“শাওন রাতে যদি স্মরণে আসে মোরে” ….
বিয়াল্লিশ বছর পরেও ভেজা শ্রাবণে উত্তম স্মরণে আজো ভেজে আমাদের মন, ভেজে সেলুলয়েডের পর্দা, টালিগঞ্জের স্টুডিওপাড়া।
সালটা ১৯৮০, মহানায়কের অন্তিম যাত্রায় ভক্তদের বাধ ভাঙা আবেগ ভাসিয়ে দিল গোটা মহানগরকে। মনে পড়ে, আমার ছোটোবেলায় টিভিতে সে দৃশ্য দেখে মা কাঁদছে, তাই দেখে আমিও। সেদিন বুঝতাম না নায়কের কথা। পরে অবশ্য ছদ্মবেশী, অমানুষ, হারানো সুর, অগ্নীশ্বর, কলঙ্কিত নায়ক, সন্ন্যাসী রাজা, ওগো বধূ সুন্দরী…প্রভতি সিনেমার মধ্যে দিয়ে চিনেছিলাম মহানায়ককে। বাঙালীর রিয়েল হিরোকে।
নির্দ্বিধায় তিনি মহানায়ক। কিন্তু অভিনেতা হয়ে কেউ জন্মায় না। এর নেপথ্যে রয়েছে পুঁথিগত, চর্চাগত ও অভিজ্ঞতালব্ধ কঠিন শিক্ষা। আজকের প্রতিবেদনের স্বল্প পরিসরে আলোচ্য তাঁর জীবনের গড়ে ওঠার কথা, বাবা মায়ের সোনার ছেলে উত্তম হয়ে ওঠার কথা— যে চরিত্রে তিনি কখনও অভিনয় করেননি … তার কথা।

গাবলু গুবলু ফর্সা নবজাতকের চোখের মনিদুটো ছিলো সামান্য ট্যারা। দাদামশাই খুশি হয়ে নাম রাখেন উত্তম। বাবার এ নাম পছন্দ না হওয়ায় নাম রাখেন অরুণ চট্টোপাধ্যায়। বাড়ীর কুলগুরুদেব ছোট্ট ছেলেটিকে দেখে অরুনের মা কে বলেছিলেন, “তোর ছেলে একদিন গোটা বাংলাদেশকে মাতাবে। এই নামেই সারা বিশ্বে স্বীকৃতি পাবে।”
উত্তমকুমারের বাবা সাতকড়ি চ্যাটার্জী তখন মেট্রো সিনেমা হলে প্রোজেকশনিস্টের কাজ করতেন। দিনে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ১৮ ঘণ্টা পরিশ্রম করতে হতো। ভবানীপুরের অভিজাত যৌথ পরিবারে আর্থিক অস্বচ্ছলতা ছিলো তাঁর শৈশবে, যৌবনে। সংসারে অর্থসঙ্কট ছিলো বটে, কিন্তু খুশির আমেজে কখনো ভাটা পড়েনি।
অন্যান্য বাবা-মায়েদের মতো ছেলে অভিনেতা হোক তেমন ভাবনাও ছিলো না কিন্তু নিজের অজান্তেই কিশোর উত্তমকে প্রজেকসান রুম থেকে সিনেমা দেখিয়ে কোথাও অভিনয় শেখার শখের বীজ বপন হয়েছিলো। পরিবারের সাংস্কৃতিক পরিবেশ, পাড়ায় “সুহৃদ সমাজ” এর যাত্রার মহড়া দেখার মধ্যে দিয়েই চলেছিলো সেই বীজের অঙ্কুরোদগম।
ছোটবেলায় পুতুলদির (বড়দিদি) টাইফয়েডে আকস্মিক মৃত্যু নায়কের অন্তরের অন্তঃস্থলে এক দগদগে ক্ষত সৃষ্টি করেছিলো। কষ্ট ভুলে থাকতে ছবি আঁকাতেন ছোট্ট অরুণ। যেতে শুরু করেন স্কুলে।

বাবার শাসনের ভয়ে চক্রবেড়িয়া স্কুলে পড়তেন ঠিকই কিন্তু মন টানতো থিয়েটারের দিকে। স্কুলে “গয়াসুর” নাটকে ছোট গয়াসুরের ভূমিকায় অভিনয় করে দুটি মেডেল পান। সেই জয়ে খুশি হয়েছিলেন শিক্ষকেরা, সহপাঠীগণ, সর্বোপরি বাবা। এরপর ক্লাস সেভেন পড়ার পর স্কুল পরিবর্তন করতে হয়।
ক্লাস এইট থেকে সাউথ সুবার্বন হাইস্কুলে পড়াশুনার সঙ্গে চলে খেলাধূলা, ছবি আঁকা, ছোট গল্প, কবিতা লেখা।সঙ্গে পড়ার ভবানীপুর সুইমিং অ্যাসোসিয়েশনে চলতো সাঁতার শেখা। ক্লাবের হয়ে নানান সাঁতরের কম্পিটিশনে ট্রফি এনেছেন অনেক। হয়েছেন ১০০ ইয়ার্ডে চ্যাম্পিয়ন। অনেকেই বলতেন, তখন নাকি তাকে জনি ওয়াশিমুলারের মতন লাগে।
সেই সাঁতারের সঙ্গে চলতো কুস্তি শেখা। ইন্দিরা সিনেমা হলের পিছনে ননী কুস্তিগীরের আখড়ায় ননী ঘোষের কাছে কুস্তি শেখা, ভোম্বলদার কাছে লাঠি চালানো শেখার মধ্যে দিয়ে চলতো স্বাস্থ্য চর্চা। পরে ১৯৪১ সালে উত্তম কুমার ও কয়েকজন মিলে তৈরি করেন “লুনার ব্যায়ামাগার”। এখানেই চলতো ফুটবল, ক্রিকেট, ভলিবল খেলা। তিনি বরাবরই মোহনবাগাণের সাপোর্টার ছিলেন।
তিনি অনুভব করেছিলেন কেবলমাত্র সুন্দর বা স্বাস্থ্যবান হলেই হবে না, চরিত্রের সঙ্গে মানানসই চেহারা ধরে রাখতেও শরীরী কসরৎ দরকার। অভিনেতা হওয়ার জন্য আর্থিক প্রতিকূলতা সঙ্গে নিয়ে চলতে থাকে আপসহীন লড়াই। অফিস থেকে এসেই মায়ের তৈরী করে রাখা পরোটা-আলুপোস্ত খেয়ে ছুটতেন থিয়েটার করতে। সেই সময়ে মায়ের নিজের ছেলে অরুণের প্রতি আর কোনো আশা ছিল না।

পোর্ট ট্রাস্টের লোয়ার ডিভিশন ক্লার্কের চাকরি, বন্ধুর কাছে আর্থিক ভাবে প্রতারিত, ডেইলি পেইমেন্ট বেসিস-এ জুনিয়র আর্টিস্ট, অগ্রণীদের কাছে নিত্য অপমানিত হয়ে, পরপর ন-টা ছবি ফ্লপ হওয়ার পরও যিনি অভিনেতা হিসেবে শ্রেষ্ঠত্বের শিরোপা কেড়ে নিতে পারেন — তিনি প্রকৃতই উত্তম।
উত্তমকুমারের অভিনীত চন্দ্রনাথ সিনেমাটি সর্বত্রই বক্স অফিসে সাড়া ফেলেছিলো। কাকতালীয় ভাবে সিনেমাটি মুক্তি পায় মেট্রো সিনেমা হলেও। সেদিন বন্ধুদের সঙ্গে ছবি দেখতে গিয়ে বাবার পাশে দাঁড়িয়েছিলেন সেদিনের সফল নায়ক উত্তম কুমার। আর প্রোজেকশান রুম থেকে রিল বাই রিল দেখাচ্ছিলেন গর্বিত পিতা। এখান থেকেই যাত্রা শুরু। এর চেয়ে বড় প্রাপ্তি জীবনে আর কি থাকতে পারে!
উত্তমকুমার যে উত্তমকুমার হয়েছিলেন তার জন্য রয়েছে চেষ্টা, সাধনা, আত্মবিশ্বাস। আর রয়েছে ইন্ট্রোস্পেকশন বা আত্মদর্শন। অভিনয় জগতের বাইরে তাঁর জীবন মানে কিন্তু এইটাই। “নায়ক” দেখে এটাই আমাদের শেখার।

১৯৮০ সালের ২৪ জুলাই ‘ওগো বধূ সুন্দরী’-র সেটে শুটিং চলছিল। নায়কের পরনে সাদা পাঞ্জাবী-পায়জামা, গালে সাবান, বাঁ কাঁধে তোয়ালে, ডান হাতে শেভিং ব্রাশ। সেটের দোতলা থেকে একতলায় নামার সিঁড়ি বেয়ে নায়িকা সুমিত্রা মুখোপাধ্যাযের সঙ্গে ডায়ালগের ঝড় তুলে নামছেন — উঠছেন। মন্ত্র মুগ্ধের মতো অভিনয় দেখছে গোটা সেট। কিন্তু সাতটা টেকের পরও আজ কিছুতেই পছন্দ হচ্ছে না তার নিজের শট। বাঁ দিকের বুকটা যে বড় চিনচিন করছে, অভিনয়তেও তা স্পষ্ট। অসুস্থ হয়ে পড়েন সেটের মধ্যেই। সেদিনের মতো শুটিং প্যাক আপ হয়ে যায়।
১৬ ঘন্টা যমে-মানুষে টানাটানির পর… প্যাক আপ হয়ে যান চিরতরে। ডায়েরীর পাতায় পরপর ডেট দেওয়া দিন গুলোর ফাঁকে নিজেই আনমনে ২৪ জুলাই বড় বড় করে লিখে গিয়েছিলেন REST…!!
কিংবদন্তীর নায়ক উত্তমকুমার পঞ্চ ভূতে লীন হয়ে গেলেন। “অন্নদাতা পিতা যেখানে ঘুমিয়ে আছেন, তাঁরই বুকের ওপর চির শান্তির প্রলেপটুকু নিয়ে ঘুমিয়ে পড়লেন তাঁর সোনার ছেলে উত্তম — পরম স্বস্তিতে!”
ওঁ শান্তি।।
তথ্যসূত্র: আমার আমি – আত্মকথন উত্তমকুমারের (অনুলেখক শ্রী গৌরাঙ্গ প্রসাদ ঘোষ) এবং অন্যান্য।
অসামান্য। কৃতজ্ঞতা
ধন্যবাদ দাদা।
খুব ভালো ইনফরমেটিভ লেখা।
থ্যাংক ইউ
যদি একটু রেস্ট নিতে পারতেন!
ভালো লেখা।
তবে, “কিছুক্ষণ আরো না হয় রহিতে কাছে,”.….
থ্যাংক ইউ গো ????
খুব সুন্দর হয়েছে।
ধন্যবাদ জানাই।
Thank you dada!!!anek kichu janlam amader mahanayak er byapar e!!
থ্যাঙ্ক ইউ