কেউ যদি জিজ্ঞেস করে — তোমার নাম কি খোকা?
অমনি এক গাল হেসে বলবে — আকাশ।
ভারী মিষ্টি সেই হাসি। মনে হবে সেই আকাশে বুঝি মেঘ করে না কখনো। তার মনটাও খুব ভালো। সেবার দমকা ঝড়ে গাছ থেকে দুটো বাবুই পাখির ছানা পড়ে গেল, তা সে ওদের জন্য কি মায়া ওর! কি করে যে ও দুটোকে বাঁচানো যায়, ওদের মায়ের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া যায় সেই চিন্তায় ভেবে ভেবে সারা। কেউ গাছের ডাল ভেঙে দিলে কিংবা ফুল তুললেও খুব রাগ হয় তার। সে বরং অবাক হয়ে গাছ ভর্তি নানা রকম ফুলের দিকে তাকিয়ে থাকতে ভালোবাসে।
আজকাল ইস্কুলের বন্ধুরাও কেমন যেন পাল্টে গেছে সব। খাঁচার গাড়িতে করে ছোটবেলা থেকে স্কুলে আসতে আসতে সবাই কি খাঁচার পাখি হয়ে গেছে? খাঁচা একদম ভাল্লাগেনা আকাশের। সে একদিন মামার বাড়ির খাঁচার পাখিটাকে উড়িয়ে দিয়েছিল লুকিয়ে লুকিয়ে। পাখিটা অবশ্য উড়ে পালাতে পারেনি সেদিন। খুব ছোটবেলা থেকে খাঁচায় থাকার জন্য সে তো উড়তেই শেখেনি কখনো। আকাশ বোধহয় ডানা ছড়িয়ে দূর আকাশে উড়ে যাওয়ার স্বপ্ন দেখে মনে মনে। তাই খাঁচার মধ্যে পাখি দেখলে তার গা রি রি করে ওঠে। ইস্কুলের বন্ধুরা বেশির ভাগই খুব গম্ভীর। কারা যেন বলে দিয়েছে, সবার সঙ্গে অতো হই হট্টগোল কোরো না তো, তাতে বুদ্ধি নষ্ট হয়। শুধু নিজের কাজটা বুঝে নেবে ব্যাস।
আকাশের দম বন্ধ হয়ে আসে এই সবের মধ্যে। সে কারো জন্য কিছু করতে পারলে যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচে। টিফিনের বাক্স খুলে আগে কোন বন্ধুকে না দিলে তার ভালই লাগে না মোটে। আকাশকে নিয়ে কিন্তু তার মা বাবার মনে একটুও সুখ নেই। কেন? সে যে ফার্স্ট হতে পারে না স্কুলে। সেকেন্ড কিংবা থার্ড ও হয় না। আকাশের বাবা নামকরা ডাক্তার। তিনি স্কুলে কখনো সেকেন্ড হননি। তাঁর ছেলে তাঁরই মত হবে, এটাই তো চাই। অথচ দেখো, পাপান, বিল্টু কিংবা মুন্নিরা সব সময় তাকে টপকে ফার্স্ট, সেকেন্ড হয়ে যায়। সবার কাছে নাকি মুখ দেখানো ভার হয়ে যায় বাবা মায়ের। এই নিয়ে অবশ্য আকাশের তেমন কিছু মাথাব্যথা নেই।
পড়তে কি তার ভালো লাগে না একটুও?
কে বললে? বরং তাদের ক্লাসে তার মত আর কেউ পড়ে না। এর মধ্যেই লুকিয়ে লুকিয়ে অ্যান্ডারশনের রূপকথা থেকে শুরু করে ভোদড় বাহাদুর, ক্ষীরের পুতুল, নালোক, টুনটুনির বই আরো কত বই পড়া হয়ে গেছে তার। খুব সুন্দর করে সে পরপর বলে যেতে পারে সেইসব গল্প। তবে পড়ার বইগুলো তেমন করে টানতে পারে না তাকে। নম্বর পাওয়ার জন্য যে পড়া মুখস্থ করা তাতে খুব একটা মন বসাতে পারে না সে। প্রতিদিন সন্ধ্যেবেলায় তাকে পড়াতে আসেন যদু বাবু। যদু বাবু স্যার ইস্কুলে পড়াতেন। এখন আর যান না। বাবা যখন ইস্কুলে পড়তেন তিনি বাবার মাস্টারমশাই ছিলেন। বাবা, রমেন কাকু, পূর্ণ জেঠু, এঁদের নিয়ে তাঁর কি গর্ব! প্রায়ই এঁদের কথা বলেন। — ওরা কত বড় হয়েছে, সবার মুখ রেখেছে। তোমাকেও বড়ো হতে হবে আকাশ!
মাস্টার মশাই কত বড়ো বড়ো মানুষের কথা বলেন, স্বামী বিবেকানন্দ থেকে আইজ্যাক নিউটন। কত কষ্ট করে বড়ো হয়েছেন তাঁরা! আকাশের পড়ার বই-এ যে এসব কিচ্ছু নেই। তাই সে অবাক হয়ে শোনে মাস্টারমশাইয়ের গল্প আর ভাবে তাঁদের কথা। এদিকে বিজ্ঞান পড়ার সময় পেরিয়ে যায়, অঙ্ক কষা বাকি থেকে যায়। মা বলেন — খোকন-টা আজকাল খুব গল্পবাজ হয়ে গেছে, পড়াশোনায় মন নেই একদম। আর মাস্টার মশাইকেও বলিহারী পড়া ফেলে কেউ গল্প করে এরকম!
এবার শীতটা বেশ জাঁকিয়ে পড়েছে। বিকেল থেকেই কনকনে ঠান্ডা পড়ে যাচ্ছে। সন্ধ্যেবেলা বাড়ির বাইরে খুব একটা বেরোচ্ছে না কেউ। আকাশের অবশ্য ভাবনার কিছু নেই। সে তো আর সন্ধ্যের পর কোথাও বেরোতে যাচ্ছে না। মাস্টারমশাইয়ের বরং খুব কষ্ট হবে এই কদিন। একে বয়স হচ্ছে তার উপর তাঁর বোধহয় ভালো শীতের জামা কাপড় নেই। আকাশ মাঝে মাঝে ভাবে, মাস্টারমশাইরা কেন যে এত গরিব! খুব মন খারাপ হয়ে যায় তার। বেশ কয়েক দিন কাটল। দারুন শীতে মাস্টারমশাইকে খুব কাহিল দেখায় কিন্তু একদিনও পড়াতে আসা বন্ধ করেননি তিনি। হি হি করে কাঁপতে কাঁপতে ঠিক সন্ধেবেলা চলে আসেন।
হঠাৎ সেদিন একটা ঝকঝকে নতুন শাল গায়ে দিয়ে ঢুকলেন মাস্টারমশাই। পড়ার ঘরের চা দিতে এসে মা কেমন চমকে উঠলেন। অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকলেন মাস্টারমশাইয়ের শালের দিকে। — শালটা খুব যেন চেনা চেনা মনে হচ্ছে!
মাস্টার মশাই বললেন — বৌমা, অরু ফিরলে একবার দেখা করতে বলবে?
— আচ্ছা স্যার, উনি ফিরলেই আপনার কাছে আসতে বলবো।
আজ খুব মন দিয়ে অঙ্ক করছে আকাশ। নাকি ইচ্ছে করেই খাতা থেকে মুখ তুলছে না কে জানে। মাস্টার মশাই যেন একটু আনমনা, কিন্তু খুব খুশি খুশি! চেম্বার সেরে বাড়ি ফিরতে বাবার একটু রাত হয়ে গেল। মাস্টারমশাই প্রায় উঠি উঠি করছেন, এমন সময় বাবা এসে পড়ার ঘরে ঢুকলেন। মাস্টার মশাই যেন খুব ব্যস্ত হয়ে পড়লেন।
— কি কান্ড বলোতো অরু!!
বাবা খানিকটা হতবাক হয়ে গেলেন — কেন স্যার?
— এত দামি একটা শাল আমার জন্য পাঠিয়ে দিয়েছো! এসব কি আর আমাকে মানায়?
— না, মানে —
— বিকেলে আকাশ যখন আমার বাড়ি গিয়ে শালটা আমার হাতে দিয়ে বলল — বাবা পাঠিয়ে দিয়েছেন। আমি ওকেও বলেছিলাম — এসব আবার কেন? ও বলল, না নিলে বাবা কষ্ট পাবেন। জানো অরু, আমার খুব মনে পড়ছিল তোমাদের ছোটবেলার কথা। তুমি খুব অভিমানী ছিলে। তুমি, পূর্ণ, রমেন সব এক একটা হীরের টুকরো। তোমরা বড় হয়েছো — এইতো আমার সুখ, আর কিচ্ছু চাই না।
এর মধ্যে মা এসে দাঁড়িয়েছেন দরজার কাছে। কটমট চোখে তাকিয়ে আছেন আকাশের দিকে। এ বছর দার্জিলিং বেড়াতে গিয়ে বাবা শালটা কিনেছিলেন। মায়েরও খুব পছন্দ হয়েছিল ওটা। আকাশ কিনা কাউকে না বলে —
মুখ নিচু করে বসে আছে আকাশ। কি জানি কপালে কি আছে?
মাস্টারমশাই চলে যাবার পরই খুব রেগেমেগে মা কি যেন বলতে যাচ্ছিলেন। তাকে থামিয়ে দিয়ে এগিয়ে এলেন বাবা। দু-হাতে জড়িয়ে ধরলেন আকাশকে। তারপর তার কপালে চুমু দিয়ে বললেন — সাবাস খোকন! আজ আমার চেয়েও বেশি নম্বর পেয়ে গেলি তুই। তুই-ই ফার্স্ট!