সংসদে ডামাডোল, হট্টগোল। বর্ষাকালীন অধিবেশন শেষ হয়ে গেল বুধবারই। বিরোধীরা অবশ্য নিজেদের পিঠ চাপড়াতে পারেন এই ভেবে যে, সরকারের জোরদার বিরোধিতা করা গেছে। এবারের বিরোধের মূল বিষয় অবশ্য পেগাসাস কাণ্ড। ইজরায়েলের একটি কোম্পানি থেকে বহুমূল্য সফ্টওয়্যার পেগাসাস কিনে এ দেশে অনেক মানুষের মোবাইল টেলিফোনে আড়ি পাতা হয়েছে, এহেন খবর সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশ পেতেই প্রতিবাদে শামিল হয়েছেন বিরোধী রাজনীতির নেতারা, বিশিষ্টজনেরা। এ নিয়ে বিক্ষোভ এমন জায়গায় গিয়েছে যে সংসদ থেকে একাধিক সাংসদকে একাধিক দিনের জন্য সাসপেন্ড করা হয়েছে। মোদী সরকার এসব আন্দোলনকে পাত্তা দেয়নি মোটেই। পেগাসাস কাণ্ড নিয়ে সংসদে আলোচনার দাবি স্রেফ অগ্রাহ্য করা হয়েছে। টানা হই-হট্টগোলেও মোটেই ঘাবড়ে না গিয়ে মোদি সরকার সংখ্যাগরিষ্ঠতার সুযোগ কাজে লাগিয়েছে ভালো ভাবেই। প্রায় কোনো আলোচনা ছাড়াই পাশ করানো হয়েছে নানা বিল। রাজ্যগুলিকে ওবিসি তালিকা তৈরির অধিকার প্রদান সংক্রান্ত একটি বিল ছাড়া কোনোটাতেই সম্মিলিত বিরোধীরা সম্মতি জানায়নি। আবার এই হট্টগোলের মধ্যেই দু’য়েকটা গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণাও কেন্দ্র করে দিয়েছে, যার সুদূরপ্রসারি প্রভাব রয়েছে। পেগাসাস ঢেউয়ে সেসব প্রায় চাপাই পড়ে গিয়েছে। তেমন একটা জিনিস হলো এনপিআর নিয়ে কেন্দ্রের বক্তব্য।
১০ আগস্ট শুক্রবার লোকসভায় কেন্দ্রীয় মন্ত্রী একটি প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে বলেন, সারা দেশে ন্যাশনাল পপুলেশন রেজিস্টার বা এনপিআর সংশোধনের কাজ শুরু হয়ে গেছে। ন্যাশনাল রেজিস্টার অফ সিটিজেনস বা এনআরসি গড়া নিয়ে এখনও কোনো সিদ্ধান্ত না হলেও এনপিআর গড়ার তৎপরতা নানা প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে। মনে পড়ে যাচ্ছে অমিত শাহের সেই বহুচর্চিত উক্তি, ‘আপ ক্রোনোলজি সমঝ লিজিয়ে’।
২০১৯ সালে লোকসভা ভোটের ঠিক আগে অমিত শাহ দেশের নাগরিকত্ব নিয়ে সেই অতি-চর্চিত মন্তব্যটি করেন। তিনি বলেন, সবথেকে আগে আসবে নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন, তারপরে আসবে এনআরসি। শাহ বলেছিলেন, এনআরসি কেবলমাত্র পশ্চিমবঙ্গের জন্য নয়, সারা দেশের জন্যই আসবে। কোনটা আগে, কোনটা তার পরে, এটা বলবার উদ্দেশ্যেই তিনি মন্তব্য করেছিলেন, ‘আপ ক্রোনোলজি সমঝ লিজিয়ে’। ক্রোনোলজি বলতে তিনি ঘটনার পরম্পরা বোঝাতে চেয়েছেন। সিটিজেনশিপ অ্যামেন্ডমেন্ট বিল ২০১৯ সংসদে পাশ হয়ে রাষ্ট্রপতির সম্মতি পায় ২০১৯ সালের ১২ ডিসেম্বর। মনে রাখতে হবে, এই ধরনের একটি বিল ২০১৬ সালেও লোকসভায় পাশ হয়েছিল। কিন্তু সেই সময়ে রাজ্যসভায় বিজেপি তথা এনডিএ-র গরিষ্ঠতা না থাকায় সেটি আটকে গিয়েছিল। পরবর্তী তিন বছরে রাজ্যসভায় রাজনৈতিক শক্তিগুলির বিন্যাস বিজেপির পক্ষে ঢলে পড়ে বলেই ১১ ডিসেম্বর ২০১৯ তারিখে নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন রাজ্যসভায় ১২৫ পক্ষে, ১০৫ বিপক্ষে, এ ভাবে পাশ হয়ে যায়। কী আছে এই আইনে? আইনটির উদ্দেশ্য ১৯৫৫ সালের নাগরিকত্ব আইনে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংশোধন করা — যাঁরা বাংলাদেশ, পাকিস্তান, আফগানিস্তান থেকে ভারতে ২০১৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর বা তার আগে এসেছেন, এবং যাঁরা হিন্দু, শিখ, বৌদ্ধ, জৈন, পারসি অথবা খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী, তাঁদেরকে বেআইনি অনুপ্রবেশকারী হিসেবে গণ্য করা হবে না। অর্থাৎ, এই সব মানুষেরা ভারতের নাগরিক হিসেবেই স্বাকৃতি পাবেন। আইনটি নিয়ে সারা দেশে বিরোধিতার ঢেউ ওঠে। প্রতিবাদের প্রধান কারণ ছিল এই যে, ভারতের নাগরিকত্ব ঠিক করতে এই প্রথম ধর্মের উল্লেখ আইনে আনা হলো, যার অর্থ ভারত তার ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্র হারাচ্ছে। অনেকেই বলেন, এই আইন পাশ হবার পরে ভারতে মুসলমানরা দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকে পরিণত হবার আশঙ্কায় ভুগছেন। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এই সংশোধনীর দরকার হলো কেন?
ভারতে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির কারবারিদের অন্যতম প্রধান অস্ত্র হচ্ছে এ দেশের নাগরিকত্ব। তাঁরা নানা প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে এমন একটা অবস্থা সৃষ্টি করতে চান, যেখানে ভারতীয় মুসলিমরা দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকে পরিণত হবেন। ২০০৩ সালে, যখন বিজেপি নেতা অটল বিহারী বাজপেয়ি প্রধানমন্ত্রী, তখন আগে উল্লিখিত ১৯৫৫ সালের নাগরিকত্ব আইনের একটি সংশোধনী পাশ করানো হয়েছিল। এই সংশোধনীতে ন্যাশনাল রেজিস্টার অফ ইন্ডিয়ান সিটিজেন্স নামে একটি নাগরিক পঞ্জি গড়ার কথা বলা হয়। প্রতিটি নাগরিক সম্পর্কে কী কী তথ্য থাকবে, তা-ও স্পষ্ট করে বলে দেওয়া হয়। প্রত্যেক নাগরিকের ১২ দফা তথ্যগুলি হলো, ১) নাম, ২) বাবার নাম, ৩) মায়ের নাম, ৪) লিঙ্গ, ৫) জন্ম তারিখ, ৬) জন্মের স্থান, ৭) বর্তমান ও স্থায়ী বসবাসের ঠিকানা, ৮) বিবাহিত না অবিবাহিত। বিবাহিত হলে স্ত্রী বা স্বামীর নাম, ৯) শরীরে দৃশ্যমান কোনো দাগ বা চিহ্ন, ১০) নাগরিক হিসেবে পঞ্জিকরণের তারিখ, ১১) নাগরিক পঞ্জিতে নাম থাকলে তার ক্রমিক নম্বর এবং ১২) জাতীয় আইডেন্টিটি নম্বর।
কী ভাবে এই বিস্তীর্ণ তথ্য সংগৃহীত হবে? ২০০৩ সালে বলা হয়েছিল, বাড়ি বাড়ি সমীক্ষা করে ন্যাশনাল পপুলেশন রেজিস্টার বা এনপিআর গঠিত হবে। এনপিআর-এ যেসব তথ্য সংগ্রহ করতে হবে, সেগুলি এনআরসি-র তথ্যসমূহের মতোই, তবে শিক্ষাগত যোগ্যতার মতো দু’য়েকটি অতিরিক্ত তথ্য এনপিআর-এ থাকবে। এনপিআর-এর মাধ্যমে পাওয়া তথ্য এর পর যাচাই করা হবে এবং অবশেষে ন্যাশনাল রেজিস্টার অফ ইন্ডিয়ান সিটিজেন্স তৈরি হবে। ২০০৩ সালের ওই সংশোধনীতে ১৪ নং ধারায় বলা হয়েছিল, এভাবে নাগরিক পঞ্জি তৈরি হলে প্রত্যেক নাগরিককে আইডেন্টিটি কার্ড দেওয়া হবে।
এনপিআর প্রথম তৈরি হয়েছিল ২০১০-১১ সালে, সেসময়ের জনগণনার তথ্যের ভিত্তিতে। তখন কংগ্রেসের নেতৃত্বে ইউপিএ-২ সরকার চলছিল, সরকারে ছিল তৃণমূল কংগ্রেসও। তাই সাম্প্রদায়িক ভিত্তিতে এনআরসি গড়ার কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। কিন্তু ২০১৪ সালে কংগ্রেস ও ইউপিএ হেরে যায়, নরেন্দ্র মোদি ক্ষমতায় বসেন। ২০১৫ সালে বাড়ি বাড়ি গিয়ে তথ্য সংগ্রহ করে এনপিআর তালিকা পুনর্নির্মিত হয়েছিল। এই কাজ করার সময়ে একটি বিরাট সমস্যা সামনে আসে। দেখা যায়, এ রাজ্য সহ দেশের নানা এলাকায় বিরাট সংখ্যক মানুষ বসবাস করছেন, যারা বা তাঁদের পূর্বপুরুষরা গত সাত দশকে নানা পর্বে প্রতিবেশী দেশ থেকে ভারতে এসেছেন। এই সমস্যা মোকাবিলা করতেই ২০১৬ সালে বিজেপি সরকার মুসলিম ব্যতীত অন্য ধর্মাবলম্বী মানুষদের নাগরিকত্ব দিতে উদ্যোগ নেয়, যে কথা আগেই উল্লিখিত হয়েছে। ২০১৯ সালে বিরাট গরিষ্ঠতা নিয়ে এসে সেই কাজই মোদি-শাহ-রা শুরু করেছেন। এনপিআর না হলে এনআরসি করা সম্ভব নয়। সংসদে মন্ত্রী বলেছেন, এনপিআর চলছে, এনআরসি নিয়ে এখনও সিদ্ধান্ত হয়নি। একথা বলবার পরের দিনই রাজ্যের বিজেপি নেতা দিলীপ ঘোষ বলেছেন, এখনই শুরু হোক সিএএ আইনের অধীনে অ-মুসলিমদের নাগরিকত্ব প্রদান। দুই-কে দুই-এর সঙ্গে যোগ করে চার করে নিতে অসুবিধা হয় না, এনপিআর ও সিএএ-এর কাজ করে এনআরসি-র কাজও শুরু হতে চলেছে, সেটা খুব একটা দেরিতে নয়। সেটা হলে দেশে আনুষ্ঠানিক ভাবে ধর্মনিরপেক্ষতা অস্ত যাবে, বিশেষ একটি ধর্মের কোটি কোটি মানুষকে দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকে পরিণত করা হবে। ধর্মনিরপেক্ষ মানুষকে তাই দেশের অন্তরাত্মা বলছে, আপলোগ ক্রোনোলজি সমঝ লিজিয়ে — আগে যেগুলো করার, তাতে হাত দেওয়া হয়েছে, পাহাড়ে ধোঁয়া যখন উঠছে, আগুন নিশ্চয়ই কোথাও লেগেছে।
ভালো লেখা।