(১৯৯০ সালের ১৭ জুন কলকাতা কর্পোরেশনের ভোট হয়। সেই ভোটে বামফ্রন্ট অন্তত ৩০টি আসন রিগিং করে জেতে। উত্তর ২৪ পরগনা থেকে শয়ে শয়ে ক্রিমিনালরা পিস্তল নিয়ে আসে। এরপর ১৯৯১ সালের ২০ মে একসঙ্গে হওয়া লোকসভা ও বিধানসভা ভোটে সিপিআইএম ব্যাপক রিগিং করে। বহু আবাসনের গেটে তালা দিয়ে অবাধে ছাপ্পা মারে। ১৯৯২ সালে ৮ জুন দক্ষিণ কলকাতার বালিগঞ্জ বিধানসভা কেন্দ্রের উপনির্বাচন হয়। সেই নির্বাচনে বেহালা, যাদবপুর, বেলেঘাটার সিপিআইএম কর্মীরা বুথ দখল করে ছাপ্পা মারে। প্রতিটি ক্ষেত্রে রাস্তায় নেমে সিপিআইএমের এই রিগিংয়ের প্রতিবাদ, প্রতিরোধ করতে এগিয়ে আসেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ১৯৯২ সাল থেকেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আওয়াজ তোলেন, ‘নো কার্ড, নো ভোট’। ১৯৯২ সালের ২৫ নভেম্বর ব্রিগেড ময়দানে বিশাল জনসভা করেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সেই জনসভাতেই তিনি জানিয়ে দেন আন্দোলন করার জন্য তিনি কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার সদস্যপদ ছেড়ে দেবেন। করলেনও তাই। ১৯৯৩ সালের ১৮ জানুয়ারি কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভা থেকে তাঁর ইস্তফাপত্র গৃহীত হলো। রিগিং, অন্যায়, অত্যাচার, দুর্নীতির বিরুদ্ধে দুর্বার আন্দোলন গড়ে তোলার জন্য ভারত সরকারের মন্ত্রিত্ব ছেড়ে দেওয়া কম কথা নয়। তার ছ-মাস পরেই ঘটলো ২১ জুলাই। সেদিনের ঘটনা নিয়ে পড়ুন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা। —সম্পাদক)

প্রথম শ্রেণি থেকে ইংরেজি চালু, নতুন শিল্পস্থাপন, বেকার সমস্যার সমাধান, নিরপেক্ষ প্রশাসনের দাবি ছিলই। ঠিক হলো যুব কংগ্রেসের তরফে ‘মহাকরণ অবরোধ’ হবে। ইস্যু—সচিত্র পরিচয়পত্র ছাড়া ভোট হবে না। নো আইডেন্টিটি কার্ড, নো ভোট! প্রথম ঠিক ছিল, কর্মসূচি হবে ১৪ জুলাই। তার পর প্রাক্তন রাজ্যপাল নুরুল হাসানের মৃত্যুর জন্য তা পিছিয়ে করা হলো ২১ জুলাই।
ঠিক হলো, আমরা মোট পাঁচটা জায়গা থেকে মহাকরণ অবরোধ করব। তার অনেক আগে থেকেই জেলায় জেলায় ঘুরে ঘুরে জনমত গঠনের চেষ্টা করেছিলাম। সহকর্মীদের সঙ্ঘবদ্ধ করার জন্য তাঁদের সঙ্গে বারবার আলোচনা করেছিলাম। জেলাগুলো থেকে কর্মসূচি নিয়ে ব্যাপক সাড়া পেয়েছিলাম। কিন্তু সরকারের কাছেও জেলা প্রশাসন থেকে সেই খবর পৌঁছেছিল। আমাদের আন্দোলন বানচাল করার জন্য ব্লু-প্রিন্ট তৈরি হলো। ১৯ জুলাই সমস্ত জেলার জেলাশাসক এবং পুলিশসুপারদের ডেকে পাঠানো হলো মহাকরণে। তাঁদের হাতে গোপন সার্কুলার ধরিয়ে বলা হলো, কোনো অবস্থাতেই যেন লাখ লাখ মানুষ সেদিন কলকাতায় ঢুকতে না পারেন। কোনো গাড়ি বা লরি নিয়ে যাতে মানুষ না আসতে পারেন, তার দিকেও নজর রাখতে বলা হলো।

কিন্তু খবরটা আমাদের কানেও পৌঁছোল। শুনেই ফোনে ধরলাম রাজ্য পুলিশের ডিজি এবং মুখ্যসচিবকে। বললাম, ‘আপনারা জানেন আমাদের এই আন্দোলন মানুষের স্বার্থে। আনুষ্ঠানিক চিঠি দিয়েও আমরা সে কথা আপনাদের জানিয়েছি। মহাকরণ অবরোধ মানে তো আর জোর করে রাইটার্স দখল করা নয়। আমরা পাঁচটা জায়গায় জমায়েত হয়ে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ দেখাব। কোন অধিকারে আপনারা এই আন্দোলন স্তব্ধ করে দিতে চাইছেন?’
উত্তরে দু-জনেই বললেন, ‘ম্যাডাম, আমাদের কিছু করার নেই। সরকারের নির্দেশ। আমাদের সেটা মানতেই হবে।’
২০ তারিখ সকাল থেকেই বিভিন্ন এলাকায় আমাদের গুরুত্বপূর্ণ নেতা-কর্মীদের ভয় দেখানো শুরু হলো। কর্মসূচি ঘিরে যাতে কোনো অশান্তি না হয়, সে জন্য আমার তরফে চেষ্টার ত্রুটি ছিল না। কিন্তু শেষপর্যন্ত ওই দিনটা যে ভাবে শেষ হয়েছিল, তার করুণ সুর আমি আমৃত্যু বয়ে বেড়াব নিজের বুকে।

বেলা সাড়ে ১১টা নাগাদ বাড়ি থেকে বেরিয়ে প্রথমেই গিয়েছিলাম মেয়ো রোডের মোড়ে। তখনই সেখানে লাখো মানুষের ভিড়। ছেলেরা অত্যন্ত উত্তেজিত। কী হয়েছে, জানতে চাওয়ায় বলল, তার খানিকক্ষণ আগেই পুলিশ মেরে মাথা ফাটিয়ে দিয়েছে পঙ্কজ বন্দ্যোপাধ্যায়ের। তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। মনে হলো, বিস্ফোরণের আকার নেওয়ার আগে ওই উত্তেজনা সামলাতে হবে। সকলকে শান্ত হয়ে বসে পড়তে বললাম। একটা ম্যাটাডোরের উপর পতাকা আর মাইক বেঁধে সভার কাজ চলছিল। পুলিশকে অনুরোধ করলাম, একটু সরে দাঁড়াতে। যাতে ছেলেরা রাস্তায় বসার জায়গাটুকু পায়। কেন জানি না, সেদিন সকাল থেকেই পুলিশ একটু অন্যরকম মেজাজে ছিল। তারা আমার অনুরোধে কান দিল না। শোভনদাকে বললাম, ‘আপনি শান্তিপূর্ণভাবে সভা চালিয়ে যান। আমি ব্রেবোর্ন রোড থেকে ঘুরে আসছি।’ স্কুটারে চেপে চললাম ব্রেবোর্ন রোডের দিকে।
মহাকরণের সামনে দেখা হলো সৌগতদার সঙ্গে। তাঁর সঙ্গেই একদল কর্মী অত্যন্ত উত্তেজিত হয়ে হেঁটে আসছেন। সৌগতদার থেকেই শুনলাম, ব্রেবোর্ন রোডে লক্ষাধিক মানুষ রয়েছে। কিন্তু পুলিশ তাদের উপর যথেচ্ছ লাঠি চালিয়েছে। মঞ্চে উঠে আমাদের নেতাদেরও পিটিয়েছে। আমাদের বক্তব্য যাতে জনতার কাছে না পৌছোয়, তার জন্য মাইকের তারও কেটে দিয়েছে। মহাকরণের পাশ থেকে হাঁটতে হাঁটতে যখন ব্রেবোর্ন রোডে পৌছোলাম, চারদিকে শুধু মানুষ। বিভিন্ন রাস্তায় কংগ্রেসকর্মীদের গতিরোধ করা হচ্ছে। কিন্তু ওই জনসমুদ্র কি ওই ভাবে আটকানো যায়?

আমায় পৌছোতে দেখেই মঞ্চের ঠিক উল্টোদিকের বাড়ির ছাদ থেকে সিপিএমের ক্যাডাররা ইট-পাটকেল ছুড়তে শুরু করল। পুলিশ সেদিক ভ্রূক্ষেপ না করে উল্টে আমাদের ছেলেদের দিকেই লাঠি উঁচিয়ে, কাঁদানে গ্যাস নিয়ে তেড়ে এল। মাইক ছাড়া খালি গলায় কিছু বলতে গিয়েও বলতে পারলাম না। তার মধ্যেই পুলিশ দৌড়ে মঞ্চে উঠল। তারপর রাইফেলের বাঁট দিয়ে সজোরে আঘাত করল আমার কোমরে। অন্য একদল পুলিশ তখন মঞ্চ লক্ষ্য করে কাঁদানে গ্যাসের শেল ছোড়া শুরু করেছে। আমার সহকর্মীরা আমায় প্রায় জোর করেই মঞ্চ থেকে নামিয়ে আনল। কোনোমতে একটা জায়গায় দাঁড়িয়ে পড়লাম। কোমরে প্রচণ্ড যন্ত্রণা। কাউন্সিলার হৃদয়ানন্দ গুপ্ত চেষ্টা করছিলেন আমায় সরিয়ে নিয়ে যেতে। আচমকাই দুটো কাঁদানে গ্যাসের শেল এসে ফাটল আমার ঠিক পায়ের সামনে। পুলিশ তখন গুলি চালাতে তৈরি। রাইফেলের নল সরাসরি আমার দিকে তাক করা। চিৎকার করে বললাম, ‘আমায় মেরে শান্তি পেলে মারুন। কিন্তু নিরীহ মানুষের উপর গুলি চালাবেন না!’
রাইফেলের উদ্যত নল আমার দিকে দেখে আমার ব্যক্তিগত নিরাপত্তারক্ষী মাইতিবাবু তাঁর সার্ভিস রিভলবার বার করে চিৎকার করতে শুরু করলেন, ‘বাড়াবাড়ি হচ্ছে! এ বার কিন্তু আমি বাধ্য হব গুলি চালাতে!’
আশ্চর্য লেগেছিল সেদিন। এমনিতেই আমি বেশিরভাগ সময়েই কোনো নিরাপত্তা নিতাম না। কিন্তু সেদিন সকাল থেকেই কলকাতা পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চের একটা পাঁচ-ছ-জনের টিম আমার পিছনে গাড়িতে ছিল। তাঁদের মধ্যে একজনের নাম ছিল মিস্টার বিশ্বাস। দেখলাম, পুলিশেরই লাঠিতে তাঁর চশমা ভেঙে চোখ আর কপালের কাছে কেটে গিয়ে ঝরঝর করে রক্ত পড়ছে। কিন্তু তিনি নির্বিকার। ক্রমাগত কাঁদানে গ্যাসের শেল ফাটছে। চারদিক ধোঁয়ায় ধোঁয়া। কিছু দেখা যাচ্ছে না। চোখে অন্ধকার দেখছি। শরীরে প্রচণ্ড যন্ত্রণা। সেই অবস্থায় কোনোমতে একটা ট্রাফিক স্ট্যান্ডের উপর বসে পড়লাম।

সিপিএমের বাছাই ক্যাডারদের সেদিন আমাদের পেটানোর দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। তারা আমার চারপাশে ঘিরে থাকা সহকর্মীদের বেধড়ক পেটাতে শুরু করল। তেড়ে এল আমাদের মারতে। তখন জনতা-পুলিশ খণ্ডযুদ্ধ চলছে চারদিকে। কিন্তু পুলিশকে বাধা দিলেন কয়েক জন মহিলা পুলিশ। তাঁদের বাধায় পুলিশবাহিনী হয়ে গেলে খানিকটা হতভম্ব।
খবর এল, স্ট্র্যান্ড রোডে অসংখ্য মানুষের জমায়েতে সভা চলছে। বউবাজারেও সভা চলছে। ধর্মতলায়ও প্রচুর জমায়েত। কিন্তু মেয়ো রোডে নাকি পুলিশ গুলি চালিয়ে কয়েক জনকে মেরে ফেলেছে। সঙ্গে সঙ্গে সিদ্ধান্ত নিলাম, মেয়ো রোডে পৌঁছোতে হবে। ওখানকার ঘটনা ব্রেবোর্ন রোডে চাউর হয়ে গেলে এখানেও উত্তেজনা মাত্রা ছাড়াবে। রক্তগঙ্গা বইবে। তার চেয়ে আমি চলে গেলে যদি মানুষ বাঁচে।
কোমরের চোটের জন্য ভালো করে দাঁড়াতেও পারছিলাম না। কোনোমতে একটা গাড়িতে সহকর্মীদের কোলে শুয়ে রওনা হলাম। মেয়ো রোডের কাছাকাছি আসতেই দেখলাম পুলিশের একটা অ্যাম্বাসেডর। অনবরত গুলি চলছে। কাঁদানে গ্যাসের শেল ফাটছে। মানুষ কিন্তু পালায়নি। অনুরোধ করলাম, আমায় ওখানে নামিয়ে দিতে। কিন্তু পুলিশের গাড়িটা আমায় অন্য কোথাও নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিল। সহকর্মী গৌতম বসু স্টিয়ারিং চেপে ধরে গাড়িটা দাঁড় করায়। ঠিক তখনই পিছন থেকে অন্য একটা পুলিশের গাড়ির দরজাটা খুলে গেল এক ঝটকায়। আর ওই গাড়ির দরজাটা এসে সোজা ধাক্কা মারল আমার এলিয়ে পড়া শরীরে। তারপর আর কিছু দেখতে পেলাম না। চোখের সামনে অন্ধকার গাঢ় থেকে গাঢ়তর হয়ে গেল।

জ্ঞান এল হাসপাতালে। চারদিকে অক্সিজেন, স্যালাইন, ডাক্তার। জানতেও পারিনি, কত রাউন্ড গুলি চলেছিল। কত মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। পরে সহকর্মীদের থেকে যা শুনেছিলাম, বীভৎসতায় তা সমস্ত ঘটনাকে ছাপিয়ে গিয়েছিল। লাঠি-পাইপগান-রাইফেল-ইটপাটকেল নিয়ে পুলিশ-সিপিএমের যৌথ সন্ত্রাস চলেছিল সেদিন। আনুমানিক ৫০০ রাউন্ড গুলি চলিয়েছিল পুলিশ। শান্তিপূর্ণ সমাবেশের উপর বিনা প্ররোচনায় ঘোড়সওয়ার পুলিশের বাহিনী উঠে এসেছিল। আমি কৃতজ্ঞ ময়দানের ক্লাবগুলোর কাছে। তারা তখন আর্ত মানুষগুলোকে আশ্রয় দিয়েছিল। তৃষ্ণার্ত মানুষকে খাওয়ার জল দিয়েছিল। বিপন্ন মানুষগুলোর দিকে বাড়িয়ে দিয়েছিল সাহায্যের হাত।
কলকাতার রাস্তায় তখন নিহত-আহতের সংখ্যা বাড়ছে। কলকাতা পুলিশের বড়োকর্তা তাঁর বাহিনীর কৃতিত্বে গর্বিত। আমাদের সহকর্মীরাই এক এক করে আক্রান্তদের হাসপাতালে পৌঁছে দিয়েছেন। শুধু কলকাতার হাসপাতালগুলোতেই ২০০-র বেশি মানুষ ভর্তি হয়েছিলেন, তার তো কোনো লেখাজোখা ছিল না। কিন্তু যুব কংগ্রেসের সংগ্রামী বন্ধুরা ওই বিপদের মধ্যেও নিহত-আহত সহকর্মীদের ফেলে পালাননি। রক্তের দরকারে তাঁরা রক্ত দিয়েছেন। রাতের পর রাত হাসপাতালে জেগে কাটিয়েছেন। আহত সহকর্মীদের বিছানার পাশে দাঁড়িয়ে সাহায্য, আশ্বাস আর বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন।
সেদিন অনেকেই ঘটনাস্থলে মারা গিয়েছিলেন। তিন-চার জন মারা যান হাসপাতালে। পুলিশের গুলিতে মোট ১৩ জনের মৃত্যু হয়েছিল কলকাতার রাজপথে। কিন্তু এত বড়ো ঘটনার পরেও নির্লজ্জ বামফ্রন্ট সরকারের বিবেক দংশন হলো না। মৌখিক শোকপ্রকাশটুকুও করল না সরকার। নস্যাৎ করে দেওয়া হলো বিচারবিভাগীয় তদন্তের দাবি।

আমাদের আন্দোলন ছিল মানুষের হয়ে। মানুষের কথা বলার জন্য। প্রতিবাদের ভাষাকে বাঙ্ময় করে তোলার চেষ্টায় সেদিন আহুতি হয়েছিল বাংলার যৌবনের। কিন্তু তারা বিচার পায়নি। মানবিক দিক থেকে সান্ত্বনা দেওয়া তো দূরস্থান, যাঁরা নির্মমভাবে ১৩টি প্রাণ কেড়ে নিয়েছিলেন, তাঁরাই বড়ো গলা করে প্রকাশ্য জনসভায় বলে বেড়াতে লাগলেন, ওই ১৩ জনের মৃত্যুর জন্য নাকি আমরাই দায়ী। তৎকালীন শাসকদলের এক তাত্ত্বিক নেতা ব্যঙ্গের সুরে বলেছিলেন, ‘শহিদ পরিবারের লোকজন গিয়ে মমতার বাড়ি ঘেরাও করুন!’
আমি কৃতজ্ঞ সমাজের সেইসব বিশিষ্ট এবং প্রণম্য ব্যক্তিত্বের কাছে, যাঁরা সেই চরম দুঃসময়েও আমার পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। আমার মাথায় রেখেছিলেন আশীর্বাদের হাত। চিকিৎসাধীন থাকা অবস্থাতেই তাঁদের অনুপ্রেরণায় সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, সরকারি সাহায্য নয়, সাধারণ মানুষের থেকে সাহায্য নিয়েই শহিদদের অসহায় পরিবারের পাশে দাঁড়াব। হাসপাতালের বিছানায় শুয়েই ‘২১ জুলাই শহিদ স্মারক তহবিল’ গঠনের খসড়া তৈরি করেছিলাম।
বিপদে-আপদে মানুষের পাশে গিয়ে দাঁড়ানো যাঁর স্বভাব, সেই বরেণ্য কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়কে চেয়ারম্যান করে ছ-জনের একটি কমিটিও তৈরি করলাম। যদিও তখনই সমাজের কয়েক জন বিশিষ্ট ভয়ে বা ব্যক্তিগত স্বার্থে পিছিয়ে গেলেন। বাংলার সমস্ত সংবাদপত্রের মারফৎ সাধারণ মানুষের কাছে আবেদন করলাম—ব্যাঙ্ক ড্রাফট অথবা চেক-এ তাঁদের সাহায্য একটা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ব্যাঙ্কে জমা দিতে।

মানুষের সাড়া পেয়ে অভিভূত হয়ে গিয়েছিলাম। ওই ছ-জনের কমিটিতে আমি ছিলাম না কোথাও। কিন্তু আমাদের লক্ষ্য ছিল প্রতিটি পরিবারের জন্য এক লক্ষ করে মোট ১৩ লক্ষ টাকা তোলা। মানুষের আশীর্বাদে অঙ্কটা গিয়ে দাঁড়াল ২০ লক্ষে। নির্দিষ্ট সময়ের পরেও বহু ড্রাফট এবং চেক এসেছিল। কিন্তু আমরা সেগুলো গ্রহণ করতে পারিনি। কৃতজ্ঞতা জানিয়ে ফেরত দিয়ে দিয়েছিলাম।
স্কুলের ছোটো ছোটো বাচ্চারা তাদের টিফিনের পয়সা জমিয়ে, বহু গৃহবধূ তাঁদের সংসার-খরচের টাকা বাঁচিয়ে সেই তহবিলে দান করেছিলেন। বহু চাকুরিজীবী ও শ্রমজীবী মানুষ, বিভিন্ন ট্রেড ইউনিয়নের সদস্যরা তাঁদের একদিনের রোজগার ব্যাঙ্কে জমা দিয়ে শহিদদের স্মৃতি তর্পণ করেছিলেন।
একুশে জুলাই এখনও আমার জীবনের এক ভয়ংকর দুঃখের দিন। শোকের দিন। কিন্তু পাশাপাশিই সমাজ এবং মানুষের সহমর্মী স্বরূপ জানারও দিন। যতদিন বাঁচব, মনে রাখব একুশে জুলাই। ‘অমর একুশে’। এই বাংলার।
সংগ্রমী মা মাটি মানুষ পত্রিকা ২১ জুলাই ২০১৭ সংখ্যায় প্রকাশিত