সত্যিকারের সাগর দেখার আগে সাগরের মত মানুষটির সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল সিনেমার পর্দায়। ঈশ্বরচন্দ্রের নাম ভূমিকায় যে পাহাড়ি সান্যাল, সেটুকু বোঝার বয়সও তখন হয়নি। দুর্যোগের রাতে দামোদরের গভীর কালো জলে তেজস্বী যুবকটির সাঁতার কাটার সাহসী ছবি, রাস্তার সাঁঝবাতিতে বালক ঈশ্বরচন্দ্রের পড়ার দৃশ্য, সাহেবের সামনে টেবিলে পা তুলে অপমানের উত্তর দেয়ার চলমান ছবি মনে গভীর দাগ কেটেছিল।
প্রশ্ন ছিল অনেক। তাঁর অদ্ভুত কেশবিন্যাস নিয়ে, তালতলার চটি নিয়ে। বড় হয়ে পড়েছি সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের কবিতায় বিদ্যাসাগরের চটি সম্পর্কে অমোঘ এক পংক্তি,
“তেমন মানুষ না পাই যদি খুঁজবো তবে হায়,
ধুলায় ধূসর বাঁকা চটি যা ছিল যা ঐ পায়।
সেই যে চটি উচ্চে যাহা উঠত এক একবার,
শিক্ষা দিতে অহঙ্কৃতে শিষ্ট ব্যবহার”।
সারা জীবন এই চটি জুতো, থান ধুতি থানের চাদর পরেই তিনি সর্বত্র সম্মান লাভ করেছেন। রবীন্দ্রনাথের কথায় এই বেশকে তিনি গৌরব অর্পণ করেছিলেন।
আমাদের বাড়ির বৈঠকখানায় দেয়াল জুড়ে থাকতো মহাপুরুষদের ছবি। শিক্ষক দাদুর সিম্পল লিভিং হাই থিংকিং এর ভাবনা থেকে। তাঁদের সবাইকে চিনতাম না। শুধু জানতাম যাঁরা ভালো কাজ করেন তাঁদের ছবি ঘরে রাখা হয়। সেখানেও ছিলেন ওই ছোটখাটো ধুতি পরা মানুষটির সাধারণ এক ছবি।
তারপর বর্ণপরিচয়, প্রথম ভাগ, দ্বিতীয় ভাগের ঐক্য বাক্য মানিক্যের পথে হাঁটা। গোপাল, রাখাল, যাদবদের সঙ্গে পরিচয়ের সূত্র ধরে বাংলা শেখা আর হাতের লেখা মকশো করা। “একদা এক বাঘের গলায় হাড় ফুটিয়া ছিল”, সাধু ভাষায় কথামালার গল্প পড়ে মানুষটিকে খুব কঠিন মনে হলেও গল্পের টানে কথামালা পড়ে যেতাম। তাঁর জীবনের নানা গল্প শুনতাম দাদুর কাছে, পিসিমণির কাছে। তাঁরা অবশ্য কখনোই ঐ বিশাল মানুষটির বেদনার কথা আমার সামনে আনেন নি। সম্ভবত সেইসময় সবকিছুর ভালো দিকই ছোটদের সামনে আনার প্রবণতা বড়দের ছিল। তবে বিদ্যাসাগর মশাই কে নিয়ে আমার অনেক কৌতুহল নিরসন করেছিলেন তাঁরা। তাঁরাই জানিয়েছিলেন সেকালের ব্রাহ্মণ পন্ডিতেরা মাথার সামনের চুল কামিয়ে প্রশস্ত ললাট আর শিখা রাখতেন। স্বাক্ষর করতেন দেবশর্মণঃ নামে।
চিরকালের অংকে কাঁচা আমি যখন সংখ্যা চেনার সময় ঊনচল্লিশ, ঊনপঞ্চাশ, ঊনষাট ইত্যাদি ঊনর আবর্তে ঘুরপাক খাচ্ছি তখন অবাক হয়েছিলাম সেই প্রতিভাধর বিস্ময় বালকটির কথা জেনে। যে গল্প সবার জানা, বালক বয়সে পথে যেতে যেতে মাইলস্টোন দেখে ইংরেজি সংখ্যা চিনে ফেলেছিলেন তিনি।
এরপর সংস্কৃত পড়তে গিয়ে অবশ্য পাঠ্য দুটি বই ব্যাকরণ কৌমুদী আর উপক্রমণিকা হাতের কাছে রাখতে হত সব সময়। ব্যাকরণে হোঁচট খেলেই দুটি বইয়ের দারস্থ হতেই হত। ততদিনে ভারতীয় সাহিত্যের নায়িকাদেরও ভালবাসতে শুরু করে দিয়েছি। সংস্কৃত ভাষার মাধুর্যে আকৃষ্ট হচ্ছি। পড়েছিলাম বিদ্যাসাগরের লেখা সীতার বনবাস আর শকুন্তলা। মুগ্ধ হয়েছিলাম বাংলায় এরকম তৎসম শব্দের ব্যবহার আর তার ঝংকারে।
বিদ্যাসাগরের জীবনীকার শ্রী চন্ডীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় লিখেছেন, “বিদ্যাসাগর মহর্ষি কণ্বের ন্যায় কন্যা শকুন্তলাকে পালন করিয়াছেন। তিনিই মহর্ষি বাল্মিকী হইয়া বনবাসে সীতার অশ্রুজল মোচন করিয়া আশ্রয় দান করিয়াছেন”। পিতার এই স্নেহ নিয়েই ভারতীয় নারীর জীবনপথটি সুগম করার চেষ্টা করেছিলেন তিনি। রাতে শাস্ত্রের গভীর অধ্যায়ন আর দিনে তাকে বাস্তব করার অভিপ্রায় নিয়ে কঠিন কাজে ব্রতী হয়েছিলেন। নিজেকে প্রাতস্মরণীয় করার যোগ্য করে তুলেছিলেন। অবলাবান্ধব মানুষটি নারীদের জন্য কি কি করেছিলেন সে তো আজ বলার অপেক্ষা রাখে না! সে সময়ে বেশিরভাগ মেয়েদের বুক ফাটে তো মুখ ফোটে না! তাই তাঁদের কৃতজ্ঞতার ভাষাটি বললেন সে সময় শান্তিপুরের তাঁতিরা। তাঁরা মেয়েদের শাড়ির পাড়ে বুনলেন “বেঁচে থাকো বিদ্যাসাগর চিরজীবী হয়ে”। যে পথটি তিনি প্রশস্ত করে দিয়েছিলেন আজকের আলোকপ্রাপ্তা নারীদের জন্যে, সেই পথে ক্লান্তিহীন হাঁটা ছিল তার। তিনি নিজে বলেছেন, হেঁটে তিনি কখনো ক্লান্ত হন না কথাটি সর্বার্থেই তাৎপর্যপূর্ণ।
আমরা ইতিহাসের পাতায় প্রমাণ পেয়েছি সাধারণত এই ধরনের মানুষগুলি বহিঃসংসারের কাজে এতটাই ব্যস্ত হয়ে পড়েন যে নিজের সংসারের কর্তব্য কর্ম থেকে খানিকটা উদাসীন থাকেন। কিন্তু এ বিষয়েও তাঁর দায়িত্ববোধ আমাদের আশ্চর্য করে। তাঁর উইল পড়লে জানা যায়, নিজের অবর্তমানে কোন নাতি নাতনি অচিকিৎসা রোগগ্রস্ত হলে তাঁরা টাকা পাবেন। বোনেদের সন্তান উপযুক্ত হবার আগে যদি তাঁদের বৈধব্য ঘটে, তাহলেও তাঁরা সাহায্য পাবেন। যে বন্ধু মদনমোহন তর্কালঙ্কারের সঙ্গে তাঁর বিচ্ছেদ হয়েছিল, বাক্যালাপ পর্যন্ত বন্ধ ছিল, সেই বন্ধুর মৃত্যুর পর তাঁর মা-বোন- মেয়েকে বিদ্যাসাগর উপেক্ষা করেননি। এমনকি উইলে তাঁর মৃত্যুর পরেও তাদের আর্থিক সাহায্যের অঙ্গীকার করে গেছেন। কত মানুষকে কত ভাবে সাহায্য করে সার্থক নামা করুণাসিন্ধু তিনি হয়ে উঠেছিলেন।
বিদ্যাসাগরের আরেক জীবনীকার শ্রী ইন্দ্রমিত্র জানাচ্ছেন স্কুল বাড়ি তৈরির আগে জমির আগাছা পরিষ্কারের জন্যে লোক না পাওয়া গেলে তিনি নিজেই হাত লাগাতেন। সমাজের কত আগাছা যে তিনি পরিষ্কার করেছেন তা বলাই বাহুল্য। ১৮৫১ সালে তাঁরই উদ্যোগে সংস্কৃত কলেজ জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সবার জন্য উন্মুক্ত হয়। মেট্রোপলিটন কলেজ ছিল তাঁর প্রাণ। সেই কলেজের অধ্যক্ষ, তাঁর নিজের জামাই সূর্য কুমার অধিকারী কে হিসেবের গরমিলে তিনি বরখাস্ত করেছেন।
এই মানুষটিকে কি বলা যায় অত্যুৎসাহী, পরিশ্রমী, দৃঢ়প্রতিজ্ঞ শিক্ষাব্রতী না এক কথায় গুণের সাগর! তাঁর সম্পর্কে যত পড়ি, যত জানি মনে হয় কম পড়া হল, কম জানা হল। এই সাগরে বারবার অবগাহন করেও তার তল পাওয়া যায় না। শ্রদ্ধায় মুগ্ধতায় মাথা আপনিই নত হয়। সাগর চিরদিন অবিচল থাকেন তাঁর বিশালতা নিয়ে।
মহানপুরুষ ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর নামটি চোখের সামনে ভেসে উঠলেই তাঁর কীর্তির কথা সবার মনে অল্প বিস্তর ভেসে ওঠে। যে যতটা জানি, সে জানা খুবই অল্প। তিনি যে সাগরসম। তাঁকে পড়ে শেষ করা যায় না। শ্রদ্ধায় অবনত হয়ে থাকি। প্রণাম জানাই তাঁকে।
তোমার সাবলীল লেখায় আরও একবার সমৃদ্ধ হলাম। ভালো লাগল।
এই ক্ষয়িষ্ণু সমাজের দিকে তাকিয়ে মনে হয়,এমন মানুষদের আর কেন ফিরে পাই না।