জ্যোতি বসুর বয়সকে আমি শ্রদ্ধা করি। তাঁর মতো বয়সে সক্রিয় রাজনীতিতে থাকা নেতা এখন দেশে বোধ হয় দ্বিতীয় কেউ নেই। সেই জন্য তিনি অবশ্যই শ্রদ্ধার পাত্র। বহু টানাপোড়েনের পরে, যে-কোনও কারণেই হোক, শেষ পর্যন্ত তিনি মুখ্যমন্ত্রিত্ব থেকে অবসর নিলেন। আমি তাঁর সুস্থ, নীরোগ, দীর্ঘ অবসরজীবন কামনা করি। চাই, তিনি স্ত্রী, বৌমা, নাতনিদের নিয়ে আনন্দে থাকুন। ভাল থাকুন। তাঁর প্রতি এই সৌজন্য প্রকাশে আমার কোনও দ্বিধা নেই। থাকা উচিতও নয়।
কিন্তু ব্যক্তি জ্যোতি বসুর প্রতি এই শিষ্টাচার প্রদর্শন করাকে মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসুর প্রতি দুর্বলতা প্রকাশ বলে ধরে নেবেন না। বরং গোড়াতেই বলা দরকার, জ্যোতি বসু, আমার চোখে, রাজ্যের সব চেয়ে অ-সফল এবং অ-কেজো মুখ্যমন্ত্রী। ২৪ বছর মহাকরণে বসে রাজসুখ ভোগ করে পশ্চিমবঙ্গকে তিনি ডুবিয়ে দিয়ে গেলেন। অথচ যে-সুযোগ এবং সময় তিনি পেয়েছিলেন, তা যদি তিনি কাজে লাগাতে পারতেন, রাজ্যের চেহারা আজ তা হলে বদলে যেত।
জ্যোতিবাবুর চেয়ে কম সময় মুখ্যমন্ত্রিত্ব করেছেন ডা. বিধানচন্দ্র রায়। ডাঃ রায় যখন মুখ্যমন্ত্রী হন, তখন এক সঙ্কটকাল। দেশভাগ হয়েছে। উদ্বাস্তুদের চাপ মাথার উপরে। সেই অবস্থার মধ্যে দাঁড়িয়েও কী অসীম নিষ্ঠায় রাজ্যকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার কাজে আত্মনিয়োগ করেছিলেন তিনি। শিল্প ও আর্থিক উন্নয়ন ছিল তাঁর ব্রত। তারই ফলে আমরা পেয়েছি সল্টলেক গড়ার স্বপ্ন। পেয়েছি কল্যাণী, দুর্গাপুর, হলদিয়া, রাষ্ট্রীয় পরিবহণ— এমন আরও কত কী! উদ্বাস্তু পুনর্বাসন এবং আর্থিক উন্নয়ন— দু’টোকেই সমান গুরুত্ব দিয়ে কাজ করেছেন ডা. বিধানচন্দ্র রায়। তার পরে অন্য যাঁরা মুখ্যমন্ত্রী হয়েছেন, তাঁরাও চেষ্টা করে গিয়েছেন সাধ্যমতো।

ব্যতিক্রম জ্যোতি বসু। তিনি কাজ করেননি। করতে দিতে চাননি। শুধু ভাঙনের জয়গান গেয়েছেন। অগ্রগতির মানচিত্রে, উন্নয়নের তালিকায় পশ্চিমবঙ্গের স্থান কোথায় ছিল এবং কোথায় নেমে গিয়েছে— সেই তথ্যই এর বড় প্রমাণ।
শিল্পায়নের কথাই ধরুন না। শিল্পের উপযোগী পরিবেশ-পরিস্থিতি তৈরির দায়িত্ব জ্যোতিবাবুর ছিল না? তিনি তা পালন করেননি। কারণ তাঁর সদিচ্ছার অভাব। তাই শিল্পায়ন আজ ভাঁওতায় পর্যবসিত। নিট ফল— শূন্য।
একই হাল শিক্ষার। এবং স্বাস্থ্যের। জ্যোতিবাবু খুব ঠান্ডা মাথায় কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়গুলিকে ক্যাডার তৈরির কারখানায় পরিণত হতে দিয়েছেন। শিক্ষক-ছাত্র সবাই ক্যাডার। শিক্ষকের নিয়োগ-তালিকা তৈরি হয় পার্টির অফিসে। সেখানে যোগ্যতার মূল মাপকাঠি রাজনৈতিক আনুগত্য।
স্বাস্থ্য পরিষেবার হাল যে কত করুণ, তা বুঝিয়ে বলার প্রয়োজন নেই। রাজ্যের আপামর জনগণ প্রতিনিয়ত তা হাড়েহাড়ে টের পাচ্ছেন। কী করলেন জ্যোতি বসু ? কী করতে পারলেন?
তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবন তথা মুখ্যমন্ত্রিত্বের শেষে এই প্রশ্নগুলি আমাকে তুলতেই হবে। ২৪ বছর ধরে গোলাপের সুঘ্রাণ উপভোগ করে গেলেন তিনি। শেষ দিনে মানুষ তাঁর কণ্ঠে যেন শুনতে পেল সমতার বদলে রিক্ততার গান। তাঁর কর্মজীবনের সার কথা হয়ে দাঁড়াল: “রিক্ত আমি নিঃস্ব আমি, দেওয়ার কিছুই নাই…..।”
না, মানুষকে কিছুই দিতে পারেননি জ্যোতি বসু।
ছোটবেলায় খাদ্য আন্দোলনের কাহিনী শুনেছিলাম। মনে হয়েছিল, জ্যোতি বসু একজন নিঃস্বার্থ বিপ্লবীর নাম। বড় হয়ে পরে জানলাম এবং বুঝলাম, তিনি ঠিক এর বিপরীত। প্রায় ৬০ বছরের রাজনৈতিক জীবনে সব সময়েই সব চেয়ে ভালটুকু ভোগ করেছেন জ্যোতিবাবু। যখন তিনি মন্ত্রী নন, স্রেফ বিরোধী নেতা, তখনও মেদিনীপুরে জনসভায় যাওয়ার পথে তাঁর পায়ে কাদা লাগবে বলে তাঁরই দলের সহকর্মী কমরেডরা তাঁকে চেয়ারে বসিয়ে কাঁধে তুলে পার করে দিয়েছিলেন। ভাবা যায়? এই না-হলে জ্যোতি বসু!
১৯৮৪-তে আমি যাদবপুর থেকে জিতে সাংসদ হওয়ার পরে জ্যোতিবাবুর সঙ্গে আমার চাক্ষুষ পরিচয়। রাজডাঙায় একটা রাজনৈতিক গোলমাল হয়েছিল। সেই ব্যাপারে মহাকরণে বৈঠকে ডেকেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু। আমি গেলাম। আমি নতুন সাংসদ। তিনি কত অভিজ্ঞ, বর্ষীয়ান। কী বললেন, জানেন? ঢুকতেই ঝাঁজের সঙ্গে তাঁর প্রথম সম্ভাষণ: “শুনুন, আপনাকে ঝগড়া বন্ধ করার জন্য ডেকেছি।” একে কি সৌজন্য বলে? আমাদের সংস্কৃতি কি এই রকম?
আমি কিন্তু ১৯৯১-এ প্রথম কেন্দ্রে মন্ত্রী হয়েই জ্যোতিবাবুকে প্রণাম করতে গিয়েছিলাম। এর জন্য বহু সমালোচনা সহ্য করতে আমি ঠিকই করেছিলাম। আমার সেই মন্ত্রিত্বের আমলেই মহাকরণে হয়েছে আমাকে। তবু আমি মনে করি, আমার সৌজন্যবোধ অনুযায়ী জ্যোতিবাবুর ঘরের সামনে থেকে পুলিশ আমাকে পিটিয়ে মেরে লালবাজারের লক-আপে নিয়ে গিয়েছিল। কারণ, আমি একটি বোবা ধর্ষিতা মেয়েকে নিয়ে তাঁর সঙ্গে দেখা করতে চেয়েছিলাম। ওই ঘটনার পরেই আমি প্রতিজ্ঞা করি, জ্যোতিবাবু মহাকরণে থাকাকালীন আমি ওই লাল বাড়িতে পদার্পণ করব না। ঢুকিওনি। আজ বলছি, আমার কথা রাখতে পেরে আমি খুব খুশি। প্রসঙ্গত বলি, এ বার রেলমন্ত্রী হয়েও আমি কিন্তু জ্যোতিবাবুর সঙ্গে প্রয়োজনীয় সৌজন্য এবং যোগাযোগটুকু রেখে গিয়েছি। কাজের ব্যাপারে পরস্পর চিঠি লেখা, কথা— সবই হয়েছে। এটাও বলব, তাঁর তরফে প্রত্যাশিত সহযোগিতা পেলে রেলের অনেক কাজ আরও দ্রুত এগোত।

বিরোধীদের সম্পর্কে জ্যোতিবাবুর মানসিকতা কী রকম? সংবাদপত্রে দেখলাম, জ্যোতিবাবু নিজেই বলেছেন, ডা. রায় নাকি তৎকালীন বিরোধী নেতা জ্যোতিবাবুকে বলেছিলেন, “আমি তোমাকে বসিয়ে দিয়ে যাব।” রাজনীতি তো আছেই। আর যা থেকে যায়, সেটা হল রাজনৈতিক সৌজন্য। ডা. রায় সেটাই প্রকাশ করেছিলেন। কিন্তু বিরোধীদের কাউকে কখনও মৌখিক ভাবেও এই রকম কোনও গুরুত্ব, স্বীকৃতি বা মর্যাদা দেননি জ্যোতিবাবু। তিনি এতটাই দাম্ভিক।
আমি দিল্লিতে দেখেছি, অন্য সব রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীরা নিজেদের রাজ্যের কাজ করিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য কত তদ্বির-তদারক করেন। ডাঃ রায়ও করতেন। জ্যোতি বসুকে কখনও এই ভূমিকাতেও দেখিনি। তিনি রাজনীতি করেছেন ‘কেন্দ্র দিল না’ বলে। এই অহঙ্কার কেন? নাকি এটাই তাঁর সদিচ্ছার অভাব? বোধ হয় তা-ই। কোনও কিছুই সেই জন্য তাঁকে স্পর্শ করত না। বানতলার নারকীয় ঘটনাকেও তিনি ‘ওরকম তো কতই হয়’ বলে অনায়াসে পাশ কাটিয়ে গিয়েছেন।
এই ভাবে ২৪ বছর কুসুমাস্তীর্ণ পথে হেঁটে ৮৫৪০টি গোলাপে গাঁথা মালা পরে জ্যোতি বসু মুখ্যমন্ত্রিত্ব ছাড়লেন। জনগণের জন্য রেখে গেলেন কাঁটার উপহার!
সবশেষে আবার বলি, ব্যক্তি জ্যোতি বসু ভাল থাকুন, সুস্থ থাকুন, আনন্দে থাকুন। কিন্তু রাজনীতিক জ্যোতি বসু মনে রাখবেন, কাঁটা দিয়েই কাঁটা তুলতে হয়।
ফুল জমে জমে পাথর….। ইতিহাস সকলের বিচার করে। কাউকে ক্ষমা করে না।
১০ই নভেম্বর ২০০০ সালে বয়সজনিত কারণে জ্যোতি বসুর মুখ্যমন্ত্রীত্ব থেকে অবসর গ্রহণ করেন। সেই উপলক্ষে আনন্দবাজার পত্রিকার বিশেষ ক্রোড়পত্র সংখ্যায় বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই লেখাটি প্রকাশিত হয়।
পড়লাম। এর বেশি আর কিছু বলব না।