দুয়ারে সরকার এলে লোকে খুশি হয়। দুয়ারে গঙ্গা এলে ছড়ায় আতঙ্ক। কয়েক কিলোমিটার দূর থেকে গঙ্গা দেখে মানুষজনের স্বপ্নমাখা ঘরবাড়ি। তারপর আস্তে আস্তে এগিয়ে এসে নিঃশব্দে তা গিলে নেয়। মুর্শিদাবাদের শামসেরগঞ্জে এই আতঙ্ক প্রায় প্রতি বছর ঘুরেফিরে আসে। গঙ্গার ভাঙনে ঘরবাড়ি চলে যায় নদীর গর্ভে। নদীপাড়ের বাসিন্দারা এ জিনিস মেনে নিয়েছেন। তারা জানেন, ঘরবাড়ি নদী নিয়ে নেবে। বাড়ির সামান্য ক’টা ইট বাঁচাতে চেষ্টা করেন তারা। গঙ্গার ভাঙনে প্রাণহানি, জলে ভেসে নিখোঁজ হয়ে যাওয়া তো রয়েইছে।
বাংলা গানে জিজ্ঞাসা ছিল, “একূল ভেঙ্গে ওকূল তুমি গড়ো/ যার একূল ওকূল দুকূল গেছে তার লাগি কি কর।’ নদী কোন জবাব দেয়না। সত্যি বলতে কি, তার জবাব দেওয়ার কোন দায়ও নেই। যাদের দায় আছে তারা নিশ্চুপ। নদী ভাঙনে সর্বস্বান্ত মানুষগুলি সাময়িক ত্রাণ পেয়ে টিঁকে থাকে কোনমতে। ঘর বাঁধে অন্য জায়গায়। ভাঙন রোধে নানা পরিকল্পনার কথা শোনে তারা। তারপর আবার ভাঙনের শিকার হয়। আর নদী খুঁজতে থাকে অন্য কোন জায়গা গিলে নেওয়ার ফিকির।

বিশেষজ্ঞরা মালদা-মুর্শিদাবাদের ভাঙনের নাম দিয়েছেন লংটার্ম ন্যাচারাল ডিজাস্টার। কয়েক বছর আগে শামসেরগঞ্জ ব্লকেরই নতুন শিবপুর গ্রামের ভাঙনের চেহারা দেখে চমকে উঠেছিলাম। ঠিক কেক কাটার মতই মসৃণভাবে কোথাও কোন চিহ্ন না রেখে বাড়িঘর খেয়ে ফেলেছে নদী। বোঝাই যাবে না কয়েকঘন্টা আগেও মানুষ এখানে বাস করতেন! ঘটনা ঘটে যায়, আর প্রতিবারই বিপর্যয়ের পর বিশেষজ্ঞরা রায় দেন ফারাক্কা ব্যারেজ হওয়ার ফলে রুদ্রমূর্তি ধারণ করেছে গঙ্গা। সে তো নয় বোঝা গেল, কিন্তু এখন মানুষগুলি কোথায় যাবেন, নিশ্চিন্তভাবে বাঁচবেন কীভাবে সে ব্যাপারে সবাই নিশ্চুপ। ৬০ এর দশকের প্রথমভাগ থেকে এই বিপদ বেড়েছে। তারপর রাজ্যে এসেছে ডান-বাম নানা সরকার। প্রতিবারই নতুন আশায় বুক বেঁধেছেন মানুষ। আর রাজনীতি শুধু একে অন্যকে দোষ দিয়েছে।

এবছর ভাঙনে যে গ্রামগুলি ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে তাদের সর্বনাশের শুরু কিন্তু কয়েক বছর আগে থেকে। মুর্শিদাবাদের নিমতিতা গ্রাম পঞ্চায়েত, চচন্ডা গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকায় এর আগেও শয়ে শয়ে বাড়িঘর, জমি চলে গেছে জলের অতলে। মনে পড়ছে, গত বছরের অগাস্ট মাসেও শামসেরগঞ্জে ভাঙনে তলিয়ে গিয়েছিল বহু বাড়ি, একটা মন্দির ও স্কুলও ছিল তার মধ্যে। আর বিস্তৃত এলাকার কৃষি জমি তো ছিলই। প্রায় ২.৭ কিলোমিটার এলাকার কোন চিহ্ন ছিলনা। প্রশ্ন হল, নদী তার নিজের কাজ করে যায়, বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দেন কিন্তু এই মানুষগুলি কীভাবে বাঁচবে সে প্রশ্নের কোন উত্তর খুঁজে পাওয়া যায়না। বারবার অস্তে এসে উদয়ের উপমায় কবিতা সাজানোর মত বুদ্ধিবৃত্তিও তাদের নেই। অসহায় চোখে নদীর দিকে তাকিয়ে তারা শুধু নিজের ভাগ্যকে অভিশাপ দেন।
ভাঙনের দায় কার এ নিয়ে রাজনৈতিক তর্জা এবার আরও বাড়বে। কারণ, শামসেরগঞ্জে উপনির্বাচন আসছে। বিজেপি বলছে, রাজ্য টাকা বরাদ্দ করলেও কাজ শুরু করেনি। তৃণমূল বলছে, কেন্দ্র আর্থিক সহযোগিতা না করলে এই সমস্যার সমাধান হবেনা। এদিকে আরও এগিয়ে আসছে গঙ্গা, ঠাঁইনাড়া মানুষগুলো কাঁদতে ভুলে গেছে। কিন্তু গঙ্গার তো কিছু করার নেই। ভুল পরিকল্পনায় তার নাব্যতা কমেছে, জলে বেড়েছে পলির পরিমাণ। নদী দিক বদল করতে বাধ্য হচ্ছে। প্রকৃতির সন্তান মানুষের দুর্দশা দেখে তারও চোখে জল আসে।