বাংলাদেশে মানবিক আশ্রয়ে থাকা ১.১ মিলিয়ন রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের অপেক্ষায় অনিশ্চয়তার মধ্যে দিনাতিপাত করছে। মিয়ানমারে নিরাপদ, টেকসই এবং মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের মধ্যেই নিহিত রয়েছে রোহিঙ্গা সমস্যার স্থায়ী সমাধান। মিয়ানমারের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিমণ্ডলে যথোপযুক্ত পদক্ষেপ ও অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টির মাধ্যমে মর্যাদাপূর্ণভাবে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন সম্ভব তবে এই বিষয়ে অগ্রগতি তেমন আশাব্যঞ্জক নয়। সেখানে রোহিঙ্গাদের প্রতি সহানুভূতিশীল কোন গুরুত্বপূর্ণ ফোরাম কিংবা সমর্থকদল নেই, এই দুর্বলতা প্রথম থেকেই অনুধাবন করা গেলেও এর প্রতিকারে কোন ধরনের সফল প্রচেষ্টার কথা শোনা যায়নি।
সেনা অভ্যুত্থানের পর গঠিত মিয়ানমারের জাতীয় ঐক্যের সরকার (এন.ইউ.জি), ‘রোহিঙ্গা’ হিসেবে তাঁদের পরিচয়ের স্বীকৃতি দিয়ে ‘পলিসি পজিশন অন দ্য রোহিঙ্গা ইন রাখাইন স্টেট’ নামে একটি অবস্থানপত্র প্রকাশ করেছে। এই স্বীকৃতির মাধ্যমে মিয়ানমারের গণতন্ত্রপন্থী দলগুলোর অবস্থানের পরিবর্তন সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। এর আগে মিয়ানমার সরকার ও সামরিক বাহিনী দাবী করে আসছিল যে ‘রোহিঙ্গা’ বলে কিছু নেই।এই অবস্থানপত্রে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব ও অধিকারের স্বীকৃতির পাশাপাশি রোহিঙ্গাদের বিদেশি হিসেবে চিহ্নিতকারী ‘ন্যাশনাল ভেরিফিকেশন কার্ড’ বাতিল এবং ১৯৮২ সালের নাগরিকত্ব আইনে পরিবর্তন আনার কথাও বলা হয়েছে। এন.ইউ.জির এ অবস্থানপত্রে উল্লিখিত প্রতিশ্রুতিগুলোতে রোহিঙ্গাদের প্রায় সব দাবিদাওয়ার প্রতিফলন আছে।

২০১৭ সালের রোহিঙ্গা সংকট শুরু হওয়ার পর মিয়ানমারের রাজনীতিকদের রোহিঙ্গাদের অধিকারের পক্ষে এভাবে কথা বলতে দেখা যায়নি। এর পাশাপাশি আরাকানের ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল ইউনাইটেড লীগ অব আরাকান (ইউ.এল.এ)-এর সামরিক শাখা আরাকান আর্মির (এ.এ) কমান্ডার ইন চিফ জেনারেল ওয়াং ম্রা নাইং জানায় তারা রোহিঙ্গাদের ‘রাখাইনের মুসলমান অধিবাসী’ এবং রোহিঙ্গাদের মানবাধিকার ও নাগরিক অধিকার স্বীকার করে। রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানের জন্য এই গ্রহণযোগ্যতা রোহিঙ্গাদের প্রতি তাঁদের মনোভাব পরিবর্তনের একটা ইতিবাচক অগ্রগতি। মিয়ানমারের রাজনৈতিক মহলে এবং আরাকানের স্থানীয় রাজনীতিতে রোহিঙ্গাদের গ্রহণযোগ্যতা সংকট সমাধান ত্বরান্বিত করবে।
এই ঘোষণাপত্রের মাধ্যমে এন.ইউ.জি রোহিঙ্গাদেরকে মিয়ানমারের মূলধারার সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে। জাতীয় ঐক্যের সরকারে রোহিঙ্গা প্রতিনিধিত্ব থাকলে ভবিষ্যৎ আলোচনার সময় তাদের দাবী উপেক্ষা করা যাবে না। এন.ইউ.জি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে স্বীকৃতি ও সমর্থন চায় এবং দেশের মধ্যে তাঁদের সমর্থক বাড়াতে আগ্রহি। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে বিদেশে অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের উচিত আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এ উদ্যোগের পক্ষে সোচ্চার হওয়া। এই রাজনৈতিক উদ্যোগে রোহিঙ্গাদের যোগ দেয়া একটা গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত। এন.ইউ.জি ও আরাকানের ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের সাথে অভিবাসী রোহিঙ্গা নেতৃবৃন্দ যোগাযোগ অব্যাহত রেখে বিভক্তি গুছিয়ে বহু যুগ ধরে চলে আসা দুই জাতিস্বত্বার সহবস্থান ও সহনশীলতা ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিতে পারে।
মাননীয় প্রধান মন্ত্রী মানবতার জননী শেখ হাসিনা মানবিক বিবেচনায় রোহিঙ্গাদেরকে বাংলাদেশে আশ্রয় দিয়ে তাঁদের জন্য সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। সেই থেকে বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে আন্তরিকভাবে কাজ করছে। রোহিঙ্গারা তাদের প্রত্যাবাসন নিয়ে দীর্ঘ অনিশ্চয়তার কারণে হতাশ হয়ে পড়ছে, এটি তাদের অনেককে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত হতে প্ররোচিত করছে। সেইসাথে প্রত্যাবাসন বিরোধী একটা দল ক্যাম্পসগুলোতে নানাবিধ আইনশৃঙ্খলা বিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত হয়ে শান্তি ও নিরাপত্তা বিঘ্নিত করছে।

রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটস (এআরএসপিএইচ) সংগঠনটি রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারের নাগরিকত্ব ফিরে পাওয়া এবং বিভিন্ন দেশে পাচার প্রতিরোধে সোচ্চার এই সংগঠনের চেয়ারম্যান মুহিবুল্লাহ রোহিঙ্গাদের খুন, ধর্ষণ, চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসাসহ বিভিন্ন ধরনের অপকর্মের বিরোধিতা করতেন। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনবিরোধী সন্ত্রাসী সংগঠন ভবিষ্যতে আরসার কর্মকাণ্ডের জন্য মুহিবুল্লাহ হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারেন—এ ভাবনা থেকে পূর্বপরিকল্পিতভাবে ২০২১ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর রাতে তাঁকে হত্যা করে। বর্তমানে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনবিরোধী সন্ত্রাসী সংগঠন আরসা বাংলাদেশের ভিতর নানা ধরনের সহিংসতার মাধ্যমে দেশের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করছে যা কোনভাবেই কাম্য নয়। বাংলাদেশে অবস্থানরত রোহিঙ্গাদেরকে এখানে সহিংস ঘটনা না ঘটিয়ে এন.ইউ.জি.ও.এ-এর সাথে সম্পর্ক উন্নয়ন করে রোহিঙ্গা সমস্যার স্থায়ী সমাধানের উদ্যোগ নিতে হবে।
১৯ জুন ২০২২, বিশ্ব শরণার্থী দিবসের আগে রোহিঙ্গারা ‘বাড়ি চলো’ কর্মসূচির আয়োজন করে। এই কর্মসূচীর মাধ্যমে তাঁরা তাদের সাত দফা দাবি পূরণে মিয়ানমার সরকারের উপর চাপ সৃষ্টির জন্য বিশ্ব সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা করে। ২০১৮ সালে জাতিসংঘের একটি ‘ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং মিশন’ মিয়ানমার সেনাবাহিনীর সামরিক অভিযানে ‘গণহত্যামূলক কাজ’ অন্তর্ভুক্ত ছিল বলে তাঁদের প্রতিবেদনে জানায়। যুক্তরাষ্ট্র, মিয়ানমারে সামরিক বাহিনী কর্তৃক সংখ্যালঘু রোহিঙ্গাদের নিধনকে ২১ মার্চ ২০২২, আনুষ্ঠানিকভাবে ‘গণহত্যা এবং মানবতাবিরোধী অপরাধ’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিংকেন ওয়াশিংটনের ইউএস হলোকাস্ট মেমোরিয়াল মিউজিয়ামে যুক্তরাষ্ট্রের এই স্বীকৃতির বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেন।মিয়ানমার জান্তাকে জবাবদিহি করতে এই স্বীকৃতি একটি শক্তিশালী এবং গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এসব কারনে মিয়ানমারের সামরিক সরকার এখন কিছুটা চাপের মুখে আছে।
যুদ্ধ সবসময় উন্নয়ন, শান্তি ও সমৃদ্ধির পথে অন্তরায়। প্রায় ৭০ বছর সামরিক শাসনের পর ২০১৫ সালে মিয়ানমারে গণতান্ত্রিক উত্তরন শুরু হতে না হতেই ২০২০ এর নির্বাচনের পর ২০২১ সালে সামরিক বাহিনী পুনরায় ক্ষমতা দখল করে। এক বছরের বেশী সময় ধরে সারা দেশজুড়ে সংঘর্ষ চলছে যা অতীতে কখনও এতদিন স্থায়ী হয় নাই। ইতিপূর্বে মিয়ানমার সেনাবাহিনী বহু দশক ধরে গৃহযুদ্ধে লিপ্ত থাকলে ও সরাসরি ভামার জনগোষ্ঠীর নেতৃত্বে সংগঠিত দলের বিরুদ্ধে সংঘর্ষে লিপ্ত হয় নাই। মিয়ানমারে স্বল্পস্থায়ী গণতান্ত্রিক পরিবেশে বেড়ে উঠা তরুন সম্প্রদায়ের অনেকে উদার মনভাবাপন্ন এবং তারাই বর্তমান ক্ষমতাসীন সরকারের বিরুদ্ধে তাঁদের কর্মসূচী অব্যাহত রেখেছে। অভিবাসী রোহিঙ্গারা এই কর্মসূচীকে সমর্থনের পাশাপাশি এই গনতান্ত্রিক শক্তির সপক্ষে কাজ করার জন্য রোহিঙ্গা যুবকদের উদ্বুদ্ধ করতে পারে। মিয়ানমারের সংখ্যা গরিষ্ঠ ভামার সম্প্রদায়, সচেতন যুব সমাজ এবং ক্ষুদ্র জাতি গোষ্ঠীর বিদ্রোহী দলগুলো বর্তমানে সামরিক বাহিনীর সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত যা সামরিক বাহিনীকে সংগঠিত আক্রমনের সম্মুখীন করছে। সংঘর্ষ বন্ধে সামরিক সরকার সংঘর্ষে লিপ্ত দলগুলোর সাথে আলোচনায় বসার ঘোষণা দিয়েছে।

এন এল ডি মিয়ানমারের জাতিগত সহিংসতা বন্ধে আগে থেকেই কাজ করছিল।উগ্রবাদী বৌদ্ধ সংগঠনের কাছে রোহিঙ্গাদের গ্রহণযোগ্যতার বিষয়ে এন এল ডির সহ প্রতিষ্ঠাতা উইন টিন ২০১৪ সালে তাঁর মৃত্যুর দুই মাস আগে মান্দালে শহরে অসিন উইরাথুর মঠে এসে তাঁর সাথে দেখা করেন, তবে তাঁদের আলোচনায় কোন অগ্রগতি হয় নাই। প্রথমবারের মত নির্বাচিত হয়ে ভামার ও বৌদ্ধ সংখ্যাগরিষ্ঠ মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের সমর্থন করলে দলটির জনপ্রিয়তা হারানোর সম্ভাবনা থাকায় এ বিষয়ে তাঁরা মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকে। এন এল ডি ক্ষমতায় থাকার সময় ২০১৭ সালের নৃশংস ঘটনা ঘটেছিল এবং তখন তাঁরা কিছু করতে পারে নাই। বর্তমানে এন এল ডির এই উদ্যোগ প্রমান করে যে তাঁরা তাঁদের পূর্বেকার অবস্থান থেকে সরে এসে সব জাতিগোষ্ঠীকে নিয়ে শান্তিপূর্ণ ও গণতান্ত্রিক মিয়ানমার গড়তে চেষ্টা করছে। মিয়ানমারে গণতন্ত্র চর্চা অব্যাহত থাকলে এই সমস্যারও একদিন সমাধান হবে যা এখন ব্যহত হচ্ছে। এই উদ্যোগের ফলাফল খুব ধীর গতিতে হলেও এর সুফল হবে সুদূরপ্রসারী। তাই এই সুযোগকে অবহেলা করা যাবে না এবং দেরী না করে অভিবাসী রোহিঙ্গা নেতৃবৃন্দ ও মিয়ানমারের রোহিঙ্গারা নিজেদের সম্পৃক্ত করে দ্রুত এই উদ্যোগ সমর্থনে এগিয়ে যাওয়া প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক মহল থেকে চাপ প্রয়োগের পাশাপাশি মিয়ানমার ও আরাকানের সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে রোহিঙ্গাদের গ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিত করা গেলে প্রত্যাবাসন কার্যক্রম দ্রুত ও সহজ হবে।
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অবঃ) হাসান মোঃ শামসুদ্দীন, এনডিসি, এএফডব্লিউসি, পিএসসি, এম ফিল, মিয়ানমার ও রোহিঙ্গা বিষয়ক গবেষক।