যারা ভেবেছিলেন কোভিড একটা লেভেল প্লেইং ফিল্ড, অতিমারির দাপটে গরিব-বড়লোক বসবে একাসনে তাদের চিন্তাভাবনা বিরাট ধাক্কা খেয়েছে। অবশ্য এমনই হওয়ার কথা ছিল। ২০২০তেই ভারতে তৈরি হয়েছে ৪০ জন নতুন বিলিওনেয়ার। এদের শীর্ষে রয়েছেন মুকেশ আম্বানি। যার সম্পদ বেড়েছে প্রায় ২৪ গুণ। শুধু আমাদের দেশই নয়, অতিমারির সময়ে সব দেশের ছবিটা প্রায় একইরকম। আর এই বিত্তবানদের সবার মোট আর্থিক সম্পদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ১ কোটি ট্রিলিয়ন ডলারেরও বেশি অর্থ। অতিমারি এই বৃদ্ধিকে স্তব্ধ করতে পারেনি। ভারতে ১০০কোটি টাকার বেশি অর্থ রয়েছে এমন বিত্তবানদের সংখ্যা ১০০৭ জন। এদের মধ্যে ১৭৯জন এই তালিকায় এবছরই প্রথম ঢুকলেন।
এ ঘটনা যে এই প্রথম ঘটলো তা নয়, ২০০৮ এ বিশ্বব্যাপী আর্থিক মন্দার সময়েও এমনটাই হয়েছিল। দেখা যাচ্ছে অতিমারি বেশ ধর্মনিরপেক্ষ ব্যাপার। জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব দেশে বড়লোকরা বাড়ছে, কমছে গরিবরা। এই ঘটনা আরেকটা সত্যকেও সামনে আনছে, আর্থিক বৃদ্ধি মানে অসাম্য বাড়া কারণ এই বৃদ্ধি সমাজের সব অংশে সমানভাবে হয়না। অনেকে তর্ক জুড়েছিলেন খোলা বাজারের মডেল পুঁজিবাদের মৃত্যু ঘন্টা বাজিয়ে দেবে। কিন্তু ২০১৮ থেকে আমরা দেখছি বিশ্বে বিলিয়নিয়ারদের সংখ্যা দ্বিগুণ হয়েছে। গরিবদের সম্পদ কমেছে প্রায় ১১শতাংশ। আঁক কষে দেখা যাচ্ছে বিত্তবানরা গরিবদের তুলনায় করও দিচ্ছেন কম। উন্নতি-বিকাশের যে ছবিটা মানুষের সামনে বিশ্বায়ন নামে একটা বেলুন ফুলিয়ে তুলে ধরা হচ্ছে তা যে কতটা অর্থহীন এই ঘটনা আবার তা নতুন করে প্রমাণ করলো। বিশ্বায়ন হয়েছে শুধু মুনাফার, শুধু লোভের আর লাভের।

কেউ প্রশ্ন তুলতেই পারেন এই কোভিডকালেও ধনীদের এই বৃদ্ধি কি করে সম্ভব? হচ্ছে, কারণ এই পরিস্থিতিতে তারা দক্ষ শ্রমিকদের শ্রম কিনছেন আরও সস্তায়। লোক কমিয়ে নিজেদের ইচ্ছেমত উৎপাদন ব্যয় কমাতে পারছেন। আবার অতিমারির অজুহাত দেখিয়ে কর থেকে শুরু করে নানাক্ষেত্রে ছাড় আদায় করছেন অনেক বেশি। এই পরিস্থিতিতে তাদের সরকারি বরাতও অনেক বেড়েছে। অন্যদিকে গরিবদের অবস্থাটা ঠিক উল্টো। শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাতে যে ছাড় ও সুবিধাগুলি তারা পেতেন এই পরিস্থিতিতে তা ব্যহত হচ্ছে। একটু হিসেব করলেই দেখা যাবে শিল্প চাঙ্গা করার যুক্তিতে, ব্যাঙ্ক লোনের সুবিধা, ঋণশোধের ক্ষেত্রে ছাড় সব সুযোগই কিন্তু বিত্তবানরাই বেশি ব্যবহার করতে পারছেন। কাজেই অতিমারি সবকিছু সমান করে দিচ্ছে তা নয়, বরং তা ব্যবধান আরও বাড়িয়েছে। ধনীরা পরিস্থিতিকে ব্যবহার করছেন সম্পদ বাড়ানোর কাজে, গরিবরা তার শিকার হচ্ছে। সবাই সমান হওয়ার কোন প্রশ্নই নেই – সব হিসেবই তো হয় যে যেখানে দাঁড়িয়ে আছে তার ভিত্তিতে।