আম্ফানের তাণ্ডবে তছনছ হয়ে যাওয়ার ঠিক এক বছরের মাথায় গত ২৬ মে সাইক্লোন ইয়াসের ধাক্কায় প্রায় তলিয়ে যাওয়ার জোগার হয়েছিল কাকদ্বীপের বিস্তীর্ণ অঞ্চল। ঘূর্ণিঝড় ইয়াস ও পূর্ণিমার ভরা কোটালে মুড়িগঙ্গা নদীর বাঁধ ভেঙে, বাঁধ উপচে প্লাবিত হয় কসতলা, কচুবেড়িয়া, বকুলতলা, ক্ষীরকূলতলা, শিবপুর গ্রাম। কসতলা গ্রামের জমা জল ধীরে ধীরে সরে গেলেও এখনও জলমগ্ন অবস্থায় রয়েছে কচুবেড়িয়া, বকুলতলা, শিবপুর, ক্ষীরকূলতলা গ্রাম। এখানকার মানুষজন তাদের ধ্বসে পড়া ঘরদোর আর ছিন্নভিন্ন হয়ে যাওয়া জীবন কোনওমতে আঁকড়ে ধরে রাখার মরিয়া চেষ্টা করছেন।
বঙ্গোপসাগরে ঘূর্ণায়মান ঝড়ের বেগে সেদিন দুপুরের পর থেকেই মুড়িগঙ্গা নদীর বুকে শুরু হয় দৈত্যাকার ঢেউয়ের দাপট, যার এক একটা ছিল সাধারণ ঢেউয়ের চেয়ে ১-২ মিটার উঁচু। নদীবাঁধ ভেঙে নোনাজল ঢুকে পড়ে গোটা এলাকায়, এক লহমায় তছনছ হয়ে যায় বাড়িঘর জমি-জিরেত।
ঠিক এক বছর আগের কথা, ২০২০ সালের ২০মে সাইক্লোন আম্ফান এসে লণ্ডভণ্ড করে দিয়েছিল দক্ষিণ ২৪ পরগণা-সুন্দরবনকে। তার আগে ২০১৯ সালে বুলবুল ও ২০০৯-এ আয়লা ঘূর্ণিঝড় গভীর ক্ষত রেখে গেছে এই গোটা এলাকার শরীরে। সব মিলিয়ে প্রায় ৩৫ শতাংশ জমিজমা প্রবলভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় ওইসব প্রাকৃতিক দুর্যোগে। বহু জায়গার মাটিতে লবণের পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় সেখানে এখনও চাষবাস আগের মতো হচ্ছিল না।
প্রসঙ্গত; বঙ্গোপসাগরে ঘূর্ণিঝড়ের সংখ্যা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা এর পিছনে দুটি ব্যাখ্যা দিচ্ছেন। প্রথমত; সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা বৃদ্ধি, যার অন্যতম প্রধান সূচক হল বিশ্বজুড়ে চলা উষ্ণায়ন এবং দ্বিতীয় কারণ হল সমুদ্রের কাছাকাছি এলাকার গড় তাপমাত্রা ক্রমশ বেড়ে যাওয়া। ২০০৬ সালে প্রকাশিত ভারতের আবহাওয়া দফতরের একটি গবেষণা অনুযায়ী মে, অক্টোবর এবং নভেম্বর মাস জুড়ে এর প্রভাবে নিম্নচাপ থেকে অতি প্রবল ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টি হওয়ার প্রবণতা বিশাল পরিমাণে বেড়ে গেছে।
উল্লেখ্য, গত বৃহস্পতিবার সকালে মুড়িগঙ্গা নদীর জল আচমকা ২০ ফুট উপর পর্যন্ত উঠে যায়। প্রায় আধ ঘণ্টা পর্যন্ত স্থায়ী হয় সেই ঘটনাটি। স্থানীয় মানুষদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, তাঁরা তাদের বাপ ঠাকুর্দার মুখেও এই ধরনের ঘটনার কথা কখনও শোনেননি। নদীর জলে তৈরি হওয়া এমন ঘূর্ণন যদিও স্থলভাগে ঢুকতে পারেনি, তার আগেই সেই জলস্তম্ভ মিলিয়ে যায় কিন্তু তার পরপরই শুরু হয় বৃষ্টি।

নদীর জলে তৈরি হওয়া জলস্তম্ভ দেখে স্বভাবতই আতঙ্কিত হয়ে পড়েন স্থানীয় বাসিন্দারা। আবহাওয়া দফতর ওই ঘটনার ব্যাখ্যায় জানিয়েছে, উত্তর বঙ্গোপসাগরে নিম্নচাপ তৈরির অনুকূল পরিস্থিতি তৈরি হওয়ায় এবং নদীর তীর সাগরের কাছাকাছি হওয়ায় এমন ঘটনা ঘটেছে।এরপরই প্রশাসন লাল সতর্কতা জারি করে এবং জলোচ্ছ্বাসের সম্ভাবনা থাকায় মাইকে প্রচার করে উপকূলবর্তী এলাকার বাসিন্দাদের নিরাপদ দূরত্বে সরে যেতে বলে। প্রশাসনিক উদ্যোগে সাগর এলাকার ঘোড়ামারা থেকে ইতিমধ্যে কয়েক হাজার মানুষকে সরিয়ে আনা হয়েছে। সাগরে মাছ ধরতে যাওয়া জেলেদেরও ফিরে আসতে বলা হয়।
এমনিতেই ঘূর্ণিঝড় ইয়াসের প্রভাবে মুড়িগঙ্গা নদীর বাঁধ ভেঙে প্লাবিত হয়েছে দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলার বিস্তীর্ণ এলাকা। কাকদ্বীপের বহু জায়গায় এখনও জল রয়েছে। সাগরের কচুবেড়িয়া, সাউঘেরি প্রভৃতি অঞ্চলে পূর্ণিমার ভরা কোটাল তারপর ইয়াসের তাণ্ডবে ঢুকে পড়া নদীর জল রয়েছে গ্রামে গ্রামে। গ্রামবাসীদের কথা অনুযায়ী, গঙ্গাসাগরের মুড়িগঙ্গা নদীর বাঁধ উপচে জল ঢুকছে গ্রামে। মুড়িগঙ্গা নদীর জল ক্রমশ বৃদ্ধি পাওয়ায় বাঁধ উপচে এলাকায় জল ঢুকছে। পূর্ণিমা এবং অতি প্রবল ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে জলোচ্ছ্বাস বৃদ্ধি পেলে, নোনা জলে এলাকা প্লাবিত হয়েছে।
ইতিমধ্যেই সুন্দরবন উন্নয়ন মন্ত্রী বঙ্কিমচন্দ্র হাজরা, কচুবেড়িয়া বাঁধ মেরামতির জন্য উদ্যোগী হয়েছেন। তার নির্দেশে ইরিগেশন ডিপার্টমেন্টের একটি জেসিবি এবং স্থানীয় মানুষরা যুদ্ধকালীন তৎপরতায় মুড়িগঙ্গা ও শীলপাড়ার কচুবেড়িয়া নদী বাঁধ মেরামতির কাজ শুরু করেন। অন্যদিকে কিছু মানুষের অভিযোগ, নদী বাঁধ সম্পূর্ণ না হওয়ায় জল ঢুকছে গ্রামে, যে কারণে গঙ্গাসাগরের মুড়িগঙ্গা ও শীলপাড়া গ্রামের মানুষরা কয়েকদিন বিক্ষোভ দেখায়।

সুন্দরবন উন্নয়ন মন্ত্রী বঙ্কিম হাজরার সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, যুদ্ধকালীন তৎপরতায় চলছে সুন্দরবন-সহ উপকূলবর্তী এলাকায় নদী বাঁধ মেরামতির কাজ। সুন্দরবন-সহ উপকূলবর্তী এলাকায় আছে প্রায় ১৮০ কিমি নদী বাঁধ। ১১ তারিখ কোটাল পেরোলেও প্রশাসনকে চিন্তায় রেখেছে আগামী ২৬ মে-র কোটাল। ফলে কোথাও কোনও ধরণের ফাঁক যাতে না থাকে সেই কাজ অত্যন্ত তৎপরতার সঙ্গে শুরু করে দিয়েছে সেচ দফতর।
রাজ্য সেচ দফতর সূত্রে খবর, প্রায় ১৫২ কিমি নদী বাঁধ মেরামতের কাজ শেষ করে ফেলেছে জেলা প্রশাসন। আগামী কয়েকদিনের মধ্যেই বাকি কাজ শেষ হয়ে যাবে। ইতিমধ্যেই নবান্ন থেকে সতর্ক করা হয়েছে আগামী ২৬ তারিখের কোটাল নিয়ে। শনিবারই দিঘা থেকে বকখালি পর্যন্ত ভরা কোটালের সময় সমুদ্রের জলস্তর ১৬.৬৩ ফুট হয়েছিল। আগামী ২৬ মে সেই স্তর আরও বাড়বে বলে জানাচ্ছে আবহাওয়া দফতর।
বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, আগামী ২৬ মে যে কোটাল আসবে তার মাত্রা অনেক বেশি হবে। ফলে একাধিক বাঁধ টপকে গ্রামে জল ঢুকবে। ফলে ঘূর্ণিঝড় ইয়াসের কারণে যে সব নদী বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল সেই সব জায়গা ভাল করে মেরামতি না হলে আগামী কোটালে ফের জল ঢুকে গ্রামগুলি প্লাবিত হবে৷ এখন চিন্তা ২৬ তারিখের কোটাল নিয়ে।
ছবি : অভিষেক সামন্ত
সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা বৃদ্ধি হওয়ায় বঙ্গোপসাগরে ঘূর্ণিঝড়ের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। প্রকৃতি ও পরিবেশ নিয়ে ছেলেখেলা না থামালে এই দুর্যোগ আরও বাড়বে আর এ ধরণের পরিণতি ঘটবেই।