সংরক্ষণ তো দুর অস্ত, উদাসীনতা, প্রশাসনিক অবহেলা আর সংস্কারের অভাবে স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম পুরোধা বাংলার মুকুটহীন সম্রাট দেশপ্রাণ বীরেন্দ্রনাথ শাসমলের জন্মভিটে আজ কার্যত ধ্বংসস্তুপে পরিণত। পূর্ব মেদিনীপুর জেলার কাঁথি মহকুমা শহর থেকে প্রায় দশ কিলোমিটার দূরে দেশপ্রাণ ব্লকের চন্ডীভেটি গ্রামই দেশপ্রাণ বীরেন্দ্রনাথের জন্মভিটে।
দীঘা-কলকাতা সড়কে কাঁথি-৩ ব্লকের মারিশদা বাসস্টপে নেমে ট্রেকার, অটো বা রিকশায় চেপে আঁউরাই আর সেখান থেকে হাঁটা পথে মাইল খানেক দুরত্বে দেশপ্রাণ বীরেন্দ্রনাথ শাসমলের জন্মভিটে গ্রাম চন্ডীভেটি। চন্ডীভেটি গ্রামের জমিদার বিশ্বম্ভর শাসমলের দ্বিতীয় সন্তান হিসেবে বীরেন্দ্রনাথ জমিদার বিশ্বম্ভর শাসমলের বিশাল দোতলা বাড়িতে ১৮৮১ সালের ২৬ অক্টোবর (বাংলা ৯ কার্ত্তিক ১২৮৮ ) মা আনন্দময়ী দেবীর কোল আলো করে জন্মগ্রহণ করেন। কিন্তু সেই বিশাল দোতলা বাড়িই আজ ধ্বংসস্তূপে পরিণত।
বীরেন্দ্রনাথ শাসমলের ধ্বংসস্তূপে পরিণত বসতবাটির দালানের ফাটলের ফাঁকে ফাঁকে গজিয়েছে বিশাল বটগাছ। আর উঠোনে শিকড় ছড়িয়েছে ছোট ছোট অশ্বথগাছ। গোটা চাতাল জুড়ে চামচিকে, বাদুড় আর বিষাক্ত সাপের আনাগোনা। দিনের বেলাতেও গ্রামের মানুষ মানুষ জন এই ধ্বংসস্তূপের ত্রিসীমানায় ঘেঁষে ভয় পান। এই ধ্বংসস্তূপেই চাপা পড়ে রয়েছে ‘বাংলার কালো ষাঁড়’ দেশপ্রাণ বীরেন্দ্রনাথের বরণীয় জীবনের স্মরণীয় নানান স্মৃতি। এই বাড়িতেই ছোটবেলা থেকে নেতৃত্ব দেওয়ার প্রবণতা, কলেজে পড়াকালীন জাতিভেদ সঙ্কীর্ণতার উর্ধ্বে বিচরণ করার দৃঢ়তা, পবিত্র জীবন যাপন যা অন্যদের কাছে ছিল অপার বিস্ময়ের।

এই বাড়ি থেকেই মা আনন্দময়ী দেবীর আশীর্বাদ নিয়ে বীরেন্দ্রনাথ বিলাতে ব্যারিস্টারি পড়তে যান। পরবর্তীকালে বঙ্গ বিভাগ প্রতিরোধ আন্দোলন গড়ে তুলে দৃঢ়তার সঙ্গে মেদিনীপুর বিভাজন রোধ করেন। মেদিনীপুরের প্রলয়ঙ্করী বন্যায় বিপন্ন মানুষের সেবার জন্য স্বেচ্ছাসেবক দল গঠন করে সেবা কার্যে নিজেকে নিয়োজিত করেন। বঙ্গীয় প্রাদেশিক কংগ্রেস কমিটির প্রথম সম্পাদক নির্বাচিত হন।অসহযোগ আন্দোলনে যোগ দিয়ে অসম সাহসিকতাময় একক প্রচেষ্টায় ইংরেজ সরকারের স্থাপিত ২২৮টি ইউনিয়ন বোর্ড তুলে দেন। সেদিন বীরেন্দ্রনাথের নেতৃত্বে সাধারণ মানুষের ঐক্যবদ্ধ জনজাগরণ সারা ভারতে পড়ে। স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে প্রথম অহিংস আন্দোলনের জয় ঘোষিত হয়। কলকাতা কর্পোরেশনে কাউন্সিলর নির্বাচিত হওয়া ছাড়াও তিনি মেদিনীপুর জেলা বোর্ডের চেয়ারম্যান হন। ব্যারিস্টার হিসেবে চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুন্ঠন মামলায় অভিযুক্ত আসামীদের পক্ষে আইনজীবী হিসেবে বিনা পারিশ্রমিকে মামলা লড়ে আসামীদের প্রাণদন্ডাদেশ থেকে মুক্ত করেন। নিঃস্বার্থ দেশপ্রেম, চারিত্রিক দৃঢ়তা আর তেজস্বীয়তায় রাজনীতি,স্বাধীনতা আন্দোলনে বীরেন্দ্রনাথ উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। আর সেই জন্যই তাঁকে ‘বাংলার মুকুটহীন সম্রাট’ ও ‘দেশপ্রাণ’ আখ্যায় ভূষিত করা হয়।

১৯৩৪ সালের ২৪ নভেম্বর দেশপ্রাণের প্রয়াণ ঘটে। দেশপ্রাণের জন্ম শতবর্ষ জাঁকজমক পরে বেশ কয়েক বছর পালিত হলেও বর্তমানে সেই উদ্যোগ উৎসাহে ভাটার টান। চন্ডীভেটি দেশপ্রাণ বীরেন্দ্র স্মৃতি রক্ষা কমিটির উদ্যোগে এখনও প্রতিবছর দেশপ্রাণ মেলা অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। বীরেন্দ্র স্মৃতিরক্ষা কমিটির সম্পাদক ফুলকুমার বেরা বলেন, “সরকারী সাহায্য ছাড়াই স্মৃতিরক্ষা কমিটির সদস্যদের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় প্রতিবছর এলাকার বাসিন্দাদের সহযোগিতায় দেশপ্রাণ মেলা অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। মেলায় দেশপ্রাণের স্মৃতিচারণ সভা, প্রবন্ধ, অঙ্কন প্রতিযোগিতা ছাড়াও নাচ, গান আবৃত্তি, অভিনয় সহ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও ক্রীড়া প্রতিযোগিতা হয়ে আসছে। এমনকী পুরুলিয়ার ছৌ নাচের আসর বসে।” ফুলকুমার বাবুর কথায়, “বর্তমান প্রজন্মের কাছে দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের গৌরবময় ইতিহাস ও সেই পর্বে দেশপ্রাণ বীরেন্দ্রনাথের ভূমিকা তুলে ধরার জন্য ভগ্নস্তূপে পরিনত দেশপ্রাণের এই বসত বাটিকে হেরিটেজ ঘোষণা করে অবিলম্বে সংস্কার করা প্রয়োজন।” তিনি বলেন, “দেশপ্রাণ মেলার ক’দিন এই এলাকা জমজমাট থাকলেও ফের শ্মশানের নীরবতা ঘিরে ধরে দেশপ্রাণের জন্মভিটেতে।”

দেশপ্রাণ পঞ্চায়েত সমিতির প্রধান ও পূর্ব মেদিনীপুর জেলা পরিষদের মৎস্য ও প্রাণীসম্পদ কর্মাধ্যক্ষ তরুণ জানা বলেন, ইতিমধ্যেই পঞ্চায়েত সমিতির পক্ষ থেকে রেজুলেশন করে সরকারের কাছে পাঠিয়ে কাঁথি-২ ব্লকের নাম সরকারীভাবে দেশপ্রাণ ব্লক করা হয়েছে। ইতিমধ্যেই দেশপ্রাণের জন্মভিটে কে কেন্দ্র করে চন্ডীভেটি গ্রামে দেশপ্রাণের মূর্তি স্থাপন, কমিউনিটি হল, জুনিয়র হাইস্কুল, স্বাস্থ্যকেন্দ্র চালু হয়েছে। তরুণবাবু বলেন, “দীর্ঘদিন ধরেই দেশপ্রাণের জন্মভিটেকে হেরিটেজ ঘোষণার পাশাপাশি সংস্কার ও সংরক্ষণের দাবী করে আসা হচ্ছে। তা এখনও হয়নি। তবে সম্প্রতি তৃণমূল সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় চন্ডীভেটি গ্রামে এসে দেশপ্রাণের বাড়ির হাল অবস্থা দেখে বাড়িটির আশু সংস্কারের প্রয়োজন বলে জানান। আমরা আশা করছি হেরিটেজ কমিশনের পক্ষ থেকে দেশপ্রাণের বাড়িটি হেরিটেজ ঘোষণা ও সংস্কার করা হবে।” তরুণ বাবুর আরও বলেন, “দেশপ্রাণের বাড়ি ঘিরে সংগ্রহশালা, শিশু উদ্যান, লাইব্রেরি ও পর্যটকদের জন্য বিশ্রামাগার নির্মাণ সহ চন্ডীভেটিকে আদর্শ গ্রাম হিসেবে তুলে ধরার।”