যদিও ভার্চুয়াল তবে এই প্রথম কলকাতার পাশাপাশি একইসঙ্গে দিল্লি, উত্তরপ্রদেশ-সহ দেশের একাধিক রাজ্যে তৃণমূল কংগ্রেসের ২১ জুলাইয়ের শহিদ দিবস পালিত হল। বাংলার পাশাপাশি ওইসব রাজ্যের প্রত্যেকটি পয়েন্টে জায়ান্ট স্ক্রিণের সাহায্যে নেত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায়ের ভাষণ সরাসরি সম্প্রচারিত হল। আর সেই কারণেই নেত্রী এদিন বাংলার পাশাপাশি হিন্দি, ইংরেজিতেও ভাষণ দিলেন৷
তৃণমূল দলকে সারা দেশে ছড়িয়ে দেওয়ার ডাক আগেই দিয়েছিলেন মমতা। ২১ জুলাইয়ের মঞ্চ থেকে নেত্রী মমতা কি বার্তা দেন তার অপেক্ষায় ছিল দেশের রাজনৈতিক মহল। তিনি যে এদিন বিজেপি তথা মোদিকে নিশানা করবেন সেটা জানাই ছিল। এদিন সরাসরি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সমালোচনায় একের পর এক বিস্ফোরক মন্তব্য করেন তৃণমূল নেত্রী৷ ‘পেগাসাস, ফেরোসাস, ডেঞ্জারাস, সব একই৷ কেন্দ্রীয় সরকার গণতন্ত্রের বদলে গোয়েন্দাগিরি চালাচ্ছে৷ যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো ভেঙে দিচ্ছে’ বলেন মমতা।
এরপরই মমতা দেশের সমস্ত আঞ্চলিক দল এবং অবিজেপি দলকে একত্রিত হওয়ার ডাক দিয়ে স্পষ্ট ভাষায় বলেন, ‘দেশকে বাঁচাতে হলে বিরোধীদের এক জোট হতে হবে৷’ কেবল জোটের কথা নয়, কেন বিজেপির বিরুদ্ধে সবাইকে একজোট হতে হবে সে বিষয়েও তিনি তাঁর ব্যাখ্যা দেন। তৃণমূল নেত্রী বলেন, ‘এদের রাজত্বে বেকারি বেড়ে গিয়েছে৷ এরা শুধু গোলি, গুলি, গালি আর পলিটিক্স করতে জানে৷ ভুল করার পর ক্ষমা চাওয়ার মানসিকতা নেই৷ উলটে বলছে, যা করেছি, বেশ করেছি৷’ এরপরই মমতা জানিয়ে দেন, ২৭ থেকে ৩০ তারিখ পর্যন্ত তিনি দিল্লিতে থাকছেন৷
প্রসঙ্গত, তিনি বলেন, নির্বাচনের সময়ে জোট করে লাভ নেই। এখন থেকেই তৈরি হতে হবে। তাই বাংলার বিধানসভায় হ্যাটট্রিকের পর এবার দিল্লি চলোর ডাক দিলেন তৃণমূলনেত্রী। আর সেই ডাক দেওয়ার জন্য একুশে জুলাইয়ের মঞ্চকেই বেছে নিয়েছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
উদ্যোগ আগেই নিয়েছিল তৃণমূল। ত্রিপুরা, উত্তরপ্রদেশ, পাঞ্জাবের পাশাপাশি মোদী-অমিত শাহের গুজরাটেও এদিন শহিদ দিবস পালন করতে চেয়েছিল বাংলার তৃণমূল। কিন্তু হোঁচট খেতে হল মোদীর গড়ে, বাধা দেওয়া হয় তৃণমূলের শহীদ দিবসে, সরানো হয় ‘শহিদ দিবসের’ ব্যানার। সেটা হওয়ারই কথা। কারণ বাংলায় একুশের বিধানসভা নির্বাচনে মোদী-শাহের বিজয়রথ রুখে দিয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এই মুহুর্তে গোটাদেশে প্রধান মোদী বিরোধী মুখ তিনিই। বাংলার মুখ্যমন্ত্রী যে ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে এক্স ফ্যাক্টর হয়ে উঠতে পারেন, সেটা মনে করছেন অনেকেই। মমতা নিজেও অবশ্য তেমনটাই চাইছেন। আর সেই উদ্দেশ্যেই এবছরের শহিদ দিবসে প্রথমবারের জন্য দলকে জাতীয় স্তরে উন্নীত করার চেষ্টা করলেন নেত্রী। আর সেই জন্যই ত্রিপুরার পর মোদীর খাসতালুক গুজরাটেও বাধা পেল তৃণমূল। ‘শহিদ দিবস’ পালনের জন্য লাগানো বড়সড় ব্যানার সরিয়ে দেওয়া হল সেই রাজ্যে।

দুপুর আড়াইটের সময় মমতার ভাষণ শুরুর আগেই গোল বাঁধে। দেখা যায়, ভাষণ শুরুর আগেই সেখানে লাগানো মমতার বিরাট ব্যানার কেউ সরিয়ে দিয়েছে। স্থানীয় তৃণমূল নেতাদের অভিযোগ, এর পেছনে জড়িত বিজেপিই৷ এতদিন শুধুমাত্র পশ্চিমবঙ্গেই রাজনীতি করেছে তৃণমূল। বলাই বাহুল্য, দলের নাম সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেস হলেও গুজরাটের মাটিতে এই দলের সেভাবে সংগঠন নেই বললেই চলে৷ তবে ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে সর্বভারতীয় রাজনীতিতে নিজেদের প্রাসঙ্গিক করে তোলার উদ্দেশ্যে ধীরে ধীরে এগোচ্ছে তারা৷
গুজরাতে বাধা পেলেও একুশের ভার্চুয়াল শহিদ মঞ্চ থেকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জানিয়ে দেন, ‘উন্নয়নে গুজরাত নয়, সারা দেশের মডেল বাংলায়৷’ কেন বাংলার কথা বললেন তিনি? তাঁর ব্যাখ্যা, তিনি বাংলার মানুষদের জন্য একাধিক জনহিতকর প্রকল্পের সূচনা করেছেন৷ তার মধ্যে কন্যাশ্রী রাষ্ট্রপুঞ্জে পুরষ্কৃত হয়েছে। কৃষকদের এখন ১০ হাজার টাকা করে দেওয়া হচ্ছে। কৃষকের মৃত্যু হলে তাঁর পরিবারকে ২ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ দেয় রাজ্য সরকার। জমির মিউটেশনও করে দেয়। তাই গুজরাত নয়, সারা দেশের মডেল বাংলা। মোদীর গুজরাত মডেলকে ধুলিসাৎ করতেই যে আগামীদিনে সারা দেশ জুড়ে বাংলাকে মডেল হিসেবে তুলে ধরা তা এদিন আরও একবার স্পষ্ট করে দিলেন তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়৷
মমতার কথাতেও এদিন বারবার ফুটে উঠেছে যে তিনি সারা দেশের অ-বিজেপি দলগুলিকে একত্রিত করার প্রচেষ্টা চালাবেন। বিজেপির মগজে মরুভূমি বলে তিনি এদিন দাবি করেন। সেই সঙ্গে তিনি এও বলেন, ‘ওটা একটা হাই লোডেড ভাইরাস পার্টি৷ করোনার চেয়েও বিপজ্জনক৷ ওরা শুধু কালা আইন বানাতে জানে৷ মানুষের মুখের হাসি কেড়ে নিতে জানে৷ ফোন ট্যাপ করে, স্পাইগিরি করলেই হয় না, মানুষের কাজ করতে হয়৷ আর কিভাবে মানুষের কাজ করতে হয়, সেটা শিখতে হবে এই বাংলা থেকে৷’
মমতার দাবি দেশজুড়ে ক্রমেই বিজেপি সমর্থন হারাচ্ছে৷ কারণ হিসেবে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছেন মোদী-শাহকে৷ সরাসরি বিজেপির এই দুই শীর্ষ নেতার নাম করে বলেছেন, ওরা যতটা সময় ধরে এজেন্সি ব্যবহার করে বিরোধীদের পিছনে পড়ে রয়েছেন, মানুষের কল্যাণে ততটা সময় ব্যায় করলে আখেরে ওদেরই ভাল হত৷ এত কিছু করে বাংলা দখল হল না৷ বাংলার মানুষ ওদের যোগ্য জবাব দিয়ে ফিরিয়ে দিয়েছে। তিনি এদিন করোনা প্রসঙ্গ টেনে এনে বলেন, করোনায় সব দিক থেকে এই সরকার ব্যর্থ৷ তাই জনস্বার্থ বিরোধী এই সরকারকে তাড়ানোর প্রক্রিয়া সময় থাকতেই শুরু করার আহ্বান জানান নেত্রী৷