কবি ও প্রকাশক ধীমান ব্রহ্মচারীর ‘শহর ও কবিয়াল’ কাব্যগ্রন্থটি সম্প্রতি পড়লাম। তাই এই বইটি নিয়ে কিছু লেখার লোভও সামলাতে পারলাম না। তাই লিখেও ফেললাম দীর্ঘ এক আলোচনা। লেখা ভালো বা খারাপ সে সমালোচনা আপনারা করলেও করতে পারেন। এবার সরাসরি আলোচনা শুরু করব কবির একটি লেখা দিয়েই —
“শহর ও কবিয়াল কোন কাল্পনিকতা নয়। দীর্ঘদিন শহরের মধ্যে থেকে শহুরেপনা মেখে মেখে দিন কাটিয়ে ফেলার একটা দীর্ঘ কাহিনী। যে ইতিহাস গ্রাম থেকেই উঠে আসতে পারত, তা এল সময়ের বাঁকে শহর থেকে। দেখার দৃষ্টিভঙ্গী কেমন সরল থেকে পরিণতি প্রাপ্ত হল।”
২৯টি কবিতায় সাজানো তিন ফর্মার এই কাব্যগ্রন্থটি। প্রথম কবিতার নাম ‘শহর ও কবিয়াল’। এই কবিতার নাম অনুসারেই কবি এই কাব্যগ্রন্থের নামাঙ্কন করেছেন ‘শহর ও কবিয়াল’। দীর্ঘদিন শহরেই আছেন কবি। তিনি খুব কাছ থেকে দেখেছেন শহরটাকে, যে শহরটা অনেক নীরব ইতিহাসের সাক্ষী, অনেক রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের সাক্ষ্য বহন করে চলেছে।
“শহরের ওপর শহর তার ওপর শহর,/ বিচিত্র শহরের আনাচে-কানাচে জমে আছে সংসার/ ভিটেহীন,ঘরহীন মানুষের শহর।”
করুণাহীন, নির্দয় শহরটাকে দেখতে দেখতে, তার অলিতে গলিতে ঘুরতে ঘুরতে দারুন একটা অভিজ্ঞতার জন্ম হয়েছে কবির। তাই-ই ফুটে উঠেছে কবিতাগুলিতে। শহরের বুক জুড়ে থাকে মানুষের কোলাহল, কোথাও বয়ে যায় একরাশ উৎসবের আমেজ, কালো রাস্তা জুড়ে বাস-ট্রাম, গাড়ি-ঘোড়া, কোথাও উজ্জ্বল আলোর ফোয়ারায় মেতে ওঠে সারি সারি মানুষ হেঁটে আসে দূর দূরান্ত থেকে। প্রতিদিনের রুটি, প্রতিদিনের পূর্ণিমার চাঁদ, চারিদিকে এত কোলাহল সত্ত্বেও শীতের রাতে নিঃশব্দে পাহারা দেয় ফুটপাত জুড়ে থাকা তীব্র চিৎকার। কারণ সেখানে জীবন উদ্বাস্তু নামে পরিচিত।ব্যস্ত মানুষের ভিড়, প্রতিদিনের রুটির রং যেন সেই সাদা।বিরাট শহরের ফুটপাত ধরে কবি হাঁটেন আর হেঁটে চলে তার সঙ্গে তার অস্তিত্ব। অন্ধকার সরে সরে যায় সময়ের বাঁকে, রাস্তা জুড়ে পড়ে থাকে শুধু ফ্ল্যাগ আর পোস্টার এর ছেঁড়া কাগজ।এমনই শহরটা সম্পর্কে এক বাস্তব দৃষ্টিভঙ্গী উঠে এসেছে কবিতাগুলিতে। এই কাব্যগ্রন্থের পাণ্ডুলিপি পড়ে কবির শিক্ষক মঞ্জুভাষ মিত্র লিখছেন —
“শহর ও কবিয়াল কাব্যগ্রন্থে কবির আত্মজীবনী, তার অন্তরের ইতিহাস লিপিবদ্ধ হয়েছে। এখানে রয়েছে দুই সংস্কৃতির দ্বন্দ্ব। গ্রামের ছেলে গ্রাম্য কবিয়াল।
জীবিকার খোঁজে গ্রাম ছেড়ে শহরে এসে কী করে শহুরে কবি হয়েছে সেই বিবর্তনের ইতিহাস বড়ো বেদনা এবং ভালোবাসার সঙ্গে বর্ণিত।”
জীবিকার সন্ধানে গ্রাম ছেড়ে শহরে আসতে হয় অনেককেই।জীবন সংগ্রামে টিকে থাকা তাদের কাছে হয়ে ওঠে একটা চ্যালেঞ্জ।
“ছেঁড়া হোর্ডিং কোনোরকমে টিকে লোহার পাটাতনে/ভর দুপুর কিংবা ঘোর রাত্রি/একান্তে বিজ্ঞাপন শহর পাহারায়-/ সব কাজের সাক্ষী হয়ে দীর্ঘ সময় পার/ একটা করে মুহূর্ত পার হয়ে এবার বছর শেষের পালা-/ ট্রাফিকের হাত কাহিনি,/ নয়তো ফুটপাতের অন্ধকারে ডুবে থাকা/ আশ্চর্য রোমান্স…”
মানুষ বড় ব্যস্ত। আমরা ছুটছি টাকার পিছনে।কারোর দিকে তাকাবার অবসর পর্যন্ত নেই। তাইতো অন্ধকারে বুক চিতিয়ে পড়ে থাকা ট্রাম লাইন, অন্ধকারের ফুটপাতে পড়ে থাকা রক্তের ন্যাকড়া যেন নিঃশব্দে কথা বলে ওঠে — “হয়তো এই পথেই হেঁটেছিল জীবনানন্দ- অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি/আর নয়তো কোন কবিয়াল।”
শহর কলকাতার অলিতে গলিতে ঘুরতে ঘুরতে, রাস্তাঘাট, চলন্ত ট্রাম, নানা ধরণের মানুষজন সম্পর্কে নানা অভিজ্ঞতার ঝুলি পূর্ণ হয়েছে কবির।
এগুলোই কবির কবিতার রসদ। কবিয়াল যেমন গান বাঁধেন স্বতঃস্ফূর্তভাবেই, এ শহরও তাই স্বতঃস্ফূর্তভাবেই আপন করে নেয় জীবনানন্দ দাশ বা এন্টনি ফিরিঙ্গিকে আর নয়তো কোন গ্রাম্য কবিয়ালকে, যে গ্রাম থেকে শহরে এসে ধূলি ধূষরিত শহরটাকে আপন করে নিতে চেয়েছিল। কিন্তু তার মধ্যেও থেকে যায় গ্রাম এবং শহরের দ্বন্দ্ব। গ্রাম ছেড়ে বহু মানুষ শহরে কাজের আশায় পাড়ি জমায়। প্রাণহীন শহরের বুকে চলে তার বেঁচে থাকার লড়াই, জীবন সংগ্রামের ঘানি টানতে টানতে একসময় অনেকেই ঢলে পড়ে অন্ধকারের বুকে।তাইতো ‘এখানে মানুষ লড়াই করে জীবন দিয়ে’ কবিতায় কবি লিখছেন —
“এখানে মানুষ লড়াই করে জীবন দিয়ে/ শ্রম চুরি করবে ভেবেছিল যারা গ্রাম ছেড়ে শহরে/ তারা আজ শ্রমের জাঁতায় পিষে মরছে মুহূর্তের পর মুহূর্ত,/ এখনো সন্ধি হয় রাজায় রাজায়,/রাস্তার নুড়ি কুড়িয়ে চলে কত সাধারণ…
তবু লড়াই চলে/
শ্রমের মূল্য দিতে দিতে ঢলে পড়ে অন্ধকারের কোলে।”
আধুনিক যুগের বিপন্নতা, বিষণ্ণতা, নগরায়নের রক্তচক্ষু গ্রাস করেছে আমাদের। কবিও আমাদের মতই রক্তমাংসের একজন সাধারণ মানুষ। তাহলে তিনিই বা বাদ যাবেন কেন? শ্রেণীহীন সমাজের স্বপ্নে মশগুল হয়ে তাই কবিও চেয়েছেন এক বিভেদহীন সমাজ, যে সমাজে মানুষে মানুষে থাকবে না কোন ভেদাভেদ, শাসক-শাসকদের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে এক সমাজতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠিত হবে।তবে আগে সমাজ থেকে মাফিয়া রাজকে নির্মূল করতে হবে। যার জন্য তার আহ্বান —
” আমরাও পারি মার খেতে/
আমরাও পারি পালটা মার, আর কত চলবে/
মাফিয়ারাজ মাফিয়ারাজ।
রাতের অন্ধকারে আমরাও দেব হানা/ আমরাও মুখোমুখি দাঁড়াব শাসকের/ স্তিমিত আলোর রোশনায় মহলে।” কখনো বলেছেন —
“আমাদেরও দু হাতে থাকবে এই মৃত্যু দেশের ঝান্ডা আর/ লোডেড পিস্তল।”
আলোচ্য কাব্যগ্রন্থের কবিতাগুলিতে ধরা পড়েছে শহরের টুকরো টুকরো স্মৃতি, যা কবির মনের মনিকোঠায় ধরা আছে আদরে, ভালোবাসায়, সোহাগ চুম্বনে, কখনো বা হতাশায়, দ্বন্দ্বে, কোনো এক অস্থির সময়ের বিষণ্ণতায়। খুব কাছ থেকে শহরটাকে দেখেছেন তিনি। কারণ — ”বহুদিন শহরেই আছি” (শক্তি চট্টোপাধ্যায়), কিন্তু ”শহরের অসুখ হা করে কেবল সবুজ খায়” (শক্তি চট্টোপাধ্যায়)। নগরায়ন, নাগরিক সভ্যতার দূষণ — এগুলোও তো শহরটাকে গ্রামের থেকে আলাদা করে দিচ্ছে, তৈরি করে দিচ্ছে গ্রাম এবং শহরের দ্বন্দ্ব।
”রাত ফুরলেই ব্যস্ত শ্রমিক দলের সঙ্গে ফিরি, কাজ কর্মের ফাঁকে/ হাওয়ায় মিশে থাকা নিকোটিন নিয়ে চলেছি প্রত্যেকটা মুহূর্ত/আর তখন বুঝতে পারি আমরা যেন কোথাও হারিয়ে যাচ্ছি।”
তাইতো শহুরে হাজারো ব্যস্ততা, ট্রামের ঢং ঢং শব্দ, কলেজপাড়ার সন্ধের তর্ক-আলোচনা, ট্রাফিকের মোড়ে যানবাহনের হর্ণ সত্ত্বেও কবি একাকী — খাঁ খাঁ রোদে উত্তপ্ত মাঠে বাতাস যেমন একা, তেমনি কবিও দস্তুর মত একা, নির্বাক। তাইতো শিক্ষক ও প্রাবন্ধিক মঞ্জুভাষ মিত্র লিখছেন —
“একটা Sense of alienation- সমাজ বিভক্তির বোধ যা আধুনিকতার ও বিংশ শতাব্দীর কবিতার একটা প্রধান লক্ষণ, তা কবিকে গ্রাস করেছে। তার মনে হয়েছে বহু জনতার মাঝে থেকেও সে অপূর্ব একা, অসহায়ভাবে একা।” এখানেই তৈরি হয় গ্রাম এবং শহরের সংস্কৃতির দ্বন্দ্ব।
“এখানে ইতিহাস ফিকে হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে/ শহরের ইমারতের ভিড়ে।/
স্তরে স্তরে সজ্জিত পাথর বয়ে নিয়ে যায় প্রবাহের/ নিঃশব্দ অঙ্গীকার।”
তাই প্রতিদিন নিজে ক্ষয়ে ক্ষয়ে যেতে যেতেও আত্মমগ্নতায় আমরা গেয়ে যাই ‘একা থাকার গান’। আসলে কিছু কিছু সময় আমরা একাকী থাকতে চাই। কিছুটা সময় একান্তে কাটাতে চাই। ঠিক তেমনি এই শহরটাও একান্তে বসে নিজের প্রতিবিম্ব দেখে নেয় —
“এদিকে এত কিছু / অথচ ওদিকে শুনশান / বৃষ্টিভেজা শহর শুধু নিজের ছবি দেখে, নিজের বুকের ওপর।”
জীবনও জীবিকার সন্ধানে মানুষ অবিরাম ছুটে চলেছে, ছুটে চলেছে টাকার পিছনে। এ হাঁটা অনন্ত। এ প্রসঙ্গে মনে পড়ে একটা ইংরেজি কবিতার লাইন-“Miles to go before I sleep.”।
“কীভাবে বাঁচব বলো?/ বিশ্রামহীন শহরের মাঝে আমি শুধুই ছুটছি/ ছুটছি টাকার পিছনে।/ এক অজ্ঞান শঙ্কা আমার পিছনে…”
ধীরে ধীরে আমরা হয়ে পড়ছি অসহিষ্ণু। পাওয়া আর না পাওয়ার যন্ত্রনা আমাদের ক্ষতবিক্ষত করছে, আমাদের মনে জন্ম দিচ্ছে খেদ। এই খেদ আর যন্ত্রণাও আধুনিকতার একটা প্রধান লক্ষণ যা ধরা পড়েছে ধীমানের কবিতাগুলির পরতে পরতে।
এই কাব্যগ্রন্থের প্রতিটি কবিতাই যেন শহর কলকাতার এক একটি খণ্ডচিত্র। আর এই খন্ডচিত্রগুলো একত্রে জুড়ে নিলেই শহরটার রূপ,তার প্রতিবিম্ব যেন আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে।শহর কলকাতার অলিতে গলিতে, ফুটপাতে, ট্রাম লাইনের পাশ ঘেঁষে বস্তির এঁধো গলিতে ভিটেহীন, ঘরহীন, মানুষের ঢেউ দেখতে দেখতে তিনি কাটিয়ে দিয়েছেন অনেকটা কাল। চারিদিকে এতো আলো, তবু কবি দেখেন অন্ধকার —
“দু-জনের চোখ দিয়ে / এখন আর গোধূলি দেখি না / দেখি অন্ধকারের খেলা।”
আবার বলছেন —
” দুটো চোখ আজ স্থির,স্থবির / চারিদিকে শুধুই অন্ধকারের মহড়া।”
আসলে গ্রাম আর শহরের মধ্যে ফারাক বিস্তর। গ্রামছাড়া কবি শহরটাকে আপন করে নিতে চাইলেও রাজনৈতিক প্রশ্রয়ে,বাস্তবের নিদারুণ কষাঘাতে কবিকে জর্জরিত হতে হয়েছে। মেনে নিতে হয়েছে চরম সত্যকে। একটার পর একটা ভাবনার চাবুক চালিয়ে কবি ক্ষতবিক্ষত করেছেন আমাদের। শব্দ ব্যবহার, ব্যঞ্জনাধর্মিতা,মননের সুতীক্ষ্ণ বোধ, অনুভব, সর্বোপরি পাঠকদের মনে এক অপূর্ব মোহময়তার জন্ম দিয়েছেন কবি এই কবিতাগুলির মধ্যে দিয়ে। তাই ‘শহর ও কবিয়াল’ মূলত এক বাস্তবতার গল্প, যে বাস্তবতা হয়তো খুঁজে পাওয়া যাবে তিলোত্তমার অলিতে গলিতে। এন্টনি কবিয়ালকে হয়তো আর খুঁজে পাওয়া যাবে না, কিন্তু দেখা পাবেন মফসসল ছেড়ে শহরের স্রোতে স্রোতে ভেসে বেড়ানো সেই গ্রাম্য কবিয়ালকে, যে হয়তো তার গানের ডালি সাজিয়ে এক মনে হেঁটে যাচ্ছেন ট্রাম লাইনের পাশ দিয়ে অথবা ভিড় বাঁচিয়ে অন্ধকার ফুটপাতের ওপর দিয়ে।
কাব্যগ্রন্থ : “শহর ও কবিয়াল”, কবি : ধীমান ব্রহ্মচারী , প্রকাশকাল : সেপ্টেম্বর,২০২৩, প্রকাশক : “এবং অধ্যায়”, নামাঙ্কন : সুপ্রসন্ন কুন্ডু, প্রচ্ছদের ফটোগ্রাফি : দেবরাজ জানা, উৎসর্গ : মফস্বল ছেড়ে যারা শহরের স্রোতে ভেসে বেড়িয়েছে, মুদ্রিত মূল্য : ১৫০ টাকা
সকলে পড়লে আমার পরিশ্রম সার্থক হবে বলে আমি মনে করি।।। ????????????????????????????????????????????????????????????????????????????????????????????????????????????