Historiography এর আভিধানিক অর্থ হলো ইতিহাস সংকলন বিদ্যা। এই বিদ্যার বিবর্তন ও হয়েছে সময়ের সাথে। উনিশ শতাব্দীতে তার ই হাত ধরে আসে সংকলনের একটি ধারা Empiricism — যার উদ্ভাবক হলেন লিওপোল্ড ভন রেনকে। এই ধারায় ইতিহাস রচনায় দরকার হয়ে পড়লো প্রমান বা Proof, নথী Document! শুধুমাত্র প্রমান বা নথী নয় পরবর্তি কালে যখন Modern empiricism এলো, লর্ড গডফ্রে এলটনের হাত ধরে তখন তথ্য ব্যাখ্যার জন্য দরকার হয়ে পড়লো Context — Political ও social context, লর্ড এলটনের কথায় —”our understanding of the past will always be incomplete. Must understand the context deeply to interpret the history!” রিভিউ তে।
আলোচ্য গ্রন্থটির লেখক খানাকুলের ভূমিপুত্র, গ্রন্থ পিপাসু দেবাশিস শেঠ মহোদয়! তার আবাসস্থল থেকে রাজা রামমোহনের জন্মভিটে খুব বেশি দূরে অবস্থিত নয়,ফলে পঠন-পাঠনের সাথে তার ভৌগোলিক নৈকট্য এই গ্রন্থটিকে আলাদা মাত্রা দিয়েছে। রামমোহন ও তার সমসাময়িক ইতিহাস ব্যাখ্যা করতে গিয়ে দেবাশিস বাবু Empiricism ও Modern empiricism এর উপর জোর দিয়েছেন। গ্রন্থের শেষের দিকে গ্রন্থঋণ বিভাগটিতে চোখ বোলালেই তার সম্যক উপলব্ধি হয়।
ঐতিহাসিক সুমিত সরকার Modern India 1885- 1947 গ্রন্থটির ইতিহাস সংকলন বিদ্যা কিভাবে অন্যদের থেকে আলাদা সেটা লিখতে গিয়ে ভূমিকায় লেখেন—”Distinct from the usual tendency in the historiography of Indian nationalism to concentrate on the activities, ideals or factional maneuvers of Leader” (page xiii)! দেবাশিস বাবু ও তার লেখায় শুধুমাত্র রাজা রামমোহন কে নিয়ে আবদ্ধ থাকেন নি টেনে এনেছেন আরও চরিত্র কে সংশ্লিষ্ট Context থেকে। আবার কোথাও কোথাও ফিরে গেছেন রোমিলা থাপারের “Roots”-এ —”…. with the claims of having roots in the past, it became necessary for historians to unpack the past to discover the actual roots.” (On nationalism, Romila Thapar, Page No. 21,22) — এই যুক্তির সারবত্তা খুঁজে পাওয়া যায় গ্রন্থের ১০২, ১০৩ পাতার মতো বহু স্থানে; যেখানে আলোচিত হয়ে বাবু সংস্কৃতি, সমসাময়িক যুব সমাজের অবক্ষয়ের কথা।
তথ্যনিষ্ঠ এই গ্রন্থটি ১৫টি অধ্যায় বিভক্ত। ভূমিকাতেই লেখক স্বীকার করেছেন—”এই বইকে রাজা রামমোহন রায়ের জীবনী গ্রন্থ ঠিক বলা যাবে না যদিও শেষ পর্যন্ত তাকে ঘিরেই আবর্তিত হয়েছে আমার যাবতীয় আলোচনা।” লেখকের এই যুক্তির সমর্থনে আমরা আশ্রয় নিতে পারি M.H. Abraham ও Geoffrey Galt Harpham লিখিত A Glossary of Literary Terms গ্রন্থের ২৯ পৃষ্ঠায় — “Late in the seventeenth century, John Dryden defined biography neatly as the history of particular men’s lives!” — কিন্তু লেখক এখানে শুধু মাত্র রামমোহন কে নিয়ে আটকে থাকেন নি! আলোচিত হয়েছে ইতালির রেনেসাঁস, সমসাময়িক মুসলিম সমাজের অনগ্রসরতা ইত্যাদি। আবার রামমোহন দেবতার স্থানে উত্তরিত করে উনি Hagiography ও লেখেন নি।
বাংলা রেনেসাঁসের প্রেক্ষাপট হিসেবে লেখক ইতালির রেনেসাঁস কে, ভারতের পাশ্চাত্য দর্শনের প্রভাব কে দায়বদ্ধ করেছেন; যা প্রাচীন ক্লীব স্থবিরতা থেকে ভারতবর্ষকে মুক্তি দিয়ে নতুন শক্তির উপাসনার পথ প্রশস্ত করেছে। ঋষি অরবিন্দ বুঝি তার কথাই বলেছেন তার দ্য রেনেসাঁস ইন ইন্ডিয়া। এই গ্রন্থে অরবিন্দ বলেন — “what we see is a giant Shakti who is awakening into a new world, a new and alien environment finds herself shackled in all her Limbs by a multitude of gross or minute bonds…. is struggling to be free from them to arise and proclaim herself to cast abroad her spirit and set her seal in the world”!
সতীদাহ-সহ বিভিন্ন কুসংস্কার দূরীকরণের জন্য রামমোহনের অগ্রদূত হিসেবে ভূমিকার কথা যেমন বলা হয়েছে তেমনি ব্রিটিশ শাসক লর্ড বেন্টিংক এর ভূমিকাও যে অপরিসীম ছিল, সে কথা এই গ্রন্থে উল্লিখিত আছে।ঐতিহাসিক Percival Spear তার History of India গ্রন্থে বলেছেন —” She was Sati or Devoted…. For over twenty years successful Governors General hesitated to move but when Bentinck acted there was surprisingly little opposition… A small Bengali Group led by Rammohan Ray actually supported him.” তবে লর্ড বেন্টিংক এর এই আগ্রহের পিছনে তার utilitarianism এর উপর আস্থা কে দায়বদ্ধ করেন ঐতিহাসিক শেখর বন্দ্যোপাধ্যায়।
দেবাশিস বাবু তার গ্রন্থে রামমোহনের হিন্দু ধর্মকে, বেদান্ত নির্ভর হিন্দু ধর্ম হিসেবে দেখেছেন। তার সমর্থন ঐতিহাসিক Percival Spear তার History of India গ্রন্থে একই ধরণের মন্তব্য করেছেন— “He considered that reason as expressed in the Upanishads was the basis of Hindu religion and that all social institutions or customs should be judged from that point!” ( page 164)!
ন্যুইয়র্কের এশিয়ান স্টাডিজের অধ্যাপক রফিউদ্দিন আহমেদ তার “Bengal Muslims 1871-1906 : a quest for identity” গ্রন্থে লিখেছেন “The Muslims lagged behind. The movement in favour of Western education started among them very late in the Nineteenth Century. (page 133). দেবাশিস বাবুর গ্রন্থটিতে তৎকালীন মুসলিম জনগোষ্ঠীর পাশ্চাত্য শিক্ষায় পিছিয়ে থাকার কারণে, রেনেসাঁসে সক্রিয় অংশগ্রহনে অক্ষমতার বিষয়টি ও আলোচিত হয়েছে।

লেখক ঐতিহাসিক তথ্য দিয়ে বলেছেন যে রামমোহন প্রথমদিকে সতীদাহ প্রথার লুপ্ত করার বিরুদ্ধেই ছিলেন। আমার ব্যক্তিগত মতামত — সমসাময়িক স্থান বিশেষে বিদ্যমান সামজিক অবস্থা ও হিন্দু সম্পত্তি আইন (দায়ভাগা ও মিতক্ষরা) সতীদাহ কে বিশেষ বিশেষ অঞ্চলে জনপ্রিয় ও একই সাথে অপ্রচলিত ও করেছিল। সতীদাহের এই যে ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতা সেটা বোধহয় রামমোহন লক্ষ্য করেছিলেন — “The practice had become most widespread in those area Where Dayabhaga school of personal law was applicable” (The illegitimacy of Nationalism, Ashis Nandy: collected from Plassey to partition by Sekhar Bandopadhyay)! সতীদাহের পিছনে যেহেতু অন্যতম কারণ ছিলো বিধবার সম্পত্তি দখল তাই দায়ভাগা হিন্দু আইন যেসব হিন্দুরা মান্য করতো সেখানেই সতীদাহ বহুল প্রচলিত ছিলো। কারণ এই আইনে বিধবা প্রচুর সম্পত্তি স্বামীর ওয়ারিশ হিসাবে লাভ করতো। অন্যদিকে ঐতিহাসিক শেখর বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন — এই প্রথা মূলত রাজস্থান ও উত্তর ভারতের কিছু অংশ, কলকাতা ও তার লাগোয়া এলাকার প্রসার লাভ করে। রামমোহন যে প্রথম দিকে সতীদাহ আইন দিয়ে রদ করতে চাননি সেটার কারণ ঐতিহাসিক শেখর বাবুর যুক্তি ও হতে পারে।
সতীদাহ যে বাংলায় একটি Social mobility এর বিষয় হয়ে গেছিল সেটা লেখক বলেছেন ১১৫ পাতায় — “….সতীর আত্মাহুতির মূল্যকে আরও উজ্জ্বলতর করেছে”! এর সমর্থন খুঁজে পাওয়া যায় ঐতিহাসিক রজত কান্ত রায় প্রণীত “Introduction to Rammohun Roy and the process of modernisation” এই গ্রন্থে নিম্ন ও মধ্যবর্তী হিন্দুজাতি ভূক্ত মানুষ সামাজিক সোপানে, কিভাবে সতীদাহ কে ব্যবহার করে উচ্চবর্ণের কাছাকাছি পৌছাতেন সে সম্পর্কে ও লিখেছেন — “Here it became popular not only among the upper castes, but also among the peasant families of lower and intermediary castes, who achieved social mobility and then sought to legitimise their new status by imitating their caste superiors!”
লেখক রামমোহনকে সমসাময়িক বাংলাদেশ তথা ভারতবর্ষে বিজ্ঞান ও সাহিত্য প্রসারের অগ্রদূত বলেও কোন অতিরঞ্জন করেননি— “..intellectuals like Ram mohun Roy proposed for his Countryman an education system that would focus on western Sciences. In Calcutta, in 1825, a society for translating European sciences was set up… ” (From Plassey to partition and after — Sekhar Bandopadhyay, page 145)।
দেবাশিস শেঠ এর এই গ্রন্থটিকে একটি তথ্য নিষ্ঠ জীবনী ও গবেষণা লব্ধ ইতিহাসের বিজ্ঞানসম্মত মিশ্রণ বললে অত্যুক্তি হবে না।
গ্রন্থটির আরেকটি তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো কিছু দুর্লভ ফটোগ্রাফ।
যারা ইতিহাস অধ্যয়ন করেন, ইতিহাস নিয়ে গবেষণা করছেন তাদের জন্য এই গ্রন্থটি একটি প্রামাণ্য গ্রন্থ। গ্রন্থের প্রকাশক দাশগুপ্ত পাবলিশার্স। মূল্য ২০০ টাকা।
বাহ্, খুব ভালো লাগলো
একজন উচ্চপদস্থ পুলিশ অফিসার হিসেবে দায়িত্ব সামলানোর পরেও এরকম একটি অসাধারণ লেখা আমাদের মুগ্ধ করেছে। আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি
খুব সুন্দর আলোচনা। পড়লেই বোঝা যায় ইতিহাস আলোচনায় তাঁর কতটা দখল।
ভালো লাগলো, বইটি পড়ার অপেক্ষায় রইলাম।। ধন্যবাদ
সুন্দর লেখা। অভিনন্দন।
মুসলিম সমাজে কি সতীদাহ প্রথা ছিল?