‘কুছ নহী হ্যায় তো আদাওত হি সহী’; গালিবের উর্দু কবিতার এই পংক্তিটি দিয়েই নিজের লেখার শিরোনাম করেছিলেন আরেক উর্দু কথাসাহিত্যিক সাদাত হাসান মান্টো, কিছু না থাকলে শত্রুতাই থাক। হয়ত মান্টো গালিবের কথা দিয়েই তাঁর নিজের জীবনের কথাই বলে ফেলেছিলেন। কিন্তু সাদাত হাসান মান্টোর সঙ্গে কিভাবে শত্রুতা হতে পারে? এটা ঠিক তাঁর লেখা এই উপমহাদেশের রাজনীতি, সমাজ আর ধর্মীয় ভণ্ডামির পর্দাটাকে সরিয়ে দিতে পেরেছিল রোদ্দুরের তাপের মতো; কিছু কথা আর কাহিনি দিয়ে।
খুব অবাক হতে হয় উর্দু সাহিত্যের সেরা কথাশিল্পী সাদাত হোসেন মান্টো উর্দুতেই তিনবার ফেল মেরেছিলেন, চতুর্থবারে কোনোমতে ম্যাট্রিক পাশ করেছিলেন। অথচ খুব খারাপ ছাত্র হওয়া সত্ত্বেও কলেজ পত্রিকার সম্পাদনার দায়িত্ব সর্বসম্মতিক্রমে তিনিই পেয়েছিলেন। আবার সেই খারাপ ছাত্রটি আলিগড় বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় যক্ষ্মায় আক্রান্ত হলে তাঁকে বিতাড়িত করা হয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে।
দেশভাগের কারণে যে সমস্ত মানুষদের জীবন বাস্তবিকই তছনছ হয়ে গিয়েছিল, সাদাত হাসান মান্টো তাদের মধ্যে অন্যতম। পাকিস্তানে যে ক’বছর তিনি বেঁচে ছিলেন, সেই সময়ও তাঁকে লেখক হিসেবে কোনও গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। জীবিকা উপার্জনের জন্য তিনি পাকিস্তানের দু-একটি ফিল্ম কোম্পানিতে চিত্রনাট্য লেখার কাজে যোগ দিয়েছিলেন। দুর্ভাগ্যবশত পরপর ছবিগুলি বানিজ্যিকভাবে অসফল হওয়ায় সেখানেও যে তিনি খুব একটা কদর পান নি তা বলাই বাহুল্য। অথচ মজার ব্যাপার হল সেই সময় মান্টো যেসব গল্প লিখেছিলেন, সেগুলিকেই পরবর্তীকালে তাঁর সেরা সাহিত্যকর্ম হিসেবে ধরা হয়।
১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট ভারত স্বাধীন হল, তার আগেই স্বাধীনতা পেয়েছে পাকিস্তান। রাত পেরিয়ে ভোরে হতেই মান্টো খেয়াল করলেন, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হাওয়ার থেকেও দ্রুতবেগে বোম্বে শহরে ছড়িয়ে পড়ছে। মান্টো লিখছেন…হিন্দু মুসলিমে লড়াই বেঁধে গেল, সে লড়াই আর থামল না, চলতে লাগল। লড়াইয়ের কারণ নতুন কিছু নয়, ওই একটাই—মন্দির, মসজিদ… জানেনই তো। কত মানুষের প্রাণ বলি হল! এই পাশবিকতা আমি সাক্ষাৎ প্রত্যক্ষ করেছি, কিন্তু নিজের বেদনা নিজের অনুভব নিজের অন্তরের ভেতরেই লুকিয়ে রেখেছিলাম।
তারপর আমি কলম তুলে নিলাম। এবং বোম্বেবাসীদের উদ্দেশ্যে আবেদন করলাম। ফলাফল দাঁড়াল আমাকে শায়েস্তা করতে আমাদের সম্মানিত মুসলমানেরা উঠেপড়ে লাগল। কিভাবে আমি তাঁদের ধোলাই থেকে পিঠ বাঁচালাম, সে অন্য গল্প। শেষ পর্যন্ত যা ভয় করেছিলাম তাই ঘটল। জনসমাগমে ঘৃণার উদ্গীরণ ঘটল এবং বোম্বের বাতাস বিষাক্ত হয়ে গেল। আর তারপর ভয়াবহ এমনকি নারকীয় সব দৃশ্য দেখতে বাধ্য হল আমার চোখ…
সেই সময় একজন মুসলিম হওয়ার অপরাধে বোম্বে ফিল্ম কোম্পানি থেকে মান্টোর স্ক্রিন রাইটারের চাকরিটা চলে যায়। পরিবারের নিরাপত্তার কথা ভেবে তিনি বাধ্য হয়ে বোম্বে ছেড়ে পালিয়ে যান। শরণার্থী হয়ে পরিবারসহ আশ্রয় নেন পাকিস্তানের লাহোরে।
শুধু কি তাই, দেশভাগের আগে অশ্লীল সাহিত্য রচনার দায়ে মান্টোকে তিন তিনবার অভিযুক্ত করে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয়। পরে পাকিস্তান বাসের সময়ও একই অভিযোগে আরও তিনবার অভিযুক্ত হয়ে কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয়। কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে সাহিত্যে অশ্লীলতার অভিযোগের জবাব দিতে গিয়ে মান্টো একবার বলেছিলেন, ‘একজন লেখক তখনই কলম ধরেন, যখন তার সংবেদনশীলতা বা অনুভূতি আঘাত পায়’।
‘গল্পলেখক ও অশ্লীলতা’-য় মান্টো লিখেছেন, মানুষের ক্ষুধাই সব সমস্যার মূলে। ক্ষুধা শুধু খাদ্যের নয়, ক্ষমতার বা যৌনতারও হতে পারে। কিন্তু সব ক্ষুধাই মানুষকে যে কোনো স্তরে নামাতে পারে বলে তিনি মনে করেন। আর এইসব ক্ষুধা নানাভাবে তৈরি হয়, তার উপস্থাপন নিয়ে লিখতে গেলে অনেকের কাছে অশ্লীল মনে হতে পারে।
মান্টোর ‘কালো সালোয়ার’ গল্পটি অশ্লীলতার দায়ে অভিযুক্ত। যে গল্প মানবিকভাবে একজন পতিতার জীবনের-দুঃখ কষ্ট তুলে ধরেছে। সেই গল্প প্রসঙ্গে মান্টো লিখেছেন— ‘তারা ফেরেস্তার হাতে পুষ্পবৃষ্টি কামনা করে না। মৃত্যুর পর পাড়া-প্রতিবেশীরা পতিতাদের জানাজায় সহযোগিতা করে না, বা কেউ দুটি গোর একত্রীকরণের ইচ্ছা প্রকাশ করে না। পতিতারা স্বয়ং একটি লাশ, যাদের সমাজ কাঁধে নিয়ে বেড়াচ্ছে। যেহেতু এই লাশ দাফন করা হয় না, তাই তাদের নিয়ে বিতর্ক অব্যাহত রয়েছে। পতিতা নামক এই লাশ বিকৃত, গলিত, দুর্গন্ধযুক্ত, বীভৎস সত্য; কিন্তু তার মুখ দেখতে আপত্তি কি? পতিতারা কি আমাদের কেউ নয়; ওরা কি আমাদের আত্মীয নয়! আমি তাই মাঝে মাঝে কফিন সরিয়ে এই লাশের মুখ দেখি এবং অন্যদেরও দেখাতে থাকি’।
যে মান্টো বোম্বাই শহরে বোহেমিয়ান দিনযাপন করেছেন, সিনেমা দুনিয়ায় ওতোপ্রতো জড়িয়েছিলেন চিত্রনাট্য রচনায়, ঘুরে বেড়িয়েছেন মাতাল-বেশ্যাদের ডেরায়, তাঁকে কেন তিনি ভারত ছাড়তে হল? কারণ বোম্বাইতেও সেদিনও প্রশ্ন উঠেছিল মান্টো তুমি কোন দিকে হিন্দু না মুসলমান? সেদিনও ধর্মনিরপেক্ষ সাংবিধানিক শপথের আড়াল থেকে উঁকি দিয়েছিল মুসলিমদের একঘরে করার, তাড়িয়ে দেওয়ার, কাজ না দেওয়ার প্রচ্ছন্ন হুমকি এবং চক্রান্ত।
মান্টোর কথা অনুযায়ী মুসলমানরাও চায়নি তিনি এদেশে থাকুন।
মান্টো তাঁর সময়ে পাকিস্তান এবং ভারতে দারুণ জনপ্রিয় লেখক ও চিত্রনাট্যকার ছিলেন, যেটা স্বীকার করতে খুব কষ্ট হত।
ঠিকই যখন তাঁর সংবেদনশীলতা বা অনুভূতি আঘাত পায় তখনই একজন লেখক কলম ধরেন, মান্টোর ক্ষেত্রেও তাই কিন্তু
বেঁচে থাকতে কোনও মর্যাদা পান নি তিনি। বরং আর্থিক টানামানির চেয়ে অমর্যাদার কষ্ট বেশি পেয়েছেন।
কেবল উর্দু সাহিত্যেই নয়, এই উপমহাদেশে মান্টোর মতো সংবেদনশীল, প্রতিবাদী এবং অবশ্যই জনপ্রিয় লেখক হাতে
গোনা, দুঃখের বিষয় মান্টো তাঁর যোগ্য সমাদর এখনও পাননি, মনে হয় তিনি মুসলমান ছিলেন বলেই…