লাগামছাড়া পেট্রোল-ডিজেলের দাম। রান্নার গ্যাসও বেশ দামি। নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম বাড়ছে প্রায় প্রতিদিন। ঠিক এই রকম পরিস্থিতিতে পাঁচ বছর পর কেন্দ্রীয় বাজেটে আয়কর ছাড়ের ঊর্ধ্বসীমা বাড়ালে কিছুটা হলেও স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছিল মধ্যবিত্ত। কিন্তু বাজেটের পর রিজার্ভ ব্য়াঙ্ক অফ ইন্ডিয়া ২৫ বেসিস পয়েন্ট রেপো রেট বৃদ্ধি করায় উদ্বেগ বাড়লো মধ্যবিত্তের। কারণ, নয়া রেপো রেটের উপরই নির্ভর করবে বাড়ি, গাড়ির ঋণে সুদের হার। ২৫ বেসিস পয়েন্ট বাড়ার অর্থ আরবিআইয়ের রেপো রেট হল ৬.৫০ শতাংশ। রিজার্ভ ব্যাঙ্কের রেপো রেট বৃদ্ধির ফলে ব্যাঙ্কগুলিও লোনের উপর সুদ বৃদ্ধি করার পথেই হাঁটবে। তার ফলে সাধারণ মানুষের ঋণের খরচ বেড়ে গেল। বিশেষজ্ঞদের ধারনা ২৫ বেসিস পয়েন্ট সুদ বাড়ায়, অন্যান্য ব্যাঙ্কগুলি ঋণের উপর ০.২০ শতাংশ থেকে ০.৩০ শতাংশ সুদ বৃদ্ধি করতে পারে। আর এই রেপো রেট বৃদ্ধির জেরে বাড়তে চলেছে বাড়ি, গাড়ির ঋণের বোঝা।
কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কের আর্থিক নীতি নির্ধারণ কমিটি গত সোমবার থেকে তিন দিনের বৈঠকে বসেছিল। সেই বৈঠক শেষে তারা নতুন রেপো রেট নিয়ে কি ঘোষণা করেন, তার দিকে তাকিয়ে ছিল মধ্যবিত্তরা। কারণ, নতুন রেপো রেটের উপরই নির্ভর করবে বাড়ি, গাড়ির ঋণের সুদের হার। করোনাকাল, লকডাউন, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ ইত্যাদির কারণে গত বছরগুলিতে চরম মূল্যবৃদ্ধির জেরে ২০২২ সালেই রিজার্ভ ব্যাঙ্ক মোট পাঁচবার রেপো রেট বাড়িয়েছিল। গত বছরের মে মাস থেকে রিজার্ভ ব্যাঙ্ক এই হার মোট ২২৫ বেসিস পয়েন্ট বাড়ায়। এমনকি গত ডিসেম্বরেও রেপো রেট বাড়ায় ৩৫ বেসিস পয়েন্ট। ফলে বাড়ি-গাড়ির ঋণের ইএমআই-এর বোঝা বাড়ে। ইতিমধ্যেই কিস্তির টাকা মেটাতে ঋণ নেওয়া মধ্যবিত্তের পকেটে চাপ বেড়েছে। এবার ২৫ বেসিস পয়েন্ট বাড়ায় চাপ আরও বাড়বে বলে তারা আশংকায় পড়লেন। এমনিতেই রেপো রেট ৬ শতাংশ পার করলেই তাকে সহনশীল মাত্রার উপরে বলে ধরা হয়। এবার তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬.৫০ শতাংশ। স্বভাবতই মধ্যবিত্তের কপালে চিন্তার ভাঁজ আরও চওড়া হল। উল্লেখ্য, ২০২১ সালের শেষেও রেপো রেট ছিল ৪.০ শতাংশ।

প্রশ্ন দেশের ব্যাঙ্কিং ভাগের প্রধান রিজার্ভ ব্য়াঙ্ক অফ ইন্ডিয়া রেপো রেট বাড়ালে ব্যাঙ্কগুলিও লোনের উপর সুদ বাড়াবে কেন? তার আগে জেনে নেওয়া দরকার রেপো রেট কি? রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অন্যান্য ব্যাঙ্কগুলিকে যে সুদের হারে ঋণ দেয়, সেই সুদের হার হল রেপো রেট। ফলে রেপো রেট হার বাড়লেই অন্য ব্যাঙ্কগুলি তাদের ঋণের হার বৃদ্ধি করে। তাতে চাপ পড়ে সাধারণ মানুষের পকেটেই। বাস্তব চিত্র হল, করোনাকাল বাদ দিলেও ২০২২ সালেও আবাসনের চাহিদায় যথেষ্ট ভাটা দেখা গিয়েছে। এখন ফের সুদ বাড়ায় সাধারণ ক্রেতার ফ্ল্যাট কেনায় যে প্রভাব পড়বে তা বলাই বাহুল্য। মূলত গৃহঋণের ভরসাতেই সাধারণ রোজগেরে মানুষ গাড়ি-বাড়ি কেনার পরিকল্পনা করেন, এখন অধিকাংশ সাধারণ মানুষ সেই পরিকল্পনা সরিয়ে রাখবেন। কারণ রেপো রেট বৃদ্ধি হওয়ায় গৃহঋণের সুদ ৯.৫% ছাড়াতে পারে বলেই বিশেষজ্ঞ মহলের ধারনা।
এবার দেখে নেওয়া যাক কতটা বাড়তে পারে গৃহঋণ। বর্তমানে একজন এসবিআই গ্রাহক ২০ বছরের মেয়াদে ২৫ লক্ষ টাকা গৃহঋণ নিলে তাকে প্রতি মাসে ২১,৮২৪ টাকা ইএমআই দিতে হয়, কিন্তু এই অঙ্ক বেড়ে প্রতি মাসে ২২, ২৫৩ টাকা হবে বলেই মনে করা হচ্ছে। প্রসঙ্গত, জানা গিয়েছে আরবিআইয়ের নীতি প্যানেল রেপো রেট বাড়ানোর সিদ্ধান্তে সর্বসম্মত ছিল না। ৪:২ সমর্থনে রেপো রেট বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়। নীতি প্যানেলের সদস্য অসীমা গোয়েল এবং জয়ন্ত আর ভার্মা ২০২২ সালের মে থেকে ছ’বার রেপো রেট বৃদ্ধির বিরুদ্ধেই ভোট দিয়েছেন। কিন্তু মুদ্রানীতি কমিটি সংখ্যাগরিষ্ঠতার সমর্থনের ভিত্তিতেই সিদ্ধান্ত নেয়। তাদের বক্তব্য, মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতেই এই সিদ্ধান্ত।
পাশাপাশি ব্যাঙ্কগুলি ফিক্সড ডিপোজিটের সুদের হারও বৃদ্ধি করতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষঙ্গরা। কারন অন্যান্য ব্যাঙ্কগুলি বিগত একবছরে আমানতাকারীদের দীর্ঘমেয়াদী ডিপোজিটের জন্য আকৃষ্ট করতে তেমনটাই করেছে। উল্লেখ্য, স্টেট ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া, অ্যাক্সিস ব্যাঙ্ক, এইচডিএফসি, আইসিআইসিআই এবং কোটাক ব্যাঙ্ক স্থায়ী আমানতের ওপর ৩%-৭.৫% সুদের হার করেছে৷ তবে রেপো রেট বাড়ায় ব্যক্তিগত ঋণের সুদ বাড়বে।