মন্টোর ‘বাবু গোপীনাথ’ গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র বাবু গোপীনাথ বাইজিদের গান শুনতে পছন্দ করতেন কেন, তিনি কি সংগীতের সমঝদার? উত্তরে বাবু গোপীনাথ বলেন, ‘সংগীতের প্রতি আমার কোনো আকর্ষণ নেই। বাইজি-গান শুনে আমি মাথা দোলাই সত্য মন্টো সাহেব, সংগীতের প্রতি অনুরাগের বশবর্তী হয়ে নয়, পকেট থেকে দশ টাকা-একশ টাকার নোট বের করে বাইজিকে দেখাতে আমি আনন্দ পাই। নোটগুলো দেখালে সে হেলতে-দুলতে উঠে আমার কাছে আসে আর এক ঝটকায় টাকার নোট আমার হাত থেকে কেড়ে নেয়। আমাকে এবং উপস্থিত অন্যদেরও এই ধরনের ঘটনা আনন্দ দেয়। সবাই জানে, বাইজির কুটিরে পিতা-মাতা মেয়েকে ট্রেনিং দিয়ে পেশাদার বাইজিতে পরিণত করে; আর মাজার ও পিরের আস্তানায় মানুষ ব্যবসা করে সৃষ্টিকর্তা নিয়ে।’
বাবু গোপীনাথ চরিত্রের উপরোক্ত বক্তব্য থেকে আমাদের সমাজের আসল রূপ সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে। এর সাথে মন্টোর জীবনের অনেক মিল আছে। মন্টোও বন্ধুদের নিয়ে নিয়মিত হিরামতি যেতেন আর বাইজিদের নাচ-গান দেখে টাকার নোট ছুড়ে মারতে আনন্দ পেতনে; যদিও তাঁর তেমন আর্থিক সচ্ছলতা ছিল না কিন্তু তাঁর স্বভাব ছিল নওয়াবজাদাদের মতো। টাকা হাতে পেলে দেদার খরচ করতেন মদ আর বাইজিদের পেছনে। বাবু গোপীনাথ বাইজিদের নিয়ে মন্টোর বিখ্যাত গল্প এবং বাবু গোপীনাথ চরিত্রটি দারুণ পাঠকনন্দিত হয়েছে।
মন্টোর জন্ম ১৯১২ সালের ১১ মে পাঞ্জাবের লুধিয়ানা জেলার সোমরালা গ্রামে। মন্টোর পূর্বপুরুষেরা ছিলেন কাশ্মীরি পণ্ডিত। পণ্ডিত নেহেরু ও আল্লামা ইকবালের পূর্বপুরুষেরাও ছিলেন কাশ্মীরি পণ্ডিত। এ জন্য মন্টো গর্ব বোধ করতেন। কাশ্মীরি লোকজনের সাক্ষাত্ পেলে মন্টো ও তাঁর বাবা তাঁদের দারুণ সমাদর করতেন। মন্টোর বাবা গোলাম হাসান ছিলেন পাঁচ সন্তানের মধ্যে কনিষ্ঠ। অমৃতসরে মন্টোর বাবা উকিলপাড়ায় থাকতেন। তাঁর বাবা মুন্সেফ হিসেবে অবসর গ্রহণ করেন।
মন্টো অমৃতসর মুসলিম হাইস্কুল থেকে অতি কষ্টে তৃতীয় দফায় এন্ট্রাস পাস করেন তৃতীয় বিভাগে। তা-ও আবার উর্দুতে ফেল করেন। মন খারাপ হওয়ায় শহরের ফজলুর দোকানে জুয়ার আড্ডায় নিয়মিত হাজিরা দিতেন। স্কুলে দুষ্টুমির জন্য তাঁর খ্যাতি ছিল। পাড়ার ছেলেরা তাঁকে টমি বলে ডাকত। মন্টোর স্কুলে পড়ার সময় পাঠ্য বইয়ের চেয়ে অন্য বই পড়ার দিকে বেশি ঝোঁক ছিল। পাঠাগার থেকে বই ধার নিয়ে ফেরত না দিয়ে সেকেন্ড হ্যান্ড বইয়ের দোকানে বিক্রি করে দিতেন। এ জন্য বেচারি হেডমাস্টারকে বইয়ের দাম পরিশোধ করতে হতো।
মন্টোর ছেলেমানুষি ছিল আজগুবি ধরনের। একবার রটিয়েছিলেন, আমেরিকা সরকার তাজমহল কিনে নিচ্ছে, এ জন্য মেশিনারি ভারতে আনা হচ্ছে!
ছাত্রাবস্থায় মন্টো নাটক মঞ্চায়নের জন্য একটি নাট্য দল গঠন করেন। বাবার কানে এ খবর গেলে তিনি ক্লাবে গিয়ে ছেলেদের তবলা-হারমোনিয়াম ভেঙে গুঁড়ো করে দেন আর নাটক মঞ্চায়নের মতো নাপাক কাজ থেকে বিরত থাকার জন্য ছেলেকে সতর্ক করে দেন।
মন্টোর পড়ার টেবিলে থাকত ভগত সিংয়ে মূর্তি। ভারত থেকে ইংরেজদের তাড়ানোর স্বপ্ন দেখতেন। ভবঘুরের ন্যায় অমৃতসরের রাস্তায় ঘুরে বেড়ানো আর সিগারেট ফুঁকে বেড়ানোই ছিল কাজ। অন্যদিকে দুনিয়া কাঁপানো বিপ্লবের স্বপ্ন দেখতেন তিনি। অসত্ সংসর্গে মদ, চরস ও সিগারেট খেতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েন।
হিন্দু মহাসভা কলেজ থেকে দুবার এফএ পরীক্ষা দিয়ে ফেল করেন। শিক্ষক ও বাড়ির লোকজন তাঁর ওপর বিরক্ত। দারুণ মানসিক চাপে পড়ে তাঁর বন্ধু উর্দু লেখক আবু সাঈদের সাথে শলাপরামর্শ করে আলীগড়ে পড়ার মনস্থ করেন। আবু সাঈদ কোরাইশিও এফএ পরীক্ষায় ফেল করেছিলেন। তখন আলীগড়ে প্রগতিশীল কবি আলী সরদার জাফরির সাথে দেখা হলে নিজেকে কমরেড মন্টো হিসেবে পরিচয় দেন।
আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়ম-কানুন ছিল কড়া। কিন্তু মন্টো কোনো নিয়ম-কানুনই মানতেন না। স্বাস্থ্য ভালো যাচ্ছিল না। এক্স-রে রিপোর্টে যক্ষ্মা ধরা পড়ে। তখনকার দিনে যক্ষ্মা মরণব্যাধি। ডাক্তার তাঁকে স্বাস্থ্যনিবাসে গিয়ে বিশ্রামের পরামর্শ দেন। মন্টোর বড় বোনের আর্থিক সাহায্যে কাশ্মীরের স্বাস্থ্যনিবাস বতুতে চলে যান। তিন মাস অবস্থানের পর সুস্থ হয়ে মন্টো অমৃতসরে ফিরে আসেন।
প্রথম প্রেম
মন্টোর প্রথম প্রেম বেশ কৌতুকপ্রদ। ১৯৩৫ সালে মন্টোর বয়স তেইশ। তিনি বতুতে স্বাস্থ্যোদ্ধারের জন্য তিন মাস ছিলেন। সেখানে পাহাড়ি উপত্যকায় বেড়াতে যেতেন। সেখানে এক কাশ্মীরি মেষচালক কিশোরীর প্রেমে পড়েন। মন্টো অবশ্য এই প্রেমকে অপরিপক্ব বলে উল্লেখ করেন। কিন্তু সারা জীবন সেই প্রেমের কথা ভুলতে পারেননি ‘এক টুকরো মিছরি’ গল্পে মন্টো মেয়েটির নাম দিয়েছেন ‘বিত্ত’। এই গল্পে মন্টো ওই কিশোরীর সাথে তাঁর ঘনিষ্ঠতার কথা উল্লেখ করেছেন অত্যন্ত মনোগ্রাহী করে।
কর্মজীবন
১৯৩৬ সালে অমৃতসর থেকে মন্টো মুম্বাই চলে আসেন। সেখানে নাজির লুভিয়ানভির সাপ্তাহিক ‘মুসাব্বির’-এ মাত্র মাসিক ৪০ টাকা বেতনে সাংবাদিকতা শুরু করেন। তখন থেকে তাঁর কর্মজীবন শুরু। মুসাব্বির-এ তিনি চলচ্চিত্রের সমালোচনা লিখতেন। ৪ বছর পর মন্টো দিল্লি অলইন্ডিয়া রোডিওতে দেড়শ টাকা বেতনে চাকরি নেন। রেডিওর জন্য নিয়মিত কথিকা ও নাটক লিখতেন; যার ফলে তাঁর খ্যাতি সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। অলইন্ডিয়া রেডিওতে কর্মরত থাকাকালে প্রখ্যাত উর্দু লেখক কৃষণ চন্দর, উপেন্দ্রনাথ আশক এবং দেবেন্দ্র সত্যার্থী—প্রমুখের সাথে তাঁর বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। দেড় বছর পর অলইন্ডিয়া রেডিওর চাকরি ত্যাগ করে মুম্বাই চলে আসেন। সেখানে ফিলিমিস্তানে তিনশ টাকা বেতনে কাহিনিকার ও সংলাপ রচয়িতার চাকরি নেন। মন্টো বেশ কয়েকটি চলচ্চিত্রের কাহিনি রচনা করেন, তার মধ্যে ‘গালিব’ উল্লেখযোগ্য। মন্টো পাকিস্তান চলে যাওয়ার পর ‘গালিব’ ছবি নির্মিত হয় এবং রিলিজ হয়। ‘গালিব’ ছবিটি বক্স অফিস হিট করেছিল এবং ভারতীয় জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করে।
গাঞ্জে ফেরেস্তে
চলচ্চিত্রের কাহিনি লেখার সাথে জড়িত থাকাকালে মন্টো রিপোর্টাজ ও স্কেচধর্মী একটি অসাধারণ গ্রন্থ রচনা করেন। গ্রন্থটির নাম ‘গাঞ্জে ফেরেস্তে’। এই গ্রন্থ মন্টোর রচিত ভারত উপমহাদেশের চলচ্চিত্র ইতিহাসের দলিল বিশেষ। বাংলাদেশে গ্রন্থটি অনুবাদ করেন প্রয়াত মোস্তফা হারুন, প্রকাশক মুক্তধারা। সত্তরের দশকে (১৯৭৭) গ্রন্থটি প্রকাশিত হলে পাঠকমহলে সাড়া জাগায়। এই গ্রন্থে অশোক কুমার, নাসিম বানু, শ্যাম, নার্গিস, উর্দু লেখিকা ইসমত চুগতাই এবং সুরসম্রাজ্ঞী নূরজাহানসহ বাইশ জনের স্কেচধর্মী জীবনী লিপিবদ্ধ আছে। তিনি তাঁদের জীবন নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করেছেন।
বিয়ে
মন্টো মেসে থাকতেন। হোটেলে খেতেন আর মাটির প্রদীপ জ্বেলে লেখাপড়া করতেন। তাঁর মা অমৃতসর থেকে মুম্বাই এলেন, মন্টোর দুরবস্থা দেখে বিয়ের জন্য মেয়ে ঠিক করেন। কাশ্মীরি মেয়ে নাম সুফিয়া বেগম। সুফিয়া বেগমের চাচার কাছে মন্টো খোলাখুলি আলাপ করেন এবং বলেন, তাঁর চাকরি অস্থায়ী। ধার-কর্জ করে দিন চলে, তার মাঝে দৈনিক এক বোতল বিয়ার কিনতে হয়। মন্টোর তিনজন সত্ভাই ছিলেন ব্যারিস্টার ও উচ্চশিক্ষিত। ওদের সাথে সুফিয়ার পরিবারের পরিচয় ছিল। মন্টোর এই অবস্থা জেনেও সুফিয়ার চাচা ভাতিজিকে মন্টোর সাথে বিয়ে দিতে রাজি হন। বড় ভাইয়েরা কখনও মন্টোর খোঁজ-খবর নিতেন না।
বিয়ের সংবাদ জেনে মন্টোর মাথা ঘুরে যাওয়ার অবস্থা। মন্টোর সিনেমা কোম্পানির মালিক শেঠজিকে তাঁর অবস্থা জানালেন। শেঠজি দয়াপরবশ হয়ে মন্টোর স্ত্রীর জন্য শাড়ি, কাপড়, গয়না কিনে দিলেন। তাতে ব্যয় হয় পাঁচশ টাকা। ১৫-২০ জন লোক নিয়ে নিকাহ অনুষ্ঠান সারলেন মন্টো। দুই কামরার ফ্ল্যাট ভাড়া নিলেন ৩৫ টাকায়। বউ ঘরে তুলতে তাঁর দেড় বছর সময় লেগেছিল। মন্টোর তিন কন্যা নিঘাত, নুজহাত ও নুসরত। একটি ছেলে ছিল দেড় বছর বয়সে মারা যায়। মন্টোর সাথে উর্দু লেখিকা ইসমত চুগতাই, শ্যাম, অশোক কুমার এবং নূরজাহানের স্বামী পরিচালক শওকত রিজভির সাথে পারিবারিক ঘনিষ্ঠতা ছিল।
অনুবাদ
অনুবাদের মাধ্যমে মন্টোর সাহিত্যজগতে প্রবেশ। ভিক্টর হুগোর কয়েদির ডায়েরি উর্দুতে অনুবাদ করেন। তারপর অস্কার ওয়াইল্ডের বেয়ারা উর্দুতে অনুবাদ করেন। মন্টো রুশ গল্পও অনুবাদ করেছেন। তিনি ফরাসি, ইংরেজি ও রুশ সাহিত্য বিশেষত মোপাসাঁ, সমারসেট মম এবং ম্যাক্সিম গোর্কির রচনা পড়ে বিশেষভাবে প্রভাবিত হন।
অশ্লীলতার অভিযোগে মামলা:মন্টোর ‘ঠান্ডা গোস্ত’, ‘কালো সেলোয়ার’, ‘ধোঁয়া’ এবং ‘ওপর নিচে আউর দরমিয়ান’ গল্পে অশ্লীলতার অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে মামলা হয়। ‘খুলে দাও’ (খোল দো) গল্প প্রকাশের দায়ে উর্দু মাসিক সাহিত্য পত্রিকা ‘নাকুশ’-এর প্রকাশনা ছয় মাসের জন্য বন্ধ করে দেওয়া হয়। তখন এ পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন আহমদ নাদিম কাসমি। আর ‘ঠান্ডা গোস্ত’ প্রকাশের জন্য জরিমানা করা হয় ‘জাবেদ সাময়িকী’কে। ‘ওপর নিচে আউর দরমিয়ান’-এর ছাপা নিষিদ্ধ করা হলে কোনো পত্রিকাই পরবর্তী কিস্তিগুলো ছাপতে রাজি হয়নি।
রাজনীতি, ধর্ম আর ভৌগলিক সীমারেখা মানুষের তৈরি। তাই মন্টো ভারত বিভাগ মনেপ্রাণে মেনে নিতে পারেননি। তাই তিনি লিখেছেন, ‘টোরাটেকসিং’-এর মতো অসাধারণ গল্প। ভারত বিভাগের ওপর এমন গল্প আর দুই-একটি লেখা হয়েছে কি না সন্দেহ। অবশ্য মন্টো অশ্লীলতার অভিযোগ থেকে শেষপর্যন্ত বেকসুর খালাস পান।
পতিতাদের নিয়ে গল্প
মন্টো পতিতাদের জীবন নিয়ে লিখেছেন ‘কালো সেলোয়ার’, ‘জানকী’, ‘মানহানি’, ‘সয়দা’, ‘শোভা’ ও ‘খুশিয়া’র মতো অপূর্ব গল্প। তাঁর গল্পের বৈশিষ্ট্য হলো—তিনি পতিতাদের জীবনের বিভিন্ন দিক অত্যন্ত মানবিক সহানুভূতির সাথে উপস্থাপন করেছেন। মন্টো অন্ধকার গলির পতিতালয়ের সুগন্ধি, সুলতানা ও খুশিয়া প্রভৃতি চরিত্র সুন্দরভাবে উপস্থাপন করেছেন, যা পাঠকদের বিশেষভাবে আকৃষ্ট করে।
রাজনৈতিক গল্প
মন্টো রাজনৈতিক গল্পও লিখেছেন, যেমন স্বরাজের জন্য এবং নয়া কানুন। নয়া কানুন গল্পে মন্টো বৃটিশবিরোধী সুপ্ত বিদ্রোহ মানুষের মাঝে জাগিয়ে তোলার চেষ্টা করেছেন। গল্পের পরিণতিতে মঙ্গু কোচওয়ান এক ইংরেজকে বেধড়ক মারধর করে আর বলে, ‘ওসব দিন চলে গেছে। যা ইচ্ছা, তা করার দিন ফুরিয়ে গেছে। এখন নয়া কানুন (নতুন আইন) চালু হয়েছে।’ পুলিশ মঙ্গুকে ধরে হাজতে পাঠিয়ে দিলে তার চিত্কার কেউ আমলে নেয়নি।
পাকিস্তানে মন্টো
ভারত বিভাগের পর তাঁর স্ত্রী সুফিয়া তিন কন্যাসহ লাহোর চলে যান। পরে ১৯৪৮ সালে মন্টো মুম্বাই থেকে কাউকে না বলে লাহোর চলে আসেন। একমাত্র চিত্রনায়ক শ্যাম মুম্বাই স্টিমার ঘাটে এসে বিদায় জানান। ১৯৫৫ সালের ১৮ জানুয়ারি মাত্র ৪৩ বছর বয়সে মন্টো লাহোরে পরলোক গমন করেন। দীর্ঘ ২১ বছর তিনি সাহিত্যচর্চায় নিয়োজিত ছিলেন। এর মধ্যে দশ বছর তাকে অশ্লীলতার অভিযোগে মামলার জন্য আদালতে ঘোরাঘুরি করতে হয় এবং অনেক আর্থিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হন। তবে নীতির প্রশ্নে আপোস করেননি। পাকিস্তান সরকার তাঁকে কম্যুনিস্ট মনে করত। তাই পাকিস্তান রেডিওতে তাঁর প্রবেশ ছিল নিষিদ্ধ। মুম্বাইয়ের মতো লাহোরে চলচ্চিত্রের জন্য সংলাপ ও কাহিনি লেখার সুযোগ ছিল না। পাকিস্তান সরকারের সাথে মার্কিন সামরিক চুক্তির কড়া সমালোচক ছিলেন মন্টো। ফলে তাঁর বক্তৃতাদান ও লেখনীর ব্যাপারেও সরকারি নিষেধাজ্ঞা ছিল। আর্থিক অনটনে তাঁর জীবন ছিল দুর্বিষহ। একবার উর্দু লেখিকা ইসমত চুগতাইকে এক পত্রে তাঁকে মুম্বাই ফিরিয়ে নেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছিলেন। শেষপর্যন্ত এই আত্মমর্যাদাসম্পন্ন লেখক শ্বশুর বাড়িতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন। তাঁর স্বাস্থ্যের নিদারুণ অবনতি ঘটে। তবু মন্টো মদ্যপান ত্যাগ করেননি। মন্টো ভাগনে হামিদ জালাল (পাকিস্তান সরকারের প্রধান তথ্য অফিসার) ‘মন্টো মামার মৃত্যু’ শিরোনামের এক নিবন্ধে মদের প্রতি তাঁর দারুণ আসক্তির বর্ণনা দিয়েছেন। তিনি লিখেছেন, ‘মৃত্যুর প্রাক্কালে নাটকীয়ভাবে মন্টো মামা মদ পানের ইচ্ছা প্রকাশ করেন। রক্তবমি হচ্ছে, পেটে প্রচণ্ড ব্যথা। তিনি জানতেন, মদ তাঁর জন্য বিষ। তিনি মৃত্যুকেও সাহসের সাথে মোকাবিলা করেছেন। হাসপাতালে অ্যাম্বুলেন্সের জন্য সংবাদ দেওয়া হয়েছে। তিনি বললেন, “কোটের পকেটে সাড়ে তিন টাকা আছে, দুই প্যাক হুইস্কি আনাও।” তাঁর শেষ ইচ্ছা পূরণের জন্য হুইস্কি আনা হলো। এক চামচ হুইস্কি তাঁর মুখে দেওয়া হলো। কয়েক ফোঁটা গলায় ঢুকল আর অবশিষ্টটুকু মুখ থেকে বাইরে গড়িয়ে পড়ল। এর মাঝে সারা দেহে খিঁচুনি শুরু হয়েছে। তখন তিনি অজ্ঞান, অ্যাম্বুলেন্সে হাসপাতালে নেওয়ার পথেই মন্টো শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। সেদিন ছিল ১৮ জানুয়ারি, ১৯৫৫ সাল।’
মন্টো সম্পর্কে কৃষণ চন্দর লিখেছেন, ‘উর্দু সাহিত্যে অনেক ভালো গল্পকারের জন্ম হয়েছে; কিন্তু মন্টো দ্বিতীয়বার জন্ম নেবে না, আর তার স্থান কেউ পূরণ করতে পারবে না। মন্টোর বিদ্রোহ আধুনিক সভ্যতার পাপের বিরুদ্ধে। তার এই প্রচ্ছন্ন বিদ্রোহের মাঝে আমরা খুঁজে পাই মন্টোর ক্ষোভ, ঘৃণা আর ভালোবাসা।’
বেঁচে থাকতে মন্টো সমাজে যথাযথ মর্যাদা পাননি, এটাই ছিল তাঁর দুঃখ। মৃত্যুর কয়েক দিন আগে তিনি লিখেছিলেন, ‘দিনরাত পরিশ্রমের পর আমার দৈনন্দিন সাংসারিক ব্যয় নির্বাহের জন্য সামান্য উপার্জন করি। এই বেদনা আমার বুকে টন টন করে। আজ যদি আমি চোখ বুঁজি তাহলে আমার স্ত্রী ও তিনটি কন্যার দেখাশোনার দায়িত্ব কে নেবে?’ এই কথাগুলো একজন লেখকের সমাজের সংকীর্ণতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ছাড়া আর কিছু নয়।
মন্টোর গল্প ইংরেজিতে অনুবাদ করেছেন পাকিস্তানের বিশিষ্ট সাংবাদিক খালিদ হাসান, যার ফলে তাঁর পরিচিতি উপমহাদেশের সীমানা ছাড়িয়ে গেছে। মন্টো কালোত্তীর্ণ জনপ্রিয় লেখক। মন্টোর সবচেয়ে বড় পরিচয়, তিনি ছিলেন একজন অসাম্প্রদায়িক, উদার, প্রতিবাদী ও প্রগতিশীল লেখক। তিনি কোনো গোষ্ঠীভুক্ত লেখক ছিলেন না। তিনি যা বিশ্বাস করতেন, অকপটে লিখতেন। তাঁর রুক্ষ সত্য ভাষণগুলো উর্দু সাহিত্যের অমূল্য সম্পদ।
মন্টো অত্যন্ত বড় মাপের লেখক হিসেবে নিজেকে নিয়ে গর্ব করতেন; ছিলেনও তা-ই। তিনি কি জানতেন, মৃত্যুর অর্ধ শতাব্দী পরও তাঁর জনপ্রিয়তা অক্ষুণ্ন থাকবে? তিনি নিজের এপিটাফ নিজেই লিখে গেছেন। লিখেছেন, ‘এখানে সাদত হাসান মন্টোকে দাফন করা হয়েছে। তাঁর বুকের গভীরে গল্পের রহস্য এবং মর্মকথা এখানে শায়িত। যেন মাটির নিচে শুয়ে শুয়ে ভাবছে, সে বিরাট গল্পকার না কি ঈশ্বর।’ এটা তাঁর অহংকার নয়, বরং ঈশ্বরের থেকে বড় একজন কথাশিল্পীর আত্মবিশ্বাস।
১৯৩৬ সালে প্রেমচন্দের বাস্তবধর্মী লেখা গল্প ‘কাফন’ দিয়ে উর্দু ছোটগল্পের আধুনিক ধারার যাত্রা শুরু, মন্টোতে এসে তা পূর্ণতা পেয়েছে। সালমান রুশদি মন্টোকে আধুনিক ভারতীয় ছোটগল্পের অবিতর্কিত শ্রেষ্ঠ রূপকার বলে আখ্যায়িত করেছেন। রুশদির এই বক্তব্যের সাথে দ্বিমত পোষণের কোনো উপায় নেই।
১৮ জানুয়ারি ২০১৩, ৫ মাঘ ১৪১৯