সোমবার থেকে শুরু হয়েছে রিজার্ভ ব্যাঙ্কের মনিটারি পলিসি কমিটি-র তিন দিনের মিটিং। রিজার্ভ ব্যাঙ্কের গভর্নর শক্তিকান্ত দাস সভায় চেয়ারম্যানের চেয়ারে বসেছেন। কী হতে পারে এই মিটিংয়ে? অভিজ্ঞ মহলের অনেকেই মনে করছেন, রেপো রেট, রিভার্স রেপো রেট, সিআরআর বা এসএলআর-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে স্থিতাবস্থা বজায় রাখার সম্ভাবনাই বেশি। সেক্ষেত্রে আগামী দিনগুলিতে ব্যাঙ্কগুলিতে সুদের হারও মোটের ওপর অপরিবর্তিত থাকারই সম্ভাবনা।
বাণিজ্য মহল অবশ্য সুদের হার কমাবার জন্য চাপাচাপি করছে। অন্যদিকে সাধারণ মানুষ চাইছে, সুদের হার কিছুটা বাড়ুক। এদিকে মাথাচাড়া দিয়েছে মূল্যবৃদ্ধি। বর্তমানে পাইকারি বাজারে মূল্যবৃদ্ধির হার কিন্তু আকাশ ছোঁয়া, চলতি বছরের অক্টোবরে তা ছিল ১২.৫৪ শতাংশ। খুচরো বাজারেও দ্রুত গতিতে দাম বাড়ছে, অক্টোবরে ৪.৪৮ শতাংশ। খুচরো মূল্যবৃদ্ধির ক্ষেত্রে সরকার এবং রিজার্ভ ব্যাঙ্কের সহ্যসীমা হলো ৪ শতাংশ, এর ২ শতাংশ কম-বেশি পর্যন্ত মেনে নেওয়া যায়। সেই হিসেবে খুচরো দাম বাড়ার ব্যাপারটা চিন্তাজনক, তাই সুদ আরও কমিয়ে মূল্যবৃদ্ধির লাগাম খুলে দেবে না রিজার্ভ ব্যাঙ্ক, এমনই আশা বিশেষজ্ঞদের। ব্যাবসা বাণিজ্যের জগতেও ভাটার টান চলছে, বিশেষ করে করোনার ওমিক্রন স্ট্রেইন ভারতে পরে। শেয়ার বাজারে ভালুক হানা চলছে মাঝেমাঝেই ফলে ক্যাশের চাহিদা তেমন।

কমিটির সদস্যদের মধ্যে আছেন রিজার্ভ ব্যাঙ্কের গভর্নর শক্তিকান্ত দাস, যিনি পদাধিকারবলে মনিটরি পলিসি কমিটির চেয়ারম্যান, রয়েছেন রিজার্ভ ব্যাঙ্কের ডেপুটি গভর্নর মাইকেল দেবব্রত পাত্র ও এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর মৃদুল কে সাগর। এছাড়া তিন জন বাইরের সদস্য মনিটারি পলিসি কমিটিতে আছেন, শশাঙ্ক ভিদে (ন্যাশনাল কাউন্সিল অফ অ্যাপ্লায়েড ইকনমিক রিসার্চ-এর সিনিয়র অ্যাডভাইসর), অসীমা গয়াল ও জয়ন্ত আর বর্মা। এই কমিটির মূল কাজ কী? সেটাও রিজার্ভ ব্যাঙ্ক আইনে বলা হয়েছে — ভোগ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি ঘোষিত নীতির মধ্যে রাখতে রেপো ও রিভার্স রেপো রেট ও অন্যান্য হার সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়াই মূল কাজ। তাছাড়া আগামী দিনে এই রেট বা হারগুলি সম্পর্কে দৃষ্টিভঙ্গি কেমন হবে, সেটাও ঠিক করে কমিটি। মনিটারি পলিসি কমিটি বছরে অন্তত চারবার বৈঠক করবে, বেশিও করতে পারে। চলতি অর্থবর্ষে কমিটি ছয়বার বসবে। এই আর্থিক বছরের বিগত দিনগুলিতে এই কমিটির বৈঠক হয়েছে, ৫-৭ এপ্রিল ২০২১, ২-৪ জুন, ৪-৬ আগস্ট, ৬-৮ অক্টোবর। ৬-৮ ডিসেম্বরে বসবার পরে আবার বসবে ৭-৯ ফেব্রুয়ারি ২০২২।
রেপো রেট কী?
যখন কোনো বাণিজ্যিক ব্যাঙ্ক রিজার্ভ ব্যাঙ্ক থেকে টাকা ধার করে, ওই বাণিজ্যিক ব্যাঙ্ক রিজার্ভ ব্যাঙ্ককে সুদ দেয়। যে হারে বাণিজ্যিক ব্যাঙ্ক রিজার্ভ ব্যাঙ্ককে সুদ দেয়, তাকে বলে রেপো রেট। এই ধরনের ঋণে অবশ্য সরকারি নিশ্চয়তা থাকতে হয়।
রেপো রেট কমে গেলে বাণিজ্যিক ব্যাঙ্ক কম সুদে রিজার্ভ ব্যাঙ্ক থেকে ধার নিতে পারে, সেক্ষেত্রে ব্যাঙ্ক-জমায় (ডিপোজিট) সুদ কমে। অর্থাৎ আপনি ব্যাঙ্কে টাকা নিয়ে গেলে ব্যাঙ্ক আপনাকে কতটা সুদ দেবে, সেটা বেশ খানিকটা নির্ভর করে রেপো রেট কত তার উপরে। তার মানে, রেপো রেট বাড়লে ব্যাঙ্ক জমায় সুদ বাড়বে, মানুষ সঞ্চয়ে আগ্রহী হবে। রেপো কমে গেলে কম সুদ পাওয়া যাবে বলে সঞ্চয়ে অনেকে আগ্রহ হারাবে, বাজারে বেশি টাকা খরচ করবে। তাই জিনিসপত্রের দাম খুব বেড়ে যেতে থাকলে রেপো রেট বাড়ানো হতে পারে। এতে ব্যাঙ্কের সুদের হার বাড়বে, মানুষ সঞ্চয়ে মনোযোগী হবে। আবার বিনিয়োগকারীরা ব্যাঙ্ক থেকে টাকা ধার নিতে গেলে বাড়তি সুদ গুনতে হবে, তাই বিনিয়োগে ভাটা আসবে, সেভাবেও বাজারে টাকা কমবে। এর ফলে বাজারে কেনাকাটা কম হবে, ফলে জিনিসপত্রের চাহিদা কমবে, কমে আসবে মূল্যবৃদ্ধির হার। আবার উল্টোদিকে রেপো কমে গেলে বাজারে ক্যাশ টাকা বেড়ে যাবে, লোকে খরচ করবে, জিনিসের দাম বাড়তে পারে, কিন্তু পাশাপাশি ব্যাবসা বাণিজ্য বৃদ্ধি পাবে, কিছু মানুষের কর্মসংস্থানও হতে পারে।
রিভার্স রেপো রেট কী?
আবার কখনো কখনো রিজার্ভ ব্যাঙ্কে বাণিজ্যিক ব্যাঙ্কগুলো টাকা রাখে। সেক্ষেত্রে বাণিজ্যিক ব্যাঙ্কগুলো রিজার্ভ ব্যাঙ্ক থেকে সুদ পায়। যে হারে বাণিজ্যিক ব্যাঙ্কগুলো রিজার্ভ ব্যাঙ্ক থেকে সুদ পায়, তাকে রিভার্স রেপো রেট বলা হয়।
রিভার্স রেপো রেটও সাধারণভাবে ব্যবহার করা হয় বাজারে ক্যাশ টাকা বাড়াতে বা কমাতে। বাণিজ্যিক ব্যাঙ্কগুলি যদি দেখে, তাদের হাতে ভালো পরিমাণে ক্যাশ রয়েছে, আবার রিজার্ভ ব্যাঙ্ক টাকা রেখে বেশি সুদও পাওয়া যাচ্ছে, তখন তারা রিজার্ভ ব্যাঙ্কে বেশি টাকা রাখতে পারে। এতে বাজারে টাকার পরিমাণ কমে আসবে, ফলে মূল্যবৃদ্ধিও কমবে। আবার রিভার্স রেপো কমলে বাজারে ক্যাশ টাকা বাড়বে, ব্যাবসা বাণিজ্য বাড়বে, জেগে উঠতে পারে মূল্যবৃদ্ধিও।
সাধারণত রেপো রেট রিভার্স রেপো রেট থেকে বেশি হয়। যেমন বর্তমানে রেপো রেট ৪ শতাংশ ও রিভার্স রেপো রেট ৩.৩৫ শতাংশ।
ক্যাশ রিজার্ভ রেশিও বা সিআরআর
এছাড়া টাকার আরও কয়েক ধরনের চলাচল ব্যণিজ্যিক ব্যাঙ্ক ও রিজার্ভ ব্যাঙ্কের মধ্যে হয়। একটি হলো ক্যাশ রিজার্ভ রেশিও বা সিআরআর। বাণিজ্যিক ব্যাঙ্কগুলি যে টাকা জমা হিসেবে সংগ্রহ করে, তার একটা অংশ বাধ্যতামূলক ভাবে রিজার্ভ ব্যাঙ্কে বিনা সুদে জমা রাখতে হয়। কারেন্ট অ্যাকাউন্টে থাকা এই অর্থকে সিআরআর বলে। সিআরআর-এ রাখা টাকা বাণিজ্যিক ব্যাঙ্ক কোনো ভাবে ব্যবহার করতে পারে না।
স্ট্যাচুটারি লিকুইডিটি রেশিও বা এসএলআর
সিআরআর ছাড়াও বাণিজ্যিক ব্যাঙ্কগুলিকে কিছু টাকা কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকারগুলির কাছে সিকিউরিটির বিনিময়ে জমা রাখতে হয়। তবে এই সিকিউরিটি বাবদ কিছুটা সুদ ব্যাঙ্কগুলি আয় করতে পারে। একে বলে স্ট্যাচুটারি লিকুইডিটি রেশিও বা এসএলআর।

ভারতের ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থায় সাধারণ মানুষ যাতে ব্যাঙ্কে টাকা রেখে একটা ন্যূনতম পরিমাণ সুদ পান, সেটা বরাবর খেয়াল রাখা হয়েছে। সেই পরম্পরা ভেঙে গেছে মোদি সরকারের আমলে। এই আমলে ক্রমান্বয়ে কমানো হয়েছে রেপো ও রিভার্স রেপো, তলানিতে ঠেকেছে ব্যাঙ্কে সুদের হার। আজকে ব্যাঙ্কে টাকা রাখলে তা বাড়ার বদলে কমে যায়, কারণ, ব্যাঙ্ক যা সুদ দিচ্ছে, মূল্যবৃদ্ধির হার তার থেকে বেশি। গত দেড় দশকে রেপো রেটের(শতাংশ) ওঠাপড়ার দিকে একবার চোখ বোলানো যেতে পারে —
২৫ অক্টোবর ২০০৫ – ৬.২৫, ২৪ জানুয়ারি ২০০৬ – ৬.৫০, ৩১ জানুয়ারি ২০০৭ – ৭.৫০, ৩০ জুলাই ২০০৮ – ৯.০০, ২১ এপ্রিল ২০০৯ – ৪.৭৫, ২ জুলাই ২০১০ – ৫.৫০, ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৩ – ৭.৫০, ২৮ জানুয়ারি ২০১৪ – ৮.০০, ২ জুন ২০১৫ – ৭.২৫, ৪ অক্টোবর ২০১৬ – ৬.২৫, ২ আগস্ট ২০১৭ – ৬.০০, ১ আগস্ট ২০১৮ – ৬.৫০, ৪ এপ্রিল ২০১৯ – ৬.০০, ৫ ডিসেম্বর ২০২০ – ৫.১৫, ২৭ মার্চ ২০২০ – ৪.৪০, মে ২০২০ – ৪.০০, ৬ ডিসেম্বর ২০২১ – ৪.০০। এবারের মিটিংয়ে মনিটারি পলিসি কমিটি রেপো ও রিভার্স বাড়ায় না কমায়, সে দিকে চোখ সংশ্লিষ্ট মহলের।
শেয়ার পতন
এ দিকে দেশের শেয়ার বাজারে চলছে বিরাট অনিশ্চয়তা।
বুধ ও বৃহস্পতিবার মিলিয়ে প্রায় আড়াই শতাংশ বেড়েছিল শেয়ার সূচক।
শুক্রবার নেমেছিল সওয়া ১ শতাংশ, আর সোমবার পতন প্রায় পৌনে দুই শতাংশ
সোমবার বাজার শেষে সেনসেক্স ৯৪৯ পয়েন্ট বা ১.৬৫ শতাংশ কমে হয়েছে ৫৬,৭৪৭ পয়েন্ট
সেনসেক্স-এর তালিকায় ৩০টি কোম্পানির সবকটির শেয়ার দর নেমেছে
৫৭ হাজারের রক্ষণ ভেঙে সেনসেক্স নেমেছে ৫৬ হাজারের ঘরে
এ দিন নিফটি-র পতন ২৮৪ পয়েন্ট বা ১.৬৫ শতাংশ, নিফটি দাঁড়িয়েছে ১৬,৯১২ পয়েন্টে
নিফটি-র তালিকায় থাকা ৫০টি কোম্পানির মধ্যে ১টি ছাড়া সবকটির শেয়ার দর নেমেছে
১৭ হাজারের রক্ষণাত্মক সীমা ভেঙে নিফটি নেমেছে ১৬ হাজারের ঘরে
ক’দিন আগেই জানা গিয়েছিল, ভারতে চলতি বছরের জুলাই-সেপ্টেম্বর ত্রৈমাসিকে জিডিপি বৃদ্ধি হয়েছে ৮.৪ শতাংশ। এ নিয়ে কেন্দ্রীয় সরকার নিজেদের কৃতিত্ব দাবি করে ঢাক পিটিয়েছে যথেষ্ট। কিন্তু বৃদ্ধি যে গত বছরের দুর্বল ও সংকুচিত জিডিপির ভিত্তিতে, সেটা ভালোই বুঝেছেন লগ্নিকারীরা। তাই জিডিপি বৃদ্ধি ভরসা জোগায়নি এখনও। তবে ওমিক্রন আতঙ্ক কেটে গেলে স্বাভাবিক বৃদ্ধির পথে ফিরতে পারে দেশ, যদি মূল্যবৃদ্ধিতে লাগাম পড়ানো যায়। কিন্তু একটানা পেট্রোল ডিজেলের দাম বাড়িয়ে মূল্যবৃদ্ধির পথ খুলে দিচ্ছে খোদ কেন্দ্রীয় সরকারই। এসবের ফলেই বাজারে ছড়িয়েছে উদ্বেগের মেঘ। তবে ওমিক্রন হানা আর্থিক কাজকর্মে বাধা হয়ে না দাঁড়ালে বাজারের ঘুরে দাঁড়ানোর সম্ভাবনা রয়েছে বলেই মনে হয়।