কড়া নেড়েছিল অনঙ্গ। অদিতি এসে দরজা খোলার আগেই সে ব্যাগে হাত দিল।
ব্যাগটা পুরোনো। বছর কুড়ি আগে এক কোম্পানির হয়ে টাকা কালেকশান করতে গিয়ে ওরাই ওকে প্রেজেন্ট করে ছিল। রোদে-জলে ও হাতের ঘাম খেয়ে খেয়ে পাশের লেখাগুলো এক সময় উঠে গেলেও ভেতরে এখনও অনেকটা জায়গা। ছোটো একটা টিফিন বাক্স থেকে লটারির টিকিট ও কাগজপত্র রেখে শীতের দিনে ভাঁজ করে একটা মাফলারও এনে ঢোকানো যায়। কিন্তু চেন ঠিক থাকলেও ইদানীং রানারটা বড় ঝামেলা করছে। আস্তে করে টানলেও খচ্ করে এসে আটকে যায়। অনঙ্গ তাই ভয়ে ভয়েই থাকে। এখনও তাই ছিল। কিন্ত অদিতি এসে দরজাটা খুলতেই ফস করে সেটাও গেল খুলে ।
বাইরে কেন! ভেতরে এসে খোলা যায় না? কখন কী পড়ে যায় —
অদিতি বলতেই অনঙ্গ হাসে, পড়ে গেছে কখনও? এই হাত ব্যাগটায় কোম্পানির চিঠিপত্র থেকে বিলটিল ও টাকা পয়সা কত কিছুই তো থাকে। হারিয়েছে কখনও?
কখনও না হলে কোনোদিন যে হবে না তা কি বলা যায় মুখ ফুটে —
না, তা অবশ্য যায় না। যা দিনকাল পড়েছে —
ভেতরে ঢুকে ব্যাগের অন্ধকার থেকে একটা সাদা খাম বের করে আনে অনঙ্গ, এই নাও —
অদিতি ততক্ষণে দরজা বন্ধ করছিল।
ভাদ্রের বেলা। দিন ফুরিয়ে যায় যায় করেও বুঝি ফুরোতে চায় না। সন্ধের মুখেও আলগা একটা আলো লেগে থাকে।
অদিতি হাত বাড়িয়ে খামটা নেয়, কী এটা?
খুলেই দেখ না।
খুলতে গিয়েও কী ভেবে অদিতি খুলল না। ফেলে দেওয়া বাতিল কোনও খাম তুলে নিয়ে সোজা করে তাতে কিছু একটা রেখেছে অনঙ্গ। টাকা নয় তো? না, টাকা তো কখনও ওকে খামে ভরে দেয় না অনঙ্গ। তবে কি কোন চিঠি? কিন্তু কীসের চিঠি, কার চিঠি!
ঘরে ঢুকে খাম খুলে চিঠিটা বের করে অদিতি। কিন্তু পড়তে গিয়েই অবাক। চিঠি কোথায়! এ তো টিকিট। অদিতি চমকে ওঠে। আর ঠিক তখুনি তার মনে পড়ে ক’দিন আগেই অনঙ্গ যেন খেতে বসে বলেছিল একসময়, এবার তারা পুজোর ছুটিতে পুরী যাবে। অনঙ্গ এবার তাদের সমুদ্র দেখাবে। সমুদ্রে নিয়ে যাবে। কিন্তু সে তো কথার কথা। এমন কথা তো অনেকই বলেছে অনঙ্গ। সেই বিয়ের পর থেকেই। ইতিমধ্যে মিন্টু হয়েছে। কলেজে গেছে। আর মিন্টুর পরে পরে যে মেয়েটা সে-ও এখন দেখতে দেখতে ক্লাস নাইনে। তা এর মধ্যে সমুদ্র কেন কোন জলাশয়ের ধারেও কোনও দিন নিয়ে যেতে পারেনি অনঙ্গ। পারবে কী, সামান্য একটা প্রাইভেট কোম্পানির চাকরি। কতই বা মাইনে! নুন আনতে পান্তা ফুরিয়ে যায়। তবু ভাগ্য ভালো যে পঞ্চাশ টাকা ভাড়ার এই আধা-বস্তির দু’কামরার বাসাটা অন্তত আছে। তা অনেক বললেও এবং বলে বলে শেষ পর্যন্ত না নিয়ে যেতে পারার জন্য অনঙ্গর ওপর রাগ সে করেনি কোনোদিনই। তবে হতাশ হয়েছে। আর অনঙ্গকে এ নিয়ে জিজ্ঞেসও করেনি কিছু। এমনকি অনঙ্গ বললেও গুরুত্ব দেয়নি। অথচ এবারে বলা শুধু নয়, বলার সঙ্গে সঙ্গে টিকিটও এসে গেল। কিন্তু টিকিটের তো একটা দাম আছে। যাওয়ার তো একটা খরচ আছে। তা হঠাৎ করে এত গুলো টাকা? বোনাস তো হয়নি এখনও! আর বোনাস যা পায় তাতে ছেলে মেয়ের গায়েই জামা ওঠে না ঠিকঠাক, এর ওপর আবার বেড়ানো।
অদিতি টিকিটটা দেখে। হাতে তুলে নিয়ে উল্টেপাল্টে ধরে দেখেও কিছুক্ষণ। একটা ছাপানো কার্ডের মতো টুকরো কাগজ। তাতে গুঁড়িগুঁড়ি অক্ষরে কীসব লেখা। লেখাগুলো দেখতে দেখতেই তাকিয়েছিল। অনঙ্গ আঙুল বাড়িয়ে দিল।
এই দেখ, দেখেছ। আমাদের চারজনের নাম। প্রথমে আমি তারপর তুমি। এরপর মিন্টু ও শমি।
কিন্তু —
কী! অনঙ্গ তাকাতে গিয়েও যেন চোখ তুলতে পারে না।
অদিতির দুই ভুরুর মাঝে সরু একটা চুলের রেখা। বলল, চারজনের টিকিটের খরচ তো অনেক হবে তাই না?
হ্যাঁ। তা মানে — অনঙ্গ আমতা আমতা করে।
অদিতি শুধোয়, তা এতগুলো টাকা হঠাৎ করে পেলে কী করে?
অনঙ্গ চমকে ওঠে। বুকের ভেতর ঝপ করে কিছু একটা নাড়া খেয়েছিল। অনঙ্গ তাই সন্তর্পনেই এগোয়। ওই মানে…হঠাৎ করে কিছু টাকা পেয়ে গেলাম —
হঠাৎ করে?
হ্যাঁ। কোম্পানির একটা প্রায় না-উদ্ধার হওয়া টাকা আমারই চেষ্টায় উদ্ধার হল…কোম্পানি তাই খুশি হয়েই…
ব্যাগটা বিছানার ওপরে রেখে শার্টটা খুলতে খুলতেই অনঙ্গ নিজেকে আড়াল করে। একটু থেমেই আবার বলে তাই, আর টাকাটা পেয়েই সোজা টিকিটের লাইনে। তিরিশ বছর ধরে শুধু তো বলেই এসেছি। তাই ভাবলাম এবারে যদি সমুদ্রটা ঘুরিয়ে আনতে পারি –
বলতে বলতে অনঙ্গ আড় চোখে একবার অদিতিকে দেখে নেয়।
কিন্তু এ টাকা আবার বোনাস থেকে কাটবে না তো?
অদিতির হাতে তখনও টিকিট। আর টিকিটের দিকে তাকিয়েই যেন সন্দেহটা প্রকাশ করে সে।
অনঙ্গর বুকের ভেতরের চাপা ভয়টা তখনও যায়নি পুরোপুরি। না তাকিয়েও লুঙ্গিটা মাথা দিয়ে গলাতে গিয়ে তার বুক কেঁপে যায়।
না না, তা কেন! বোনাসের সঙ্গে এর সম্পর্ক কী?
নেই তো?
না না।
নেই জেনে অদিতি সামান্য আশ্বস্ত হয়। হলেও পুরোপুরি বুঝি সন্দেহমুক্ত হয় না। কিছু আরও বলতে যাচ্ছিল এই সময়েই আবার অনঙ্গ প্রসঙ্গ বদলাবার জন্যই যেন বলে, এরপরে আরও একটা রির্জাভেশন করাতে হবে –
প্যান্ট ছাড়তে ছাড়তে বলে অনঙ্গ।
আবারও কেন!
বাহ্ — এটা তো যাওয়ার। গেলে ফিরতে হবে না?
তা আজ একটাই আনলে যে —
অনঙ্গর বুকের ভেতরের চাপা অস্বস্তিটা যেন তখন সরতে শুরু করেছে। আর সরতেই সে বলল বুঝিয়ে। আর বুঝিয়েই এরপর আবার রির্জাভেশনের নিয়মটা বুঝিয়ে বলে অনঙ্গ। বুঝিয়েই তারপর জানায় অদিতিকে। যাওয়ারটা হল আজ। ফেরারটা দিন সাতেক বাদে গিয়ে কেটে আনব। সে টাকাও রেখে দিয়েছি। মিন্টু ও শমিকে এখন জানাবার দরকার নেই। আগে রিটার্নটা হোক।
কিন্তু রিটার্ন কী, অত দূরেও যেতে হল না তার আগেই সব ফাঁস। অদিতিই আর থাকতে না পেরে বলে ফেলল। বলতেই ছেলে অবাক। মেয়ে তো প্রায় লাফিয়েই পড়ে আর কী!
সত্যি! সত্যিই যাব মা?
সত্যি নয় তো কী মিথ্যে বলছি! খেয়ে উঠে টিকিটটা দেখিস —
কিন্তু টিকিট দেখতে গিয়ে টিকিটের গায়েই যেন চুমু খেয়ে বসল শমি। শমিতা।
উফ্, আমি তো ভাবতেই পারছি না। রোজ কিন্তু সমুদ্রে চান করব বলে দিলাম মা —
হ্যাঁ, তা তো করবেই! অদিতির ঠোঁটের ফাঁকে হাসি, শেষে ঢেউ এসে টেনে নিয়ে যাক আর কী!
শমিতা হাসে, ধ্যাত্। আমি সাঁতার জানি না বুঝি —
তোমার ওই সাঁতারকে সমুদ্র থোড়াই কেয়ার করে। পুরীর ঢেউ তো দেখোনি?
তাহলে নুলিয়া নেবে —
নুলিয়া!
হুঁ —
কত খরচ জানিস! আজকাল ওদের রেট বেড়ে গেছে —
কিন্তু তুমি কী করে জানলে? তুমি তো যাওনি —
না গেলেও পাশের বাড়ির শ্যামার মা গেল না সেদিন! সে-ই এসে বলেছে —
বলুক। একবারই তো যাব। নাকি, বল বাবা?
অনঙ্গ কী বলবে! টিকিটটা নিয়ে মেয়ের কান্ড-কারখানা লক্ষ করে যাচ্ছিল। এই সময়েই মিন্টু, কিন্তু টিকিট পেলে কী করে বলো তো?
কেন!
কেন কী, যা ভিড়। আর পুরীর অবস্থা তো আরও খারাপ। কী হবে! ওদিকে দার্জিলিং নেই। মোর্চার হামলার ভয়ে কেউ যেতে চায় না। তাই ওই পুরীই শেষ ভরসা বাঙালির। পেয়েছ যে এই তোমার ভাগ্যি — অনঙ্গের ঠোঁটে বিজয়ীর হাসি।
হ্যাঁ। তাইই ঠিক। প্রায় পড়ে পাওয়া আর কী! হঠাৎ কিছু ক্যানসেল হয়ে যাওয়ায় —
ভাগ্যিস হয়েছিল। শমি হেসে টিকিটটা আবার তুলে ধরে চোখের সামনে। মিন্টু শুধোয়, কোন ট্রেন? হাত বাড়িয়ে শমির কাছ থেকে টিকিটটা নিয়ে সে মাথা নাড়ে, বাহ্ জগন্নাথ এক্সপ্রেস। খুব ভালো। ফেরাটা নিশ্চয়ই পুরী এক্সপ্রেসে কাটছ বাবা?
তাই তো ভেবেছি। অনঙ্গ বলে, কিন্তু তুই কী করে জানলি?
সবাইই তাই করে। এটাই বেস্ট পেয়ার —
তোকে কে বলল?
কে আবার বলবে! বন্ধুদের মুখে শুনি না —
তোর বন্ধুদের সবারই পুরী ঘোরা — তাই না? অনঙ্গর চোখে আগ্রহ।
সবার কিনা জানি না। তবে অনেকেই গেছে —
বলতে গিয়েই মিন্টু আবার জিজ্ঞেস করে, তা আমরা থাকছি কোথায়?
তুইই অনুমান কর। চোখ তুলল অনঙ্গ।
মিন্টু হাসে, এই দেখ। অনুমানে এসব আবার হয় নাকি! হোটেল আছে, হলিডে-হোম আছে, গেস্ট হাউস আছে, ধর্মশালা আছে। এখন তুমি কোনটা কীভাবে ঠিক করেছ —
ওই তো। ওই হলিডে হোমই ঠিক করেছি। জানাশোনা একজন ঠিক করে দিয়েছে।
কোথায়?
স্বর্গদ্বারের কাছাকাছি।
স্বর্গদ্বার! ওখান থেকে সমুদ্র কতদূর বাবা?
মিন্টু নয় শমি। শমিই এবারে জানতে চাইল।
অনঙ্গ হাসল, আমি তো আর যাইনি কখনও। তবে বদ্রিদা বলেছে হলিডে হোমের ছাদে উঠলেই নাকি সমুদ্র দেখা যায় —
বদ্রিদা কে? অদিতি চোখ সরু করে।
ওই তো। হলিডে হোম যে ঠিক করে দিয়েছে —
তাহলে আমরা যাচ্ছি কবে বাবা? শমিতা যেন তখনও লাফাচ্ছে মনের ভেতরে। চোখের কোলটা ভেজা।
অনঙ্গ কী বলতে যাচ্ছিল কিন্তু ঝপ করেই সেখানে ঢুকল মিন্টু। শমিতার দিকে তাকিয়ে ভেঙচালো, তাহলে আমরা কবে যাচ্ছি বাবা! কেন টিকিটটা নিয়ে এতক্ষণ কী দেখলি? যাচ্ছি সাত তারিখে। নবমীর দিন —
নবমী? অন্যসময় হলে মিন্টুর ভেঙচানো নিয়ে হুলুস্থূল বাধিয়ে ফেলত। কিন্তু এখন আর সেসব গায়েই মাখল না শমিতা। বলল, তাহলে তো দারুণ হল। পুজোয় ঠাকুরও দেখে যেতে পারব। আচ্ছা আমি কী পরে যাব মা — শমিতা চঞ্চল। পারলে যেন এখুনি ট্রেনে উঠে পড়ে।
অদিতি হাসে, আরে দাঁড়া দাঁড়া। এখনও তো দেরি আছে —
কোথায় দেরি! শমিতা ঘাড়ের বিনুনিটা সরিয়ে বলে, সামনের সপ্তাহে বিশ্বর্কমা। আর তার পড়েই তো… ঠিক আছে ঠিক আছে ও হয়ে যাবে খন। আগে তো বিশ্বর্কমা যাক –
পরে রাত আরও বাড়লে এঁটোকাঁটা গুটিয়ে বাসনটাসন মেজে যখন ঘরে ঢুকল অদিতি ওই তখনই অনঙ্গ চোখ তুলল, কী হল তুমি কিছু বলছ না?
কী বলব!
বাহ্ তিরিশটা বছর ধরে তো শুধু আশ্বাসই দিয়ে এসেছি। তুমি যতবারই সমুদ্রের কথা বলতে আমি ততবারই হ্যাঁ, হবে হবে’ বলে এসেছি —
শুধু তুমি কেন! অদিতি স্মৃতিতে ফেরে, ছেলে বেলা থেকেই বলতাম বাবাকে। কিন্তু ‘হবে হবে’ বলে বাবা কোনও দিন নিয়ে যেতে পারেনি। অথচ আমাদের পাশের বাড়ির নান্টুরা যখন বছর বছর সমুদ্রে বেড়াতে যেত তখন যে কী কষ্ট হত। কষ্টটা বুকে চেপে ভাবতাম, থাক বাবা না হয় পারছে না বিয়ের পরে আমার বর নিশ্চয়ই আমাকে সমুদ্র দেখিয়ে আনবে একবার। কিন্তু —
অনঙ্গের ঠোঁটে বিষন্ন হাসি, কী করব বল! সামান্য চাকরি তারওপর এই টানাটানির সংসার। ভাবলেও কোনো সুরাহা করে উঠতে পারিনি। অথচ…
বলতে বলতে আরও কিছু বলার জন্য যেন শব্দ খুঁজল অনঙ্গ। কিন্তু গলা তার ধরে এল।
অদিতির গলায় চাপা স্বর, অথচ তুমি আজ সেই সমুদ্র দেখাতেই নিয়ে যাচ্ছ। কিন্তু যেতে গিয়েও যেন মনের কোথায়ও ভয়।
কীসের ভয়?
অদিতি চুপ। পরে বলল, কী জানি —
খেয়ে উঠে অনঙ্গ মেঝেতে পাতা ঢালা বিছানায় পুরোনো একটা ডাইরির পাতা খুলে কী লিখছিল। এখন সেদিকে অদিতির চোখ পড়তেই সে শুধোল, কত খরচ হবে বল তো?
খরচ! অনঙ্গের ঠোঁটে ম্লান হাসি, বাহ্ খরচ তো হবেই। টাকা তো লাগবেই। টাকা ছাড়া কি ঘোরা হয়। কিন্তু টিকিটের টাকা না হয় পড়ে পাওয়ার মতোই পেয়ে গেছ। কিন্তু পুরীতে গিয়ে থাকার খরচ। হলিডে হোমের ভাড়া? অদিতি তাকায়।
সেটা বদ্রিদা বলেছে যাওয়ার দু’দিন আগে দিলেই চলবে। বুকিংটা করিয়ে রেখেছে —
তা রাখুক। দিতে তো হবে।
অনঙ্গ চুপ। আরও একটু নীরবতা। একসময় অদিতিই আবার বলে, এক কাজ কর —
কী! অনঙ্গ সাগ্রহে তাকায়।
এবারের বোনাসের টাকা পেলে মিন্টু ও শমির জামা-প্যান্ট ছাড়া আর কোন কিছুতেই খরচ কোরো না। বাকি টাকাটা ওখানে গিয়ে না হয়…
অনঙ্গর বুকে সামান্য হলেও যেন স্বস্তি। ঝুঁকে পড়ে হিসেবের ডায়েরিটা আবার টেনে নেয় সে। নিয়ে কী দেখতে থাকে। দেখতে দেখতেই কী লেখে। লিখতে লিখতেই একসময় আবার শুয়ে পড়ে।
শুয়ে বুঝি ঘুমিয়েই পড়েছিল। হঠাৎই এক সময় তার ঘুমটা আলগা হয়ে আসে। আসতেই কানে আসে, ঘরের ভেতরে অন্ধকারে কেউ কথা বলছে। কথাগুলো খুবই চাপা। আস্তে করে যেন সুরের মতো ভেসে আসছে। অনঙ্গ উঠে বসে।
ওপরে তক্তপোশে শুয়ে অদিতি ও শমি। মিন্টু পাশের ছোটো ঘরটায়। অনঙ্গ কান ভাসিয়ে শুনতেই টের পায়, অদিতিই বলছে। সমু্দ্রের সামনে দাঁড়িয়ে যেন সমুদ্রের সঙ্গেই কথা বলছে। ওপারে ঢেউ। পাহাড় প্রমান হয়ে যেন বিচের ওপরে এসেই ভেঙে পড়ছে। তারই মাথায় সাদা ফেনা। ফেনার মাথায় কত কী যে! লাল, কমলা, খয়েরি ও বেগুনি ঝিনুক থেকে সুদৃশ্য টিনের কৌটো। ভাসা ফুল। সবই ফিরে আসছে। সমুদ্র কিছুই নেয় না। কিছুই গ্রহণ করে না। ফলে গ্রহণ না-করা ঝিনুকের দিকেই ছুটছে মানুষ। ঝিনুক কুড়িয়ে আনছে। ‘দেখেছ — কী সুন্দর! কত সব ঝিনুক। নাও না, নাও হাতে নাও —’ অদিতি বলছে। অদিতির মুখে বিড়বিড় করে শব্দ।
অনঙ্গ উঠতে গেল। ঘুমের ভেতরে কথা বলছে অদিতি। নিশ্চয়ই স্বপ্ন দেখছে।
উঠতে গিয়েও অনঙ্গ ওঠে না। থাক, থাক না। বলুক। বলুক অদিতি যতক্ষণ পারে। যতক্ষণ পারে স্বপ্নটা একটু দেখুক।
পরের দিন। রবিবার।
বাজার থেকে ফিরে এসেই অনঙ্গর চোখে পড়ল, তক্তপোশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে জামাকাপড় নামিয়ে বসেছে অদিতি। পাশে শমিতা।
কী ব্যাপার, এই সাতসকালেই এসব নিয়ে — অনঙ্গ অবাক। অদিতি হাসে। কিন্তু উত্তর দেয় না। দেয় শমিতাই। বা রে, ট্রাঙ্ক তো খোলাই হয় না। দেখতে হবে না কার কী আছে —
তাই বলে আজই? অনঙ্গের চোখে কৌতুহল।
অদিতি মাথা নাড়ে, নানা — ওর কথা ছাড়ো। ভাদ্রের রোদ চলে যাচ্ছে। ভাবলাম, একবার ট্রাঙ্কটা খুলি। আচ্ছা শোনো মিন্টু বলছিল পুরী থেকে নাকি চিলকা বলে একটা জায়গায় যাওয়া যায়। ভারী নাকি সুন্দর। তাহলে সেখানেও যাব —
ওখানে নাকি একটা দ্বীপ ছিল বাবা। কালীজায়া। দাদা কাল বলছিল। শমিতা বলে। বলতেই অনঙ্গ শুধোয়, ছিল কেন এখন নেই?
না বাবা। সুনামিতে নাকি ধ্বংস হয়ে গেছে —
তাহলে আর ধ্বংসস্তূপ দেখে লাভ কী!
না না, আমরা তাহলে কোনারকে যাব বাবা। সূর্যমন্দির দেখব। আমাদের বইয়ে আছে। বাবা তুমি কোনারকের ইতিহাস জানো?
ব্যাগ নামিয়ে অনঙ্গ ফ্যালফ্যাল করে তাকায়।
দুপুরে খেয়ে উঠে কখন শুয়েছিল। এবং শুতে না শুতেই চোখের পাতায় ঘুম। আর ঘুম নামতেই আকাশ কালো করে খানিকটা মেঘ এসে পড়ল। মেঘটা ধীরে ধীরে জমল আকাশে। এবং এরপরেই আকাশ ঝেঁপে বৃষ্টি। শেষ ভাদ্রের বর্ষা। একটু হয়েই একসময়ে আবার ধরে এল। আর ধরতেই আকাশটা আবার ঝকমকে। একদম নতুন পারা লাগানো আয়নার মতো।
অনঙ্গ উঠল। বৃষ্টিটা নামতেই ঘুমের একটা আমেজ নেমে এসেছিল। চোখ বুজে তাই ঘুমিয়েই পড়েছিল। জেগে উঠে শুনল পাশের ঘরে অদিতির গলা। অদিতি, শমি ও মিন্টু। মিন্টুই বলছে বেশি। ওরা শুনছে। জিজ্ঞেসও করছে মাঝেমাঝে। এবং উত্তর শুনেই আবারও কৌতুহল।
তবে তুই যা-ই বলিস দাদা, দীঘার চেয়ে পুরীর সমুদ্রে কিন্তু ঢেউ বেশি। আমার ভূগোল মিস বলেছে —
তোর ভূগোল মিসকে বলে দিস পুরীর চেয়ে গোপালপুরে ঢেউ আরও বেশি —
সেটা কোথায় রে দাদা! শমিতা হতাশ।
ওড়িশাতেই। তবে অন্যদিকে। না হলে কি বলতাম না বাবাকে।
শমি বলে, মা জানো তো সমুদ্রের রঙ পাল্টায় —
তাই বুঝি। অদিতির চোখ জোড়া বড় হয়ে যায়, কখন বদলায় রে?
তা জানি না। তবে মিস বলছিল…
অনঙ্গ এগিয়ে যায়। কিন্তু ঢুকতে গিয়েও থমকে দাঁড়ায়। পাজোড়া যেন ততক্ষণে মেঝেতেই আটকে গেছে তার।
ও ঘরে ওরা সবাই সমুদ্রের গল্প বলছে। অনঙ্গ গিয়ে দাঁড়ালে কী জানি যদি ধরা পড়ে যায়। মিথ্যে তো বলেছে এরই মধ্যে একটা। পড়ে পাওয়া নয়। কোম্পানিও দেয়নি তাকে। স্রেফ ধার করেছে। অফিসের মিউচুয়াল ফান্ড থেকে। বোনাস পেয়েই শোধ করে দেবে বলেছে। আর ধার করা সে টাকা থেকেই টিকিট ও পুরীতে হলিডে হোম বুকিং। যদি ধরা পড়ে যায় এখন?
ধরা তো পড়বেই। অনঙ্গ জানে। তবে ধরা সে পড়তে চায় না সমুদ্রে যাবার আগে। হোক না ধারের টাকায় যাওয়া, কিন্তু তিরিশটা বছর পরে এই একটু আনন্দের সুযোগ! এতদিন চেষ্টা করে করেও ধার করতে ভয় পেয়েছে এত টাকা। কিন্তু এবারে সে ভয়টা সে কাটিয়ে উঠেছে। আর উঠেছে বলেই তো শুনছে এখন সমুদ্রের গল্প।
মা কে ঘিরে দুই ছেলে মেয়েই এখন নিমগ্ন সমুদ্রের কাছে।
অনঙ্গ সরতে গিয়েই পারে না। কী জানি যদি পায়ের শব্দে সমুদ্রের গল্পটা থমকে যায়।
চুপচাপ দাঁড়িয়ে অনঙ্গ তাই সমুদ্রেরই গল্প শোনে।
ছাপোষা মানুষদের আশা আকাঙ্খা নিয়ে লেখা সুন্দর গল্প।