ব্যাঙ্ক জমায় সুদ এখনও মূল্যবৃদ্ধির হারের থেকে অনেক কম। সেভিংস ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের তো কথাই নেই, স্থায়ী আমানতেও তা দরদাম বাড়ার হারের বেশ খানিকটা নীচে। বাজারে আগুন, চাল-ডাল, সবজি, পোশাক বা মোবাইল ফোনের রিচার্জ থেকে শুরু করে যাতায়াত খরচ, যা-ই কিনতে যাবেন, দাম নাগালের বাইরে। অথচ মূল্যবৃদ্ধি ঠেকাতে রিজার্ভ ব্যাঙ্ক গত কয়েক মাসে দফায় দফায় বাড়িয়েছে নানা হার। সাধারণ ভাবে রিজার্ভ ব্যাঙ্ক এসব হার বাড়ালে ব্যাঙ্ক, পোস্ট অফিসেও সুদ বাড়ার কথা। কিন্তু তা হচ্ছে না। এটাই এখন মস্তবড় ধাঁধা হয়ে দাড়িয়েছে আর্থিক বিশ্লেষকদের কাছে। কেন এমন হচ্ছে?
আজব সরকারের তাজ্জব আর্থনীতি
মোদি আমলে অর্থনীতিতে নানা কীর্তি দেখা যাচ্ছে, যাকে ব্যতিক্রমী বললেও কম বলা হয়। একটার পর একটা ভুল পদক্ষেপে জাতীয় অর্থনীতির দফারফা করে দিচ্ছেন মোদি-নির্মলা সীতারামণরা। ২০১৪ সালে গদিতে বসেই এমন সব কাজ শুরু করেছেন নরেন্দ্র মোদি, যাকে অর্থনীতির পড়ুয়ারা আজব বলেই আখ্যা দিচ্ছেন। কয়েকটি উদাহরণই যথেষ্ট।

২০১৬ সালের ৮ নভেম্বর চার ঘণ্টার নোটিসে নোটবাতিল করা হলো। পুরনো নোট টাকা জমা দিতে ও অনুমোদিত নোট তুলতে গিয়ে ব্যাঙ্কের লাইনে মৃত্যু হয়েছিল শতাধিক মানুষের। জাতীয় অর্থনীতির অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে গেল। বিরাট ধাক্কা খেল ছোট ও মাঝারি ব্যাবসা।
নোট-বাতিলের চোট না কাটতেই পরের বছর, ২০১৭ সালে ১ জুলাই সম্পূর্ণ অপ্রস্তুত অবস্থায় চালু হলো জিএসটি। ধ্বংস হয়ে গেল লক্ষ লক্ষ ছোট মাঝারি ব্যাবসা। কর্মহীন হয়ে পড়লেন বিশাল পরিমাণ মানুষ। জাতীয় উৎপাদন বা জিডিপি-র উপর প্রভাব ফেলতে শুরু করল ২০১৮ থেকেই।
বিজেপি শাসনের বছরগুলোতে ব্যাঙ্কের লক্ষ লক্ষ কোটি টাকা লুট, বিদেশ পালালেন নীরব মোদি, মেহুল চোকসিরা। বিশাল বিশাল কয়েকটি কর্পোরেটের কাছে সরকারি ব্যাঙ্কগুলোর বকেয়া, যাকে পোশাকি ভাষায় নন্ পারফর্মিং অ্যাসেট বা এনপিএ বলে, তা আদায় করার চেষ্টার বদলে মুছে দেওয়া হচ্ছে ব্যাঙ্কের চালু খাতা থেকে। কর্পোরেটদের মেরে দেওয়া টাকায় বিরাট গর্ত হচ্ছে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কগুলোর জমা-খরচের খাতায়, সে গর্ত বোজাতে সরকার টাকা ঢালছে। সরকারের টাকা সাধারণ মানুষের ট্যাক্সের টাকা, সেই টাকা কায়দা করে, ঘুরপথে চলে যাচ্ছে আম্বানি-আদানিদের পকেটে। এখানেই শেষ নয়। দেশের সেরা সম্পদ সব বিক্রি করে দেওয়া হচ্ছে বন্ধু কর্পোরেটদের। সরকারি ব্যাঙ্ক, এলআইসি বেসরকারিকরণের প্রক্রিয়া চলছে জোরকদমে।
মোদি জমানায় রিজার্ভ ব্যাঙ্ক ও রেপো রেট
বাণিজ্যিক ব্যাঙ্ক যখন রিজার্ভ ব্যাঙ্ক থেকে টাকা ধার নেয়, তখন রিজার্ভ ব্যাঙ্ককে যে হারে সুদ দিতে হয়, তাকেই বলে রেপো রেট। প্রচলিত পথে অর্থনীতি চললে রেপো রেট কম থাকলে ব্যাঙ্ক জমায় সুদ কম থাকে, রেপো বাড়লে ব্যাঙ্ক জমায় সুদও বাড়ে। ক্ষমতায় বসেই মোদি সরকার ক্রমাগত কমিয়েছে রিজার্ভ ব্যাঙ্কের রেপো রেটের হার। নীচের তথ্যগুলি একটু খঁটিয়ে দেখলেই বোঝা যাবে, কীভাবে তরোয়াল চালিয়ে রেপো রেট ছেঁটেছে বর্তমান কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে তালমিল করে চলা বিজার্ভ ব্যাঙ্ক।

মোদি সরকার আসার ঠিক আগে, ২৮ জানুয়ারি ২০১৪ রেপো রেট ছিল ৮ শতাংশ। এরপর তা টানা কমতে থাকে। ১৫ জানুয়ারি ২০১৫ ওই হার ছিল ৭.৭৫, ৫ এপ্রিল ২০১৬-তে ছিল ৬.৫০, ২ আগস্ট ২০১৭-তে ৬ শতাংশ। ২০২০ সালের প্রথম দিকে, ৬ ফেব্রুয়ারি ২০২০-তে রেপো রেট ছিল ৫.১৫ শতাংশ। করোনা-জনিত লকডাউন চালু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিরাট কোপ পড়ে রেপো রেটের উপর, ২৭ মার্চ ২০২০-তে তা হয়েছিল ৪.৪০ শতাংশ। এর পরে ২২ মে ২০২০ তারিখে রেপো রেট আবার কমিয়ে করা হয়েছিল মাত্র ৪ শতাংশ। এই ভাবে রেপো রেটের উপর কোপ পড়ায় টানা কমতে থাকে ব্যাঙ্ক জমায় সুদ। পাশাপাশি স্বল্প সঞ্চয়েও একটানা সুদ কমিয়ে দেয় কেন্দ্রীয় সরকার। কোভিড নিষেধাজ্ঞার কারণে প্রতিবাদও করতে পারেনি সাধারণ মানুষ।
অর্থনীতির দুর্দশা ২০১৮-১৯ থেকেই তীব্র হতে থাকে। কমতে থাকে জিডিপি বা জাতীয় উৎপাদন বৃদ্ধির হার। কিন্তু সব চাপা দেওয়ার চেষ্টা হয় কোভিডকে সামনে রেখে। ব্যাপক প্রচার হতে থাকে, কোভিড লকডাউন ও তার পরবর্তী পরিস্থিতিই আর্থিক অবনতির জন্য দায়ী।
রেপো রেট কমল, দেখা দিল মূল্যবৃদ্ধি
জাতীয় উৎপাদন বৃদ্ধির সব বড়বড় দাবি যখন বাতাসে মিলিয়ে যায়, দেখা দেয় দারুণ মূল্যবৃদ্ধি। ২০১৯ সালে এ দেশে খুচরো দরদাম বৃদ্ধি হয়েছিল ৩.৭৩ শতাংশ হারে। ২০২০-তে ওই হার বেড়ে দাঁড়ায় ৬.৬২ শতাংশ। এদিকে লক-ডাউনের ধাক্কায় কোটি কোটি মানুষ কর্মহীন হন, চাহিদা কমে যায়। চাহিদা কমায় ২০২১ সালে দাম বাড়ার হার কিছুটা কমে হয় ৫.১৩ শতাংশ। তারপরই ধারাবাহিক ভাবে বাড়তে থাকে জিনিসপত্রের দরদাম।

চলতি বছরের (২০২২) জানুয়ারিতে খুচরো দাম বৃদ্ধির হার ছিল ৬.০১ শতাংশ, পাইকারি মূল্যবৃদ্ধি ছিল ১২.৯৬ শতাংশ। ফেব্রুয়ারিতে ওই দুই হার আরও বেড়ে হয়েছিল ৬.০৭ ও ১৩.১১ শতাংশ। এপ্রিলে ৭.৭৯ ও ১৫.১০ শতাংশ। মে মাসে খুচরো মূল্যবৃদ্ধি ছিল ৭.০৪ শতাংশ, পাইকারি দাম বাড়ে ১৫.৮৮ শতাংশ। জুনে খুচরো দাম বেড়েছে ৭.০১ শতাংশ ও পাইকারি দাম বৃদ্ধি ১৫.১৮ শতাংশ। ব্যাপারটা হাতের বাইরে চলে যাবার পরে টনক নড়ে মোদি সরকারের। রিজার্ভ ব্যাঙ্ক রেপো রেট বাড়াতে শুরু করে। মে মাসে ৪০ বেসিস পয়েন্ট বা ০.৪০ শতাংশ, ৮ জুন ২০২২-এ ৫০ বেসিস পয়েন্ট বা ০.৫০ শতাংশ। এতেও দরদাম নিয়ন্ত্রণে আসার কোনো লক্ষণ না দেখানোয় আবার ৫ আগস্ট ২০২২-এ ৫০ বেসিস পয়েন্ট বা ০.৫০ শতাংশ বাড়ানো হয় রেপো রেট। ওই হার ৪ থেকে বেড়ে হয় ৫.৪০ শতাংশ। অর্থাৎ মূল্যবৃদ্ধি রুখতে রিজার্ভ ব্যাঙ্ক তিন দফায় রেপো রেট বাড়িয়েছে ১৪০ বেসিস পয়েন্ট বা ১.৪০ শতাংশ। এর ধাক্কায় ব্যাঙ্ক থেকে নেওয়া ঋণে সুদ ক্রমাগতই বাড়ছে। সাধারণ মধ্যবিত্ত বা গরিব মানুষও ব্যাঙ্ক থেকে ঋণ নেন। তাদের গুণতে হচ্ছে অনেকটাই বাড়তি সুদ।
কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার হলো, বারবার রিজার্ভ ব্যাঙ্ক রেপো রেট বাড়ালেও বাড়ছে না ব্যাঙ্ক জমার সুদ। স্থায়ী আমানতে যেটুকু সুদ মিলছে তা মূল্যবৃদ্ধির হারের থেকে অনেকটাই কম। দরদাম বৃদ্ধিতে এমনিতেই নাজেহাল আমজনতা। তার উপর সুদ নির্ভর মানুষ, বিশেষ করে প্রবীণ নাগরিকরা পড়েছেন বিরাট সমস্যায়। প্রশ্ন উঠছে, কোন কারণে আটকে যাচ্ছে আমানতের সুদ বৃদ্ধি?
ব্যাঙ্কগুলির বক্তব্য
ব্যাঙ্কগুলো বলছে, ঋণের চাহিদা নেই মোটেই। তাই ব্যাঙ্কগুলোর বাড়তি টাকার দরকার নেই। বাড়তি টাকার প্রয়োজন হলে আমানতে সুদ বাড়িয়ে টাকা ঘরে তোলে ব্যাঙ্ক। তেমন দরকার হচ্ছে না বলেই ব্যাঙ্ক জমায় সুদও বাড়ছে না। তার অর্থ কী এই যে, দেশে শিল্প, কলকারখানার মালিকরা ঋণ কম নিচ্ছেন? সম্প্রতি প্রকাশিত তথ্যে সেটাই প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে।

সদ্য প্রকাশিত তথ্যে জানা যাচ্ছে, দেশে কর্মহীনতার হার প্রায় সর্বকালীন রেকর্ড ছুঁয়েছে। চলতি মাসের (আগস্ট ২০২২) ৭ তারিখে বেকারির হার ছিল ৯.৬৬ শতাংশ। এ থেকেই বোঝা যায়, দেশে কমছে শিল্পোৎপাদন, পরিষেবা ইত্যাদি। ফলে বাড়ছে কর্মহীনতা। দেশে আর্থিক বৃদ্ধির গল্পটা যে একেবারেই ধোঁকা, সেটা দিনের আলোর মতোই পরিষ্কার। কেন ব্যাবসা বাণিজ্যের কর্ণধাররা ব্যাঙ্ক থেকে ঋণ নেওয়া কমাচ্ছেন? সহজ উত্তর, মানুষ জিনিসপত্র কম কিনছেন। একদিকে মূল্যবৃদ্ধি, অন্য দিকে বেকারি, উভয়সংকটে মানুষ খেয়ে-পরে বেঁচে থাকার দিকেই নজর দিচ্ছেন, আগে যা কিনতেন, তা কমিয়ে ফেলছেন। জাতীয় জীবনে ঘনিয়ে আসছে ঘোর বিপদ।
এমন পরিস্থিতিতে এগিয়ে আসছে লোকসভা ভোট। মানুষের দৃষ্টি ঘোরাতে তাই দরকার ধর্মীয় মেরুকরণ। সেই কাজে রাতদিন এক করে লেগে পড়েছে বিজেপি আরএসএস-এর কর্মীরা, সোশ্যাল মিডিয়া বাহিনী। শুরু হতে চলেছে ভয়ংকর খেলা। কেবল সাধারণ মানুষই পারেন এই চক্রান্ত ভেঙে দিতে। মানুষের স্মৃতি যতই ক্ষণস্থায়ী হোক, তাঁদের নিশ্চয়ই মনে আছে, ২০১৯-এর ভোটের ঢাক যখন বেজে গেছে, তখনই হঠাৎ ঘটল পুলওয়ামার দুঃখজনক ঘটনা। তারপর বালাকোট এয়ার স্ট্রাইক, প্রচারের ঝড়। এবার কী? জনতার ভোট-পাতে এবার কোন ভোজ?