| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

শবাসন

Reporter Default
রিপোর্টার / ৩০৮ জন পড়েছেন
আপডেট সোমবার, ৬ জুলাই, ২০২০

শুভময় মণ্ডল

—দু-পায়ের পাতার মাঝখানে ছ-ইঞ্চি ফাঁক থাকবে, দেখুন শবাসন বললেই কিন্তু শবাসন হয় না, ঠিকঠাক করতে হবে। দু-পায়ের পাতার মাঝখানে ছ-ইঞ্চি ফাঁক রেখে, ঠিক ছ-ইঞ্চি ফাঁক রেখে শুলেন তো চিৎ হয়ে, প্রথমে কী করবেন? সব নিঃশ্বাস ছেড়ে দেবেন, ভেতরে যা নিঃশ্বাসবায়ু ছিল সব ছেড়ে দেবেন। যা পুরোনো শ্বাসবায়ু ছিল সব।

—নিঃশ্বাস আবার পুরোনো হয় নাকি।

—হয় না! শরীর পুরোনো শ্বাসবায়ু কিছু থাকবে না। সব ছেড়ে দেবেন।

সুজিত দেখায় কীভাবে সব নিঃশ্বাস ছেড়ে দিতে হবে। চেয়ারে মাথাটা এলিয়ে দিয়ে, তারপর নিঃশ্বাস ছাড়তে শুরু করে। টায়ার পাংচার হয়ে গেলে যেমন সব হাওয়া বেরিয়ে যায়।

মাথাটা চেয়ারে এলানোই থাকে, সুজিত বলে যায়, তারপর কী করবেন? প্রথমে পায়ের গোড়ালি ছেড়ে দেবেন, যেন ওখানে শিরা-পেশির কোনও বাঁধন নেই, আপনি সব ছেড়ে দিচ্ছেন, সব আলগা হয়ে যাচ্ছে।

ক-দিন আগে পায়ের শিরার দিকে হঠাৎ টান পড়ল, রাজর্ষির এক কলিগ বলেন, কী হলো, পায়ে কী হলো আপনার? রাজর্ষি বলেছিল, বুঝতে পারছি না জানেন, শিরাটান ধরল নাকি, নাকি মচকানো কোনও ব্যথা লাগল। না,—না সাবধানে থাকুন, রাজর্ষির কলিগ বলেন, কালই একবার আপনার কার্ডিয়োলজিস্টের সঙ্গে কথা বলে নিন। আপনার প্রেসারের সমস্যা তো! হার্টের সঙ্গে, জানেন তো, পায়ের শিরার খুব যোগাযোগ! অ্যাঞ্জিয়ো….

সুজিতের কথা শুনতে শুনতে দিন তিনেক আগে কলিগের সেই কথাগুলো মনে পড়ছিল খুব। শুনেই তো ওর প্রেসার আরও বেড়ে গিয়েছিল। চেয়ারে মাথাটা এলিয়ে দিয়েই সুজিত বলে যাচ্ছে, চোখ বুজিয়ে আছে ও, যেন এখনই শবাসনে শুয়ে আছে, শিরা তন্তুর সব বাঁধন খুলে দিলেন। এইবার আস্তে আস্তে উপর দিকে উঠছেন, প্রথমে দুই হাঁটু, তারপর কোমর, সব বাঁধন খুলে দিচ্ছেন একে একে, ক্রমশ আলগা হয়ে যাচ্ছে আপনার শরীর।

সুজিত রাজর্ষির অফিসে ওর চেম্বারে মাঝে মাঝে আসে। সুখ-দুঃখের কথা হয়। সেদিন রাজর্ষি যখন বলেছিল, ওর একটা হাইপার টেনশন ধরা পড়েছে, সুজিত বলেছিল, সে কি আপনার হাইপার টেনশন! কেন আপনার হাইপার টেনশন কেন? আপনি ঠান্ডা মাথার মানুষ, নেশা নেই কোনও, আপনার হাইপার টেনশন? অবশ্য আপনি ভাবেন তো, যারা দুনিয়া নিয়ে ভাবে…

—সেই তো উপরেরটা একশো আশি তলারটা একশো এক। ওষুধ খেতে শুরু করে দিয়েছি। জানো তো ভাই, প্রসারের ওষুধ একবার ধরলে আর ছাড়া যায় না।

সুজিতের মুখখানা ছোটো হয়ে আসে। যেন এক অসহায় বিষাদে। বলে, শরীরের উপর জবরদস্তি, জানেন তো শরীরকে শরীরের মতো ছেড়ে দিতে হয়।

কিছুক্ষণ থামে সুজিত। তারপর সেই অসহায় বিষাদখানা আলতো করে সরিয়ে দিয়ে বলে, ওষুধ খাচ্ছেন খান, কী আর করা যাবে, তবে আমি কয়েকটা আসন দিচ্ছি করুণ তো। নিয়মিত করুন, দেখবেন প্রেসার আপনি সেরে যাবে। পার্মানেন্ট কিয়োর।

তখন সুজিত বলে প্রথমে শবাসনের কথা। বলে যাচ্ছে এখনও, তার মাথাটা চেয়ারেই হ্যালান দেওয়া, মাথাটা সে তুলছে না, চোখ খুলছে না, কোন ঘুমের দেশ থেকে যেন সে বলে যাচ্ছে, গোড়ালি হাঁটু কোমর পার হয়ে এইবার আপনি শরীরের অন্দরে এলেন। কোমর পার হতে আপনি শরীরের অন্দরে এলেন, ক্রমশ অস্ফুট হয়ে আসছে সুজিতের স্বর, যেন সে ঘুমেই আচ্ছন্ন, বলে যাচ্ছে, আপনি সব অন্ত্র, নাড়ি, চক্র, নলপথ সব ছেড়ে দিচ্ছেন, সব যেন আলগা হয়ে যাচ্ছে, পাক খুলে যাচ্ছে সবার, সব শিথিল হয়ে যাচ্ছে, সব বাঁধন খুলে যাচ্ছে, সব বাঁধন, বাঁধন।

রাজর্ষি সুজিতের সেই এলিয়ে দেওয়া মাথার দিকে তাকিয়েছিল একমনে, সেই যে সুজিত আচ্ছন্নের মতো বলে যাচ্ছিল অস্ফুটে। হঠাৎ যেন সুজিতের ঘুম ভেঙে যায়, সে চেয়ারে এলিয়ে দেওয়া ঘাড় মাথা সোজা করে, হঠাৎ যেন ঘুম থেকে জেগে উঠে টানটান হয়ে বলে, জানেন তো, শরীরের কাজ শরীরকে করতে দিতে হবে। ওকে দিনে অন্তত দু-বার ওর মতো থাকতে দিতে হবে। ওর রোগবালাই ও নিজে সারিয়ে নেবে। ওর ওপর কোনো জোর খাটালে চলবে না। মানুষ তো সব সময় শরীরকে নিজের ইচ্ছেমতো চালায়। শরীরকে সারা দিনে অন্তত কিছুক্ষণ ওর ইচ্ছেমতো ছেড়ে দিন, সব ঠিক হয়ে যাবে। অন্তত দু-বার সারাদিনে শরীরকে ওর নিজের ইচ্ছেমতো থাকতে দিন!

শরীরের নিজের ইচ্ছে! সারাপথ ভাবতে ভাবতে রাজর্ষি বাড়ি ফিরেছিল।

২.

সকালে উঠে রাজর্ষি শবাসনে শোয়! ওর বরাদ্দে থাকা কাজগুলো সেরে নিয়েছিল আগে।

পাখাটা চালিয়ে নেয়। তারপর শবাসন।

দু-পায়ের পাতার মাঝখানে ছ-ইঞ্চি ফাঁক থাকল তো! রাজর্ষি ধড়ফড় করে উঠে পড়ে। ঠিক ছ-ইঞ্চি ফাঁক চাই, সুজিত বলেছিল। নাও এবার ঠিক আছে। ছাড়ো, ছাড়তে শুরু করো। পাখাটা কি বড়ো জোরে চলছে? শীত শীত করছে নাকি! ক-দিন যা টানা বৃষ্টি চলছে। এক পয়েন্ট কমিয়ে দিয়ে শোবো নাকি, পাখাটা! পাখাটার ব্লেডগুলোয় কী ঝুল-ময়লা জমেছে! দিব্যা বললো বলে, পাখা তিনটে একটু পরিষ্কার করলে না! সব আমি করব!

চোখ বোজাও তো, চোখ বোজাও! নইলে উইথড্র করতে পারবে না। উইথড্র করতে না পারলে কী করে শরীর ছাড়বে।

প্রথমে গোড়ালির হাড় পেশি শিরা সব ছেড়ে দাও! বাঁ-পায়ের গোড়ালির উপর শিরাটানের ব্যথাটা এখনও আছে নাকি। পা-টা এদিক-ওদিক বেঁকিয়ে বুঝতে চায় রাজর্ষি। যাহ, সেই নিজের ইচ্ছে চালাচ্ছে তো পায়ের ওপর ছেড়ে দাও! ছেড়ে দাও! ছাড়তে ছাড়তে আস্তে আস্তে পায়ের নরম মাংস পার হয়ে হাঁটুতে ওঠো। ওঠো। হাঁটুর মালাইচাকি ছেড়ে দাও।

ক-টা বাজল!

গলির মোড়ে মাছওয়ালা বসেছে তো!

চোখ খুলে ফেলে রাজর্ষি। বাঁ-কাতে জানলার দিকে তাকায়। জানালার উপর বসে আছে পোষা বেড়ালটা। রাজর্ষির সঙ্গে চোখাচোখি হতেই বিড়ালটা ডেকে ওঠে!

গলির মোড়ে মাছওয়ালা বসলেই কিছুক্ষণ পরেই ওর কাছে যায় রাজর্ষি। বাড়ির মাছ কেনার থাকলে কেনে। কিনলে বা না-কিনলে মাছওয়ালার কাছ থেকে কাটা মাছের কানকো-ফুলকোগুলো জোগাড় করে, আর কয়েকটা চারা মাছ কেটে ছোটো ছোটো করে নেয়। বিড়ালটার জন্যে। বিড়ালটা রাজর্ষির জন্যে অপেক্ষা করে।

রাজর্ষি তাড়াতাড়ি চোখ বুজিয়ে নেয়। চোখ বোজাতেই বুঝতে পারে বিড়ালটা ওর দিকেই চেয়ে আছে। নিজের শরীরের উপর ওর ইচ্ছে পুরোপুরি তুলে নিতে পারবে কি পারবে না, পরের কথা, চোখ বুজিয়ে রাজর্ষি বুঝতে পারে বিড়ালটার ইচ্ছে এখন লম্বালম্বি শবাসনে শুয়ে-থাকা তার সারা শরীর মাপছে!

বিড়ালটা মাছের কানকো-ফুলকো খেতে খুব ভালোবাসে। তাবত বিড়ালই ভালোবাসে। রাজর্ষির যেতে দেরি হলে অন্য দু-তিনজন সব কানকো-ফুলকো প্ল্যাস্টিকে করে নিয়ে চলে যায়। চিরুনির মতো মাছের কানকো, লাল টুকটুকে কাঁকইয়ের মতো, বিড়ালটা খেতে খুব ভালোবাসে। মাছের কানকোর উপর মাছের তখন আর কোনও ইচ্ছে নেই, পলিপ্যাক থেকে মাটিতে পড়তেই বিড়ালটার ইচ্ছেই রাঙা কুসুমের মতো ফুটে ওঠে।

হাঁটুর মালাইচাকি সন্ধি থেকে আস্তে আস্তে কোমরের দিকে ওঠো। ধীরে। কোমর হলো শরীরের সব থেকে বড়ো সন্ধি, খেয়াল করো। কোমরের সন্ধি পুরোপুরি আলগা করে দাও। আলগা করে দিতে পারলেই শরীরের নিম্নাংশ শরীর থেকে পুরো আলগা হয়ে গেল। ছেড়ে দাও, দাও!

ম্যাও।

বিড়ালটা ডাকছে। স্পষ্ট কথা—এতক্ষণ শুয়ে আছো কেন? নড়াচড়া নেই। যাও। এ কেমন ধারা আজ!

বাবুই বলেছিল গল্পটা। গল্প নয় তথ্য।

ধরো তোমরা তিন জনে একসঙ্গে উপবাস শুরু করলে—তুমি, একটি কুকুর এবং একটি বিড়াল। অথবা তোমাদের তিন জনকে একটা ঘরে খাবার না দিয়ে আটকে রাখা হলো—তুমি, একটি কুকুর, একটি বিড়াল। মাইন্ড ইট, বিড়াল এবং কুকুর, দু-জনেই কিন্তু তোমার পোষা। মানে ওরা দু-জনেই তোমায় ভালোভাবে জানে, তুমিই ওদের প্রতিদিন খেতে দাও, নর্ম্যালি। ফাস্টিং অন। ধরো তিন জনের মধ্যে তুমিই প্রথম মরে গেলে। না, কন্ডিশনটা হলো এই—তিন জনের মধ্যে তুমিই প্রথম মরে যাবে। তাহলে, বিড়ালটা কিন্তু একদিন সময় নেবে তুমি মরে যাবার পর তোমাকে খেতে। কুকুরটা অপেক্ষা করবে আরো আট দিন। আরও আট দিন সে খিদের সঙ্গে লড়ে যাবে, তারপর তোমার শরীরে দাঁত বসাবে।

ম্যাও—বিড়ালটা আবার ডেকে ওঠে। আসলে তাড়া দেয়।

রাজর্ষি চোখের পাতা চেপে বুজিয়ে ফেলে। চোখ বুজিয়ে দেখতে পায় বিড়ালটা সারা চোখের খিদে দিয়ে ওকে চাটছে। শবাসন চাটছে।

প্রথম প্রথম রাজর্ষি পরিমাণমতো কানকো-ফুলকো আর টুকরো মাছ এনে বাগানের চাতালের উপর বিড়ালটাকে খেতে দিত। ক-দিন পরে বিড়ালের জন্য খাবার নিয়ে ফেরার পথে তার মনে হয় মাথার উপর কয়েকটা ছায়া নড়ছে। তাই-ই। ঠিক তাই। কানকো-ফুলকো মাছ নিয়ে ফেরার পথে সে দেখে মাথার উপর তার পাঁচটা কাক উড়ে আসছে। পথের রোদে ছায়াগুলি কাটাকুটি খেলছে। সে গেট খোলে, কাকগুলো মাথার উপর চক্কর খায়। কাকগুলো বাগানের চাতালের কিনারায় এসে বসে। না, ঠিক ছোঁ মেরে খেতে চাইছে না তারা। সে বিড়ালটাকে খেতে দিলে কাকগুলো নরম নিষ্পাপ খিদেয় তার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। কখনও যদি একটুকরো ছুড়ে দেয়, কী খুশি হয় কাকগুলো। একটা কাক মুখে করে খাবার তুলে নিলে, খাবার তুলে নিয়ে ফিরে গিয়ে পাঁচিলের ওপর বসলে, এক-একটা কাক এক-পা দু-পা করে তার দিকে এগোতে থাকে। ভয় পায় না। সে কাকের চোখ দেখতে পায়। কী প্রার্থনামাখা চোখ! তার পায়ের গোড়ায় চলে আসে এক-একটা কাক।

আসলে জানেন তো পৃথিবীতে স্বাভাবিক খাবার কমে যাচ্ছে! রূপাই বলেছিল।

ওকে রাজর্ষি একদিন বলেছিল গল্পটা, সে যখন বিড়ালটাকে বাগানের চাতালের উপর খাবার দেয়, কাকগুলো মাথার ওপর চক্কর খায়, কার্নিশের উপর বসে ডেকে ডেকে জানান দেয়, দু-তিনটে কাক ভয়ডর ভুলে পায়ের নখের কাছে চলে আসে, গেটের ওপারে দাঁড়িয়ে থাকে দুটো পথের কুকুর, পাঁচিলের মাথার উপর এসে থমকে দাঁড়ায় দুটো বেজি।

—দেখবেন বেজি দুটোও কোনওদিন আপনার পায়ের কাছে চলে এসেছে, রূপাই বলে।

—এলো তো, আজই দেখি পাঁচিল থেকে নেমে গুটিগুটি….। কতজনকে খেতে দেবো বলুন তো!

—পৃথিবীতে স্বাভাবিক খাবার এত কমে আসছে, ওদের আর মানুষের কাছাকাছি চলে আসা ছাড়া কোনও পথ থাকছে না! পৃথিবী আর নিজের ইচ্ছেমতো ওদের খাবার দিতে পারছে না! রূপাই বলেই যাচ্ছে, মানুষ তো কিছুটা জোর করেই পৃথিবীর কাছ থেকে খাবার আদায় করে। বুদ্ধি করে আদায় করে। পৃথিবীকে খুঁড়ে, চষে! আর পাখি বেজি, কত রকমের জন্তু, ওদের খাবার দেয়, পৃথিবী নিজে। আপনি সকাল বেলা দুটো পাখিকে চাতালের উপর দানা ছড়িয়ে খেতে দিন,  দেখবেন ঝাঁক ঝাঁক পাখি আসছে। আপনাকে ঘিরে বসছে, খেতে চাইছে। যেন পাখিদের লঙ্গরখানা খুলেছেন আপনি। মানুষের সঙ্গে ভাব জমানো ছাড়া ওদের আর উপায় নেই এখন। অস্তিত্বের প্রশ্ন।

রাজর্ষি রূপাইয়ের মুখের দিকে চেয়ে থাকে। ও দূরের দিকে তাকিয়ে বলেই যাচ্ছিল, পথিবী আর নিজের ইচ্ছে মতো ওদের খেতে দিতে পারছে না, নিজের ইচ্ছেমতো ওদের থাকবার জায়গা দিতে পারছে না।

—স্বাভাবিক খাবারের মতো স্বাভাবিক জায়গাও কমে আসছে, বলছো?

—একেবারে, রাজদাদ একেবারে! কমে আসছে না, শেষ হয়ে আসছে। নিরূপায় পৃথিবী। পৃথিবীর আর কোনও নিজের ইচ্ছে নেই। পৃথিবী আর নিজের ইচ্ছেমতো চলতে পারছে না এতটুকু! অসহায়।

রাজর্ষি ভাবছিল, এইবার সে নাভিকেন্দ্রে পৌঁছেছে। শরীরের অন্দরে পরিপাক তন্ত্রের কত নালি থলি পাকে পাকে জড়ানো আছে, সবার উপর থেকে ইচ্ছা তুলে নিতে হবে, সব নালি থলি অন্ত্রকে তাদের ইচ্ছেমতো থাকতে দিতে হবে এইবার।

ধুর! তাই হয় নাকি। যত সে ভাবছে গোড়ালি হাঁটু কোমর নাভি—সবখান থেকে তার ইচ্ছে তুলে নিতে হবে, তত তার ইচ্ছেগুলো ওখানে গিয়ে গিঁট পাকিয়ে যাচ্ছে। গ্রন্থি, গ্রন্থি, কীসব অনড় অচল গ্রন্থি তার শরীর জুড়ে। তার গোড়ালিতে গ্রন্থি, নাভিমূলে গ্রন্থি, সে যেন ছাড়াতেই পারছে না।

ধড়মড় করে উঠে পড়ে রাজর্ষি, শবাসন ছেড়ে।

ধুর! পৃথিবীটাই নিজের ইচ্ছেমতো চলতে পারছে না, তো মানুষের শরীর! শরীরকে ছেড়ে দাও তার ইচ্ছের উপর! যত্তোসব! হয় না, ও সব হয় না।

শবাসন ভেঙে খাট থেকে দ্রুত নেমে রাজর্ষি দু-পায়ের উপর দাঁড়ায়। বিড়ালটা স্বস্তি পায়। আশ্বস্ত হয়। মাথাটা একটু বেশি যেন ঘুরছে মনে হয়। প্রেসারটা বাড়ল!

সে পলিপ্যাক নেয়। দ্রুত পায়ে বার হয়। মাথাটা খুব ঘুরছে। মাছওয়ালার কাছে যাবে! হাত থেকে পলিপ্যাকটা পথে পড়ে। সে আবার তুলে নেয়। মাছওয়ালার কাছ থেকে কানকো-ফুলকো জোগাড় করে। ছোটো মাছগুলো টুকরো করে কেটে নেয়। পলিপ্যাকে ভরে। মাছওয়ালার কাছে যাবার পথে কাকগুলো তাকে দেখছিল। দুটো কুকুর। বিড়ালটা তাকে গেট পর্যন্ত এগিয়ে দিতে এসেছিল।

দ্রুত সে বিড়ালটাকে খেতে দেয়। কাকগুলোর দিকে এক-আধটা ছোড়ে। আরও দুটো হুলো এসেছে আজ। সে না দাঁড়িয়ে থাকলে পোষ্যটার খাওয়া হবে না। হুলো দুটো কেড়ে খেয়ে নেবে। আবার, হুলো দুটোকে তাড়াতেও ইচ্ছে করছে না। কী মিনতি ফুটে আছে ওদের চোখে। পাঁচিলের উপর আজ তিনটে বেজি। বাড়ি থেকে এগোলে যে ব্যস্ত পথ, তার পাশে এক চিলতেই জলা জায়গা পড়ে ছিল এতদিন। একটা পোড়ো ঘর। পোড়ো দেওয়ালের বাৎসল্যে বট অশ্বত্থ যেমতো বাড়ে স্বাভাবিক। একটা ডোবা। ডোবার ওপরটায় ছাতি ধরেছিল কী গাছ ওটা। যজ্ঞডুমুর? দিন তিনেক আগে ফেরার পথে দেখা গেল চকচকে করোগেটে টিন দিয়ে ঘিরেছে পোড়ো দেওয়ালের মায়া, ডোবার আঁধার। বাঁশের মাথায় বোর্ড পড়েছে ‘কল্পতরু হাইট্‌স্’। তৃতীয় বেজিটা হয়তো ওখান থেকে এসেছে বাসা ছেড়া হয়। বাকিগুলো কোদাল-গাঁইতি পড়তেই কতদিনের বাসা ছেড়ে পালাতে চেয়ে পথের চাকার তলায় থেঁতলে মরে যাবে।

তাড়াতাড়ি খাবার দিয়ে রাজর্ষি ঘরে ফেরে। দ্রুত ঘরে ফেরে। মাথাটা এত ঘুরছে।

শুয়ে পড়ে। পৃথিবীটা আপন ইচ্ছেমতো ঘুরছে পাগলিনীর মতো। সেই ঘুরন সে টের পায় গোড়ালির শিরায়, হাঁটুর মালাইচাকি, কোমরের সন্ধি, নাভিমূলে। পটাপট গিঁট খুলে যাচ্ছে সব। পাক খুলে যাবে সকল নাড়ির। সব কটা নালি থলি খালি হয়ে গেল সব দেহরস নিঃসরণ করে। পেশিগুলোর জোড় খুলে যাচ্ছে, আঁশিয়ে উঠছে মাংসতন্তু। কতদূর, কোন সব আদি ইচ্ছেতে পৌঁছে গেল শরীর। নাভিমূলের গিঁটটা খুলে যেতেই সব আলগা। সব জোড় খুলে যেতেই প্লাবনের জলের মতো এলিয়ে পড়ে থাকে শরীর। আপন ইচ্ছেতে। তার শয়ন ঘিরে এগিয়ে আসে ওরা। বিড়ালটা দাঁত বসিয়ে দেয় নাভিমূলে। আঁখিগোলকে ঠোঁট ডুবিয়ে দেয় কাক। তার চোখ আর কাকচক্ষুতে চোখাচোখি হয়। অথবা সে কাকচক্ষু দিয়েই দেখছে এই একান্ত উৎসব এখন। কুকুর দুটো এই সব দেখে আর নিজেরই দাঁড়ার মাংসে দাঁত বসায়। পেটের কোটরে তার এ গলি সে গলি, সুড়ঙ্গ গলিঘুঁজি মূত্র সুড়ঙ্গ, পিত্তথলি আপন খেয়ালে ঘোরে রোমশ বেজিগুলি।

সংগ্রামী মা মাটি মানুষ পত্রিকা ২০১৭ পূজা সংখ্যায় প্রকাশিত

আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev