ভারতবর্ষে ‘সমবায়’ শব্দটি আধুনিক হলেও এর বাস্তব প্রয়োগ অতিপ্রাচীন। কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রে ‘ধর্মগোলা’ কিংবা মৌর্যযুগের কারিগরদের গিল্ড ব্যবস্থার মধ্যে সমবায় ভাবনার যৌথ অর্থনৈতিক কার্যকলাপের পরিচয় পাওয়া যায়। সমবায়ের জনক হলেন রবার্ট আওয়েন। ১৮৪৪ সালে ইংল্যান্ডের রচডেল শহরে ১৮ জন বেকার যুবকদের নিয়ে রবার্ট আওয়েন সমবায় আন্দোলনের যাত্রা শুরু করেছিলেন। সংস্থার নাম দিয়েছিলেন ‘রচডেল ইক্যুইটেবল পাইওনিয়ার্স সোসাইটি’। এঁদের মধ্যে ১৪ জনই ছিল তাঁত প্রযুক্তিবিদ্যা ডিপ্লোমাধারী। তাদের মূলধন ছিল মাত্র ২৮ পাউন্ড। তারা সেই দিন ২৮ পাউন্ড দিয়ে মুদি ব্যবসা করেনি। সুতা-তাঁতকল রংয়ের সাথে সকলের লব্ধ প্রযুক্তিজ্ঞান সমন্বয় ঘটিয়ে ইতিহাসে সমবায় আন্দোলনের সূচনা করেছিলেন। এর ঠিক ৪ বছর পর অর্থাৎ ১৮৪৮ সালে কার্ল মার্কস ও এঙ্গেলস শ্রমজীবি মানুষের মুক্তির পথ দেখাতে কমিউনিষ্ট ম্যানিফেস্টো প্রকাশ করেন।
ভারতে সমবায় আইনের সূচনা হয় ১৯০৪ সালের ২৫ মার্চ। অবিভক্ত বাংলায় সমবায় আন্দোলনের দুই প্রাণপুরুষ হলেন, স্যার ড্যানিয়েল হ্যামিলটন এবং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। সমবায় সমিতির গতি সঞ্চারে আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়ও সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছিলেন। ১৯০৫ সালে রবীন্দ্রনাথের ভাবনায় গুরুত্ব পায় গ্রামবাংলার আর্থ-সামাজিক বিকাশে সমবায় সংগঠিত করে তোলার চিন্তাধারা। গ্রামবাংলার কৃষি, ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের বিকাশে নিয়মিত মেলার উদ্যোগেয় শুরু তাঁরই উদ্যোগে, শ্রীনিকেতনে নিয়মিত মেলার আয়োজনের উদ্দেশ্য ছিল গ্রামীন অর্তনৈতিক একটা বাজার তৈরি করা। পরবর্তীতে তাঁর লেখার মধ্যে সেই ভাবনা আমরা পেয়েছি। পল্লী প্রকৃতি রচনায় তিনি লিখেছেন — ‘আমাদের ফসল ক্ষেতে কিছু বিলাতি বেগুন, কিছু আলু ফলিয়েছি। চিরকাল তাঁত চালিয়ে শতরঞ্জি বুনিয়েছি গোটাকতক।’ ১৯০৬ সালে রবীন্দ্রনাথ তাঁর পুত্র রথীন্দ্রনাথ এবং বিশ্বভারতীর আরও দুই ছাত্রকে মার্তিন যুক্তরাষ্ট্রে পাঠিয়েছিলেন উন্নত কৃষি ব্যবস্থা নিয়ে পড়াশোনা করতে।
গোসাবার হ্যামিল্টন সাহেব সমবায় ভাবনার সার্থক রূপায়ণের এক পথপ্রদর্শক। জন্মসূত্রে স্কটিশ, স্যার ড্যানিয়েল ম্যাকিননান হ্যামিল্টন সুন্দরবনের গোসাবায় সমবায় ঘিরে যে কর্মকাণ্ড গড়ে তোলেন তা অবশ্যই আমাদের সকলের অনুসরণযোগ্য। ১৯১৮ সালে ক্রেতা সমবায় সমিতি, ঠিক তার পরের বছর একটি শস্য-সবজি ফলের খামার, ১৯২৩ সালে একটি বিক্রয় সমিতি, ১৯২৪ সালে গোসাবায় কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক, ১৯২৭ সালে সমবায়ের মাধ্যমে তৈরি যামিনী রাইস মিল আর ১৯৩৪ সালে রুরাল রিকনস্ট্রাকশন ইনস্টিটিউট — এ সবই হ্যামিল্টন সাহেবের অবদান। আর প্রয়াত ভি. জে. ক্যুরিয়নের আমূল কো-অপারেটিভ সবার কাছেই খুব পরিচিত নাম।
১৯৫৪ সাল থেকে সমবায়ের প্রসার ও প্রচারের লক্ষ্যে পালন করা হয়ে আসছে সমবায় সপ্তাহ। প্রথম প্রথম নভেম্বর মাসের প্রথম শনিবার সূচনা হত সমবায় সপ্তাহ। ১৯৭২ সালে পন্ডিত জওহরলাল নেহেরুর জন্মদিনে অর্থাৎ ১৪ নভেম্বর দিনটিতেই সমবায় সপ্তাহ শুরুর সিদ্ধান্ত কেন্দ্রীয়ভাবে নেওয়া হয়। তারপর থেকে প্রতিবছর আমাদের দেশের সরকারি ক্যালেন্ডারে পাকাপাকিভাবে জায়গা করে নিয়েছে সমবায় সপ্তাহ পালনের কর্মসূচি।
রাজ্য সরকারের সমবায় বিভাগের নীতি বাস্তবায়িত হয় কো-অপারেশন ডাইরেক্টরেটের ৩টি জোনাল ও ২২টি রেঞ্জ অফিসের মাধ্যমে। পশ্চিমবঙ্গে ১৭ ধরনের সমবায় রয়েছে। সমবায়ের উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণে সাহায্যকারী ভূমিকা পালন করে। রাজ্য সরকারের সমবায় বিভাগের দুটি শাখা : ক) কো-অপারেশন ডাইরেক্টরেট (Co-operation Directorate), খ) কো-অপারেশন অডিট ডাইরেক্টরেট (Co-operative Audit Directorate)। সমবায়ের ধরনগুলি হলো : ভোগকারী সমবায় (Consumer Cooperatives), উৎপাদনকারীদের সমবায় (Producers’ Cooperatives), সমবায় বিপণন সমিতি (Co-operative Marketing Society), আবাসন সমবায় সমিতি (Housing Co-operative Society), সমবায় ঋণদান সমিতি (Co-operative Credit Society),
১৯০৪ সালে তদানীন্তন ব্রিটিশ ভারতের জেনারেল লর্ড কার্জন সমবায় ঋণ দান সমিতি আইন জারি করেন। মূলত এই আইনের মাধ্যমেই উপমহাদেশের সমবায় আন্দোলনের সূচনা হয়। ১৯৪০ সালে বঙ্গীয় আইন পরিষদ দি বেঙ্গল কো-অপারেটিভ সোসাইটি অ্যাক্ট নামে সমবায় আইন পাস করে।
পশ্চিমবঙ্গ সরকারের উদ্যেগে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের চিন্তা ধারায় রাজ্যর সমবায় ব্যাবস্থার উন্নয়নের পাশাপাশি সমবায় ব্যাংককে নতুন ভাবে গড়ে তোলার পাশাপাশি তার কর্মকাণ্ড বাড়ানো ও শাখা বৃদ্ধি ঘটিয়ে প্রান্তিক মানুষজনের আয় বৃদ্ধি ও মান উন্নয়ন ঘটানো। ব্যাঙ্কহীন গ্রামগুলিতে ২৬০০টি ব্যাঙ্ক পরিষেবা কেন্দ্র খোলা হবে। রাজ্যের যেসব গ্রামে ব্যাঙ্ক নেই সেখানে ২৬০০টি ব্যঙ্কিং পরিষেবা কেন্দ্র তৈরী করবে সমবায় দপ্তর।
বহুদিন ধরেই গ্রামাঞ্চলে ব্যাঙ্কিং পরিষেবা পৌঁছে দেওয়া নিয়ে সরব হয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কেন্দ্রীয় সরকারকে একাধিকবার অনুরোধ ও জানিয়েছিলেন বাংলার মুখ্যমন্ত্রী। মুখ্যমন্ত্রী মনে করেন, গ্রামীণ উন্নয়ন হলে রাজ্যের উন্নয়ন হবে। রাজ্যের উন্নয়ন হলে দেশের উন্নয়ন হবে। কেন্দ্রের তরফে কোনও সদর্থক পদক্ষেপ না করলেও রাজ্য তার সীমিত ক্ষমতার মধ্যেও গ্রামীণ অঞ্চলে ব্যাঙ্কিং পরিষেবা পৌঁছে দেবার নির্দেশ দেন সমবায় দপ্তরকে। এই ব্যঙ্কিং পরিষেবা কেন্দ্রগুলি গ্রামীণ মানুষের চাহিদার সাথে সাথে বেকার ছেলে মেয়েদের স্বাবলম্বী হতে ও ব্যাংকের লোন পেতে সাহায্য করবে। সৃষ্টি হবে কর্মসংস্থান।
নতুন এই পরিষেবা কেন্দ্রগুলিতে ব্যাঙ্কের প্রায় সমস্ত অত্যাধুনিক পরিষেবাই পাওয়া যাবে। অনলাইন ব্যাঙ্কিং পরিষেবাও মিলবে এই শাখাগুলিতে। রাজ্যের প্রায় ৭০০টি গ্রাম পঞ্চায়েতে আপাতত কোনও ব্যাঙ্ক নেই। রাজ্যের এই সিদ্ধান্তের ফলে সমবায় আন্দোলনের এক নতুন অধ্যায় শুরু হবে, উপকৃত হবে গ্রামীণ মানুষ।
দেবাশিস ভট্টাচার্য, সিইও, সমতা কো-অপারেটিভ ডেভেলপমেন্ট ব্যাঙ্ক লিমিটেড
অসাধারণ তথ্য সমৃদ্ধ এই লেখা। পড়ে ঋদ্ধ হলাম।