বিবেকানন্দকে গোড়াতে ধরা যাক তাঁর খেলাস্থলে—কোনো রূপক অর্থে নয়—একেবারে খাঁটি খেলার মাঠে।
প্রথমেই হাজির হন অশ্বারোহী বিবেকানন্দ। বিবেকানন্দের প্রিয় সম্রাট আকবরের পা ঘোড়ায় চড়ে বেঁকে গিয়েছিল; আর এক প্রিয় দিগ্বিজয়ী নেপোলিয়ান ঘোড়ার পিঠেই ঘুমোতেন। সুতরাং বিবেকানন্দকেও ঘোড়ায় চড়তে হয়েছে। কবে, কখন? আজীবন। টগবগিয়ে চলেছেন প্রথম থেকেই। পিতা বিশ্বনাথ দত্ত জিজ্ঞাসা করলেন, বিলে, তুই বড় হয়ে হবি কি? বিলে সগর্বে জানাল, কোচোয়ান।… পক্ষীরাজ না জুটুক, কয়েক বছরের মধ্যে একটা সাদা বর্মী-ঘোড়া তার বরাতে জুটে গেল। সেটাকে নিয়ে বালক নরেন্দ্র হই-হই করে কলকাতার রাস্তায় ছুটছে, সেই দেবভোগ্য দৃশ্যের উল্লেখ সবিশেষ না পাওয়া গেলেও কিছু উল্লেখ মহেন্দ্রনাথ দত্তের রচনায় পাওয়া যায়। ওই বালক যখন বিশ্ববীর, তাঁর তখনকার সওয়ারী-ছবির কিছু বর্ণনা পেয়েছি একজন বিখ্যাত বাঙালীর কাছ থেকে, তাঁর নাম অশ্বিনীকুমার দত্ত।
হিমালয়ের ভয়াবহ পথে ঘোড়া ছোটানো হয়তো উইম্বলডনে সাইকেল চড়ার অভিজ্ঞতার চেয়ে কিছু বেশি উন্মাদনাপূর্ণ; কিন্তু সাইকেল চড়ার ব্যাপারটাও খুব কম উন্মাদনাপূর্ণ নিশ্চয় ছিল না। স্বামীজীর এক সাইকেল-অ্যাডভেঞ্চারের বিবরণ দিয়েছেন তাঁর ভাই মহেন্দ্রনাথ দত্ত। তিনি তখন ইংলণ্ডেই ছিলেন।—
“একদিন স্বামীজী খুব প্রফুল্ল; বেলা ১২টার সময় বলিলেন, ‘চ। সকলে মিলে সুমুখের মাঠে গিয়ে বাইক চড়ি।’ মিস্ মুলারের আর্থার নামে একটা মালী ছিল। সে মিস্ মুলারের গ্রিন হাউস থেকে একটা বাইক মাঠে পৌঁছিয়া দিয়া আসিল। সারদানন্দ-স্বামী বাইকটি ধরিলেন, আর স্বামীজী বর্তমানে লেখকের কাঁধে হাত দিয়া বাইকে উঠিয়া বসিলেন। অনভ্যস্ত, সেইজন্য দুইজনে দুই দিক থেকে বাইকটি সামলাইতে লাগিলাম। তারপর স্বামীজী সারদানন্দ-স্বামীকে বলিলেন, ‘তুই চড়, শেখ্ না, দিনকতক চেষ্টা করলে অভ্যাস হয়ে যাবে।’ সারদানন্দ-স্বামী অনিচ্ছা সত্ত্বেও খাতিরে বাইকের উপর একবার চড়িয়া বসিলেন। মোটা মানুষ, বড় ভয় করিতে লাগিল, সেইজন্য দুইজনে দু’পাশ থেকে তাঁহাকে আটকাইতে লাগিলাম। আর্থার মালী-ছোঁড়া একটু দূরে বেড়াতে ঠেস দিয়া দাঁড়াইয়া তামাশা দেখিয়া খুব হাসিতেছিল। স্বামীজী মালী-ছোঁড়াকে হাসিতে দেখিয়া কৌতুক করিয়া বলিতে লাগিলেন, ‘ওরে, আমাদের [বাইক] চড়া দেখে দেখে মালী-ছোঁড়া হাস্ করছে। আরে হাস্ করছিস ক্যান?’… সারদানন্দ-স্বামী একটু পরে নামিয়া পড়িলেন। স্বামীজী আবার বাইকে উঠিলেন। সেদিন মনটা খুব প্রফুল্ল ছিল, মৃদু স্বরে বাংলায় গান গাইতে লাগিলেন – “সাধের তরণী আমার কে দিল তরঙ্গে/ভাসল তরী সকালবেলা, ভাবিলাম এ জলখেলা, মধুর বহিবে সমীর ভেসে যাব রঙ্গে’।”
স্বামীজী বিমানের যুগের মানুষ নন, কিন্তু তখন বেলুনে ওড়া আরম্ভ হয়ে গেছে। স্বামীজী ইউরোপে আছেন। তাঁর বেলুনে চড়ার বাসনা হল। বাল্যের পক্ষীরাজের শখটা একেবারে যায় নি। তাছাড়া আকাশ তাঁর স্বস্থান। সুতরাং কাহিনি এই—
“স্বামীজী লন্ডন হইতে যাত্রা করিয়া জেনেভা নগরীতে উপনীত হইলেন। তখন জেনেভা নগরীতে একটি শিল্পপ্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হইতেছিল। স্বামীজী সুইজারল্যান্ডের শিল্পজাত দ্রব্যসমূহ দর্শন করিয়া সাতিশয় সন্তুষ্ট হইলেন। উৎসাহভরে সমস্ত দিবস প্রদর্শিত দ্রব্যসমূহ পর্যবেক্ষণ করিয়া বেড়াইতে লাগিলেন। অবশেষে একটি বেলুন দেখিয়া তিনি বেলুনে উঠিবার জন্য অধীরভাবে আগ্রহ প্রকাশ করিতে লাগিলেন। সূর্যাস্তের পূর্বে বেলুন উড়িবে না শুনিয়া স্বামীজী বালকের ন্যায় অধীরভাবে সঙ্গীগণকে জিজ্ঞাসা করিতে লাগিলেন, এখনও কি সময় হয় নাই? মিসেস সেভিয়ার আকাশ-ভ্রমণটা নিরাপদ নয় মনে করিয়া আপত্তি প্রকাশ করিতে লাগিলেন। স্বামীজী তাঁহার কোনো প্রকার আপত্তিতে কর্ণপাত করিলেন না, বরং তাঁহাকে পর্যন্ত বেলুনে উঠিতে বাধ্য করিলেন। সেদিন আকাশ বেশ পরিষ্কার ছিল। ঊর্ধ্ব হইতে সূর্যাস্তের মনোহর শোভা দর্শন করিয়া স্বামীজী অতীব আনন্দিত হইলেন। বেলুন হইতে অবতরণ করিয়া তাঁহারা সকলে ফটো তুলিয়া প্রফুল্লচিত্তে হোটেলে প্রত্যাগমন করিলেন।”
স্বামীজী অবশ্যই দাবি করতে পারেন, তিনিই প্রথম ভারতীয় সন্ন্যাসী যিনি যোগ-বলে নয় বেলুন-বলে আকাশবিহার করেছিলেন।
স্বামী বিবেকানন্দকে নিয়ে মতামত দেবার স্পর্ধা করতে পারি না॥ শুধু পড়ে যেতেই ভালো লাগে।