পূজো মানেই বাঙালির কাছে ‘থাকব না কো বদ্ধ ঘরে, দেখব এবার জগৎটাকে’। বেড়ানো জাতি হিসাবে বাঙালির সুনাম আছে যথেষ্ট। সময়-বাজেট কম্বিনেশন নিয়ে তা সে দিঘা-পুরী-দার্জিলিং হোক বা সিমলা-কুলু-মানালি বা দক্ষিণ ভারত। বাঙালি শুধু সেটুকুতেই তৃপ্ত নয়, সে দেখতে চায় জগৎটাকে। বিদেশ ভ্রমণের পরিকল্পনা থাকে অনেকেরই। তাই, দেশ হোক বা বিদেশ, যে কোন ট্রাভেল ডেস্টিনেশনে বাঙালির দেখা মিলবেই।
একঘেয়ে জীবনের স্বাদ পাল্টাতেই মন চায় ‘ভাগলবা’। সারাবছরের এনার্জির রসদ যোগান হয় এই কটা দিনের মুক্ত ভ্রমণের অক্সিজেন থেকে। সারাবছর ধরে মধ্যবিত্ত ফান্ড ক্রিয়েট করে এই উদ্দেশ্যে। শুধু অর্থ-ই বেড়ানোর প্রতিবন্ধকতা নয়, বেড়ানোর ইচ্ছেটাও ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘদিন সীমিত গন্ডির মধ্যে আবদ্ধ থাকার ফলে যে সংকীর্ণতার জন্ম নেয়, তা থেকে মন ছুটে চলে মুক্তির প্রত্যাশায়। মুক্ত বিহঙ্গের মতো ছুটে চলে সে অজানাকে জানার অদেখাকে দেখার।
ছোটবেলায় একবার পুজোয় বেড়াতে গেছিলাম পাহাড়ে। বড়ো বড়ো সুটকেস নিয়ে রিজার্ভেশন স্লিপার ক্লাসে। ট্রেনে জানলার ধারে বসে খবরের কাগজ পেতে টিফিন কৌটো খুলে ঠান্ডা লুচি, আলুর দম আর কড়া পাকের মিষ্টি খাওয়ার অভিজ্ঞতাই আলাদা। খাবার ভাগাভাগি করা হতো সহযাত্রীর সঙ্গেও। পাহাড়ে এক মন্দিরে দেখা মিলেছিলো পুজোর উদ্বোধন। প্যান্ডেল নেই, মাইক নেই, ঢাকের বদলে ধামসা মাদল। মন্দিরের চৌহদ্দি পেরোলেই নিরালা নিঝুম অন্ধকার।

সেদিন বড্ড মিস করেছিলাম আবেগ, আন্তরিকতা, ভালোবাসা ও নিষ্ঠার পূর্ণ প্রতীক পাড়ার দুর্গাপুজা। কান চাইছিল শুনতে প্রায় আধা ঘন্টা জুড়ে কর্কশ স্বরে ‘ওয়ান, টু, থ্রি….মাইক টেস্টিং’। ভোরবেলায় আগমনীর গান দিয়ে শুরু করে ক্রমান্বয়ে বিসমিল্লাহ খানের সানাই, ‘পাখিটার বুকে যেন তীর মেরো না’, নয়নো মে স্বপ্না, ম্যায় হুঁ ডন কিম্বা ‘দো ঘুঁট মুঝে ভি পিলাদে…’ কিম্বা প্যান্ডেলে ক্যাপ ফাটানোর আওয়াজ, ঘুগনি, ফুচকা, হজমি শরবতের গন্ধ …
বাঙালি আত্মবিস্মৃত জাতি হিসেবে খ্যাত। করোণাকালে ছোট থেকে বড়ো মন ভালো ছিলো না কারো। গৃহবন্দী থাকার দশা কাটলেও কর্মোদ্যমে ঘাটতি ভাবাচ্ছে সবাইকে। ভ্যাক্সিনের আগমনে করোনার প্রকোপ কিছুটা কমায়, গতানুগতিক জীবনের ক্লেদ, কেজো জীবনের মানসিক টানাপোড়েন থেকে মুক্তি পেতে মন চলে যায় প্রকৃতির কোলে।
পুজোর মরশুমে এবছরও কলকাতা হাইকোর্ট পুজো মণ্ডপ দর্শকশূন্য রাখার নির্দেশ জারি করেছে। মুখভার হয়েছে যখন পুজো উদ্যোক্তাদের তখন হাসি চওড়া হয়েছে পর্যটন ব্যবসায়ীদের। পর্যটন শিল্পে উৎসাহের পারদ চড়তে শুরু করেছে। মণ্ডপে ঘোরার আনন্দ মাটি হতেই ছুটিকে কাজে লাগিয়ে রাজ্যে বা রাজ্যের বাইরে বেড়াতে যাবার প্ল্যান বানিয়ে ফেলেছে শহরবাসীর একাংশ।
হিমাচল প্রদেশ, উত্তরাখন্ড, দার্জিলিং, অসম, উত্তর-পূর্ব ভারতের পাহাড়ি এলাকাগুলিতে পর্যটকদের ভিড় বাড়ছে। শুধু পাহাড় নয়, সমতলে এবং সমুদ্র সৈকতের পর্যটনকেন্দ্রগুলিতেও পর্যটকদের ভিড় বাড়ছে।

তবে ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অফ মেডিকেল রিসার্চের (আইসিএমআর) আশঙ্কা ‘রিভেঞ্জ ট্যুরিজিম’-এর হাত ধরেই দেশে করোনা সংক্রমণের ঢেউ আছড়ে পড়তে পারে। রিভেঞ্জ ট্রাভেল বা ট্যুরিজিম (প্রতিশোধ ভ্রমণ বা পর্যটন) বলতে সেই ঘটনাকে বোঝায় যেখানে মানুষ জাগতিক রুটিন থেকে মুক্ত হতে চায়। করোনা ভাইরাসের সঙ্কটের পরিপ্রেক্ষিতে মানুষের জীবনে চলে এসেছে একঘেয়েমি। সেই ঘ্যানর ঘ্যানরের হাত থেকে মুক্তি পেতেই চাই ট্রাভেল।
আইসিএমআর এর একটি রিপোর্টে বলা হয়েছে,’ যে সব জায়গায় পর্যটকদের ভিড় দেখা যাচ্ছে, সেখানকার বাসিন্দাদের মধ্যে ইমিউনিটি কতটা গড়ে উঠেছে তার সঠিক তথ্য আমাদের কাছে এখনো নেই’। হঠাৎ করে একজায়গায় জনসমাগম হলে জনঘনত্ত্ব বাড়বে। যা বিপদের অশনি সংকেত। বিশেষজ্ঞদের একাংশের বক্তব্য, সংক্রমণের শিকড় এই ‘রিভেঞ্জ ট্যুরিজিম’।
আপাতত সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে থাকায় আতঙ্কিত হওয়ার কারণ নেই। শুধু বিশেষ কিছু সতর্কতা মেনে চলুন। প্রয়োজনে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন। দূরে না হলেও আমাদের রাজ্যের প্রতিটি জেলাতেই রয়েছে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যে ভরপুর ভ্রমনস্থান। সপরিবারে সবান্ধবে ছোট্ট ভ্রমণের আনন্দ উপভোগ করুন। নিজের চেনা শুধু নয়, একান্ত কাছের মানুষটাকে নতুন করে খুঁজে পাওয়া যায় একসঙ্গে পথ চলার আনন্দে। অতএব ঠিকঠাক পরিকল্পনা করে দুগ্গা দুগ্গা বলে বেরিয়ে পড়ুন।
বাচ্ছাদের না নিয়ে যাওয়া ভালো এই বছরের জন্য।
ভালো লাগলো।