শ্রাবণ মাসকে শিবের অত্যন্ত প্রিয় মাস বলে মনে করেন তাঁর ভক্তরা। রাজ্যের প্রাচীনতম মন্দিরগুলির মধ্যে ভগবান শিবের সুদ মহাদেব মন্দির জম্মু-কাশ্মীরের একটি জনপ্রিয় ধর্মীয় স্থান। এই মন্দিরটি পাটনীটপ থেকে ৪২ কিলোমিটার এবং জম্মু থেকে ১১২ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত।
এই মন্দিরের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হল, এখানে মাটিতে পুঁতে রাখা একটি বিশাল ত্রিশূলের তিনটি টুকরো রয়েছে, যা পৌরাণিক কাহিনী অনুসারে স্বয়ং ভগবান শিবের। এই ত্রিশূলটি মন্দিরের প্রধান উপাস্য। মূলত ত্রিশূল তিনটি শক্তির প্রতীক— জ্ঞান, ইচ্ছা এবং সম্মতি৷
শিবের মনুষ্যকৃতি মূর্তি এবং শিবের ত্রিশূল শিবপূজার ব্যাপকতার সাক্ষ্য বহন করে।

এই ত্রিশূলটি মন্দিরের প্রধান উপাস্য।
এই মন্দিরের নির্মাণ চিনানীর চন্দ্রবংশীয় রাজা করেছিলেন প্রায় ২৮০০ বছর আগে। স্থানীয় চৌধুরী রামদাস এবং তার পুত্র চৌধুরী পরাগ একশো বছর আগে এই মন্দিরের পুনঃনির্মাণ করেন।
জনশ্রুতি আছে যে, সুধ মহাদেবের মন্দিরে গৌরী কুন্ড নামক একটি ঝরনায় স্নান করার পরে দেবী পার্বতী এখানে নিত্য শিবলিঙ্গের পূজা করতেন। একদিন মাতা পার্বতী যখন পুজো করছিলেন, তখন মহাদেবের পরম ভক্ত সুধান্ত নামের এক দানব এলেন এখানে পুজো করতে।

এই সেই পাপনাশিনী বাওলি (কূপ)।
দানব পার্বতীকে দেখে আলাপ করার বাসনায় মায়ের সামনে এসে দাঁড়ালেন। পূজা শেষ হওয়ার পর মাতা পার্বতী চোখ খোলেন এবং হঠাৎ সামনে অসুরকে দেখে আতঙ্কে চিৎকার করে ওঠেন। তাঁর এই শব্দ কৈলাসে ভগবান শিবের কাছে পৌঁছায়। সমাধিতে নিমগ্ন ভগবান শঙ্কর অনুভব করেন যে মাতা পার্বতী অবশ্যই কোনো সমস্যায় পড়েছেন এবং তাঁকে রক্ষা করার জন্য ত্রিশূল নিক্ষেপ করেন। ত্রিশূল এসে দানব সুধান্তর হৃদয়ে আঘাত করে।
যখন শিব জানতে পারেন যে তিনি অজান্তে একটি বড় ভুল করেছেন তখন মহাদেব সুধান্তকে পুনর্জীবন দান করতে চান। কিন্তু দানব সুধান্ত নিষেধ করলেন। সে পুনর্জীবন চান না বরং নিজের ইষ্ট দেবতার হাতেই মৃত্যুপ্রাপ্তি পেয়ে মোক্ষ লাভ করতে চান। ভগবান শিব সুধান্তের ইচ্ছার সন্মান জানিয়ে বললেন, আজ থেকে এই মন্দিরের বিগ্রহ সুধান্তের নামের সঙ্গে যুক্ত হবে। সেই থেকেই ভগবানের নামের সঙ্গে ভক্তের নাম জুড়ে গিয়ে এই মন্দিরের নাম হল সুধ ( তথা শুদ্ধ) মহাদেব।

ভগবান শিব হলেন কৃপালু, উদার, ত্যাগী, ভক্ত বৎসল দেবতা। ভগবানের হাতে ভক্তের মৃত্যু হলে বড়ই বিহ্বল হয়ে পড়েন মহাদেব। তাই নিজের নিক্ষেপ করা ত্রিশূলটিকে তিন টুকরো করে ওখানেই পুঁতে দাঁড় করিয়ে দিলেন। আজো এই ত্রিশূলগুলিকে মন্দির চত্বরে খোলা জায়গায় সমাহিত করা আছে এবং এখানে আসা ভক্তগণ ত্রিশূল খন্ডগুলিকে নিত্য জলাভিষেকও করেন।
বিশাল আকারের এই ধাতব ত্রিশূলের গায়ে প্রাচীণ অজ্ঞাত লিপিতে কিছু লেখা আছে। পৃথিবীর কোন লিপির সঙ্গে এই লিপির মিল খুঁজে পাওয়া যায়নি। তাই এর গায়ে কি লেখা আছে, তা উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।
এই মন্দিরে একটি প্রাচীণ শিবলিঙ্গ, নন্দী ও শিব পরিবারের প্রতিমা মূর্তি রয়েছে। মন্দিরের গর্ভগৃহে স্থাপিত রয়েছে কালো পাথরের অপূর্ব দর্শন শিব-পার্বতীর প্রতিমা।

মন্দিরের পরিসরে পাকা বাঁধানো একটি পাত্র বিশেষ রয়েছে। প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী দানব সুধান্তের অস্থি এতে সংরক্ষিত আছে। মন্দিরের বাইরে একটি পাপনাশিনী বাওলি (কূপ) রয়েছে যেখানে ১২ মাস ধরে পাহাড় থেকে জল আসে। বিশ্বাস করা হয় যে, এই পবিত্র জলধারায় স্নান করলে সমস্ত পাপ ধুয়ে যায়। তাই, মন্দিরে স্নান করার পরেই বেশিরভাগ ভক্তরা যান।
এই মন্দিরে নাথ সম্প্রদায়ের সাধক বাবা রূপনাথ বহু বছর আগে সমাধি গ্রহণ করেছিলেন। তাঁর ব্যবহৃত ধুনি এখনও মন্দির চত্বরে অখণ্ড জ্যোতিরূপে দিবা-রাত্র জ্বলছে। এই মন্দিরের দেওয়ালের গায়ে বেশ ছোট একটি ফোঁকর রয়েছে। প্রথা আছে, ওই সংকীর্ণ ফোঁকর দিয়ে সাষ্টাঙ্গে গলে গেলে মানুষ নিষ্পাপের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে যায়।

সুধ মহাদেব থেকে আরও কয়েক কিলোমিটার এগিয়ে মানতালাই
সুধ মহাদেব থেকে আরও কয়েক কিলোমিটার এগিয়ে মানতালাই (১৪৫০ মিটার) দেবদারু গাছে ঘেরা একটি গ্রাম পড়বে। মা পার্বতীর জন্মভূমি মানতালাই। কিংবদন্তি অনুসারে, এটি সেই জায়গা যেখানে ভগবান শিব দেবী পার্বতীর সাথে বিবাহ করেছিলেন। মন্দিরে শিব পার্বতীর বিবাহের বিভিন্ন দৃশ্য পাথরের মূর্তিতে বিরাজিত।
এখানে শিব মন্দির ছাড়াও আপনি স্বামী ধীরেন্দ্র ব্রহ্মচারীর তৈরি কমপ্লেক্সটিও দেখতে পারেন যার মধ্যে রয়েছে একটি গাছের আকৃতির বাড়ি একটি বিমানের স্ট্রিপ একটি হোস্টেল এবং অন্যান্য অনেকগুলি অসমাপ্ত প্রকল্প। স্বামী ধীরেন্দ্র ব্রহ্মচারী প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর যোগ পরামর্শ দাতা ছিলেন।

ভগবান শিব দেবী পার্বতীর সাথে এই জায়গায় বিবাহ হয়েছিল।
জঙ্গলের কাছেই রয়েছে গৌরীকুন্ড। খুব ভালোভাবে দেখলে কুণ্ডতে গাভীর স্তনের আকার দৃষ্ট হবে। ভক্তগণ বলে থাকে, এটি কামধেনু গাভীর স্তন। ভক্তগণ অত্যন্ত শ্রদ্ধার সঙ্গে এই জল গ্রহণ করে গৃহে নিয়ে আসেন।
এছাড়াও একটি “দেবক” স্রোত রয়েছে যা সুধ মহাদেব থেকে উৎপন্ন হয় এবং কয়েক কিমি পরে পাথরের শিলাগুলির মধ্যে বিলীন হয়ে যায়।
মন্দিরটি বিশেষ করে আষাঢ়-শ্রাবণ মাসের পূর্ণিমা তিথিতে (জুলাই-আগস্ট) তাৎপর্য অর্জন করে। যখন ভক্তরা এখানে “ত্রিশূল” পূজা করতে আসেন। এই উপলক্ষ্যে মন্দির প্রাঙ্গণে তিন দিনের বিরাট মেলা বসে।

মা পার্বতীর জন্মভূমি মানতালাই।
মেলায় সারা ভারতের বিভিন্ন রাজ্য থেকে শিব ভক্তগণ একত্রিত হয়ে থাকেন। মাথার উপর নীলাকাশ, চারিদিকে সবুজের সমারোহ আর দূরে পাহাড়ের চূড়ায় বরফরাজি। প্রকৃতি দেবীর এই নৈসর্গিক সৌন্দর্য অবলোকন করতে দর্শনার্থীরা ছুটে আসেন এখানে বারংবার।।
তথ্যঋণ: সম্পর্কিত বিভিন্ন বই, ম্যাগাজিন এবং পত্রিকা।