ইউক্রেনে যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে থেকেই ভারতে বেশ তীব্র মাত্রায় রাশিয়া বিরোধী প্রচার চলছিল। রাশিয়াকে সম্ভাব্য আক্রমণকারী এবং জেলেনেস্কির নেতৃত্বে ইউক্রেনকে আক্রান্ত নিপীড়িত দেশ হিসেবে চিত্রিত করা হচ্ছিল। যুদ্ধ শুরু হবার পরে এই প্রচারের মাত্রা বহুগুণ বেড়ে যায়। প্রতি মুহূর্তে নানা ভয়ংকর খবর, যথা অসামরিক ব্যক্তিদের মৃত্যু, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, হাসপাতালে হামলা, সে দেশের লোকেরা না খেতে পেয়েও অসমসাহসিকতার সঙ্গে লড়ছেন, এমন সব আবেগে শান দেওয়া খবর পরিবেশন করা হচ্ছে। এই প্রচারটা সব সংবাদ মাধ্যমেই হয়েছে, কিন্তু টেলিভিশন ও দৃশ্য-স্রাব্য সোশ্যাল মিডিয়াতে তা যেন সর্বব্যাপী হয়ে পড়েছে। বাঙালি এর আগেও বিশ্বের নানা জায়গায় যুদ্ধ পরিস্থিতিতে যুদ্ধের বিরোধিতা করেছে। উদাহরণ হিসেবে ভিয়েতনামের যুদ্ধের কথা উল্লেখ করা যায়। গত শতকের সত্তরের দশকে যুদ্ধবাজ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যেমন জনমত দেখা গিয়েছিল, সেটা বাঙালির জাতীয় ইতিহাসে গৌরবজনক এক অধ্যায়। কিন্তু যুদ্ধ মানেই অন্ধের মতো তার বিপক্ষে দাঁড়াতে হবে, এমন শিশুসুলভ আচরণ বাঙালি কখনও করেনি। আবার একটা উদাহরণ, ১৯৭১ সালের ভারত-পাক যুদ্ধ এবং বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রাম। তখন সীমান্ত পেরিয়ে এক কোটিরও বেশি শরণার্থী পশ্চিমবঙ্গে এসেছিলেন। ভারতের অন্যান্য রাজ্যেও শরণার্থীরা ভিড় করেছিলেন। যুদ্ধ তথা আশ্রয় নেওয়া লোকজনের খরচ মেটাবার জন্য তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধির নেতৃত্বে ভারত সরকার সাধারণ মানুষের থেকে নানা রকম করও আদায় করেছিল। তখন কিন্তু দেশবাসী স্বেচ্ছায় সেসব কষ্ট মেনে নিয়েছিলেন এবং ভারত সরকারের যুদ্ধপ্রচেষ্টা ও উদীয়মান বাংলাদেশকে স্বাগত জানিয়েছিলেন। আসলে তখন মানুষ এটা বুঝেছিলেন, যুদ্ধের বিরোধিতা করা মানেও বিবদমান এক পক্ষকে সমর্থন করা, যুদ্ধের সমর্থন করা মানেও অন্য আরেক পক্ষকে সমর্থন করা। আম-জনতা একটা পক্ষ বেছে নিয়েছিলেন। ততটা প্রাসঙ্গিক না হলেও প্যালেস্টাইন-ইস্রায়েল সংঘাতে বাঙালি তথা ভারতবাসী প্যালেস্টাইনের পক্ষে থেকেছে বা আজও আছে। এমন উদাহরণ আরও দেওয়া যায়। কিন্তু এবারে মিডিয়ার আচরণটা যেন সেই ঐতিহ্যের সম্পূর্ণ উল্টো দিকে এসে দাঁড়িয়েছে।

ইউক্রেন যুদ্ধের পশ্চাদপট – ন্যাটো ও ওয়ারশ’ জোট
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে দুনিয়া দু’ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছিল। একটি পক্ষের নেতৃত্বে ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, অপর ভাগটি চালাতো সোভিয়েত ইউনিয়ন। বিশ্বযুদ্ধের অন্যতম পরিণতি হিসেবে ইয়োরোপও রাজনৈতিক ভাবে দুটো ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছিল। পূর্ব অংশটি সমজাতান্ত্রিক পথ বেছে নিয়েছিল এবং তারা সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে মৈত্রীর পথে গিয়েছিল। ইয়োরোপের পশ্চিম অংশে ধনবাদী রাষ্ট্র ও রাজনীতির রাস্তায় হাঁটে এবং সোভিয়েত ইউনিয়ন বিরোধী মার্কিন-ব্রিটিশ জোটের দিকে ঝুঁকে পড়ে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের জন্য মূলত দায়ী হিটলারের নেতৃত্বাধীন জার্মানি দেশটিও দু’টুকরো হয়ে যায়, পূর্ব জার্মানি সোভিয়েতের দিকে এবং পশ্চিম অংশটি ইঙ্গ-মার্কিন পক্ষে যায়। সেই শিবির বিভাজন সামরিক জোটেরও জন্ম দেয়। মার্কিন দেশের উদ্যোগে ও নেতৃত্বে গড়ে ওঠে নর্থ অ্যাটলান্টিক ট্রিটি অর্গানাইজেশেন বা NATO. অপর দিকে সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতৃত্বে গড়ে উঠেছিল ওয়ারশ’ চুক্তি নামে সামরিক জোট। ন্যাটোর ঘোষিত লক্ষ্যই ছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন ও সমাজতন্ত্রকে কোণঠাসা করা। ওয়ারশ’ জোটের লক্ষ্য ছিল ন্যাটোর আগ্রাসন থেকে রক্ষা পাওয়া। এক কথায় বলা যেতে পারে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ফলশ্রুতিতে এক দ্বিমেরু বিশ্ব গড়ে উঠেছিল, দু’টি মেরুর দু’টি সামরিক জোট ছিল ন্যাটো ও ওয়ারশ’ চুক্তি। ১৯৮৮-৮৯ পর্যন্ত পরিস্থিতিটা মোটের ওপর এমনই ছিল। এর পরে সোভিয়েত ইউনিয়নে নানা যুগান্তকারী পরিবর্তন ঘটতে থাকে। প্রথমত সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যায়, ওই যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে থাকা অনেকগুলি দেশ স্বাধীন হয়ে যায়। খোদ রাশিয়াতেও কমিউনিস্ট শাসনের সমাপ্তি ঘটে, নানা পথ বেয়ে সেখানে পুঁজিবাদী রাষ্ট্র এবং পুতিন জমানা চলতে থাকে। একই সঙ্গে বিলুপ্তি ঘটে ওয়ারশ’ চুক্তি নামে সামরিক জোটেরও। রাশিয়ায় সমাজতন্ত্র ভেঙে যাবার অন্তিম লগ্নে সে দেশের শাসক গর্বাচেভকে ন্যাটোর তরফ থেকে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, ন্যাটোকে আর সম্প্রসারিত করা হবে না। কিন্তু অভ্যাস মতোই মার্কিনিরা তাদের প্রতিশ্রুতি ভেঙেছিল।
ঠান্ডা যুদ্ধের অবসানে কেনা ভাঙা হলো না ন্যাটো?
কথাটা সোজা এবং সহজ। সোভিয়েত ইউনিয়নকে ঠেকাতে ন্যাটো গড়া হয়েছিল। সোভিয়েতই যখন থাকল না, অবলুপ্ত হলো ওয়ারশ’ জোট, তখনও কেন রেখে দেওয়া হলো ন্যাটো সামরিক জোটকে? ন্যায় ও সহজ বুদ্ধিতে এর ব্যাখ্যা মিলবে কি? কথাটা খুব পরিষ্কার, সোভিয়েত ইউনিয়নের অনুপস্থিতিতে সারা দুনিয়ায় আধিপত্য বিস্তারের লক্ষ্যেই ন্যাটো ভেঙে দেওয়া হয়নি। সোভিয়েত পতনের মাত্র বছর খানেকের মধ্যে ১৯৯০-৯১ সালে মার্কিনিরা ইরাক আক্রমণ করে। তখন তৎকালীন ন্যাটোর প্রায় সব সদস্য দেশ সেই যুদ্ধে সশস্ত্র অংশগ্রহণ করেছিল। সেটা উপসাগরীয় যুদ্ধ বলে ইতিহাসে উল্লেখিত হয়। এর পরই যা হওয়া উচিত তার সম্পূর্ণ উল্টোদিকে হেঁটে ন্যাটোকে সম্প্রসারণের কাজে হাত দেয় আমেরিকা।
১৯৯০ সালে ন্যাটোর ১৬টি সদস্য দেশ ছিল। ১৯৯৯ সালে, পোল্যান্ড, হাঙ্গেরি এবং চেক প্রজাতন্ত্র যোগ দেয়। ঠিক তার পরেই আবার বাজানো হয় যুদ্ধের দামামা।
ইরাককে সম্পূর্ণ ভেঙে গুঁড়িয়ে দিতে ২০০৩ সালে মার্কিনিরা ইরাক আক্রমণ করে। অজুহাত হিসেবে বলা হয়েছিল, ইরাক না-কি গণবিধ্বংসী অস্ত্র বানাচ্ছে। সেবার মার্কিনিদের সঙ্গে যুদ্ধে যোগ দিয়েছিল ব্রিটেন, অস্ট্রেলিয়া এবং পোল্যান্ড। পরে প্রমাণ হয়ে গেছে, ইরাক কোনো গণবিধ্বসী অস্ত্র বানাচ্ছিল না, স্রেফ ইরাকের তেলের খনির দখল নেবার জন্যই ওই আক্রমণ সংঘটিত করা হয়েছিল। তখন কিন্তু ওয়ারশ’ জোট নেই, রাশিয়াও কিছু বলেনি।

পরের বছর, ২০০৪ সালে একটার পর একটা পূর্ব ইয়োরোপীয় দেশকে ন্যাটোতে যুক্ত করা হয়। বুলগেরিয়া, এস্তোনিয়া, লাটভিয়া, লিথুয়ানিয়া, রোমানিয়া, স্লোভাকিয়া এবং স্লোভেনিয়া যোগ দেয় ২০০৪ সালে। ২০০৯ সালে, আলবেনিয়া এবং ক্রোয়েশিয়া যোগ দেয়। ২০১৭ সালে, মন্টিনিগ্রো এবং উত্তর মেসিডোনিয়া যোগ দেয় এবং ২০২১ সালে, বসনিয়া এবং হার্জেগোভিনা যোগ দেয়। এইভাবে, ইউক্রেন এবং জর্জিয়া বাদে, প্রায় সমস্ত পূর্ব ইউরোপীয় দেশ ন্যাটোতে যোগ দেয় এবং রাশিয়ার সীমান্তে ১,৭৫,০০০ ন্যাটো সৈন্য মোতায়েন করে।
২০০৮ সালে রাশিয়া একটি ইউরোপীয় নিরাপত্তা চুক্তির প্রস্তাব করেছিল। সে প্রস্তাবে বলা হয়েছিল, কোনো দেশ অন্যের নিরাপত্তার বিনিময়ে তার নিরাপত্তা জোরদার করবে না। মার্কিনিরা ওই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে। উল্টে ওই অঞ্চলে অবশিষ্ট দু’একটি দেশকেও ন্যাটোতে অন্তর্ভুক্ত করতে উঠেপড়ে লাগে, চেষ্টা করতে থাকে ইউক্রেনকে ন্যাটোতে নিয়ে নিতে। ন্যাটোতে ইউক্রেনের প্রবেশকে রাশিয়া তার নিরাপত্তার জন্য হুমকিস্বরূপ আক্রমণাত্মক পদক্ষেপ হিসাবে সঠিকভাবে দেখেছে, সেটা কীভাবে অস্বীকার করা যাবে?
ইউক্রেনে ন্যাটোর আগ্রাসী পদক্ষেপের পক্ষে অসুবিধা হচ্ছিল সে দেশের সরকার। তাই মার্কিনিরা সিআইএ ও অন্যান্য গোয়েন্দা চক্রকে কাজে লাগিয়ে তীব্র রাশিয়া বিরোধী একটি শক্তিকে মদত দিতে শুরু করে। ২০১৪ সালে এই শক্তিই একটি অভ্যুত্থান ঘটায়। তার পরের কয়েক বছরে নানা রাজনৈতিক ওঠাপড়ার মধ্য দিয়ে জেলেনেস্কি ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট হন। জেলেনেস্কি অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে ইউক্রেনকে ন্যাটোতে অন্তর্ভুক্ত করতে উঠেপড়ে লাগেন। আনুষ্ঠানিকভাবে ন্যাটোতে যোগদান করার আগেই ইউক্রেনে ন্যাটো পরিকাঠামো বৃদ্ধি পেতে শুরু করে। পরিস্থিতি যাতে হাতের বাইরে না যায়, সেজন্য নানা প্রচেষ্টা চালিয়েছে রাশিয়া। গত ডিসেম্বরে রাশিয়া প্রস্তাব করেছিল, (ক) আর ন্যাটো সম্প্রসারণ নয় (খ) রাশিয়ার সীমান্তে কোন আক্রমণাত্মক অস্ত্র নয় ইত্যাদি। এটিও প্রত্যাখ্যান করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। পুতিন এবং রাশিয়া বাস্তব কারণেই এই প্রতিকূল পরিস্থিতিগুলিকে রাশিয়ার নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসাবে দেখেছে। এসবের ফলশ্রুতিই রাশিয়াকে বর্তমান সামরিক পদক্ষেপ এবং আক্রমণের দিকে পরিচালিত করেছে। সুতরাং, এটি মূলত রাশিয়া এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র/ন্যাটোর মধ্যে একটি যুদ্ধ। ইউক্রেন সেই রঙ্গমঞ্চ যেখানে এই যুদ্ধ চালানো হচ্ছে।

এই অতি সংক্ষিপ্ত ইতিহাস থেকে কি এটা বোঝা গেল না, যে মার্কিনিদের দুনিয়াব্যাপী দখলদারির প্রচেষ্টার কারণেই ইউক্রেনে আজকের সংকট ঘনীভূত হয়েছে? এই ইতিহাস জানা, যে কোনো উৎসূক ব্যক্তি একটু চেষ্টা করলেই জানতে পারেন। ২০১৪ থেকেই রাশিয়া মূলত আত্মরক্ষামূলক পদক্ষেপ নিচ্ছিল, যা ব্যর্থ হওয়ায় এবার লেগেছে যুদ্ধ। এই যুদ্ধে রাশিয়ার বিরোধিতা করলে যে মার্কিনি আগ্রাসনের পক্ষে দাঁড়ানো হবে, সেটা কি ভাবা দরকার নয়? রাশিয়ার সীমান্তে শত্রুসেনারা যুদ্ধসাজে প্রস্তুতি নেবে আর রাশিয়া মুখ বুজে বসে থাকবে, এটাই কি তবে মিডিয়া ভাষ্যকাররা দাবি করছেন? কাল যদি ভারতের প্রতিবেশি কোনো দেশে ভারতের দিকের সীমান্তে কোনো শত্রু দেশের সেনা মোতায়েন হতে থাকে (ধরুন নেপালে), চুপ করে থাকবে কি আমাদের দেশ?
গত দীর্ঘ দশকগুলোতে বারবার রাশিয়া ভারতের পাশে দাঁড়িয়েছে। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রামের প্রেক্ষিতে ভারত আক্রমণ করতে সপ্তম নৌবহর পাঠিয়েছিল আমেরিকা। সেবারও রাশিয়া তাদের যুদ্ধজাহাজ পাঠালে ল্যাজ গুটোয় আমেরিকা। খাদ্য সংকট সহ প্রতিটি বিপদের দিনে রাশিয়ার সহায়তা পেয়েছে ভারত। আশ্চর্য লাগছে এই ভেবে, কীভাবে ইতিহাস চেতনাহীন একটা অবস্থান অধিকাংশ প্রচার মাধ্যম নিচ্ছে।
ভারত সরকারের নানা কাজের সমালোচক আমরা। কিন্তু আন্তর্জাতিক মঞ্চে ভারতের নিরপেক্ষ থাকাটা কি ভুল হয়েছে? আজ যখন অপিশোধিত পেট্রোলিয়ামের দাম আকাশ ছুঁতে চলেছে, তখন সেই রাশিয়া থেকেই তো সস্তায় তেল কিনছে ভারত।
ভারতে যুদ্ধের খবর যতটুকু আসছে, সবটাই মার্কিনি শিবিরের খাওয়ানো খবর। প্রভূত পরিমাণে ভুয়ো খবর, জাল ভিডিও-ও নির্বিচারে চলছে। যুদ্ধের খবর জোগাড় করার কত প্রামাণ্য পদ্ধতি রয়েছে সাংবাদিকতা মহলে। সেসব কোথায় গেল?