‘কেউ আমাকে শিরোপা দেয়, কেউ দু’চোখে হাজার ছি ছি
তবুও আমার জন্ম-কবচ, ভালোবাসাকে ভালোবেসেছি
আমার কোন ভয় হয়না,
আমার ভালোবাসার কোন জন্ম হয়না, মৃত্যু হয়না’
[‘জন্ম হয়না, মৃত্যু হয়না’/‘আমার স্বপ্ন’, ১৩৭৯]
আধুনিক বাংলা কবিতাপ্রেমীদের কাছে এই শব্দবন্ধগুলি নেহাতই অপরিচিত নয়, শব্দবন্ধে নিহিত আছে এক অভিমানী প্রেমিকের স্পর্ধিত সংলাপ। ভালোবাসার পুঁজি সম্বল করে যে প্রেমিক জীবনের রুক্ষ পৃষ্টাকে নীল অক্ষর দিয়ে ভিজিয়ে দিতে পারেন তিনি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, সাহিত্যের বিবিধ ক্ষেত্রে যার কলম পৌঁছে গেছে অবলীলায়। ‘সেই সময়’, ‘প্রথম আলো’ কিংবা ‘কাকাবাবু-সন্তু’রা স্রষ্টা সুনীলকে খ্যাতির চূড়ায় পৌঁছে দিলেও সুনীল আসলে একজন পুরদস্তুর কবি। কবি হওয়ার কাজটা খুব সহজ নয়, তার জন্য প্রয়োজন গভীর অনুভূতির। শব্দের সাথে বন্ধুতা ও যথার্থ শিল্পবোধই একজন সফল কবির জন্ম দেয়, আর এ সমস্ত কিছুর মূলে রয়েছে জীবনমন্থিত দুঃখবোধ।
এখন প্রশ্ন হতে পারে দুঃখবোধই কেন? সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় তো দুঃখবাদী নন, পঞ্চাশের বহুবিখ্যাত কবিদের মত তিনিও বোহেমিয়ান, ভবঘুরে বরং ভোগবাদী গোত্রভূক্ত, তাহলে? আসলে প্রতিটা মানুষের জীবনে প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির এক অদ্ভুত খেলায় দুঃখ এসে জড় হয়, যদি সাধারন দুঃখও কবির মনে এক বোধের জন্ম দেয় তাকেই বলবো দুঃখবোধ। এই দুঃখবোধই সৃষ্টিশীল মানুষকে শিল্প সৃষ্টির প্রেরণা দেয়। রবীন্দ্রনাথের ভাষায় তা বেদনাময় চৈতন্য নামে পরিচিত, যদিও রবীন্দ্রনাথ একে দুঃখবাদ না বলে আনন্দবাদ বলতে চেয়েছেন। একটা বিষয় লক্ষ রাখা দরকার যে দুঃখবোধ আর দুঃখবাদ এক নয়, কেননা দুঃখবাদের ভেতর একপ্রকার নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় মেলে, সমস্ত কিছুকেই দুঃখের আগুনে পোড়াতে হয় আবার সবকিছুর উর্ধে সেই দুঃখকেই সত্য বলে মানতে হয়। যেমন যতীন্দ্রনাথ সেনগুপ্তের কবিতায় আমরা পাই —
‘মিথ্যা প্রকৃতি, মিথ্যা আনন্দ মিথ্যা রঙিন সুখ
সত্য, সত্য সহস্রগুণ সত্য জীবের দুখ!’
[‘দুঃখবাদী’/‘মরুশিখা’ ১৩৩৪]
দুঃখতো থাকবেই তাই বলে কবিতায় আনন্দ, উল্লাস কিংবা শান্তির কি কোন ভুমিকাই থাকবেনা? এর নিষ্পত্তি করা যায় রবীন্দ্রনাথের গান দিয়ে —
আছে দুঃখ, আছে মৃত্যু, বিরহ দহন লাগে,
তবুও শান্তি, তবু আনন্দ, তবু অনন্ত জাগে।
[‘পূজা’ পর্যায়]
শুধুমাত্র একটা শব্দ ‘তবু’ যেন যতীন্দ্রনাথের দুঃখবাদ থেকে দুঃখবোধকে আলাদা করে দিয়েছে। অর্থাৎ দুঃখ যখন কবিতার বিষয় বা উদ্দেশ্য হয়ে উঠবে তা দুঃখবাদ আবার দুঃখ যখন প্রেরণাস্বরূপ শিল্পসৃষ্টিতে সহায়তা করবে তা হবে দুঃখবোধ।
জীবনকে যেমন ভাবে দেখতে চাওয়া হয় তেমনটা না হলে দুঃখ আসে তেমনই কবি সুনীলের জীবনেও হয়তো দুঃখযাপনই তাঁর কবিসত্ত্বাকে অভিমানী করে তুলেছিল। টাউন স্কুলের শিক্ষক কালীপদ গঙ্গোপাধ্যায়ের বড় ছেলে সুনীল অভাবের তাড়নায় নবম শ্রেণীতে পড়তে পড়তেই প্রথম গৃহশিক্ষকতা শুরু করে। তখন থেকেই শুরু হয়ে যায় তাঁর কর্মজীবন, মূল্যবোধহীন এই কঠিন বাস্তবের মুখোমুখি হতে তাঁর প্রধান অবলম্বন হয়ে উঠেছিল কবিতা। তাঁর জীবনলব্ধ দুঃখবোধের অভিজ্ঞতা কিভাবে শিল্প হয়ে উঠল তাই এখানে লক্ষণীয়। সুনীলের কথায়—
“ধনী পরিবারের কেউ মারা গেলে তার শবযাত্রায় যেমন একদল লোক পিছনে পিছনে হরিবোল ধ্বনি দিত, তেমনই সেই দলের একজন ধামা থেকে মুঠো মুঠো খই ছড়িয়ে ছড়িয়ে যেত,তার মধ্যে খুচরো পয়সা। যত বেশি বড়লোক তত পয়সাও বেশি, সেই পয়সা কুড়োবার জন্য হন্যে হয়ে পড়ত একদল বাচ্চা ছেলেমেয়ে। ফুটপাতের যারা স্থায়ী বাসিন্দা, তাদের বলে কাঙালি, বস্তির বাচ্চারা তাদের চেয়ে একটু উঁচুতে, এই দু’দলেরই অধিকার ছিল পয়সা কুড়োবার। আমরা তো ভদ্রলোকের বাড়ির ছেলে, আমাদের ওসব করতে নেই। লোভ যে হতনা তা নয়, রাস্তা দিয়ে সে রকম কোনো শবযাত্রার মিছিল যাচ্ছে, গড়ানো পয়সাগুলোর দিকে করুণ চোখে তাকিয়ে থেকেছি, অন্য ছেলেরা এসে টপাটপ কুড়িয়ে নিয়েছে”। [‘অর্ধেক জীবন’ পৃঃ-২২]
নিঃসন্দেহে করুণ দৃশ্য, ধনী-দরিদ্র বা সমাজ বৈষম্য নাবালক সুনীলের মনের মধ্যে প্রভাব ফেলেছিল এই ধরনের বৈষম্য সমস্ত মানুষের সাথে মেশবার পথে বাধা সৃষ্টি করে, তাই ছেলেবেলা থেকেই একাকীত্ব তাকে পেয়ে বসেছিল—
“একটাও রয়্যাল গুলি কিনতে পারিনি কখনো
লাঠি-লজেন্স দেখিয়ে দেখিয়ে চুষেছে লস্করবাড়ির ছেলেরা
ভিখারীর মতন চৌধুরীদের গেটে দাঁড়িয়ে দেখেছি
ভিতরে রাস-উৎসব”
[‘কেউ কথা রাখেনি’/ ‘বন্দী জেগে আছো’ ১৩৭৫]
এই উপলব্ধি আসলে কবির এরকম বহু অভিজ্ঞতা থেকে পাওয়া, স্বাধীনতা প্রাপ্তির পরও ভারতবাসী দুঃস্বপ্নের প্রহর গুনছিল, আশাভঙ্গের বেদনাই গভীরভাবে মনে করিয়ে দেয় কেউ কথা রাখেনা। পরিণত দর্শনের এই কবিতায় ভালোভাবে খুঁজলে স্পর্শ করা যাবে সুনীলের শৈশবের স্মৃতি।
সুনীলের কবিতাযাপনের সূত্রপাত হয়েছিল বাবা কালীপদ গঙ্গোপাধ্যায়ের হাত ধরে। ম্যাট্রিক পরীক্ষার পর বাবার নির্দেশে প্রতিদিন টেনিসনের কবিতার অনুবাদ করতে হত, প্রথমদিকে বাবা কালীপদবাবু অনুবাদ মিলিয়ে দেখতেন কিন্তু শেষের দিকে সুনীল বুঝতে পেরেছিল বাবা আর অনুবাদ মিলিয়ে দেখছেন না, সেই সুযোগে তিনি টেনিসনের অনুবাদের বদলে নিজের লেখা কবিতা চালান করে দিতেন বাবার কাছে। এইভাবে সুনীলের কবি হওয়ার প্রস্তুতি শুরু হয়ে যায়, ফলস্বরূপ ১৯৫১ সালে তাঁর প্রথম কবিতা ‘একটি চিঠি’ ‘দেশ’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয় এবং ১৩৬৭ বঙ্গাব্দে তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘একা এবং কয়েকজন’ প্রকাশিত হয়।
সুনীলের কবিতাযাপনের বেশ কয়েকটি অধ্যায় আছে, যেমন সময়যন্ত্রণা, প্রেম-বিরহ, একাকীত্ব এবং কৃত্তিবাস।সুনীলের বয়স যখন সাতাশ বছর তখন তাঁর বাবা মারা যান, সুনীল প্রত্যক্ষ করে এক দুর্বিষহ জীবন —
“আমি কীরকম ভাবে বেঁচে আছি তুই দেখে যা নিখিলেশ
এই কি মানুষজন্ম? নাকি শেষ
পুরোহিত-কঙ্কালের পাশা খেলা! প্রতি সন্ধেবেলা
আমার বুকের মধ্যে হাওয়া ঘুরে ওঠে, হৃদয়কে অবহেলা করে রক্ত”
[‘আমি কীরকম ভাবে বেঁচে আছি’, ১৩৭২]
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় চাকরি অপেক্ষা সাহিত্যকেই মূল জীবিকা হিসেবে গ্রহন করলেন, বিখ্যাত কবি কিংবা সাহিত্যিক হবার বাসনা তাঁর ছিলনা শুধুমাত্র অর্থের জোগান দিতে তাঁকে জন্ম দিতে হল একের পর এক উপন্যাস, ছোটগল্প ও গদ্যের। তাঁর রচিত কথাসাহিত্যগুলি কালজয়ী হলেও তিনি কবিতা রচনাতেই সবচেয়ে বেশি আনন্দ পেতেন। কবিতার প্রতি ভালোবাসাই তাঁকে ‘কৃত্তিবাস’ গোষ্ঠীর অন্যতম মুখপাত্র করে তুলেছিল। পঞ্চাশের দশক বাংলা কবিতা যে স্বেচ্ছাচার, বোহেমিয়ানিজম, যৌনতা, আমদানি করেছিল তার অধিকাংশই তাঁদের জীবনযাপনের অঙ্গ। বাগবাজার, শ্যামবাজার, গঙ্গার ঘাট, শ্মশান, খালাসিটোলার মদ দোকান, সোনাগাছির মত জায়গায় ছিল তাঁদের অবাধ যাতায়াত, এমনকী গণিকাদের ঘর ভাড়া নিয়ে চলত মদ্যপান ও বিশুদ্ধ কবিতাচর্চা। সুনীল গণিকাকেও তার কবিতায় চরিত্র হিসেবে ব্যবহার করেছেন। ‘না পাঠানো চিঠির’ কথা মনে পড়ে, যেখানে কবি এক গরিব মেয়ের পতিতা হবার গল্প শোনাচ্ছেন। সে তার মায়ের উদ্দেশ্যে পত্র লিখছে যদিও সে জানে এ চিঠি কোনদিনই তার গন্তব্যে পৌঁছবেনা। নাটকীয় ভাবে কবি আমাদের সামাজিক দুঃখকে স্পর্শ করেছেন। সেই গভীর মর্মস্পর্শী চিত্রনাট্যের কিছু অংশ —
“বাড়িতে কন্যা সন্তান থাকলে কত জ্বালা
দু’বেলা ভাত দাও রে, শাড়ি দাও রে, বিয়ের জোগাড় করো রে
হাবলু, মিজান, শ্রীধরদের থাবা থেকে মেয়েকে বাঁচাও রে
আমি কি বুঝিনা, সব বুঝি
কেন আমায় বিক্রি করে দিলে, তাও বুঝি
সেই জন্যই তো আমার কোন রাগ নেই, অভিমান নেই”
[‘না-পাঠানো চিঠি’/‘সেই মুহূর্তে নীরা, ১৯৯৭’]
সুনীলের কবিতার সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ন অধ্যায় প্রেম আসলে প্রেম ছাড়া সুনীলের কবিতা ভাবাই যায়না। সুনীল ছিলেন একজন অত্যন্ত রক্ষণশীল পরিবারের সন্তান, রক্ষণশীলতা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে প্রেসিডেন্সি কলেজে ছেলে-মেয়ে একসাথে পড়ে এই অজুহাতে তাঁর সেখানে ভর্তি হওয়া পর্যন্ত হলনা। বাবার মৃত্যুর পর সুনীল প্রায় সবধরনের নেতিবাচক রক্ষণশীলতা ত্যাগ করেছিলেন। কবির জীবন ও কবিতায় অপর্না, স্বাতী, অরুন্ধতীর মত নাম এসেছে কিন্তু সুনীল বেছে নিলেন একটি নাম নীরা, নারী শব্দ থেকেই নীরার জন্ম, এবং সম্ভবত নীরা কোন একজন নারী নয়। বাস্তব জগৎ থেকে উঠে আসা নারীদের প্রতিনিধি ও সুনীলের কল্পলোকের তিলোত্তমা। তবে সুনীলের প্রেমের কবিতায় মিলন, বা যৌনতার থেকে বিরহের কাতরতা যেন সবচেয়ে বেশি বিশ্বাসযোগ্য হয়ে উঠেছে। যেমন—
“বিষন্ন আলোয় এই বাংলাদেশ…
এ আমারই সাড়ে-তিন হাত ভূমি
যদি নির্বাসন দাও,আমি ওষ্ঠে অঙ্গুরি ছোঁয়াবো
আমি বিষপান করে মরে যাবো”
[‘যদি নির্বাসন দাও’/‘আমার স্বপ্ন’, ১৩৭৯]
একটা অদ্ভুত বিষয় হল, যে মানুষ একসময় কোন কিছুর পরোয়া না করে সমস্ত ভয় ও সংস্কারকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়েছেন তিনিই মৃত্যু এবং প্রেমহীনতা নিয়ে ভাবিত। প্রেম কী শুধুই তাঁকে খাতাভরা স্মৃতি আর বিষাদ দিয়েছিল? শান্তির আশ্রয় দেয়নি? কবির এক সময়ের প্রেমিকা বিডন স্ট্রীটের অপর্না নাম্নী মেয়েটির কথা প্রসঙ্গে সুনীল জানাচ্ছেন —
“গঙ্গার ধারে সান্ধ্য নিরালায় আমার হাত চেপে ধরে অপর্না বলেছিল যে, তার বিবাহে নিশ্চিত আমার নিমন্ত্রণ হবে, আমি যেন সেদিন না যাই, কিছুতেই যাব না কথা দিতে হবে তার সঙ্গে আর সারাজীবনেও দেখা হবেনা, এ কথাও দিয়েছিলাম”। [‘অর্ধেক জীবন’ পৃঃ-১৯০]
আক্ষেপের চোরাবালি তাঁকে গ্রাস করেছিল। সুনীলের অভাবের সংসারে অপর্নার কবি গৃহিনী হয়ে ওঠা হয়নি। নিজের ব্যর্থ প্রেম থেকে তিনি অহংকার সংগ্রহ করেন এবং খুঁজে পান কবিতার রসদ।
তবু স্মৃতিও তো ক্লান্ত হয় বিশ্রাম চায় তখন সে বলে ওঠে —
“এখন আমার ওষ্ঠে লাগেনা কোন প্রিয় স্বাদ
এমনকি নারী এমনকি নারী এমনকি নারী
এমনকি সুরা এমনকি ভাষা
মন ভালো নেই মন ভালো নেই মন ভালো নেই”
[‘মন ভালো নেই’, ১৩৮৩]
মনের এই স্বাদ-হীনতা থেকে পালাতে সকলেই চায়, কিন্তু সকলে পারেনা যেমন শক্তি পারতেন সুনীল পেরে ওঠেননি, কারন যখনই পালাতে চেয়েছেন তখনই চোখের সামনে ভেসে এসেছে মা, বাবা ভাই-বোনদের মুখ আর দায়িত্ববোধ।
শৈশব বা কৈশোর তাঁর কাছে ভালোবাসা হারানোর মতই দুঃখজনক, যার সুবাস কবি পান কিন্তু তার কাছে ফিরে যাওয়া তো সম্ভব নয়, তাই আক্ষেপের সুরে কবি বলেন —
“অনেক মানুষ সারাজীবন জানলোই না
সত্যি সত্যি সে কি হারিয়েছে”
[‘যার যা হারিয়ে গেছে’]
সারাজীবন পাওয়া না পাওয়ার হিসেব করতে করতে মানুষ বার্ধক্যে এসে পৌঁছয়, কেউ ধর্মে মন দেন কেউ ছুটির ছুতোয় জীবন অপচয় করেন, সুনীলের চিরসখা ছিল কবিতা।নিজের সফলতা ব্যর্থতার উত্তর খোঁজেন কবিতাতেই। কোন শক্ত ম্যাজিকে ছেলেরা বুড়ো হয়ে যায় তা তাকে সংশয়াচ্ছন্ন করে, মরবার আগে পর্যন্ত তিনি পদ্য লিখে যেতে চান। তিনি বিশ্বাস করেন জীবন-মৃত্যু-রাগ-অভিমান সবটা একটাই কবিতার বিভিন্ন পর্ব —
“একটাই তো কবিতা
লিখতে হবে, লিখে যাচ্ছি সারা জীবন ধরে
আকাশে একটা রক্তের দাগ, সে আমার কবিতা নয়
আমার রাগী মুহূর্ত আমার ব্যস্ত মুহূর্ত কবিতা থেকে বহুদূ্রে সরে যায়
সে দুঃখের যমজ, সে তার সহোদরকে চেনেনা”।
[‘একটাই তো কবিতা’/‘স্বর্গ নগরীর চাবি’, ১৩৮৭]
সুনীল জানিয়েছিলেন তাঁর কবিতার অনুপ্রেরণা ছিলেন বিষ্ণু দে কিন্তু আমরা বিষ্ণু দের কবিতার সাথে তার যোগাযোগ বড় একটা দেখিনা, বরং বুদ্ধদেব বসুর কবিতার সঙ্গে মিল কখনো কখনো লক্ষ করা যায়। যাই হোক কবিতাময় এই মানুষটির কবিতায় কোনো রক্তের দাগ নেই, বিষ্ণু দের মত স্লোগানের উচ্চকন্ঠ নেই, ব্যাস্ততার লেশমাত্র নেই, আছে ‘দুঃখের যমজ’ শব্দবন্ধ যা এই ক্ষোভময় বেঁচে থাকার মধ্যে এক টুকরো শান্তি দিতে পারে।
সুনীল একদিকে যেমন জীবনবোধে ভাবুক অন্যদিকে শিল্পবোধে আক্রান্ত এই দুটি উপাদানই আমাদের দুঃখবোধের কাছে পৌঁছে দেয়।তাঁর জীবনটাই যেন কবিতার খাতা কবিতার জন্যই তাঁর জন্ম। দুটি উদাহরন দেওয়া যাক যেখানে ব্যক্তি সুনীল ও কবি সুনীলকে আলাদা খুঁজে বের করা কঠিন হয়ে উঠবে —
প্রথমত,
“নবীন কিশোর, তোমাকে দিলাম ভুবনডাঙার মেঘলা আকাশ
তোমাকে দিলাম বোতামবিহীন ছেঁড়া শার্ট আর ফুসফুস ভরা হাসি
দুপুর রৌদ্রে পায়ে পায়ে ঘোরা, রাত্রির মাঠে চিৎ হয়ে শুয়ে থাকা
এ সব এখন তোমারই, তোমার হাত ভরে নাও আমার অবেলা
আমার দুঃখবিহীন দুঃখ, ক্রোধ শিহরন”
[‘উত্তরাধিকার’/‘বন্দী জেগে আছো’, ১৩৭৫]]
দ্বিতীয়ত,
“শুধু কবিতার জন্য তুমি নারী, শুধু
কবিতার জন্য এত রক্তপাত, মেঘে গাঙ্গেয় প্রপাত
শুধু কবিতার জন্য আরো দীর্ঘদিন বেঁচে থাকতে লোভ হয়
মানুষের মত ক্ষোভময় বেঁচে থাকা, শুধু কবিতার জন্য
আমি অমরত্ব তাচ্ছিল্য করেছি”
[‘শুধু কবিতার জন্য’/‘আমি কীরকম ভাবে বেঁচে আছি’,১৩৭২]
দুপুর রৌদ্রে উদ্দেশ্যবিহীন ঘুরে বেড়ানো বা রাত্রের মাঠে চিৎ হয়ে শুয়ে থাকার মধ্যে প্রতিফলিত হয় সুনীলের রোজনামচা, ছেঁড়াশার্টের মধ্যে রয়েছে দারিদ্র্য জয়ের আনন্দ, তাঁর সমস্ত দুঃখ, ক্রোধ আলো তুলে দিতে চান নবীন কবিতাপ্রেমীদের কিশোরদের কাছে। দুঃখই তাঁকে দিয়েছে দুঃখের সাথে লড়াই করার শক্তি সেই স্পর্ধাই তাঁকে বেঁচে থাকবার প্রেরণা দেয়। দুঃখবোধের উচ্চারণই তো তাঁকে বোধির কাছে পৌঁছে দেয়। সুনীলের জীবনমন্থিত দুঃখবোধই তাঁর কবিতাযাপনের আশ্রয়, নাহলে শুধু কবিতার জন্য অমরত্ব তাচ্ছিল্য করা যায়না। শেষমেশ সুনীলের জীবন ও কবিতা যখন মিলেমিশে এক হয়ে যায় তখনও মনের মধ্যে একটা প্রশ্নই বারবার উঁকি দেয় —
“কী লেখে সে কবিতা? না কবিতা রচনা করে তাকে?”
[‘কবিতা মূর্তিমতী’/‘মন ভালো নেই’, ১৩৮৩]
সহায়ক গ্রন্থ :
১। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়; ‘অর্ধেক জীবন’; আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড; একাদশ মুদ্রণ ২০১৭।
২। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ; ‘শ্রেষ্ঠ কবিতা’; দে’জ পাবলিশিং; উনত্রিংশ সংস্করণ আগস্ট ২০১৬।
৩। সুব্রত গঙ্গোপাধ্যায়; ‘ছেঁড়া কাগজের ভিজে অক্ষরঃ সুনীলের কবিতা’, ‘কবিতা পরম্পরা তিরিশ থেকে শূন্য দশক’; প্রতিভাস; প্রথম প্রকাশ জানুয়ারি ২০২২।
৪। সুবল সামন্ত (সম্পাদিত); ‘কবিতার সুখ দুঃখঃ চির অতৃপ্ত সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়’, ‘বাংলা কবিতাঃ সৃষ্টি ও স্রষ্টা’ (২য় খণ্ড); এবং মুশায়েরা; দ্বিতীয় সংস্করণ আগস্ট ২০১৮।
৫। শাওন নন্দী; ‘কবি সুনীল এবং উত্তরাধিকার’, ‘কবিতার দিগন্ত’; এবং মুশায়েরা; প্রথম প্রকাশ ডিসেম্বর ২০১৮।
৬। যতীন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত; ‘মরুশিখা’; প্রজ্ঞাবিকাশ; দ্বিতীয় সংস্করণ; জানুয়ারি ২০১৬।