প্রুফ রিডারের চাকরি, মেডিক্যাল রিপ্রেজেন্টেটিভ, দর্জির দোকানদারির ব্যবসা গুটিয়ে রঙ্গমঞ্চে। চলচ্চিত্রের পর্দায় কৌতুকের রস ঢেলে দিয়ে নাট্য ও চিত্রমোদিদের একঘেয়ে বিষাদের মুহূর্তকে ধুয়ে মুছে আনন্দ পরিবেশন করে এলেন জহর রায় সুদীর্ঘ বছর ধরে। হাস্যকৌতুক অভিনয়ে বাংলা চলচ্চিত্রে এতটা সফলভাবে জহর রায় ছাড়া বোধহয় আর কোন অভিনেতাকে দর্শকদের চোখে মুখে হাস্যরসের ফুল ঝুড়ির মালা ছড়াতে পারেননি। দর্শকের জন্য জহর রায় ছিল একটা ইমেজ যিনি খলনায়ক থেকে শুরু করে ট্র্যাজিক চরিত্রে সমান পারঙ্গম।
১৯১৯ সালে ১৯ সেপ্টেম্বর জন্মে কেঁদেছিলেন আর বেদনাদায়ক মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ার আগের দিন পর্যন্ত লোকটা কখনো অনাবিল হাস্যরস, কখনো বিদ্রূপ আবার কখনো বিদ্যুৎ গতিতে চলাফেরার সংলাপের মাধ্যমে রস সৃষ্টিতে স্মৃতিময় হয়ে রইলেন। বিমল রায়ের “অঞ্জনগড়” ছবিতে তার প্রথম জীবনের অভিনয় থেকে শেষ পর্যন্ত প্রায় সাড়ে তিনশো ছবিতে তিনি অভিনয় করেছিলেন।

জহর রায় অভিনয় ক্ষমতাটা খানিকটা পেয়েছিলেন পৈত্রিক সূত্রে। বাবা সতু রায় ছিলেন সাইলেন্ট যুগের একজন নামকরা অভিনেতা। ব্রিটিশ ডমিনিয়ান ফিল্ম কোম্পানির ছবিতে অভিনয় করেছেন। নব নাট্য মন্দিরের শিশির ভাদুড়ীর নাটক “রঘুবীর”-এ অপূর্ব অভিনয় দেখে রাজশেখর বসু (পরশুরাম) তাকে বেঙ্গল কেমিক্যাল কোম্পানিতে চাকরি দেন। জহরের শিক্ষা জীবন কাটে কলকাতায় এবং বিহারের রাজধানী পাটনায়। বি.এ পড়তে পড়তে ছেড়ে দেন। ১৯৫৪ সালে কমলা দেবীকে বিবাহ করেন। তাঁদের তিন কন্যা এবং একটি মাত্র পুত্র ছিল।
অসাধারণ কৌতুক অভিনেতা ও মানুষ ছিলেন জহর রায়। এ প্রসঙ্গে একটা সরস গল্প বলি।
সেই আমলে সুঅভিনয় শিক্ষক বলে নরেশচন্দ্র মিত্র মশাইয়ের সুনাম ছিল। খলনায়ক চরিত্রে তাঁর অভিনয় সমালোচকদের প্রশংসা কুড়িয়েছিলো। তাঁর নিজের কন্ঠস্বর ছিলো অনুনাসিক। জহর রায় এতটাই দক্ষ অভিনেতা ছিলেন যে সেই অনুনাসিকত্বটুকুও নকল করেছিলেন। জহর রায় পাটনা থেকে প্রথম কলকাতায় এসেছিলেন রুজি রোজগারের ধান্দায়। কোন একটা বিশেষ ছবি পরিচালনা করছিলেন নরেশ মিত্রর এক সহকারী। এই পরিচালকের অনুরোধে নরেশবাবু নতুন শিল্পী নির্বাচন ও অভিনয় শেখার দায়িত্ব নিয়েছিলেন। জহর রায় ছিলেন শিল্পী পদপ্রার্থী। জহর রায়কে সিনেমার একটি বড় ডায়লগ দিয়ে বললেন, এই জায়গাটি পড়তো। জহর রায় পড়লেন কিন্তু সেই পড়া নরেশ মিত্রর মনঃপুত হল না। বিরক্ত হয়ে উনি বললেন, ‘তুমি যাও তোমার দ্বারা হবে না।’

পরিচালকের জহর রায় পরিচিত ছিল। তিনি ওর অভিনয়ের ক্ষমতা জানতেন। তিনি ইশারায় ওকে বাইরে অপেক্ষা করতে বলে, নরেশবাবুকে বোঝালেন। বললেন আপনি দেখিয়ে দিন ও ঠিক করবে। জহর রায় আবার ঘরে ঢুকলো। নরেশ বাবু বোঝালেন, ‘শোন, আমি যেমনটি বলছি ঠিক সেই রকম বলবে। বাহাদুরি করতে যেও না।’ আসলে উনি কিন্তু অন্ধ অনুকরণ চাইছিলেন না, চাইছিলেন যেভাবে তিনি কথাগুলোর উপর জোর দেবে সেভাবেই যেন জহর জোর দেয়। উনি সমস্ত ডায়ালগটা নিজের মতো করে পরলেন। সারাদিন বসে থেকে এবং একবার বাতিল হয়ে জহর রায় তখন প্রচন্ড রেগে গেছে। সে নরেশ মিত্রের অনুনাসিক উচ্চারণ পর্যন্ত নকল করে বক্তব্যটা বললেন। অগ্নিগর্ভ হয়ে নরেশ বাবু বললেন, ‘তুমি কি আমাকে বিদ্রুপ করছো?’
খুব ভালো মানুষের মতো জহর রায় বলল, ‘আজ্ঞে না, আমি সব রকম পারি, তাই দেখাচ্ছি।’ আপনার বন্ধু শিশির কুমারের মত ডায়লগ টাও বলতে পারি। বলেই শিশির কুমারের কণ্ঠস্বর এবং বলার ভঙ্গি নকল করে বক্তব্যটি আবার বললেন। নরেশ মিত্র গুণী শিল্পী ছিলেন। জহর রায়ের দিকে সপ্রশংস দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলেন কিছুক্ষণ তারপর বললেন, ‘বাহাদুর ছেলে। না বাবা, তুমি চরিত্রটা বুঝে নাও, নিয়ে নিজের মতো করেই বলো। এই পার্টটার জন্য আমি তোমাকে মনোনীত করলাম। তাহলে কথা দাঁড়ালো এই যে, নকল করো না, গ্রহণ করো।’ (সৌজন্যে “কিছু কথা কিছু স্মৃতি” — বিকাশ রায়)

শুধু অভিনয় নয় জহর রায় খুব ভালো স্কিট বা কৌতুক নকশা লিখতে পারতেন। সেগুলোই ফাংশনে করতেন আর পরে রেকর্ড হয়ে বের হত। তার মধ্যে কয়েকটা হল ন্যাপাসুর বধ, ফাংশান থেকে শ্মশান, সধবার একাদশী ইত্যাদি। তবে দুঃখের বিষয় হলো ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়ের কৌতুক নকশাগুলি যেমন এখনো পাওয়া যায়, জহর রায়ের নকশাগুলি কোথাও হারিয়ে গেছে।
জহর রায় এবং ভানু বন্দোপাধ্যায় ছিলেন একমাত্র ব্যতিক্রম, যাদের নামেই সিনেমা চলত কোন সুপারহিট নায়ক-নায়িকা ছাড়াই। বিশ্বের কোথাও বোধ করি এরকম উদাহরণ পাওয়া যাবে না যেখানে দুজন কমেডিয়ানের নামে সিনেমার নামকরণ হয়েছে — “ভানু গোয়েন্দা জহর অ্যাসিস্ট্যান্ট”, “এ জহর সে জহর নয়”, “ভানু পেল লটারি” ইত্যাদি। হরিহর আত্মা ছিলেন দুই অভিনেতা।

প্রচুর পড়াশোনা করতেন জহর রায়। বইয়ের মধ্যে মগ্ন হয়ে থাকতেন, জীবনের সব বিষয় নিয়েই তার আগ্রহ ছিল। প্রচুর বই কিনতেন ও তাই দিয়ে লাইব্রেরী বানিয়ে ফেলেছিলেন। তার কথাবার্তা ছিল যেমন সরস, তেমনি বুদ্ধিদীপ্ত। সত্যজিৎ রায়ের “পরশপাথর”, “গুপী গাইন বাঘা বাইন”, ‘সাড়ে চুয়াত্তর’, ‘সদানন্দের মেলা’, ‘জয় মা কালী বোর্ডিং’, ‘সাহেব বিবি গোলাম’, যমালয়ে জীবন্ত মানুষ ইত্যাদি
ছবিতে অভিনয় দেখলে তা স্পষ্ট বোঝা যেত। তিনি যেমন লোক হাসাতে পারতেন তেমনি কাঁদাতেও জানতেন। রঙ্গমঞ্চ-এ তার অভিনয় একটা জাদু ছিল। তার অভিনয় আজও অবিস্মরণীয় হয়ে আছে দর্শক হৃদয়ে। ‘আদর্শ হিন্দু হোটেল’ এ মতিলালের চরিত্রে অভিনয় করে অভিনয়ের এক নতুন রূপ দিয়েছিলেন। শুধু কমিক রোল নয়, বদমাইশ, ক্রুর কত রকম রোলে তিনি অভিনয় করেছেন।
জহর রায়-এর একটি অসাধারণ গুন ছিল অসম্ভব রকমের উপস্থিত বুদ্ধি। কোন থিয়েটারে তার সহশিল্পীরা নিশ্চিন্ত থাকত যে, কোন বিপদে পরলে তিনি ঠিক উদ্ধার করবেন। যেমন কোন ফাংশনে উদ্যোক্তারা টাকা দিতে না চাইলে, প্রাপ্যটাকা জহর রায় ঠিক আদায় করে আনতেন সকলের জন্য।

তবে জহর রায় এতটাই ভালো মানুষ ছিলেন যে, নিজের প্রাপ্যটা সবসময় বুঝে নিতে পারতেন না। অনেক কম টাকাতেও যেকোনো ছোটখাটো রোলে কাজ করতে রাজি হয়ে যেতেন। এ নিয়ে ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে তার প্রায়ই মতবিরোধ হতো। তবে পরের দিকে এক ভয়ঙ্কর বদ অভ্যাসে আসক্ত হন — মদের নেশা। অতিরিক্ত মদ্যপান, সুগারের সঙ্গে লিভারের অসুখ তার কাল হয়ে দাঁড়ালো। তিন বার জন্ডিস হয়েছিল, তবুও কঙ্কালসার চেহারা নিয়ে ছবি করলেন ‘উত্তমের ব্রজবুলি।’ ঋত্বিক ঘটকের সঙ্গে শেষ কাজ করলেন ‘যুক্তি তক্কো গপ্পো’।
১৯৭৭ সালের ১১ অগস্ট সকলকে ফাঁকি দিয়ে চলে গেলেন জহর রায়। সেদিন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পাঁচতলায় নীল কাপড় ঢাকা পার্থিব শরীরের সঙ্গে ছিল কেবল ভানু বন্দোপাধ্যায় ও সৌমিত্র। শতবর্ষ পেরিয়ে গেলেও কেউ কি সঠিকভাবে স্মরণ করেছে এই শক্তিশালী অভিনেতাকে! ভানু বন্দোপাধ্যায় প্রায় সময় আক্ষেপের সুরে বলতেন, ‘দেশবাসীর কাছ থেকে জহরের মতো অভিনেতার কি এটাই পাওনা ছিল। অন্য দেশে জন্মালে ও ‘স্যার’ উপাধি পেত।’ তবুও বাঙ্গালীর হৃদয়ে তিনি আছেন, থাকবেন। আর তাকে চিনতে সিনেমাপ্রেমী জহুরীদের কষ্টিপাথর লাগে না, এক ঝলক দেখলেই তারা জহর চিনে ফেলেন।।
খুব সুন্দর হয়েছে।
ধন্যবাদ জানাই।
Rinki i knew every bit of it but your writing has a charm which i simply couldn’t ignore….very well written of someone who is one my favourite actors of all time for many portrayals off different characters in different movies.Thank you very much.
Thank you so much for your wonderful words. Means a lot to be reckoned.