। ১৯৫০-এ দেবানন্দ অভিনীত ৯টি ছবি রিলিজ করে যে হিট হাওয়ার রেকর্ড করে রেখেছেন, তা আজো বিস্ময়কর।
হিন্দি ছবির জনপ্রিয় অভিনেত্রী সুরাইয়ার সঙ্গে দেব আনন্দ এর প্রেমের কথা সবাই জানেন। সুরাইয়া-দেব জুটির ‘বিদ্যা’ আর ‘নমুনা’ ছবি হিট হয়ে গেলে জুটিটি দারুন জমে যায়। বয়সে ছোট হলেও সুরাইয়া কর্মক্ষেত্রে দেবের সিনিয়র। দেশ ভাগে নুরজাহান চলে গেলে সুরাইয়া তখন ভারতের নাম্বার ওয়ান গায়িকা। অভিনয়, সুকণ্ঠ আর সৌন্দর্য সব মিলিয়ে তখন তিনি আকাশের চাঁদ।
গ্রেগরি পেগের প্রচণ্ড ভক্ত সুরাইয়া, দেবের মধ্যে গ্রেগরির ছায়া দেখতে পান। শুরু হয় ভালোলাগার কাহিনী।

“খোয়াব হো তুম ইয়া কোই হকিকত”-এর আবেশে একটু করে মেলামেশা, গল্পগুজব শুরু হয়। একদিন ‘নমুনা’ শুটিংয়ের ফাঁকে সুরাইয়া দেবের মেকআপ রুমে ঢুকে গিয়ে জিজ্ঞেস করে, ‘আমি কিন্তু তোমাকে দারুন ভালোবেসে ফেলেছি। তুমি কি আমাকে ভালবাসতে পারবে?’ এমন সুন্দরী গুণী অভিনেত্রীর সঙ্গে কাজ করতে করতে দেবের ও যে ভালো লাগবে, এটাই স্বাভাবিক। কিন্ত স্বভাব অনুসারে দেবের পক্ষে তা প্রকাশ করা সম্ভব ছিলো না। তবে সুরাইয়ার ভালবাসার ডাকে দেব সানন্দেই সাড়া দিয়েছিলেন। ক্রমে দুজনের গভীর প্রেমের কথা চারিদিকে ছড়িয়ে পড়েছিল।
সুরাইয়া পরিবারের সর্বেসর্বা ছিলেন তাঁর নানী। পরিবারের কারো নানীর ওপর কথা বলার ক্ষমতা ছিল না। নানী যখন নাতনির বেজাতের সঙ্গে ভালবাসার কথা শুনলেন তখন তিনি সেটি বরদাস্ত করতে পারলেন না। নাতনিকে প্রচণ্ড বকাবকির সঙ্গে শুরু হলো চোখে চোখে রাখা।

এরপর দেব-সুরাইয়া জুটির ‘দো সিতারে’ ছবির শ্যুটিং শুরু হতেই নানী নাতনির অগোচরে লোক লাগিয়ে দেবের সঙ্গে সুরাইয়ার মেলামেশা বন্ধ করে দিলেন। এই সময় প্রেমিক যুগলের চিঠি আদান প্রদানের জন্য গুরুদত্তের সাহায্য নিতে হয়েছিলো।
১৯৫১ তে ‘দো সিতারে রিলিজ হওয়ার আগে ‘সনম’ ছবির শ্যুটিং শুরু হয়। শুটিংয়ের ফাঁকে জুটি ঠিক করে সনম-এর কাজ শেষ হওয়ার পর অন্যত্র পালিয়ে গিয়ে বিয়ে করবে। নির্দিষ্ট দিনে দুজনে পালিয়েও যান।
এদিকে নির্দিষ্ট দিনে নিজের লোকের মাধ্যমে তা জানতে পেরে নানী ফোন করে পুলিশের কাছে দেবের বিরুদ্ধে। পুলিশ দু-জনকে ধরে নিয়ে আসে থানায়। নানী সুরাইয়াকে নিয়ে বাড়ি চলে যান। এরপর সুরাইয়ার জীবনে নেমে আসে বিচ্ছেদের যন্ত্রণা আর নানীর গঞ্জনা। বাগদত্তা রূপে দেব-সুরাইয়াকে তখনকার দিনে ৩ হাজার টাকার হিরের আংটি পরিয়ে দিয়েছিলেন দেব। পরদিন ভোরে নানী সেই আংটি আঙ্গুল থেকে জোর করে খুলে সমুদ্রের জলে ভাসিয়ে দিয়ে আসেন। সুরাইয়াকে কোরান ছুঁয়ে আল্লার নাম নিয়ে প্রতিজ্ঞা করান, ‘এখন থেকে সারা জীবন দেব আনন্দর সঙ্গে কোন সম্পর্ক রাখবো না’।

সব জেনে দেব প্রচণ্ড আঘাত পান। একান্তে কেঁদে ভাসিয়েছেন। সুরাইয়াকে দেব কোনোদিন ভুলতে পারেননি। সুরাইয়াও এতোটাই ভালোবেসেছিলেন, কোনোদিন আর বিয়েই করলেন না।
এত নায়িকার সঙ্গে অভিনয় করেছেন দেব, স্বল্প পরিসরে তাদের কথা বিশদভাবে আলোচনা করা সম্ভব নয়। তাদের মধ্যে নার্গিস, মধুবালা, মীনাকুমারী, সাধনা, কামিনী কৌশল, আশা পারেখ, বৈজয়ন্তিমালা ছিলেন স্পেশাল। কামিনী কৌশলের সঙ্গে তাঁর প্রেম ভালোবাসার কাহিনী কিন্তু অনেকেরই অজানা।
১৯৫০-এ দেব আনন্দ তাঁর নিজস্ব প্রোডাকশন হাউজ “নবকেতন” তৈরি করেন। নবকেতন এর ব্যানারে ৬২টি ছবি তৈরি হয়। তবে দেবের নির্দেশিত ছবি সেরকম ভাবে কোনোদিন হিট হয়নি। ‘হমসফর’ ছবিতে কল্পনা কার্তিকের সঙ্গে অভিনয় করেন। কল্পনা নবকেতনের অংশ হয়ে যান। ১৯৫৭ সালের চলচ্চিত্র ‘নাউ দো গিয়ারাহ’ পরিচালক ছিলেন বিজয় আনন্দ (দেব আনন্দের আরেক ভাই)। ১৯৫৪ সালের চলচ্চিত্র ‘ট্যাক্সি ড্রাইভার’-এর শুটিং চলাকালীন দেব আনন্দ এবং কল্পনা বিয়ে করেন। ১৯৫১ থেকে ‘৫৭ পর্যন্ত সব কটি চলচ্চিত্রে কল্পনা দেব আনন্দের নায়িকাই ছিলেন।

নতুন তারকা খুঁজে বের করতে দেব সাহেবের জুড়ি মেলা ভার ছিলো। টিনা মুনিম, জিনাত আমন, রিচা শর্মা, নাতাশা সিনহা, ফতেমা শেখ, দীপশিখা ওনার হাত ধরেই ফ্লিম ইন্ডাস্ট্রিতে এসেছিলেন। এরকম রেকর্ড সম্ভবত আর কোন চিত্রনির্মাতার নেই।
বাঙালি মেয়েদের সৌন্দর্যকে আলাদা চোখে দেখতেন দেব। শর্মিলা ঠাকুর, রাখী গুলজার, সুচিত্রা সেনের প্রশংসা করতেন। হৃষিকেশ মুখার্জীর ‘আসলি নকলি’ ছবিতে দেবের বোনের ভূমিকায় অভিনয় করেন মিষ্টি নায়িকা সন্ধ্যা রায়।

ড্রিম গার্ল হেমা মালিনীর সঙ্গে ১৯৭০ সালে ‘জনি মেরা নাম’ হিট হয়। ‘৭১ এ দেবের কেরিয়ারে অন্যতম হিট ছবি ‘হরে রাম হরে কৃষ্ণ’ মমতাজ নায়িকা ছিলেন। দেবের বোনের ভূমিকায় ছিলেন জিনত আমন। তাঁর আত্মজীবনী, রোমান্সিং উইথ লাইফ (২০০৭) এ দেব লিখেছিলেন “অবচেতনে, আমরা একে অপরের সাথে আবেগগতভাবে সংযুক্ত হয়ে পড়েছিলাম। হঠাৎ একদিন আমি অনুভব করলাম যে আমি জিনাতকে খুব ভালোবেসে ফেলেছি — এবং তাকে বলতে চেয়েছিলাম!”
অনেক হিট ছবি দর্শকদের জন্য রেখে গেছেন দেব। প্রায় পঞ্চান্ন বছর বয়স অবধি লিড রোল করেছেন। বলিউডের মহা নক্ষত্র ৮৮ বছর বয়সে অস্তমিত হন। কাজ পাগল মানুষটি মৃত্যুর আগে পর্যন্ত ছবির কাজ করে গেছেন। তাইতো দেব আনন্দ শেষ পর্যন্ত চির সবুজই রয়ে গেলেন। তাঁর কথা দিয়েই আজকের লেখার ইতি টানি।

‘অতীতে বাস করতে নেই। বরঞ্চ ভাবা উচিৎ যে প্রাপ্তির কোনও শেষ সীমা হয়না। মানুষ যতটুকু পেয়েছে সেখান থেকে তার ফের ঝাঁপানো উচিৎ। আরও, আরও, আরও… ‘
কৃতজ্ঞতা স্বীকার : গৌতম ভট্টাচার্য, টুলু দাস ও উইকিপিডিয়া।।
Khub valo laglo pore
থ্যাংক ইউ ❤️❤️
ভালো লেখা
খুব খুশি হলাম ❤️
Dev Saab …the legendary actor
Thanks dear ❤️????
অনেক ঘটনা আমরা অনেকেই জানিনা,,, দেব আনন্দ এর এমন biopic প্রথম জানলাম আপনার লেখনীর মাধ্যমে,, ধণ্যবাদ জানাই আপনাকে ????????????
থ্যাংক ইউ বন্ধু ????