চলে গেল ২১শে ফেব্রুয়ারি। আমরা বাংলা ভাষার ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা করলাম। যে ভাষার এমন বিরাট সাহিত্য আছে, যে ভাষার এমন মহান লেখকরা আছেন, যে ভাষায় কয়েক হাজার লিটল ম্যাগাজিন প্রকাশিত হয়, সে ভাষাকে বিকৃতি ও অবক্ষয় থেকে রক্ষা করতে হবে। নিশ্চয়ই এ ক্ষেত্রে প্রশাসনের ভূমিকা আছে। কিন্তু তার চেয়ে বড় ভূমিকা আছে নাগরিকদের। আমাদের রাজ্য থেকে প্রকাশিত ছোট পত্রিকাগুলি নিরন্তর প্রচার চালালে, আমাদের সাহিত্য সম্মেলনগুলি উদ্যোগ গ্রহণ করলে সুফল ফলবে আশা করি।
আমি এমন এক সাহিত্য সম্মেলনের উল্লেখ করব, যারা গত কুড়ি বছর ধরে বাংলা ভাষার প্রসারের কাজে নিযুক্ত আছে। আমরা বলছি পর্ণশ্রী সাহিত্য সম্মেলনের কথা। গত বারোই ফেব্রুয়ারি তাদের ২৩-২৪তম বার্ষিক সম্মেলন হয়ে গেল পর্ণশ্রী বিদ্যামন্দিরে। ১৯৯৯ সালের ২১ শে ফেব্রুয়ারি তাদের যাত্রা শুরু হয়। প্রথম বছরের সম্মেলনে সভাপতি ছিলেন অন্নদাশংকর রায়। অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সুভাষ মুখোপাধ্যায়, বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত, অজিত ঘোষ, বিপ্লব চক্রবর্তী। তারপর থেকে বিভিন্ন সম্মেলনে এসেছেন সাহিত্য-সংস্কৃতি জগতের নানা খ্যাতিমান মানুষ, যেমন প্রদীপ ঘোষ, অমিতাভ চৌধুরী, চুণী গোস্বামী, বন্দনা সেন, প্রতুল মুখোপাধ্যায়, অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়, পবিত্র মুখোপাধ্যায়, শ্যামলকুমার সেন, সুবোধ সরকার, প্রচেত গুপ্ত, প্রণতি ঠাকুর, দীপালি নাগ, পি কে ব্যানার্জী, কণা বসু মিশ্র, রুশতি সেন, স্বপন সোম প্রমুখরা। শুধু যে খ্যাতনামারা বক্তৃতা করেন, তা নয়, দর্শক-শোতারাও তাতে অংশগ্রহণ করেন। কখনও কখনও আলোচনা চমৎকার একটি বিতর্কের চেহেরা নেয়। সম্মেলনের উদ্যোক্তারা সুস্থ বিতর্ককে স্বাগত জানান।

তিনটি অধিবেশনের আয়োজন করা হয় সম্মেলনে। সকালের অধিবেশনে আলোচনা, দুপুরের অধিবেশনে স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের তাৎক্ষণিক বক্তৃতা ও কবি সম্মেলন, রাতের অধিবেশনে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। অঞ্চলের মানুষকে এই সম্মেলন যে উদ্ধুদ্ধ করতে পেরেছে তার প্রমাণ সকালের অধিবেশনে মানুষের অংশগ্রহণ। রবিবার সকালে বাড়ির অনেক কাজকর্ম থাকে। সেগুলি কোনভাবে সেরে নিয়ে সম্মেলনে উপস্থিত হন এলাকার মানুষ। সাহিত্য অ্যাকাডেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখক তপন বন্দ্যোপাধ্যায় একবার সম্মেলন মঞ্চেই বলেছিলেন, ‘রবিবারের সকালবেলা আপনারা কোন ম্যাজিকে এতগুলি মানুষকে জড়ো করেছেন বলুন তো!’
পর্ণশ্রী সাহিত্য সম্মেলনের মূল স্লোগান : বাংলা বলো, বাংলা পড়ো, বাংলা লেখো। সম্মেলনের প্রতিনিধি ও দর্শক-শ্রোতাদের মনে এই স্লোগানটি গেঁথে দেবার চেষ্টা করেন সম্মেলনের কর্মকর্তারা। আকারে-প্রকারে এই সম্মেলন বিরাট কিছু নয়। তাই তার প্রভাবও এমন কিছু বিরাট নয়। কিন্তু রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তের ছোট ছোট সংস্থাগুলি বাংলা ভাষা প্রসারের ব্যাপারে এ রকম ছোট—খাটো উদ্যোগ নিলে কাজের কাজ হবে। এলাকার স্কুল-কলেজ-ক্লাবগুলিকে এর সঙ্গে যুক্ত করতে পারলে আরও ভালো হয়।
পর্ণশ্রী সাহিত্য সম্মেলনের আলোচনা করতে গিয়ে আর একটা দুঃখের কথা বলতে হয়। এখনও পর্যন্ত এই সংগঠন চেষ্টা সত্ত্বেও নতুন প্রজন্মকে আকৃষ্ট করতে পারে নি। এটা শুধু পর্ণশ্রী সাহিত্য সম্মেলনের ব্যর্থতা নয়, সাধারণভাবে এই ধরনের সব সংগঠনেরই সমস্যা। বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির ব্যাপারে নতুন প্রজন্মের প্রতিনিধিদের অনাগ্রহ নিয়ে প্রশাসন ও বিশেষজ্ঞদের গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনা করা দরকার।
লেখক সিনিয়র ফেলোশিপপ্রাপ্ত গবেষক