মোড়টা চোখে পড়তেই যেন ট্রাক অটো আর মানুষের সংখ্যা বেড়ে যায়। বাসটা থামবে মোড় ছাড়িয়ে, যত দূর মনে পড়ে, সিনেমা হলটার উলটো দিকে। দরজার সামনে দাঁড়ানো আঠারো উনিশের দুটি ছেলে নামব-কি-নামব-না করতে করতে মোড় আসামাত্র লাফিয়ে পড়ে। পিছনে অধৈর্য জনাদুই যাত্রী এর পর পরমেশকে তাড়া দেয়।
দুপুর নাগাদ বৃষ্টি হয়ে থাকবে। পচা পাতা আর জঞ্জাল কাদার সঙ্গে মিশে থকথক করছে। একটা অটো আচমকা বাঁ দিকে ঢুকে পড়তে থাকে। ছোকরা ড্রাইভার একবার আড়চোখে পরমেশকে দেখে নিয়ে চেঁচিয়ে ওঠে, বারিকপুর, বারিকপুর। পরমেশ থেমে-পড়া অটোর গায়ে হাত রেখে কোনও ক্রমে টাল সামলায়। একটু দাঁড়িয়ে বাসটার না চলে-যাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করে। পিছনে নামতে থাকা লোকগুলির কেউ অন্তত অটোর ছোকরাটাকে কিছু বলবে বলে সে আশা করেছিল। ঠাসাঠাসি লোক উঠিয়ে অটোটা বারাকপুরের দিকে রওনা হওয়ার পর, চটির ভিতর ঢুকে যাওয়া প্যাচপ্যাচে কাদা নিয়ে কোনওমতে রাস্তার একপাশে সরে আসে। বহুকাল আগে সেজোকাকি বলেছিল, জায়গাটা খারাপ। পরমেশের মনে আছে। তখনও সে চাকরিতে জয়েন করেনি। যতদূর মনে পড়ে, অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটার পাওয়ার পরদিন।
—হঠ যাও, হঠ যাও।
একটা ঠেলা। পরমেশ বাঁদিকে একটু এগিয়ে একটা পান-বিড়ি-সিগারেটের দোকানের সামনে দাঁড়ায়। পিছনে, যে-রাস্তাটা গঙ্গার দিকে চলে গেছে, সেখানে একটা ট্রাক পুরোপুরি ঘুরতে না পেরে রাস্তার মুখ আটকে দাঁড়িয়ে, ঠেলার পাশে একটা অটো। ভিতরে ঠাসাঠাসি অন্তত আট-ন’জন। বউ-বাচ্চা-পুরুষ, দু’জনের শরীর বোরখায় ঢাকা। কালো। অটোচালক বাইশ-পঁচিশের ছোকরা। মুখে বাংলা হিন্দি মিশিয়ে উদ্দাম খিস্তি করছে। ট্রাক ড্রাইভার জানালা দিয়ে মুখ বের করে তাকিয়ে। পিছনের সবুজ রঙের ডালায় সাদা রঙে লেখা, আবার দেখা হবে। ভিড়ের মধ্যে থেকে চার-পাঁচজন হঠাৎ ছুটতে শুরু করে। এম ফাইভ— এম ফাইভ। পরমেশ তাকায়। উপচে পড়া ভিড় নিয়ে লাল-সবুজ রঙের যে-বাসটি এসে দাঁড়ায়, তার মাথায় পাঁচ সংখ্যাটি ইংরেজিতে লেখা। দূরে জুটমিলের চিমনি থেকে বের হওয়া ধোঁয়া পাক খেয়ে ওপরে উঠছে। পান-বিড়ি-সিগারেটের দোকানে টেপ বাজছে। গানটা হিন্দি অথবা উর্দুও হতে পারে। একজন কেউ গলা কাঁপিয়ে দু’-একটা কথা বলার পরমুহূর্তেই কারা যেন ধুয়ো ধরছে। বিড়ি সিগারেট ধরাবার আগুন জ্বলছে পাকানো নারকেল দড়িতে। পাশে সাউণ্ড বক্সের গায়ে লাল আলো জ্বলছে আর নিভছে। পিছনের শো-কেসে কনডোমের প্যাকেটে লেখা, মিস্টিরিয়াস নাইট। চেক-লুঙ্গি পরা একটা ছেলে হঠাৎ থুক করে রাস্তায় পানের পিক ছিটকে চেঁচিয়ে ওঠে, মার শালাকো। তার এই আচমকা চিৎকারে যেন জুটমিলের সেই ধোঁয়া ভেঙে পড়ে। ক্রমে গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে মিলিয়ে যেতে থাকে।
—একটু জল হবে ভাই? থোড়া—
—ক্যা?
—থোড়া পানি, কল আছে কোথাও?
একটু পিছিয়ে রাস্তার ধারেই পরমেশ কলটাকে আবিষ্কার করে। মিউনিসিপ্যালিটির পিছনে রাস্তার দিকে তাকায়। ওপাশে সিনেমা হলটার বিশেষ কিছুই পরিবর্তন হয়নি। লাল আলোয় ইংরেজি হরফে হলের নাম ফুটে আছে। গেটের ওপর বিশাল ব্যানার। বন্দুক হাতে একটা বছর কুড়ির মেয়ে। গায়ে আঁটোসাঁটো জামা এবং শর্টস। হাতের বন্দুক রাস্তার দিকেই তাক করা।
পরমেশকে এখন একটু এগিয়ে মোড় থেকে ডান দিকে ঘুরতে হবে। সেই পান-বিড়ি-সিগারেটের দোকানের পাশ দিয়ে গঙ্গার দিকে যাওয়ার রাস্তাটা তার ধরার কথা। পুরো এলাকাটা জুড়ে দু-দুটো বিশাল জুটমিল আর অসংখ্য ছোটবড় কারখানা। সেজোকাকি বলেছিল, লক-আউট হলে বা দেশে ফসল কাটার সময় ওদের অনেকেই গ্রামে ফিরত। বিহার, ইউ-পি। বল্মীক সিং ইউপি-র। সেজোকাকির কথামতো, বল্মীক বাবার কাছেই আসত প্রায় বাড়ির লোকের মতোই। ওর গ্রামের কথা গল্প করত, ওর মা-বাবা, ঘর— এমনকী পাশের গ্রামে ঠিক-করে-রাখা একটি মেয়ের কথাও নাকি বলেছিল একদিন। আধা-হিন্দি আধা-বাংলা। যতদূর মনে পড়ে, সেজোকাকি বল্মীকের চেহারার একটা বর্ণনাও দিয়েছিল। সেজোকাকি বলেছিল, ছবির বয়স তখন কত, তেইশ-চব্বিশ। পরমেশের তখন ছয় কিংবা সাত। সেজোকাকির হিসেবমতো বল্মীকের তখন উনিশ-কুড়ি। মেয়েরা এই সব কী চমৎকার মনে রাখে। এখন যদি কেউ সীমার বয়স জিজ্ঞেস করে, পরমেশকে বার্থ সার্টিফিকেট দেখতে হবে, আর সাবিত্রী হয়তো আঙুল গুনে বলবে, আমাদের বিয়ে হল আটষট্টি, সেজোপিসির ছেলে বাইরে গেল জানুয়ারিতে—’এই ভাবে বিড়বিড় করে ঠিক হিসেব মিলিয়ে দেবে।
হোর্ডিংয়ের মেয়েটা এখনও তাকিয়ে। হাতে পিস্তল। পিছনে মোটরসাইকেলের ওপর ছেলেটা কে? চোখে কালো রঙের রোদ-চশমা। নায়ক নির্ঘাত, আবার পাকাচুল একটা বুড়োও। হাত উঁচিয়ে কী যেন বলছে। হয়তো মেয়েটার বাবা। না কি ছেলেটার? মেয়েটির শরীরে আর একটু পোশাক দিলে ভাল করত। হাসি পায় পরমেশের। এক সময় সেও কিছু কম সিনেমা দেখেনি, মধুবালা, মীনাকুমারী।
—দাদু। একটু দেখে।
দেখো কাণ্ড। সমবয়স্ক না হলেও কত আর ছোট হবে, লোকটার বয়স অন্তত চল্লিশ। পরমেশকে দাদু বলে বসল! ইদানীং কেউ কেউ অবশ্য বলে ফেলছে, এমনকী আজ স্টেশনেও সীমার সামনেই টিকিট কাউন্টারের লোকটা টাকা ফেরত দেওয়ার সময় বলল, এই যে দাদু। সীমা রেগে যায়। আসলে লোকের আর দোষ কী! চুল উঠে মাথা প্রায় ফাঁকা। যাও বা আছে— সাদা। এর ওপর চোয়াল ভাঙা আর রোগা পরমেশকে দেখে চুয়ান্ন না কি চৌষট্টি, বোঝা হয়তো সত্যিই মুশকিলের। অথচ সেজোকাকি বলত, তুই পেয়েছিস তোর মায়ের চুল। ওরা নাকি হিংসে করত। সেবার দেখা করতে যাওয়ার আগে বলছিল, ‘ওর চুল দেখবি, কোমর অবধি, কুচকুচে। দেখা অবশ্য হয়নি। বাবা আর সেজোকাকাকে না জানিয়েই যেতে হয়েছিল তখন। আসলে পরমেশ বড় হয়েছে ততদিনে। বছর পঁচিশ বয়েস, হাতে অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটার। কী যে হয়েছিল হঠাৎ তখন।
সীমাকে এখন মাঝে মাঝে মায়ের সঙ্গে মিলিয়ে দেখার ইচ্ছে হয়। সবাই বলে ও নাকি হয়েছে ওর বাবার মতো, অর্থাৎ পরমেশের মতোই। সেজোকাকি বেঁচে থাকলে পরমেশ ঠিক জানতে চাইত। বিয়ের আগে পরমেশকে দেখতে এসে সাবিত্রীর কাকা মায়ের কথা জানতে চেয়েছিল। সেজোকাকু বলেছিল, সে তো ও ছোট থাকতেই, হ্যাঁ, আমরা তখন— ।
ট্রেন ছাড়ার পর সীমা বলেছিল, সাবধানে থাকবে, মায়ের সঙ্গে ঝগড়া কোরো না কিন্তু।
যতদূর মনে পড়ে, একটা মসজিদের পাশ দিয়ে বাঁ দিকে। জায়গাটার নাম মনে থাকলে রিকশা নেওয়া যেত। ‘খয়ের ছাড়া একটা সাদা পান দেখি’ বলে পরমেশ পকেটে হাত দেয়। গা’টা ঘিন ঘিন করছে। চটির ভিতর কাদা আর জলের প্যাচপেচে অনুভূতি। এমনিতে কোনও নেশা নেই পরমেশের। বড়জোর নিমন্ত্রণ বাড়ি গিয়ে শখ করে একটা দুটো সিগারেট, ব্যস। এটাকে কোনও মতেই নেশা বলা যাবে না, যেমন আছে সাবিত্রীর। পরমেশ বহু দিন বারণ করেছে। দাঁতগুলি নষ্ট হবে বলে সতর্ক করেছে। তা চমৎকার দাঁতগুলির কী হাল হয়েছে দেখ। পান হাতে নেওয়ার ফাঁকে পরমেশ একবার রাস্তার দিকে তাকায়। বাস-ট্রাক-অটো-ঠেলার এই জটলার মধ্যে দিয়ে এখানকার মানুষজন কেমন নির্বিকার হেঁটে যাচ্ছে।
—আচ্ছা, মসজিদটা এখান থেকে কত দূর বলতে পারেন ভাই? লোকটা পরমেশের দিকে তাকায়। বলে, কোনসা মসজিদ?
—ওই যে এক মোড় কা উপর একঠো মসজিদ হ্যায় না।
পরমেশ হিন্দি বলার চেষ্টা করে।
—কৌন মসজিদ? বড়া মসজিদ? ছাইগাদা মইদান কা মসজিদ ইয়া দাসুবাবু বাগানকা, আপ— ।
একটা রিকশা হলে হত, কিন্তু এত বছর পর বল্মীক সিং নামটা ছাড়া এখানকার আর কোনও নাম পরমেশ এখন মনে করতে পারছে না।
সেজোকাকি বলেছিল, তোর মার থেকে বয়েসে কিছু ছোট হবে। ওইটুকু। সেবারও শুধু ওইটুকু সম্বল করে এসেছিল পরমেশ। চাকরিতে জয়েন করার দিনকয়েক আগে। অন্তত বছর ত্রিশ আগেকার কথা। হিসেবমতো তখন পরমেশের চব্বিশ অথবা পঁচিশ। সেজোকাকি জানতে চেয়েছিল, দেখা হলে কী বলবি? চিনতে পারবি? চটের পরদার আড়াল থেকে সেবার কেউ বলেছিল, ‘ইধার ছবিজি উবিজি কোই নেই—।’ পুরুষকণ্ঠ। লোকটা বাইরে বেরিয়েছিল। সেজোকাকির কথামতো লোকটাকে মেলাবার চেষ্টা করেছিল। পরমেশ। ‘ভাগো হিয়াসে’, বলে লোকটা ধমকে দিয়েছিল। প্রায় দৌড়ে পালিয়ে আসার আগে পরমেশ যেন কাচের চুড়ির আওয়াজ পেয়েছিল। যেন আচমকা অস্থির হয়ে ওঠা কোনও হাতেই ওই চুড়ি পরা ছিল। সেজোকাকিকে সম্ভবত সেই কথা আর বলা হয়ে ওঠেনি। আজ ট্রেন ছেড়ে দেওয়ার পর সীমা যখন বলল, ‘সাবধানে যেও, মায়ের সঙ্গে—।’, তখন জানালা দিয়ে বিকেলের আলো ওর মুখে কিছুটা জায়গা জুড়ে ছড়ানো, যেন ট্রেনটা চলতে শুরু করলেই সেটা ছিটকে সরে যাবে, অজুর ডান হাতটা তুলে ও পরমেশকে দেখিয়ে তখন বলছে, ‘দাদুকে টা-টা করে দাও।’
মেয়েটার শরীরে আর একটু পোশাক দিলে পারত। চোখ দুটোর কী এক কৌশল যে, সে এখনও যেন পরমেশকেই দেখে। হাতে পিস্তল, আর যেন এক্ষুনি চিৎকার করে উঠবে, হল্ট, হ্যাণ্ডস আপ। পরমেশ চোখ সরায়। বেঁচে থাকলে মায়ের বয়স এখন অন্তত সত্তর।
মালা বিক্রি হচ্ছে। ফুল। সাদা লাল নীল। কিছু পরমেশের চেনা। বেল, রজনীগন্ধা, গাঁদা। বাঁ দিকে দেওয়ালের গায়ে ড্রেনের পাশে সার দিয়ে রাখা খাট। কাঠের। সস্তা। ড্রেনের লাগোয়া দেওয়াল একটা লোহার গেটে গিয়ে শেষ হয়। হাসপাতাল। ওপরে ইংরেজিতে লেখা নাম। নীচে গ্রিল। কোনও কারুকাজ নেই। নতুন। বহু কাল আগেকার স্মৃতিতে পরমেশ এই হাসপাতালকে খুঁজে পায় না। এতক্ষণে ড্রেনের পাশে দাঁড় করিয়ে রাখা খাটগুলির তাৎপর্য সে বুঝতে পারে। এবং ফুলেরও। ডান দিকের দেওয়ালে সেঁটে দেওয়া সিনেমার পোস্টার। যত দূর মনে পড়ে, ওটা জুটমিল।
—ক্যা, বাবু?
ওহ্, সে খেয়াল করেনি। ডান দিকে দেওয়াল দেখতে গিয়ে এক বৃদ্ধের পা মাড়িয়ে দিয়েছে। কালো, রোগা। চোখে চশমা। ভাঙা কাচ। একটা গুটি সুতো দিয়ে কানের সঙ্গে পেঁচিয়ে রাখা। থুতনিতে দাড়ি। ডান দিকের দেওয়ালে প্রায় ন্যাংটো একটি মেয়ে। প্রায় না বলে ন্যাংটো বলাই ভাল। নাভির নীচ থেকে উরু অবধি একটুকরো কাগজ দিয়ে ঢাকা। হলের নাম। শো-টাইম, একটা-চারটা-সাতটা।
কোথাও ডুগডুগি বাজছে। পরমেশ তাকায়। সামনে রাস্তার বাঁ পাশে কিছু বাচ্চা সার দিয়ে বসে। হাততালি দিচ্ছে। অগর কোই দাদ, হাজা—। বাচ্চারা ছাড়াও জনাতিনেক লোক গালে হাত দিয়ে। কেউ বা খাপছাড়া দাঁড়িয়ে, যেন উঁকি মেরে চলে যাওয়ার জন্যই। বানরটা সম্ভবত নাচতে চাইছে না। একটা লোক দড়ি ধরে বসে। বিড়বিড় করছে। বাচ্চারা হাততালি । দিচ্ছে। লোকটা চেঁচিয়ে উঠল হঠাৎ, নাচ শালি, কলকাত্তাওয়ালি— । হাতের বেত দিয়ে মাটিতে আঘাত করছে। ধুলো উড়িয়ে শব্দ হচ্ছে। সপাৎ সপাৎ— । পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় পরমেশ একটু দাঁড়ায়। একটা লাল কাপড় পাতা। একটা বাচ্চা ছেলে অথবা মেয়ে, মাটিতে শুয়ে, মাথা সাদা কাপড়ে ঢাকা। বাঁদরটা জড়সড় দাঁড়িয়ে। লোকটা দড়ি ধরে টানছে। হ্যাট শালি। বাঁদরটার গায়ে লাল ব্লাউজ। মাটিতে শব্দ হচ্ছে, সপাৎ- সপাৎ— ।
একটি মসজিদ। জানালার লাল, সবুজ আর নীল কাচের নকশা চোখে পড়ছে। দোতলার কার্নিস থেকে একটা দড়ি ঝুলছে। সাড়ে চারটে। বাস থেকে নেমে মিনিট কুড়ি হাঁটা হয়ে গেল। সম্ভবত এটাই। পরমেশ স্মৃতি থেকে মসজিদের চেহারাটা মিলিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। কারা যেন সুর করে গান গাইছে। ভিখিরি-টিখিরি হবে। বেশ একটা করুণ সুর। ক্রমে চড়া থেকে নীচে নেমে ভেঙে গুঁড়ো হয়ে যেন মিলিয়ে যেতে থাকে। ভ্যাপসা এই ভিড়ের মধ্যেও বেশ একটা মন কেমন করা অনুভূতি। হয়তো দেশগ্রামের কোনও গান। বিহার অথবা ইউ-পির। একটু চা হলে হত। এখানে গোটা রাস্তা জুড়েই বাজার অথবা হাঁটার জায়গা। আলাদা করে কিছু নেই। সাইকেল অনর্গল বেল বাজিয়ে যাচ্ছে। থামছে না। রিকশাগুলি পক্-পক্ শব্দ করে গায়ের ওপর দিয়েই গাড়ি বের করে নিয়ে যাচ্ছে।
—ছামিয়া, আরে হে রে ছামিয়া—
পরমেশ চমকে ওঠে। তাকায়। হঠাৎই সে টের পায়, দিনটা চলে যাচ্ছে। বস্তি আর দোকানঘরগুলির ভিড় কাটিয়ে জেগে থাকা জলের ট্যাংকের ভেজা শরীর বিকেলের রোদ পেয়ে চকচক করছে। পরমেশ ফের ভিড়ের বাইরে তাকায়। সে অপেক্ষা করে। ‘আহ্, ছামিয়া’ ডাকের সেই টান এই দিনটাকে যেন আটকে দেয়। যেন জলের ট্যাংকের গায়ে সেই আলো থাকে। এক নারীমূর্তির ছবি মনে পড়ে। জানালার পাশে রাখা আয়নায় চোখ রেখে কেউ চুল বাঁধে, দাঁত দিয়ে চেপে রাখা রঙিন ফিতে ওড়ে। পরমেশ সেই ডাকের উৎস খোঁজে। একরাশ মাথা ছাড়া এখানে কিছুই চোখে পড়ে না।
জুটমিলের ভোঁ পড়ল। একটা জমাট বাঁধা ভিড় গেটের বাইরে এসে যেন ফেটে পড়ে। গেটে দাঁড়িয়ে দুই দারোয়ান ওদের পকেট হাতড়াচ্ছে। কারও ভ্রূক্ষেপ নেই। কেউ বা বাস, কেউ বা পাঁচটা আটত্রিশের ট্রেন ধরবে। পরমেশের আচমকা বড় রাস্তায় বাসস্ট্যাণ্ডের উলটো দিকের হোর্ডিংয়ের কথা মনে পড়ে। রাস্তার দিকে পিস্তল তাক করে মেয়েটা এখনও দাঁড়িয়ে।
চা খেতে খেতে পরমেশ খোঁজ নেওয়ার চেষ্টা করে। বল্মীক সিং, হ্যাঁ, বছর পঁয়ষট্টি হবে— যদি অবশ্য বেঁচে থাকে এখনও। হ্যায় কোই? সে হিন্দিতে বোঝাবার চেষ্টা করে। দুদ্দাড় করে একটা ম্যাটাডোর ভ্যান ছুটে যায়। ধুলো। পরমেশ হাত দিয়ে গ্লাস ঢাকে। ওদের একজন ঘাড় নাড়ে। বিড়বিড় করে বলে, বল্মীক, বল্মীক—! পাশের লোকটাকে ডেকে বলে, সমঝা ?
দোকানটা বড়ই। একজন চা তৈরি করছে। একজন পয়সা নিচ্ছে। মাঝে দুটো বছর বারো-তেরোর ছেলে খরিদ্দারের হাতে চা ধরিয়ে দিয়ে আসছে। বেশি দুধের চা, সঙ্গে এলাচের ঘ্রাণ। বাড়ি ফিরে সাবিত্রীকে বলতে হবে। ও নির্ঘাত অবাক হবে। সীমা থাকলে হয়তো ডেকে বলবে, তোর বাবার কথা শোন, কোখেকে কী দেখে এসেছে, বুড়ো বয়সে। সাবিত্রীর মুখে বুড়ো বয়সে কথাটা শুনতে বেশ মজাই পায় পরমেশ। —কোন মহল্লামে? ছাইগাদা? আর ফুলবাগান, ইস ইলাকামে?
পরমেশ জানে। বুঝতেও পারছে। হাজার হাজার নাকি লাখ— যেদিকে তাকানো যাচ্ছে শুধু মাথা। রাস্তার দু’পাশে দেওয়ালময় বিজ্ঞাপন। আবছা অন্ধকারে দু’টি শরীর যেন মিশে যাচ্ছে। নির্ঘাত এক যুবক আর এক যুবতীর। মাইকের বাংলা, হিন্দি আর উর্দু এখনও কানে আসছে, আগর কোই গনোরিয়া সিফিলিস। একজন পরমেশকে বলল, বাঁ দিকে মিনিট পাঁচ। একটা দোকান, গোল্ডেন স্টোর্স, তার গা দিয়ে সরু গলি। আপনি বরং ইরশাদ ভাইয়ের— ।
—ছামিয়া ইরে ছামিয়া!
পরমেশ তাকায়। চায়ের দোকানের আড়ালে একটা দেওয়ালের পাশে। অন্ধকারে কেউ বসে। শীর্ণকায়। কালো। গায়ে একফালি কাপড়। একটা বালতি। সামনে জড়ো করা ছাই। ঘুটে দিচ্ছে। দূরে বছর পাঁচেকের একটা বাচ্চা মেয়ে। ডাঁই-করে-রাখা জঞ্জালের স্তুপ থেকে কিছু একটা খুঁজে বের করেছে। রঙিন কাপড় কিংবা কাগজ। মেয়েটি একবার ঘাড় ফিরিয়ে তাকায়।
পরমেশ বাঁ দিকে ঘুরে একটা নতুন রাস্তা পেয়ে যায়। একটা দোকানের মাথায় গোল্ডেন স্টোর্স’ লেখা সাইনবোর্ড ওর চোখে পড়ে। বিবরণ অনুসারে গোল্ডেন স্টোর্সের গা দিয়ে ঢুখে পড়া সরু গলি থাকার কথা। ঝাঁঝালো গন্ধ আসছে। বছর চোদ্দো-পনেরোর একদল ছেলে সম্ভবত মাঠ থেকে ফিরছে। পরমেশ ওদের পথ করে দিতে গিয়ে টাল সামলে উঠতে পারে না। ডান পায়ের গোড়ালি পিছনের নর্দমায় প্রায় বসে যায়। একটা বাচ্চা নর্দমার পাশে বসে। তার এই অপ্রস্তুত অবস্থায় ছেলেদের মধ্যে কেউ, ‘ইয়াঃ’ বলে চিৎকার করে ওঠে। হাততালি দেয়। নর্দমার পাশে বসে থাকা বাচ্চাটি আচমকা উঠে দাঁড়ায়। তার একটা হাত হাঁটু অবধি নেমে পড়া প্যান্ট সামলায়। পরমেশের দিকে তাকিয়ে সে অবাক। গোল্ডেন স্টোর্সের সামনে দাঁড়িয়ে পরমেশ নিজের পায়ের দিকে তাকায়। চটি-সহ পা ঝাঁকায়। কিছু ময়লা পা থেকে আলাদা হয়। ডুগডুগিটা এখনও বাজছে। বাঁদরটা কি তবে নাচ শুরু করল? ছেলেগুলোকে এখন আর দেখা যাচ্ছে না।
—কিসিকো ঢুণ্ড রহা হ্যায়?
—পানি হ্যায়? কল? জল আছে এখানে? একজন ডান দিকে হাত তুলে দেখায়, একটু পুরনো রেললাইন, লাইন জুড়ে বাজার। খটাস করে একটা শব্দ হল। বন্দুকের টিপ করছে কেউ। বেলুন ফাটছে। লাল, সবুজ, নীল। একটা টাইমকল। ফাঁকা। কেউ দাঁড়িয়ে নেই। জল পড়ছে। অল্প। সরু সুতোর মতো। চটিটা খুলে পা থেকে আলাদা করতেই পরমেশ বিশ্রী গন্ধটা টের পায়।।
—ইরশাদ ভাই কে আছে? ইরশাদ গোল্ডেন স্টোর্সের সামনে বসা ছিট ছিট লুঙ্গি পরা একজন উঠে দাঁড়ায়। দোকানের ভিতর বসে থাকা মাঝবয়সি লোকটার সঙ্গে কী ফিসফিস করে। রাস্তার দিকে তাকায়।
—কিসকো চাহিয়ে? ভনিতা না করে পরমেশ বল্মীকের কথা জানতে চায়।
—উমর কিতনা?
—ষাট-পয়ষট্টি হবে। পরমেশ অনুমানের চেষ্টা করে।
লোকটি, কী যেন হাতড়ায়। আনমনা ‘বল্মীক, বল্মীক—’বলে কয়েকবার যেন বিড়বিড় করে। দোকানে বসে থাকা কে একজন ইরশাদকে ডাকে।
‘ওর বউ বাঙালি’— কথাটা বলবে ভেবেও লোকটি উঠে যাওয়ার উপক্রম করতেই পরমেশ বলে, বল্মীক ইউ-পির, সম্ভবত জুট মিল।
একটা গম ভাঙানোর দোকান চলছে। ঘর-ঘর-ঘর-ঘর শব্দ হচ্ছে একটানা। সিমেন্টের মেঝে কাঁপছে। গমের ব্যাগ নিয়ে জনা দুই বাচ্চা দাঁড়িয়ে। আটার গুঁড়ো ভাসছে বাতাসে।
—সিধা যাইয়ে, এক কাপড়াকা দুকান, সিলেক্ট স্টোর্স পিসাবখানা।
এখানে কিছুই পাল্টায়নি। তার থেকে ঝুলে থাকা কাপড়, আণ্ডারওয়ার। দু’পাশে বাঁশের বেড়া দিয়ে ঢেকে দেওয়া বারান্দা, সার দেওয়া ঘর, খাটিয়া। খাটিয়ায় শুয়ে থাকা লোকগুলির নির্লিপ্ততা এবং উনুনের ধোঁয়া। পরমেশের হঠাৎ মনে হয়, সময়টা যেন আটকে আছে। সব ক’টা ঘর দেখতে একই রকম। পরমেশ একটা খাটিয়ার কাছে যায়। খাটিয়ায় শুয়ে থাকা লোকটা কাকে যেন ডাকে। উনুনের ধোঁয়া দলা পাকিয়ে ধীরে শুয়ে থাকা লোকটার ঘরে ঢুকছে। কেউ সাড়া দেয় না।
—কিসকো মাঙ্গতা?
পরমেশ অবাক। হ্যাঁ, খাটিয়ায় শুয়ে থাকা লোকটাই জানতে চায়, কিসকো মাঙ্গতা? পরমেশ জানায়, সে একজনকে খুঁজছে। বল্মীক সিং, ইউ-পির এবং অনেক দিন আগে এখানে একবার আসার ব্যাপার উল্লেখ করে, যদিও ত্রিশ বছরের ব্যবধানের কথাটা বলা হয়ে উঠে না।
—উয়ো তো ইস ঘর ছোড়কার চলা গ্যয়া।
—কোথায়?
লোকটা শুয়ে থেকে ঘাড় কাত করেই কথা চালিয়ে যায়। একটা বাচ্চা ছেলে খাটিয়ার পাশে লোকটার গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে। ছেলেটা পরমেশকে দেখছে। পিছনের ঘরে কেরোসিন ল্যাম্প। গাঢ় আর কালো ধোঁয়া দরজার গা বেয়ে বাইরে আসছে। সাইকেল হাতে নিয়ে একটা লোক সম্ভবত পাশের ঘরের, একবার ঘাড় ফিরিয়ে পরমেশকে দেখে নেয়। সাইকেলের ধাক্কায় দুটো মুরগির বাচ্চা কঁক-কঁক শব্দ করে দু’পাশে ছিটকে যায়। লোকটা ঘরে ঢোকার আগে বারান্দায় বাঁশের খুটির গায়ে সাইকেলটাকে হেলান দিয়ে রাখে। খাটিয়ায় আধশোয়া অবস্থায় থাকা লোকটা শব্দ পেয়ে ঘুরে তাকায়। পাশের মসজিদ থেকে আচমকা আজানের ধ্বনি ওঠে। আল্লা-আ-আ হো-আকবর— । পরমেশ আকাশের দিকে তাকায়। সীমা এখন নিশ্চয়ই বাড়ি পৌঁছে গেছে। সাবিত্রী এখন কী করছে?
—কিসকো মাঙ্গতা?
পরমেশ চমকে ওঠে। সাইকেল নিয়ে আসা লোকটা পরমেশের দিকে স্থির তাকিয়ে। পরমেশের চেয়ে অনেকটাই লম্বা। বয়স বোঝার উপায় নেই। ত্রিশ থেকে পঁয়তাল্লিশের মধ্যে। এদিকের রাস্তায় আলো আসেনি।
—বল্মীক সিং।
—তুম কৌন?
লোকটার প্রশ্নের ধরনে পরমেশ চমকায়। লোকটার চেহারা, চাউনি, গলার আওয়াজ আর সর্বোপরি চেপে বসা অন্ধকার পরমেশকে দুর্বল করে। আল্লা-আ-আ-হো-ও-ও। আজানের ধ্বনি কাঁপতে থাকে। মহল্লা থেকে মহল্লায় ক্রমে ছড়িয়ে পড়তে থাকে। নিজের সম্বন্ধে কী যে বলা যায়, পরমেশ ঠিক করে উঠতে পারে না।
—ওর সঙ্গে দরকার আছে একটু।
—উও তো দাশুবাবু বাগানমে চলা গ্যয়া— লগভগ দশ সাল।
আশহাদো আলা— মোহাম্মাদার রসুলুল্লা-আ। আজানের ধ্বনি ভাঙতে থাকে। কোথাও যেন গহ্বর তৈরি হয় একটা। হা-হা-করা সেই গহ্বর যেন পরমেশকে টেনে নিতে থাকে। লোকটা ইতিমধ্যে দরজা খুলে ঘরের ভিতর ঢুকে পড়ে। খাটিয়ায় শোওয়া লোকটা এখন অন্য দিকে মুখ ঘুরিয়ে সম্ভবত ঘুমিয়ে নিচ্ছে। পরমেশ যখন বাইরে বেরিয়ে আসছে, আচমকা কেউ যেন বলে উঠে, হনুমানজিকো মন্দিরকো বগলমে যো মহল্লা হ্যায়—
মসজিদের পাশ দিয়ে এগিয়ে যাওয়ার সময় আবার সেই সুর কানে আসে। বিলাপ। সুর ক্রমে স্পষ্ট হয়। মসজিদের কাছে ভিড় বাড়ে। পরমেশ একবার মসজিদের ঘড়ির দিকে তাকায়। সোয়া পাঁচ। সূর্যকে এখান থেকে আর দেখা যাচ্ছে না। মসজিদের দোতলায় লাল-নীল-সুবজ-এর নকশা জ্বলজ্বল করছে। সামনের দিকে পুরনো আমলের কয়েকটা বাড়ি। পিছনে সার দেওয়া বস্তি। সুরটা এখন স্পষ্ট। শুধু সুর নয়, যেন কিছু কথাও আছে। ব্যথা আর কান্না যেন জড়িয়ে আসে। হয়তো বা ধর্মের কোনও নিবেদন। যেন বা ঈশ্বরের পায়ে নিজেকে বিলিয়ে দেওয়ার এক বিশেষ ভঙ্গি। ঝন্ করে শব্দ হয়। কেউ পয়সা ছুড়ছে। পরমেশ পকেটে হাত দেয়। ভিড়ের প্রান্তে আসে। কুষ্ঠরোগী। একের পর এক। শুয়ে। হাত-পা নাড়ছে। গা দগদগ করছে। বিলাপ করছে। পরমেশ এখন স্পষ্ট শুনতে পায়, ভিক্ষা চাইছে। ‘বা-বু-উ’ শব্দটা ভেঙে ভেঙে কী চমৎকার এক উচ্চারণের কৌশল যে, পরমেশ এতক্ষণ এটাকে কোনও পরবের গান বলেই ভেবেছে। সে পকেটে হাত দিয়ে একটা কুড়ি পয়সা বের করে। ঝ-ন্-ন্ শব্দ হয়। পরমেশ ফের ঘড়ির দিকে তাকায়। প্রসূন কি ফিরেছে? সাবিত্রী হয়তো ছাদে কার্নিসের পাশে চেয়ার পেতে বসে।।
রাস্তাটা এক সময় সরু হতে থাকে। দু’পাশের ড্রেন হাত চারেকের ব্যবধানে চোখে পড়ে। এক সময় এটা হয়তো পাকা রাস্তাই ছিল। এখন পিচ বা খোয়া কোনওটাই নেই। রাস্তা দু’পাশ থেকেই ভেঙেছে। ড্রেনের জল। কেমন চিকচিক করছে দেখ। কেমন লাল, সবুজ, নীল। সম্ভবত তেল ভাসছে। পাশের ফ্যাক্টরি থেকে বেরিয়ে এসেছে হয়তো।একটা মন্দির দেখে পরমেশকে থামতে হয়। পাশে একটা তেলেভাজার পাশে জমতে থাকা ভিড়ের দিকে তাকায়।
—কিছু হয়? তেলেভাজাওয়ালা লোকটার কাছে সে জানতে চায়।
—কী?
—এই যে স্বপ্নের ওষুধ –
—ধ্যার, উলটোপালটা গাছের ছাল না নিয়ে বরং স্টোনই—
একটা খেলনা সাপ রাস্তার অর্ধেকটা জুড়ে এঁকেবেঁকে একবার ডান দিক থেকে বাঁ দিক, ফের বাঁ দিক থেকে ডান দিক করছে। জনাপাঁচেক বাচ্চা দাঁড়িয়ে। অজুর অন্য কিছু কিনলে হয়। অন্তত একটা চাবি দেওয়া মানুষ। দম দিয়ে ছেড়ে দেওয়ামাত্র কেমন হাত-পা ছুড়ছে দেখ। লোকটার কাছ থেকে তেলেভাজা কেনায় পরমেশ ওর কাছে বেশ কিছুটা সহজ হতে পারে। এবং দাশুবাবুর বাগানের কথা জিজ্ঞেস করে।
তেলেভাজাওয়ালা ভুল ভাঙায়। সামনেরটা হনুমান মন্দির নয়। শিবের। পাশেই গঙ্গা। হনুমানজির মন্দির একটু এগিয়ে বাঁ দিকে, পাশে টি.ভি-র দোকান। একটা মোটর সাইকেল আসছে। আচমকা ভটভট শব্দে এস্ত পরমেশ রাস্তা থেকে কিছুটা বাইরে সরে আসে। এ দিকটায় ভিড় একটু কম।
—আপনি মনে হয় নতুন। কয়েক বছরের মধ্যে—
ওর আন্তরিক আর সহজ কথাবার্তা পরমেশের ভাল লাগে। জানতে চায়, এখানে সে কতদিন ধরে ব্যবসা করছে।
—তা ধরুন বছর পঁচিশ।
পরমেশ অবাক। লোকটাকে দেখলে বছর পয়ত্রিশের বেশি মনে হয় না। বেগুনির অর্ধেকটা কামড়ে মুখের ভিতর নেওয়ার পরে সে অস্বস্তিতে পড়ে, গরম। মুখ হাঁ করে বাতাস ছাডে। হাতে ধরে রাখা বেগুনির অর্ধেকটা থেকে তখনও ধোঁয়া বের হতে থাকে।
—একটা কথা জিজ্ঞেস করব?
—বলুন?
—তুমি বল্মীক সিং বলে কাউকে চিনতে? বছর বিশেক আগে—
লোকটা গরম তেলে পিঁয়াজি ছাড়ছে। বুদবুদ ভাঙার শব্দ হচ্ছে। এক ভদ্রলোক আর এক ভদ্রমহিলা পাশে এসে দাঁড়ায়। ভারী চেহারার। দেখে বাঙালিই মনে হয় পরমেশের।
—সম্ভবত এক বাঙালি ভদ্রমহিলাকে—
একটা মিছিল আসছে। আচমকাই পরমেশ এটা লক্ষ করে। কোনও শব্দ নেই। বা হঠাৎ করেই মিলিয়ে গেল যেন।
পরমেশ তেলেভাজার গাড়ির আড়ালে গিয়ে দাঁড়ায়। মড়া। কেউ কোনও কথা বলছে না। মাথায় রুমাল।
—কৌন?
তেলেভাজাওয়ালা অধীর। মিছিলের দিকে তাকায়। যেন চেনামুখ খোঁজে।
—আরে রফিক, কৌন গয়া?
—আলি সাব, উও যো ফুলবাগান মহল্লা কা—
—ক্যা ইনসানকা?
মিছিলের টানে লোকটা এগিয়ে যায়। তেলেভাজাওয়ালা লোকটা মিছিলটা শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাকিয়ে দেখে। ডান হাত একবার কপালে ছুঁইয়ে বুকে নামায়। বিড়বিড় করে কী যেন বলে। গঙ্গার দিক থেকে হু-হু করা হাওয়া ছুটে আসছে। ঠাণ্ডা। বন্দুক নিয়ে এখনও কেউ টিপ করছে, কোথাও শব্দ হচ্ছে, ফটাস।
—কোথায় আছে বলতে পারো? ওদিক থেকে বলল, দাশুবাবুবাগান—
পরমেশ বর্ণনা দেয়।
—ও, গণেশ? বল্মীকের বড় ছেলে, প্রথম পক্ষের। আর কিছু বলল?
ঘাড় নাড়ল পরমেশ। অর্থাৎ, না।
লোকটা কথা বন্ধ করলেও কাজ বন্ধ করেনি। সেই ভদ্রলোক আর ভদ্রমহিলার কথামতো চারটে বেগুনি আর চারটে আলুর চপ ঠোঙায় করে এতক্ষণে দেওয়া হয়ে গেছে। ওরা হাঁটতে হাঁটতে গঙ্গার দিকে চলে গেল।
লোকটা পাতলা করে কাটা বেগুনের টুকরো বেসনে মাখিয়ে ডান হাতে নেয়, আঙুলের ডগা থেকে আলতো করে ছাড়ে। সব কটা বেগুনের টুকরো গরম তেলে ছেড়ে দিয়ে হাত দিয়ে চেপে ধরার আগে, ঠোঁটের সঙ্গে আটকানো নিভে যাওয়া বিড়ির টুকরো ফের ধরায়। একটা টান দিয়ে পরমেশের দিকে তাকায়। হাসে।
—বল্মীকের বউ?
প্রশ্নটা পরমেশ আচমকাই করে ফেলে। কেউ একজন পরপর টিপ করছে। ভিড়ের আড়ালে কোনও ছেলে অথবা মেয়ে। দেখা যাচ্ছে না। থেকে থেকে শুধু শব্দ হচ্ছে, ফটাস।
—ছিল একটা, বাঙালি, কোখেকে ভাগিয়ে নিয়ে এসেছিল। সে তো বহু দিন— বেঁচে আছে কি না—
সাবিত্রী প্রথম প্রথম বলত, মায়ের একটা ছবি থাকলে হত, অন্তত পায়ের ছাপ হলে— । পরমেশকে বলতে হয়েছিল, আমি তখন খুব ছোট, ভাল করে মনেই নেই। সাবিত্রীর দাদা শুনে বলেছিল, প্যাথেটিক।
পয়সাটা মিটিয়ে পরমেশ হাঁটতে শুরু করে। আলো কমে এসেছে। জেনারেটারের শব্দ আসছে। সম্ভবত লোডশেডিং। একটা ট্রাক। জুট মিলের দিকে যাচ্ছে। ট্রাকের ওপর দাঁড়ানো এক খালাসির হাতে রাখা গামছা পতাকার মতো উড়ছে। ট্রাকটা দুলছে। খোয়া ওঠা রাস্তার জমা জল ছিটকে বাইরে আসছে। পরমেশ সরে দাঁড়ায়। বলে ওঠে, আস্তে। ছিটকানো কাদা দু’-একজনের গায়ে মাথায় লেগেছে নিশ্চিত। পরমেশ চার পাশে তাকায় এবং ভ্রক্ষেপহীন জনতাকে দেখে। দু-একটা বাচ্চা লাফিয়ে ট্রাকের পিছনের ডালা আঁকড়ে ওঠার চেষ্টায়। খালাসিটা কি ঘুমিয়ে? বাচ্চাদের কেউ ট্রাকে বোঝাই বস্তার গায়ে একটা কিছু দিয়ে আঁচড়ে দেয় ধারালো কিছুই হবে। পরমেশ দাঁড়িয়ে পড়ে। দু’পাশে ওর মতো আরও কয়েকজন ব্যাপারটা দেখছে। বাঁক নেওয়ার জন্য ট্রাকটা একটু গতি কমাতেই বাচ্চা দুটো লাফায়।
—চলিয়ে। চলিয়ে। ক্যা—
—উ—
পরমেশ চমকে ওঠে। এবং দেখে মাঝবয়সি একজন তাকে রাস্তা ছাড়তে বলছে। অল্প কাদা জমে যাওয়ায় হাঁটার মতো একফালি রাস্তা জুড়ে পরমেশ অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে।
—জোড়া দশ, জোড়া দশ—।
নীল, সুবজ, সাদা রঙের একগুচ্ছ রুমাল একবার ওপরে উঠছে এবং ফের নীচে নামছে।।
—জোড়া দশ, জোড়া—
একটা হালকা ভিড়, কেউ কেউ উবু হয়ে রুমাল বাছছে। একটা বাচ্চা দাঁড়িয়ে। একটা হাত ধরে সম্ভবত ওর মা। ছেলেটা রাস্তার দিকে তাকিয়ে। উবু হয়ে থাকা লোকগুলির মধ্যে উঠে দাঁড়িয়ে একটা রুমাল তুলে কী বলছে। ছেলেটার বাবাই হবে। ছেলেটা রাস্তার ওপাশে এক বেলুনওয়ালার দিকে তাকিয়ে। লাঠির মাথায় আটকে রাখা বেলুনগুলি উড়ছে। তেলেভাজার লোকটা বলেছিল, বউটাকে তাড়িয়ে
বাঁ দিকে একটা টিভি-র দোকান। পাশাপাশি রাখা দুটো টিভি সাদা-কালো, রঙিন। টিভি-তে একটা মেয়ে গান গাইছে। কোমর দুলিয়ে নাচছে। একটা অটো আসছে। ফুটপাথে চটের ওপর জড়ো করে রাখা আলু পটল। সবক’টাতেই রং মাখানো, অভিজ্ঞতায় টের পায় পরমেশ।
কোথাও কীর্তন হচ্ছে। অস্পষ্ট একটা ঝমঝম ধ্বনি জেগে উঠে আবার এই ভিড় আর কোলাহলের ভিতর যেন ডুবে যাচ্ছে।
লোকটার কথামতো টিভি-র দোকানের পাশের গলিতে ঢুকে পরমেশ ডান দিকে তাকিয়ে গুনে গুনে তৃতীয় লাইনে এসে পৌঁছয়।
—হ্যায় কোই?
লাইনের বাঁ দিকে দ্বিতীয় ঘরের বাইরে দাঁড়িয়ে পরমেশ কড়া নাড়ে। ‘হ্যায় কোই? কেউ আছো? ও ভাই? অন্দরমে— ।’ কারও দ্রুত ছুটে আসা টের পাওয়া যায়। ঘরের ভিতরে কেরোসিন ল্যাম্পের ম্লান আলো কাঁপছে। একটা ঘস-ঘস শব্দ আসছে। যেন ভারী একটা মেশিন চলছে কোথাও। অনেক দূরেই। অন্ধকারে কিছু অবশ্য বোঝবার উপায় নেই। হাওয়ার শব্দ হচ্ছে। বেশ একটা সোঁ সোঁ ভাব। বৃষ্টি আসবে নাকি ফের? ক’টা বাজে? পরমেশ আবার কড়া নাড়ে। এ বার এমনকী দরজায় ধাক্কা দেয়।
—হ্যায় কোই। অন্দরমে— ও ভাই—
কেমন অদ্ভুত এক নীরবতা। যেন এক্ষুনি কাচের চুড়ির আওয়াজ শোনা যাবে। পিছনের রাস্তার হাঁটতে থাকা লোকদের টুকটাক কথা কানে আসে। সাইকেলের আওয়াজ জেগে উঠে ফের মিলিয়ে যায়। যেন জানালার ফুটো থেকে কেউ খামচে ধরে।
—এটা কি বল্মীক সিংয়ের—
ঘরের ভিতর কেরোসিন ল্যাম্পের আলো সামান্য টলে ওঠে। দরজা খোলা পেয়ে কিছু বাতাস আচমকা ঢুকে থাকবে হয়তো।
—বোলিয়ে—
বয়স্ক কেউ। অস্পষ্ট, গলাটা ভাঙা। আধা অন্ধকারে ঘরের ভিতরটা পরিষ্কার দেখা যায় না।
—অনেক দূর থেকে আসছি—
পরমেশ হাঁপায়। থামে। ‘বহু মূত্র, পেচ্ছাবে জ্বালা, হাঁপানি, মাইকে কেউ চিৎকার করছে।
—একটু বাইরে আসবেন ভাই, থোড়া—
তলপেটটা কেমন ভার লাগছে। ইদানীং পেচ্ছাবের সময় কেমন।
—কিসিকো মাঙ্গতা?
—বাল্মীক সিং। আমার—
বাক্যটা শেষ করতে পারে না পরমেশ। ‘আমার’ শব্দটা উচ্চারণের পরে একটা শূন্যতাকে সে আচমকা ছুড়ে দেয়, সে পরমেশ এখন রুমাল কিনতে থাকা বাবা-মায়ের হাত ধরে বালকের মতো তাকিয়ে। বেলুনওয়ালার হাতের কাঠিতে আটকে থাকা বেলুন ওড়ে। লাল, সবুজ, হলুদ। ঘরের ভিতর কেরোসিন ল্যাম্পের আলো কাঁপতে থাকে।
—কৌন?
ঘরের ভিতর কেউ কাশছে। যেন জুড়ে থাকা পাঁজরের হাড় ছিটকে বেরিয়ে আসবে। বুকটা কেমন ধড়ফড় করছে না? ছেলেটার মুখ অনেকটা অজুর মতো। মায়ের হাত ধরে রাস্তার দিকে তাকিয়ে। অজুর জন্য কিছু কিনলে হত। ও কী করছে এখন? হয়তো ঘুমিয়েই পড়েছে। সাবিত্রী হয়তো দরজার গোড়ায় দাঁড়িয়ে। হয়তো প্রসূনকে বলছে, এত দেরি হওয়ার তো কথা নয়। কেউ আসছে। ঘরের ভিতর কেউ যেন কথা বলছে। কে একজন দরজার আড়ালে এসে দাঁড়াল। পরমেশ একটু পিছিয়ে আসে।।
—কাঁহাসে আয়া তুম?
কারও হেঁটে যাওয়ার শব্দে পরমেশ পিছন ফিরে তাকায়। বাঁদরটা ফিরছে। দড়ি দিয়ে বাঁধা। লোকটার বাঁ হাতে দড়ি। ডুগডুগিটা সম্ভবত ঝোলার ভিতরে রাখা। বাচ্চা একটা মেয়ে পিছনে।
কেউ একজন বাইরে বেরিয়ে আসে। পরমেশের বুক কাঁপে। প্রেশারটা দেখাতে হবে। পাশের টেবিলের সঞ্জয় বলছিল, ‘চল্লিশের পরই।’ পরমেশের এটা চুয়ান্ন। রিটায়ারমেন্টের আর বছর চার। পরমেশ দম নেয়। হনুমানজির মন্দিরে মন্ত্র পাঠ হচ্ছে। ওঁ-স্বা-হা-আ-আ-ওঁ—। কীসের পুজো? একটু জল পেলে হত। পরমেশ বলল, বল্মীক সিং। কথা শেষ করতে না দিয়েই লোকটি জানতে চায়, কাঁহাসে আয়া? এইসা চিল্লাতা কাঁহে? পরমেশের একটা হাত যেন কেউ ধরে। যেন তার আরেক হাতে রুমালগুচ্ছ। লাল, সবুজ, নীল। যেন এক বালক। যেন সে কারও হাত ধরে, পরমেশ ফের জিজ্ঞেস করে, বল্মীক সিং আউর উসকা—।
—ক্যা, দারু-মারু কুছ—
পাশের ঘর থেকে বুড়ো মতন কেউ বাইরে আসে। বেড়ার গায়ে দাঁড় করানো একটা খাটিয়া নামায়। কাকে যেন ডাকে, হা-রে-নাসিরিয়া। কে যেন ট্রানজিস্টারের নব ঘোরাচ্ছে। পরমেশ লোকটির দিকে স্থির তাকিয়ে থাকে। ওরই বয়সি হবে। কাঁচাপাকা চুল। সে আর একটু পিছিয়ে আসে। রাস্তার ধারে টাইমকল। জল চলে গেছে। একটা কুকুর যেন শুঁকছে। জমে থাকা জল চাটছে চাতালের।
-বল্মীক সিং আউর উসকা বাঙালি—
পরমেশ শেষবারের মতো চেষ্টা করে। লোকটা ওর দিকে তাকিয়ে। স্থির।
—তু ক্যা পুলিশকো—
পরমেশ ঘাড় নাড়ে।
—না না, আমি ওকে—
লোকটা উত্তর শোনার ধৈর্য দেখায় না।
—উসকা বাঙালি ক্যা—
আচমকা বাতাসে দূর থেকে আসা কীর্তনের ঝমঝম ধ্বনি ঘাই মারে।
—হ্যাঁ, আমি, ওই বাঙালি—
ঘরের ভিতর দাঁড়িয়ে থাকা কেউ নড়ে উঠল যেন।
—ও শালি বিশ-বাইশ সাল পহেলে আফরোজ মিয়া কো সাথ ভাগ গিয়া, জানতা নেই?
কুকুরটা জল চাটছে এখনও। চকচক শব্দ হচ্ছে। মন্দিরে মাইক লাগিয়ে কেউ মন্ত্র পড়ছে, ওঁ স্বাহা, ওঁ—
—ইয়ে ক্যা আজ কা বাত? আউর উও বুড়িয়া তো রেণ্ডি থা, সমঝা?
অন্ধকার ঘরে ভিতর থেকে কেউ কাশছে। অনবরত। যেন রক্ত, পিত্ত, কফ— যা কিছু আছে সব দলা পাকিয়ে বেরিয়ে আসবে।
—কে? কী হয়েছে?
লোকটা নির্বিকার। কাশির আওয়াজ বা পরমেশের প্রশ্ন কোনওটাই যেন ওর কানে যায় না।
—বাঙালিবাবু আউর বল্মীক কো বাদ আফরোজ মিয়া আউর উসকো বাদ— ক্যা জানে!
তলপেটে যেন কী জমছে। যন্ত্রণা। ঘাড়ের কাছে কেমন একটা ঠাণ্ডা ভাব। ঘাম জমছে যেন। বাতাস যেন ফুরিয়ে আসছে। মাইকের চিৎকার যেন ক্রমে দূরে মিলিয়ে যাচ্ছে। পরমেশ কি পড়ে যাবে? হাতের কাছে কিছু ধরার মতো পেলে হত। সে বসে পড়ে। ওপর দিকে তাকায়। আহ্ বাতাস, জলের ট্যাংকটা আকাশের অনেকটাই ঢেকে রেখেছে। কীর্তনের সেই আওয়াজ থেকে থেকে জেগে উঠছে। লোকটাকে কিছু বলা হয়ে ওঠে না। পরমেশ ড্রেনের ধারে বসে পড়ে। নাভির নীচের দিকের পেশিতে কেমন একটা খিঁচ ধরেছে। পেচ্ছাব করতে গিয়ে পরমেশের মনে হল, কেউ যেন একটু ব্লেড দিয়ে নরম মাংস আর চামড়া টেনে দিচ্ছে। আহ্—
—ক্যা হুয়া ভাই?
লোকটা হাত ধরে। দাঁড় করায়।
—ক্যা হুয়া?
—কিছু না, একটু জল হবে?
লোকটা কাকে যেন ডাকে। কেউ ঘরের ভিতর থেকে বাইরে আসে। একটা গ্লাস হাতে দেয়। আহ্—
অন্ধকারে ঘরের ভিতর কেউ শ্বাস নিচ্ছে। কষ্ট হচ্ছে খুব। শব্দটা বাড়ছে। পরমেশ গ্লাসটা ফেরত দেয়।
তেলেভাজার লোকটা এখন নেই। ঠাণ্ডা হাওয়া দিচ্ছে। রাত এখন কত? ঘড়িটা নিয়ে আসা হয়নি। প্রসূন হয়তো খোঁজাখুঁজি শুরু করেছে। হয়তো সীমাদের বাড়ি লোক পাঠিয়েছে।
সামনে কীসের একটা জটলা। কেমন হুমড়ি খেয়ে পড়া ভিড়। পরমেশ এ বার ফিরবে। মেন রোড ধরে বড় রাস্তায়। হোর্ডিংয়ের মেয়েটা রিভলবার হাতে তখনও দাঁড়িয়ে থাকবে। হাসপাতালের দেওয়ালে দাঁড় করিয়ে রাখা মড়ার খাটগুলির পাশ দিয়ে পরমেশকে যেতে হবে। মায়ের হাত ধরে দাঁড়িয়ে থাকা সেই বালকের কথা মনে পড়ে। ওদের কি রুমাল পছন্দ হয়েছিল? অথবা ছেলেটা কি বেলুন কিনে দেওয়ার বায়না ধরেছিল— সুতো দিয়ে আটকে রাখা সেই লাল-হলুদ বেলুন। হুমড়ি খাওয়া ভিড়ের কেন্দ্রে কেউ যেন লাফায়। হাত-পা ছোড়ে। কী একটা বলে চিৎকার করে। মসজিদটা চোখে পড়লে কাউকে জিজ্ঞেস করতে হত না।
—হো-ও-ও-ও—
পরমেশ চমকায়। তাকায়। ওই ভিড়ের থেকে কেউ ছিটকে বেরোয়। লোকটার পিছনে কেউ ছোটে। গোল হয়ে দাঁড়ানো ভিড়ের কাছে যায় পরমেশ। অজুর জন্য কিছু—
একটা চাকা। দাগকাটা। একটা লোক ঘোরাচ্ছে। চিৎকার করছে। সাত-ছয়-পাঁচ-চার-তিন। কেউ যেন লাফিয়ে ওঠে। কারও লুঙ্গির গোঁজে হাত।
—ক্যা মাঙ্গতা বাবু? আইয়ে—
পাশে দাঁড়ানো দু-একজন তাকায়। পরমেশকে দেখে। ওদের মধ্যে। কেউ বলে, আইয়ে না, আইয়ে।
মাথার ওপর একফালি চাঁদের গা বেয়ে হালকা এক টুকরো মেঘ। ছায়া। পরমেশ পিছিয়ে আসে। ঘোরে। লোকগুলি ডাকছে। ভরসা দিচ্ছে। আইয়ে, আইয়ে। পরমেশ বাঁ দিকে ঘোরে। লোকগুলি ডাকছে। হাসছে। আইয়ে না। হো-ও-ও-ও। আইয়ে— ।
বাঁ দিকে ঘুরে পরমেশ একটা মন্দির আবিষ্কার করে।
এদিকে হনুমানজির মন্দির নেই। অন্য কিছুর হবে। সামনে গঙ্গা থাকার কথা। গায়ে মাথায় জল বুলিয়ে মিনিট পাঁচ বসে, সে এখন ঠাণ্ডা হতে পারবে। কাজটা ভাল হল না। ওরা কী ভাবছে, কে জানে! প্রসূন যদি সীমাদের বাড়ি খোঁজ করতে গিয়ে থাকে?
মন্দিরের ভিতর ঢুকতেই জল চোখে পড়ে। চিকচিক করছে। পরমেশ সিঁড়ি বেয়ে নামে। ওপরের রাস্তায় চোখে পড়ে ক্ষীণ আলোর রেখা। কোথাও বা অন্ধকার। জল ক্রমে অন্ধকারে মিশে যায়। একটা গুব্-গুব্ ধ্বনি। সম্ভবত স্টিমার। পরমেশ সিঁড়ি বেয়ে নামে। নীচে ঢেউ ভাঙছে। অন্ধকারে ছলাত ছলাত শব্দ। সে আঁজলা ভরে জল নেয়। ঘাড়-মাথা ভেজা হাত দিয়ে বুলায়। ওপরে মন্দিরের গায়ে একটা অল্প পাওয়ারের ল্যাম্প। আলো নীচ অবধি আসছে না। সিঁড়ির গায়ে একটা ফলক। সাদা। চৌকো। সম্ভবত শ্বেত পাথরের। অল্প আলোয় কিছু লেখা চোখে পড়ে। পরমেশ চোখ রাখে। উবু হয়ে কাছে যায়। ভগবান মহাপ্রভুর শ্রীচরণে—হরবালা দাসী, বঙ্গাব্দ ১০৬৮। গুব্-গুব্ শব্দটা এখনও কানে আসছে। হাজার আটষট্টি, এখন কত? বঙ্গাব্দ পরমেশের ঠিক মনে থাকে না। সে ওপর দিকে তাকায়। চুড়ো দেখে। মন্দিরের বাঁ দিকে একটা গাছ। হরবালা দাসী। পরমেশ চশমাটা খোলে। মোছে। একটা অদ্ভুত ঘ্রাণ। ফুলের। গাছ থেকে নীচে, মাটিতে পড়ে। পরমেশ হাতে নেয়। সাদার গায়ে হালকা হলুদ। কীর্তনের সুর ভেসে আসছে। বড় রাস্তার কথা কাউকে জিজ্ঞেস করতে হবে। ডান দিকে নদীর ধারে প্রায়
নিভে আসা একটা আগুনের কুণ্ডের পাশে কারা যেন বসে। এলোমেলো হাওয়ায় আগুনের লাল কণা উড়ছে। লোকগুলির পিছনে সার দেওয়া ঘর, কারা যেন দাঁড়িয়ে।
—কৌন হ্যায় রে—
পরমেশ মন্দির ছেড়ে গঙ্গার ধার ঘেঁষে, আগুনের প্রায় নিভে আসা। কুণ্ডের দিকে হাঁটতে থাকে।
—আমি—
—কৌন? ইয়া মুনির?
আসলে যতটা কাছে মনে হয়েছিল, ততটা নয়। আর জমি ঠিক সমতলও নয়। কোথাও বা ঝোপজঙ্গল। পরমেশ হাঁপায়। আগুনের কাছে যাওয়ার জন্য তাকে জলের দিকে আসা একটা ডাল বেয়ে ওপরে উঠতে হয়।
—কৌন? কৌন হ্যায় তুম?
—আমি।
পরমেশ সাড়া দেয়। হাওয়ায় প্রায় নিভে যাওয়া কুণ্ডের লাল কণা উড়তে থাকে। এঁকে বেঁকে। কখনও স্থির— মুহুর্তের জন্য, কখনও-বা উধাও। ঠাণ্ডা হাওয়া আসছে। সাবিত্রী এখন কী করছে? ‘ওঁ স্বাহা, ওঁ’ আওয়াজটা এখন আবার স্পষ্ট হয়েছে।
—ভাই বড় রাস্তাটা কোন দিকে বলতে পারো?
কুণ্ডের চারপাশে বসে থাকা লোকগুলি কেউ কেউ ওর দিকে তাকায়।
—বড় রাস্তাটা—
—কঁহাসে আয়া?
পরমেশ জায়গার নাম করে।
—তু ক্যা নয়া?
পরমেশ ঘাড় নাড়ে। সেজোকাকি বহু আগে বলেছিল, জায়গাটা বাজে, যাস না, লাভ নেই।
—ওধারসে কাঁহা—
আগুন প্রায় নিভে এসেছে। একটু আগেও লাল টকটক করতে থাকা মুখগুলি ক্রমে অস্পষ্ট।
—একটু জিরিয়ে —
সেই গুব-গুব শব্দটা এখনও আসছে।
—তু ক্যা পুলিশকা?
—না ভাই আমি —
কী রকম এলোমেলো হতে থাকে। কেমন একটা ঝিমঝিম ভাব, লাল ফুলকিগুলি মরে এসেছে।
—কিউ? পয়দা কা মামলা তো —
—কৌন হায় রে— ইয়া বিরজা?
কেউ হাঁক দেয়। সার দেওয়া খুপরিগুলির বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা দু’-একটা জটলা এখন পরমেশের চোখে পড়ে। খুপরিগুলির কোনওটার বা দরজা খোলা। হাওয়ায় নড়তে থাকা পরদার আড়ালে ল্যাম্পের আলো কাঁপে। ডুবে যাওয়া করতালের স্পন্দন আচমকা ঝমঝম করে ওঠে।
—ক্যা শালাকো পাশ—
হো-ও-ও-ও—
এলোমেলো হাওয়ায় একটা হাসির হররা ওঠে।
—আউর বুড়িয়া চাহিয়ে তো কোঠিবাড়ি মে যাও– লাইনকা মালকিন ছবিজিকো পাশ— হাঃ হাঃ শালা বুডঢা—
কোথাও সিটি বাজছে। টানা। বেজেই যাচ্ছে। ঘাড় আর পিঠ বেয়ে ঘাম নামছে। তলপেট টনটন করছে। গঙ্গার দিকে মুখ করে প্যান্টের বোতাম খুলতে গিয়ে আর খোলা হয়ে ওঠে না। অন্ধকারে কোথায় শব্দ হয়। গুব্-গুব্-গুব্-গুব্। সে কান খাড়া করে। শব্দটাকে স্পষ্ট করে শুনতে চায়।
—ক্যা হুয়া তুমহারা?
কারা যেন হাসছে। হো-ও-ও-ও—।
বাতাসে সস্তা পাউডারের ঘ্রাণ।
প্রসূন ঘরের ভিতর ঢোকে।
—সাত নম্বর— হাঁ দেখিয়ে—
পেট আর মাথায় সেলাই। ড্রয়ারটা ধরতেই হাতে আঠালো আর চকচকে কী লাগল। পায়ের কাছে একটা শরীর। চোখ উপড়ে নেওয়া। শরীর ফুলে উঠেছে। কোমরের নীচে খুবলে নেওয়া অংশে পোকা বিজবিজ করছে। প্রসূন ড্রয়ারের দিকে তাকায়। টাক। কপালের বাঁ দিকে একটা আঁচিল। মাথার দু’পাশে অবশিষ্ট চুল সাদা। জামা-প্যান্ট খুলে নেওয়া। বয়স পঞ্চাশ-পঞ্চান্ন।
—ক্যা, মিলা? নেহি মিলা? তব ঠিক হ্যায়— শালা বুঢ়া এক রেণ্ডিকো ঘরমে— |
আজ দুদিন হল কোনও খবর নেই। লোকটা কোথায় যে গেল? মেয়ে আর নাতিকে ট্রেনে তুলে দিতে সেই যে স্টেশনে।
প্রসূন রাত দশটা নাগাদ বেরিয়েছে। পুলিশের খবর ছিল একটা। পরশু রাতে কোথায় যেন একটা লাশ পাওয়া গেছে। বয়সটা প্রায় মিলে গেছে। এমনকী পুলিশের দেওয়া চেহারার বর্ণনাও। ওটা নাকি একটা খারাপ জায়গায় পড়েছিল।
ভোর রাতে দরজায় কড়া নাড়ার আওয়াজ পেতেই সাবিত্রী ধড়ফড় করে ওঠে। একটু ঝিমনির ভাব এসেছিল। সীমার বর আর প্রসূন বাইরে দাঁড়িয়ে।
—সীমা ওঠ, দরজাটা খোল!
দরজাটা খুলতেই ঘরে ঢোকে। প্রসূন জামাটা খুলেই ছুড়ে দেয়।
—পেলি?
ওরা বসে আছে। মাথার ওপর পাখা ঘুরছে। শব্দ হচ্ছে।
—মিলল?
প্রসূন বিড়বিড় করে কী যেন বলল। সীমার বর পাশের ঘরে গেল। অজু ঘুমে। সীমা তখনও ফুপিয়ে কাঁদছে। প্রসূন মায়ের দিকে তাকায়।
—কী রে?
দেওয়ালের গায়ে ক্যালেণ্ডারটা ঘষটাচ্ছে। শব্দ হচ্ছে। সীমা দরজার দিকে তাকায়। ভেজিয়ে রাখা দরজাটা খুলে যায়। দু-একটা কাক ডাকছে।
—বললাম তো, ওটা আমাদের লাশ নয়।
প্রসূন আচমকা চিৎকার করে উঠে।