মেয়েটির নাম সাহিবান। সে শত্রুর দেশ সফর করতে এসেছে। প্রাচীন স্মৃতিস্তম্ভের স্থাপত্যকর্ম নিরীক্ষণ করতেই তার এ দেশে আসা। কয়েকটা দিন এ দেশে থাকার ভিসা সে পেয়েছে। সে তার এক পুরনো বান্ধবীর বাড়িতে কয়েকদিন থাকার চিঠি তার বান্ধবীর কাছ থেকে নিয়ে এসেছে।
মেয়েটি বান্ধবীর বাড়িতে পৌঁছালে তার বাবা-মা তাকে সাদর অভ্যর্থনা জানালেন। তাদের শোবার ঘরের পাশের গেস্টরুমে তার থাকার ব্যবস্থা হলো। বাড়ির বড় ছেলেটি উপরতলার ঘরে থাকে। ঘরের বারান্দা ফুলের টবে ভর্তি। টবগুলো ফুলের ভর্তি।
চা পান করার পর সাহিবান তার রুমে গিয়ে একটু বিশ্রাম নিল। একটু পরেই ডিনারের সময় হলো। গৃহস্থের বড় ছেলেটি একগুচ্ছ ফুলের তোড়া হাতে করে উপরতলা থেকে ডাইনিং রুমে হাজির হয়ে ফুলদানীতে রাখলো। বান্ধবীর মা সাহিবানকে গেস্টরুম থেকে ডেকে এনে তার সাথে ছেলের পরিচয় করিয়ে দিলেন। সবাই একসাথে ডিনার সারলো।
পরদিন সকালে মেয়েটি চা-নাস্তা খেয়ে নগরীর প্রাচীন স্মৃতিস্তম্ভগুলো দেখতে বের হলো। সে রোজই সন্ধ্যার পরে বাসায় ফেরে। সাহিবান রোজই বাসায় ফিরবার সময় ফুল ও মিষ্টি নিয়ে আসে। বান্ধবীর মা তাকে ওইগুলো আনতে নিষেধ করলেন। মেয়েটির মনে হলো খালি হাতে বাড়ি ফেরা ভালো দেখায় না।
চারদিনের দিন ছোটখাটো একটা দুর্ঘটনা ঘটলো। ছেলেটি তার মোটরসাইকেলে দুর্ঘটনায় ঘটিয়ে পায়ে আঘাত পেল। সে ডাক্তারের ক্লিনিক থেকে তার পায়ে ব্যান্ডেজ বেঁধে বাড়ি ফিরে সোজা তার নিজের রুমে গিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়লো। কয়েক মুহূর্ত পরেই সে তার পায়ে প্রচণ্ড ব্যথা অনুভব করলো।
সন্ধ্যার পর সাহিবান বাসায় ফিরে দুর্ঘটনার খবর জানতে পারলো। মা ছেলের পায়ে হাত বুলিয়ে তার ব্যথা উপশম করতে ব্যস্ত হয়ে উঠলেন। সে রাতে সাহিবান ডিনার খেয়ে উপরতলায় ছেলেটির রুমে এলো। ছেলেটির মায়ের সাথে সে সারারাতে ওই রুমেই কাটালো।
পরদিন সকালে সাহিবান উপরতলার বাথরুম থেকে হাতমুখ ধুয়ে নিচে এসে ব্রেকফাস্ট সারলো। তাদের তিন দিনের সেবাযত্নে ছেলেটি সুস্থ হয়ে উঠলো। তবে তাকে মোটরসাইকেল ও কার চালানো থেকে বিরত থাকতে হলো বেশ কয়েকদিন। কাজ থেকে তাকে এক সপ্তার ছুটিও নিতে হলো।
নগরীর বাইরে আরো কয়েকটি প্রাচীন স্মৃতিস্তম্ভ দেখতে সাহিবানের তখনো বাকি। মায়ের অনুমতি পেলে মেয়েটিকে নগরীর বাইরের স্মৃতিস্তম্ভগুলো দেখিয়ে আনার ইচ্ছে সে মায়ের কাছে ব্যক্ত করলো। মা হেসে তাকে অনুমতি দিলেন। ছেলের মনের মধ্যে খুশির আমেজ দেখা দিয়েছে ভেবে মা স্বস্তি পেলেন। কলেজ জীবন শেষ করে কাজে লিপ্ত হওয়ার পর থেকে ছেলেমেয়েদের প্রতি এতদিন অনীহা দেখিয়ে আসছে। সে বিয়ে করতেও চায় না। পার্র্টিতেও সে যেতে চায় না।
দুদিন পরে সাহিবান ছেলেটিকে জিজ্ঞেস করলো যে সে কি তার সাথে গঙ্গায় গোসলে যেতে পারবে। মেয়েটির অনুরোধের কথা মাকে জানালে মা ছেলেকে সাহিবানের সাথে গঙ্গায় গোসল করতে যাবার অনুমতি দিলেন। ফলে তারা দুজন গঙ্গায় গোসলে যেতে ব্যস্ত হয়ে উঠলো।
মেয়েটি সব সময়ই সাদাসিধে পোশাক পরতে ভালোবাসে, সাধারণ কাপড়চোপড় সাথে নিল। তারা সন্ধ্যার পরে বাড়ি থেকে বের হলো। তারা রাতযাপনের জন্য গঙ্গার ধারে ছোট্ট দুটো কুঠির ভাড়া করলো। তারা জলের ওপর দিয়ে সূর্যোদয়ের দৃশ্য অবলোকন করার জন্য ভোর হওয়ার আগেই সাহিবান ঘুম থেকে জেগে ছেলেটির কুঠিরে গিয়ে তাকে ঘুম থেকে জাগিয়ে তুললো। ছেলেটি ঘুম থেকে উঠে হাতমুখ ধুয়ে মেয়েটির সাথে গঙ্গার ধারে গেল। সাহিবান জলের ওপারের দিগন্তরেখার দিকে লাল উদিত সূর্যের দিকে তাকিয়ে রইলো। এক সময় সাহিবান জামা কাপড় পরেই স্নান করার জন্য নদীতে নেমে পড়লো।
তরুণটি নদীর তীরেই দাঁড়িয়ে থাকলো। সে তোয়ালে আনেনি, ফলে পোশাক খুলে নদীতে স্নান করার জন্য নিচের দিকে নামা সম্ভব হলো না। তবে সে জলের কাছে গিয়ে বসে জল হাতে নিয়ে যেন খেলায় মেতে উঠলো। এক সময় সে দেখতে পেল সাহিবান জলের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে দুহাত জোড় করে সূর্যের দিকে তাকিয়ে আছে।
সাহিবান ফিরে এলে ছেলেটি তাকে বললো, ‘তুমি আমার জন্য একটা তোয়ালে আনলে আমি তোমার সাথে জলেতে নামতে পারতাম।’ ছেলেটির কথা শুনে সাহিবান একটু মুচকি হাসলো। তারা মেয়েটির কুঠিরে ফিরে এলো। সাহিবান চা খেতে খেতে ছেলেটিকে বললো, ‘আমাকে শহরে নিয়ে চল। আমি শহরের দোকানগুলো দেখতে চাই।’ এখনো দোকান খোলেনি। ছেলেটি জবাবে বললো।
দোকানপাট খুললে তারা বাজারে গেল। বাজারের গলিগুলো সরু সরু। দোকানগুলো শঙ্খ, শাঁখা, পুঁতির মালা, হাতের কারুকার্য করা নানা জিনিসে ভরা। মেয়েটি তার পছন্দের জিনিসগুলোর খুঁজতে লাগলো। সোনালি বর্ডার দেয়া দোপাট্টা, কাচের চুড়ি এবং হাতির দাঁতের কারুকার্য খচিত বিয়ের কনের পোশাকাদি বিক্রির একটা দোকানের সামনে সে হঠাৎ করে দাঁড়িয়ে পড়লো। মেয়েটি হাতের কব্জি দোকানির সামনে তুলে ধরে তার হাতে লাগে এমন ধরনের চুড়ি চাইলো। সে দোকান থেকে একটা লাল দোপাট্টা, কিছু সিন্দুর কিনলে তরুণটিকে অবাক হয়ে তাকে জিজ্ঞেস করলো, ‘সাহিবান, এ সব জিনিস দিয়ে তুমি করবে? তুমি এগুলো পছন্দ করো আমি তা জানি। কিন্তু তুমি কিভাবে ওইগুলো পরে তোমার দেশে ফিরে যাবে।’
মেয়েটি হেসে বললো, ‘আমার হাত দুটো দেখেও কি আমাকে দেশে ঢুকতে দেবে না?’ ছেলেটি মেয়েটির কথা শুনে বললো, ‘তুমি কি তোমার হাত দুটো তাদেরকে দেখাতে পারবে?’
তারা দুজন কুঠিরে ফিরে আসার পর সাহিবান তার কপালে সিন্দুরের একটা টিপ আঁকলো। তারপর সে হাতে বালা ও লালরঙের দোপাট্টাটি পরে নিল। সে সময় তাকে বিয়ের কনের মতো দেখাচ্ছিল। তারা বাড়িতে পৌঁছলে তরুণটির মা সাহিবানকে দেখে অবাক! তার মুখ দিয়ে কথা সরলো না। সে তার ছেলেকে আড়ালে ডেকে নিয়ে জিজ্ঞেস করলো, ‘তুই সত্যি কথটা বল! তুই কি সাহিবানকে বিয়ে করেছিস?’
ছেলে হেসে বললো, ‘মোটেই না মা।’
‘আমরা কেউই বিয়ের কথা ভাবিওনি। সাহিবান শখ করেই ওইগুলো পরেছে।’ ‘বোকা মেয়ে তো! ওইগুলো পরে ওইভাবে দেশে ফিরে যেতে পারবে না।’ মা ছেলেকে বললো।
পরদিন সাহিবানকে দেশে ফিরতে হবে। তার ভিসার মেয়াদ ফুরিয়ে যাচ্ছে। মেয়েটিকে এয়ারপোর্টে পৌঁছে দেয়ার জন্য পরদিন ব্রেকফাস্ট খেয়ে তরুণটি গ্যারেজ থেকে গাড়ি বের করলো। ঠিক সে সময় ছেলেটির একজন বন্ধু সেখানে হাজির হলে সে মেযেটির সাথে তার পরিচয় করিয়ে দিয়ে বললো, ‘এখন আর দেরি করার সময় নেই। কয়েক মিনিটের মধ্যে রওনা হতে হবে।’ তারা নিচেরতলার শোবার ঘরে বসে কথা বলছিল। বন্ধুটি সাহিবানকে জিজ্ঞেস করলো, ‘আপনি কি দরগার তীর্থযাত্রী?’
‘দরগায় যেয়ে উঠা হয়নি তবুও বলতে হয় আমি দরগারই একজন তীর্থযাত্রী।’ সে জবাব দিল। এবার বন্ধুটি সাহিবানের নাম ধরে জিজ্ঞেস করলো, ‘এই সাহিবানের মির্জা কোথায় থাকে?’ মেয়েটি হেসে বললো, ‘মির্জার শত্রুগোত্রের লোক, তাই এটাও সত্যি যে সাহিবানের মির্জাও তাই।’ কথাটা বলে তরুণটির মুখের দিকে চোখ তুলে তাকিয়েই চোখ নামিয়ে নিল। বাড়ি থেকে বের হবার মুহূর্তে বন্ধুটি আবার জিজ্ঞেস করলো, ‘এ সময় কিন্তু সাহিবান তার মির্জার সাথে চলতে সাহস হারায়নি।’ সাহিবান ফিরে দাঁড়িয়ে বললো, ‘সাহিবান চায় না যে তার মির্জা তার পিতার গোত্রের লোকদের হাতে খুন হোক।’
সে গাড়িতে উঠে বসলো। গাড়ি এয়ারপোর্টের দিকে চলতে শুরু করলো। সাহিবান এসে যেন তার সুরভি ছড়িয়ে রেখে গেল।
তারপর কয়েকটা দিন সাদামাটাভাবেই কেটে গেল। একদিন তরুণটির ঠিকানায় একটা চিঠি এলো। চিঠিতে সাহিবান অনেক কথাই লিখেছে। ‘তোমাকে অনেক অনেক ধন্যবাদ! ফেলে আসা দিনগুলোর কথা মনে পড়ে, যদিও সেই সব দিনের কথা আমাদের ভাবাও পাপ। আমি কী করতে পারি… আমি সবই বুঝি।’ চিঠিটাতে সাহিবানের দীর্ঘশ্বাসের অনুরণন প্রকাশ পেয়েছে তা ছেলেটি চিঠিটা পড়েই বুঝতে পারলো। ‘তোমার জীবন থেকে নির্বাসনে থাকা সাহিবান।’ চিঠিটাতে সাহিবানের কোনো ঠিকানা নেই।
অনুবাদ : মনোজিৎকুমার দাস
লেখক পরিচিতি : অমৃতা প্রীতম (১৯১৯-২০০৫) পাজ্ঞাবী তথা ভারতীয় সাহিত্যের অন্যতমা মহিলা কবি, ঔপন্যাসিক , গল্পকার ও প্রাবন্ধিক। তাঁর লেখা বইয়ের সংখ্যা শতাধিক। তাঁর বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থের নাম আজ এখন ওয়ারিস শাহ নু . যা পাঞ্জাবের লোককাহিনীর উপর ভিত্তি করে লেখা। তাঁর লেখা বিখ্যাত উপন্যাসের নাম পিঞ্জর। নারীবাদী লেখিকা হিসাবে তিনি বিশেষ ভাবে খ্যাত। উল্লেখযোগ্যসংখ্যক কাব্য, উপন্যাস ছোটগল্পের রচয়িতা হিসাবে বিশ্বসাহিত্যাঙ্গনে তিনি সমধিক পরিচিত। তাঁর লেখা উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ ইংরেজি-সহ বিভিন্ন ভাষায় অনুদিত হয়েছে। তিনি সুনেহে কাব্যগ্রন্থের জন্য সাহিত্য একাডেমী পুরস্কারে ভূষিত হন। এছাড়াও তিনি তাঁর সাহিত্যকর্মের জন্য একাধিক পুরস্কার লাভ করেন। প্রাপ্ত পুরস্কারের মধ্যে জ্ঞানপীঠ পুরস্কার অন্যতম। ১৯৬৯ সালে তাঁকে পদ্মশ্রী এবং ২০০৪ সালে পদ্মবিভূষণ পুরস্কার প্রদান করে। একই সালে তিনি সাহিত্য একডেমীর ফেলো মনোনীত হন। ২০০৫ সালের ৩১ অক্টোবর লোকান্তরিত হন।
মনোজিৎকুমার দাস, অনুবাদক, গল্পকার ও প্রাবন্ধিক, লাঙ্গলবাঁধ, মাগুরা।