মাদপুর স্টেশন থেকে দক্ষিণে, তিন কিমি দূরে চমকা গ্রাম। এখানেই মেদিনীপুর জেলার সর্বশ্রেষ্ঠ সূত্রধর, ঠাকুরদাস শীল তৈরি করেছিলেন নাগ পরিবারের শ্রীধরজীউর এই নবরত্ন মন্দিরটি। দীর্ঘ প্রায় সত্তর বছর পর আবার সেই মন্দিরের দরজা ভক্তদের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হলো ১লা বৈশাখ (১৫ এপ্রিল) শনিবার। বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা ও পুজার মধ্য দিয়ে, শ্রীধরজীউর নতুন করে যাত্রা শুরু হলো। বেশীর ভাগ পরিবার যখন আর্থিক অসচ্ছলতার কারনে সাহস করে সংস্কারের প্রাথমিক ধাপে পা রাখতেই দ্বিধাগ্রস্থ সেই সময় চমকার নাগ পরিবার সমবেতভাব এগিয়ে এসে একে জঙ্গলের জটা থেকে মুক্ত করে কিছুটা হলেও দিলেন নতুন প্রানের ছোয়া।
এবার আসি একটু এর ইতিহাসের কথায়।
সে আজ প্রায় দেড়শো বছর আগের কথা। আজকের মতন তখনও উদ্দোগী পুরুষরা মাঝে মাঝেই ভাগ্যান্বেষণে বেড়িয়ে পরতেন। সেই রকমই নাগ বংশের আদি পুরুষ অযোধ্যারাম নাগ শোনা যায় ভাগ্যসন্ধানে বেরিয়ে পশ্চিমমুখে এগোতে এগোতে শ’দেড়েক মাইল পথ উজিয়ে এসে থেমেছিলেন খান্দার পরগণার (মেদিনীপুর জেলার খড়গপুর নগরীর অদূরে) চমকা নামের এই গ্রামে। নতুন এলাকায় এসে, তুলোর ব্যবসা শুরু করেছিলেন তিনি। তারপর আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয় নি। কার্পাস তুলোর ব্যবসাতে বিপুল লক্ষ্মীলাভ হয অযোধ্যারামের। সময়টা অষ্টাদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি। কিছুদিন আগেই বড়লাট কর্নওয়ালিসের ‘চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত’ আইন চালু হয়েছে আর তার সুবাদে বহু ধনবান ব্যক্তি নতুন নতুন জমিদারী প্রতিষ্ঠা করছেন। ব্যবসার অর্থে অযোধ্যারামও বড়সড় একটি জমিদারী প্রতিষ্ঠা করলেন। বিশাল দীঘি আর চকমিলানো প্রাসাদ গড়লেন বসবাসের জন্য। অবশ্য আজ আর তার কিছুই অবশিষ্ট নেই।

জেলা জুড়ে তখন গৌড়ীয় বৈষ্ণব ধর্মের প্লাবন চলেছে। সেই প্রভাব থেকে অযোধ্যারামও বাদ গেলেন না। তিনিও বিষ্ণুকেই গ্রহণ করলেন আরধ্য দেবতা রূপে। কোনও মূর্তি নয়, শ্রীধরজীউ নামের শালগ্রাম শিলা প্রতিষ্ঠা করলেন পারিবারিক বিগ্রহ হিসাবে। সেকালে মেদিনীপুর জেলায় সেরা সূত্রধর ছিলেন দাসপুর গ্রামের ঠাকুরদাস শীল। তার হাতের ছোয়ায় গড়ে উঠছিল এক একটি অনুপম সৌধ। জেলার সূত্রধর সমাজের শিরোমণি তিনি। রাজা জমিদাররা নাম লিখিয়ে রাখতেন ঠাকুরদাসকে দিয়ে মন্দির গড়াবার জন্য। অযোধ্যারামও তাঁকেই নির্বাচন করেছিলেন স্থপতি হিসাবে। দেখতে দেখতে একসময় চমকায় বিশাল নবরত্ন মন্দির গড়ে উঠল ঠাকুরদাসের হাতে। শিল্পী তাঁর জীবনে যতগুলি মন্দির গড়েছেন, চমকা গ্রামে নাগ পরিবারের শ্রীধর মন্দিরটি তার মধ্যে অন্যতম শ্রেষ্ঠ কীর্তি। ইটের তৈরী পূর্বমুখী তিন তলা বিশিষ্ট নবরত্ন মন্দির। উঁচু ভিত্তিবেদীতে প্রতিষ্ঠিত বর্গাকার মন্দিরের দৈর্ঘ্য-প্রস্থ সাড়ে একুশ ফুট, উচ্চতা প্রায় পঞ্চাশ ফুট। তিনটি তলেই সামনে অলিন্দ। নীচতলার অলিন্দে খিলান যুক্ত তিনটি দ্বারপথ। টেরাকোটা ফলকে মোড়া থামগুলি ‘ইমারতি’ রীতিতে তৈরী।

গৰ্ভগৃহে যাওয়ার একটিই পথ। গর্ভগৃহ থেকে একেবারে ত্রিতল পর্যন্ত রয়েছে সিঁড়ি। কার্ণিশের নীচ বরাবর একটি প্রতিষ্ঠা-লিপি আছে মন্দিরে। মন্দিরের আসল সৌন্দর্য তার অজস্র টেরাকোটা অলংকরণ। সেগুলিই এই মন্দিরের প্রকৃত গরিমা। কি নেই সেখানে! রামায়ন, মহাভারত, কৃষ্ণলীলা, পুরাণ কাহিনী সব ধরা হয়েছে মোটিফ হিসাবে। সেগুলির মধ্যে আছে রামায়নের কাহিনী যেমন জনকের রাজসভায় রামচন্দ্রের হরধনু ভঙ্গ, পঞ্চবটী বনে সীতাদেবী, সুর্পণখার নাসিকা ছেদন, রাবণের সীতাহরণ, জটায়ুর যুদ্ধ, রাম-রাবণের যুদ্ধ, রাম রাজা ইত্যাদি। তেমনই রয়েছে মঙ্গলকাব্য থেকে ধনপতি এবং শ্রীপতির সিংহল যাত্রা, কমলে-কামিনী দর্শন, রয়েছে কালিয়নাগ দমন ইত্যাদি। মন্দিরের দ্বিতলের অলিন্দে, কার্ণিশের ওপরে, বড় আকারের দুটি মূর্তি স্থাপিত হয়েছিল। বর্তমানে সেগুলি মস্তকবিহীন। সেরকম আরও দুটি রয়েছে গর্ভগৃহের দরজার দুপাশে। অঙ্গনে মন্দির ছাড়াও, আরও দুটি সৌধ নির্মাণ করেছিলেন ঠাকুরদাস। উত্তরে ভোগঘর, আর দক্ষিণে দ্বিতলবিশিষ্ট একটি নহবতখানা। দুটিই আজ ধ্বংসপ্রাপ্ত।

সামান্য পরিবর্তন ঘটিয়ে ১লা বৈশাখের অনুষ্ঠানে সেখানেই ভোগ রান্নার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। এছাড়াও, পৃথকভাবে উল্লেখ করবার মত বিষয় হলো, গর্ভগৃহের দরজার দুটি পাল্লা। তিরিশটি খোপের এই দরজায় খোদাই কাজের যে অপূর্ব মুন্সিয়ানা দেখানো হয়েছিল মেদিনীপুর জেলায় দারুতক্ষণ শিল্পের তা এক উৎকৃষ্ট নিদর্শন। এর সিংহভাগই বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছে। বর্তমানে মাত্র চারটি অবশিষ্ট রয়েছে। মন্দিরকে বেষ্টন করে ছিল একটি ইটের প্রাচীর। তাও আজ বিলুপ্ত। এই মন্দিরের বিপর্যয়ের শুরু স্বাধীনতার পরবতী সময়ে থেকেই। জমিদারি উচ্ছেদ আর বিভিন্ন আইনি জটিলতায় দেবদেবীর সেবার জন্য উৎসর্গ করা জমিগুলোর অধিকার ক্রমে পরিবারগুলির হাত থেকে চলে যায়। দেবসেবার খরচ চালানোই প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠতে থাকে। সেসময় নিশ্চিন্তা গ্রামের অধিবাসী শরিকরা বিষ্ণু বিগ্রহটি তাঁদের পরিবারে নিয়ে গিয়ে প্রতিষ্ঠা করেন। তখন থেকেই পরিত্যক্ত হয়ে পরে বিগ্রহহীন মন্দিরটি। অনাদরে, অবহেলায় এক পা এক পা করে ধ্বংসের পথে এগিয়ে চলে অনিন্দ্য সুন্দর দেবালয়টি। শরিকী জটিলতায় দীর্ঘকাল মন্দিরের সংস্কার হয়নি। অসংখ্য টেরাকোটা ফলকে সাজানো মন্দিরটি ধ্বংসের দিন গুনছিলো। কিন্ত শ্রীধরজীউ বোধহয় কিছু অন্যরকম চাইছিলেন। আসুন পরিবারের সদস্য দের মুখেই শুনে নেওয়া যাক সেই অবিশাস্য কাহিনী।

“সেদিন হঠাৎ করে চিন্ময় বাবু মন্দির দেখতে এসেছিলেন। ওনার সাথে কলকাতা থেকে এসেছিলেন কমল বাবু যিনি দীর্ঘ দিন এরকম মন্দির সংস্কার ও পুনরুদ্ধারের সাথে জরিত। অনেকক্ষন ধরে উনি ওনার নানা অভিজ্ঞতার কথা বলছিলেন। এভাবেই এক সময় উনি আমাদেরকেও পরামর্শ দেন জঙ্গল পরিস্কার করে ছোট করে আবার পুজো শুরু করতে। কেন জানি না ওনার কথাগুলি আমাদের খুব মনে ধরে যায়। মনে হয় সত্যই তো একবার চেষ্টা করে দেখলে হয় না। শুরু হয় আলোচনা। অদ্ভুত ভাবে একটা পারিবারিক বোঝাপড়ার যায়গাও তৈরী হয়। কেমন একটা উদ্দীপনা, কিছু একটা করে আবার মন্দির শুরু করতে হবে এই আবেগে আমরা ভেসে যাই। পরিস্কার করা হয় মন্দির-সহ সমগ্র দেবাজ্ঞন। এবং এই কাজের সবটাই কাঁধে তুলে নেন পরিবারের সদস্যরা”। ধিরে ধিরে মন্দির ফিরে পেতে থাকে তার হারিয়ে যাওয়া অনিন্দ সুন্দর রূপ। আর ১লা বৈশাখ (১৫ এপ্রিল) শনিবার বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা ও পুজার মধ্য দিয়ে, শ্রীধরজীউর নতুন করে যাত্রা শুরু হলো। অসাধ্য সাধন করে, উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন বৃহৎ নাগ পরিবারের সদস্যরা।
কমল বাবু পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন প্রান্তে কালের গর্ভে হারিয়ে যাওয়া মন্দির গুলোকে জনমানসে স্বমহিমায় ফিরিয়ে আনতে নীরবে নির্জনে চেষ্টা করে চলেছেন। এজন্য তিনি সমগ্র মানবজাতির কাছে ধন্যবাদার্হ। লেখা টি পড়ে উপকৃত হলাম আনন্দ পেলাম। কিন্তু বাঁকুড়া জেলার জয়পুর গ্রামের মন্দির গুলো সংস্কারের কোন উপায় বের করতে পারছি না।নিজে নিজের কাছে লজ্জিত হচ্ছি।
কুর্নিশ জানাই নাগ পরিবারের উৎসাহী সদস্যগণ ও পরামর্শদাতা তথা উদ্যোগী কমল ব্যানার্জী মহাশয়কে। এভাবে যদি দেশের আনাচে-কানাচে অবহেলায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা অমূল্য রত্নগুলি রক্ষা পায় তাহলে ইতিহাস চোখের সামনে ভাস্বর হয়ে উঠবে।
এমন উদ্যোগ ভালো লাগে। লেখাটি সকলের পড়া উচিৎ।
এই মন্দির সংস্কার ও তার পিছনে কমলবাবুর পরামর্শে নাগ পরিবারের উদ্যোগ প্রশংসনীয়।