তুমি ভাবলে তোমার বুকের ওপর পেটের নাড়িভুঁড়ি চাপিয়ে রাখল কেউ। উহ্ মা, আমার যে কি হাসি পাচ্ছে তখন! ওটা তো আসলে — কি বলি বলো তো, হয়তো আমিই, মানে তখনও তুমি তো জানোই না কিছু। তুমি ভেবেছিলে পেট থেকে আমাকে বের করার জন্য নাড়িভুড়ি সব বের করে তোমার — । ভেবেছিলে আগে নাড়িভুড়ি বের করে তবে — । তারপর আমাকে। আর তুমি তেমন তেমন ভাবলে যখন, তখন আমিই বা জানব কী করে অন্য কিছু? এইবার তোমার পেটের ওপর রেখে দেওয়া নাড়িভুঁড়ি নিয়ে নার্স চলে যাচ্ছে যখন ঠিক তক্ষুনি কী যেন মনে পড়ল তোমার। ডেকে উঠলে, নার্সদিদি—।
তোমাদের বাড়ি-ঘর উঠোন সব কী যে সুন্দর মা! ঘরের পেছনে আমগাছ, পেয়ারা। বেগুনের চারা লাগিয়েছ, লাউয়ের মাচা। বাড়ির সামনের দিকে ফাঁকা জায়গা কিছুটা। ওখানে কাঁঠাল গাছ একটা। কিছু শালিকের যেন ওটা বেশ পছন্দের। একবার ওটার ডালপাতায় কিচকিচ-কিচকিচ তো পরক্ষণের তোমার অ্যাসবেসটসের ছাদে একেবারে পিড়িক করে উড়ে যাওয়া। আমি আগে থেকে আর করে জানব কী করে? ওই যখন তুমি গোরু রাখতে গেলে রাস্তার ওপাশে জমিতে, যখন তুমি দেখছ বমি পাচ্ছে যেন তোমার, আর যখন তুমি জানো তোমার মাসিকের সময় পেরিয়ে গেছে আজ অনেকদিন, আর তুমি আনমনা হয়ে গেলে। আনমনা মানে তুমি তখন আর ওই ধানখেত, ধানখেতের সবুজ ছাড়িয়ে দূরের গাছপালা, আর আরও দূরে কোথাও গাছপালার আড়ালে নেমে আসা আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকলেও ওই ধানখেত বা ধানখেতের সবুজ বা দূরের গাছপালার আড়ালে নেমে আসা আকাশের কোথাও ছিলে না, তুমি তখন হঠাৎ করেই ভাবলে আমার কথা। ভাবলে মানে আমার যেন ছবি তৈরি করলে একটা নিজের মনে। আর আমিও ঠিক তক্ষুনি— । মানে সেই থেকেই তোমার সঙ্গে— , তুমি ডাকছ আমাকে, কথা বলছ। আমি খেলছি, চরে বসছি তোমার বুকে-পিঠে, হামাগুড়ি দিচ্ছি। চলে যাচ্ছি তোমার পেছন পেছন।
তোমার শাশুড়ি-মা কিন্তু তখন ডেকেই যাচ্ছে তোমাকে, ও বউ ভাতের মার তো—, গোরুর খুঁটো পুতে এতক্ষণ করছিস কী? কার কথা ভাবিস এত?
ভাল কথা, তোমার শাশুড়িমা মানে তো ঠাকুমা আমার, তাই না? খুব ক্যাটক্যাটে কিন্তু।
তোমার যেন হুঁশ ফিরল তখন। আরে, ভাত বসানো আছে না? আর তক্ষুনি তোমার আবার ঘোমটার কথা মনে পড়ল। ঘোমটা ঠিক করে রাস্তা পার হয়ে— ।
বাতাস হচ্ছে খুব। পাতা ঝরছে গাছ থেকে। শুকনো, মরা। আর এলোমেলো ছড়িয়ে যাচ্ছে। আর কী মজার শব্দ হচ্ছে না কেমন সেই পাতা ঝরার। অমনি তোমার মায়ের কথা মনে পড়ল। আর তুমি তক্ষুনি যেন একেবারে আমার মতো এই এতটুকু হয়ে গেলে। তুমি তখন একেবারে এক পা-দু’ পা করে যেন নতুন হাঁটতে শিখেছ, যেন আমার মতোই সব একেবারে নতুন, একেবারে নতুন সবকিছু দেখছ এমনি করে তোমার ছোটবেলার সেই পুকুর, আলতো হাওয়ায় পুকুরের জলের কেঁপে কেঁপে ওঠা দেখছ। পুকুরপাড়ের নিমগাছ, পাশের রাস্তা। একদিকে তোমার ছোটবেলার বন্ধু সেই ইতুদের বাড়ি। বেশ কয়েকটা হাঁস একেবারে একসঙ্গেই ডেকে উঠল না? যেন তোমাকে দেখেই— । যেন এক্ষুনি তোমার মা হাত রাখবে তোমার পিঠে, এক্ষুনি জানতে চাইবে, কী হোল তোর?
একটা মেয়ে স্কুলে যাবে বলে ওদিকে সাইকেল বের করেছে। আর সেই মেয়েও কেমন তোমাকে ‘বউদি—’ বলে ডেকে উঠল ভাত বেড়ে দেওয়ার জন্য। রাস্তার দিকে কোনও সাইকেলেও যেন মেয়েটির কথা ধরেই টিং-টিং বেজে উঠল। মেয়েটি কে গো? ননদ তোমার? মানে আমার কে যেন মা? পিসি, তাই তো? পিসি কিন্তু জানেই না যে তোমার মনের মধ্যে এই একটু আগে আমার— । জানলে আমাকে ঠিক আদর করতো তাই না মা?
তোমার ইচ্ছে হল আগে তোমার মাকে, না কি তোমার বরকে— এই তোমার বমি-বমি ভাবের কথা, মাসিক বন্ধ হওয়ার কথা— তোমার মা-ই কিন্তু শিখিয়ে-পড়িয়ে দিয়েছিল তোমাকে। কী হলে কী হবে, না কি হতে পারে। বলছিল দরকারে ফোন করে নিবি। আচ্ছা, তোমার বর কী যেন হবে আমার? ‘বাবা’, তাই না? না, তোমার শাশুড়ি মানে আমার ঠাকুমাকে বলবে বলে তুমি ভাবোইনি কিছু তখনও। বাবা তখন কোথায় যেন? তোমার থেকেই জানলাম, অনেক দূরে, কোন সেই কেরালায়। তুমি ঠিক করলে, মাকে নয়, আগে তোমার সেই কেরালার লোকটাকে, মানে আমার বাবাকে বলবে ফোন করে। কী বলবে? বলবে, ‘জানো আমার আজ সকাল থেকেই বমি-বমি পাচ্ছে খুব।’ বলবে, ‘মাসিক বন্ধ হয়ে গেছে দিন দশ, সন্দেহ হচ্ছে কেমন।’ তুমি কিন্তু জানো, বাবা বলবে, তাতে কী, এমন তো হয়। তুমি বলবে, না গো এবার অন্যরকম। ওই যে বমি-বমি ভাব। বাবা বলবে, মাকে বলো, বলোনি? মা মানে বাবা বলতে চাইল নিজের মায়ের কথা — তোমার শাশুড়িমা। আমি জানি, বাবার কথা শুনে চুপ করে থাকবে তুমি। কেন চুপ করে থাকবে, বলতে পারো না, বলো, তোমার শাশুড়িমা তোমাকে দিয়ে দিনের পর দিন — । বলো, আড়াই বিঘা জমিতে সার ছেটানো বা জল দেওয়া কি মুখের কথা? তারপর রান্না করো, স্কুলের ভাত বেড়ে দেওয়া ননদকে — , দুটো হাতই তো আমার? না, তুমি জানালার পাশে দাঁড়িয়ে শুধু জল ফেলবে চোখের।
আজ কিন্তু তুমি খেলেই না কিছু। সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে কেমন। হাওয়া আসছে দক্ষিনের। একটা কুবো কোন ঝোপের আড়ালে নিজের মনেই বলছে কী যেন। কুব-কুব-কুব। কোন ঝোপ-জঙ্গলের আড়ালে সেই লাল-লাল চোখ আর কালো ঠোঁট নিয়ে একেবারে একা। পুকুর ঘাটে ছাতার পাখির ঝাঁকটা অপেক্ষা করছে তোমার জন্য। কেমন সাত ভাই মিলে —। কেমন চিঁচ-চিঁচ-চিঁচ। ওদের ডাক শুনেই তোমার কেমন মনে হল, আহারে, সাত সাতটা ভাই একটা বোন পেল না? একটা বোন পেলে সাত ভাইয়ের কত আনন্দ হতো বলো। তোমার হঠাৎ করে যেন কেমন কান্না এল না মা? কেন গো চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল তোমার? ডাল দিয়ে মাখা ভাতের ওপর দিয়ে আঙুল দিয়ে থালার গায়ে যেন নকশা কাটছ তুমি। তুমি খেলে কি খেলে না এটা কেউ লক্ষ্যও করল না। ভাবছ, একটা মেয়ে থাকলে আজ আমাকে না খেয়ে উঠতে দিত? সেই তুমি যখন তোমার মাকে জড়িয়ে —, তুমি যেমন তোমার বাবার মার খেয়ে মাটিতে পড়ে থাকা মাকে জড়িয়ে — । তুমি তখন খুব আমার কথা ভাবছ। যেন আমি তোমাকে জড়িয়ে ধরে আদর করছি তোমাকে। চুল আঁচড়ে দিচ্ছি আমার মত করে। আমি কিন্তু ঠিক পড়তে পারছি তোমার কথা।
ওপাশে তোমার শ্বশুর-শাশুড়ি আর দেওর-ননদ। আর এদিকে এই পুকুর পারে তুমি। তুমি মানে তোমার কেরলে যাওয়া সেই লোকটা, যে তোমাকে —। ঘাটে থালাবাসন নিয়ে বসতে না বসতেই মাঝ পুকুর থেকে হাঁসগুলি যেন বুঝল অনেক কিছু। একেবারে প্যাঁক-প্যাঁক শব্দ তুলে যেন, ও বউ- ও বউ —। যেন মা সুবচনী আসবে এক্ষুনি, যেন মেজবউ যা চাইবে তা —। দূর থেকে ফেরিওয়ালা আসছে না? ব-র-ফ, এই ব-র-ফ। উফ্, কত দূর থেকে ডাকটা একা একা, একা একা, বাতাস কাটিয়ে, একেবারে ইউক্যালিপ্টাসের পাতার ঝিরঝির শব্দটার গা জড়িয়ে —। এতক্ষণ চুপচাপ বসে আছ কেন মা? এই ঘাটে একা থালা-বাসন পাশে রেখে তুমি চুপচাপ জলে পা নামিয়ে ঢেউ তুলছ, কার কথা ভাবছ তুমি? আর সেই ছাতারদের সাত ভাই কেমন টের পেল দেখ আমার কথাগুলি, আমি বলামাত্রই ওরা একেবারে চিঁচ-চিঁচ-চিঁচ —। তোমার ঘর থেকে অমনি তোমার সেই মোবাইলের শব্দ উঠল। উঠেই যাচ্ছে সেই শব্দ। একটানা। যেন অনেক দূর থেকে কেউ, অনেক দূরের —, যেন অধৈর্য —। আর তুমি এক ঝটকায় এই ভাবে লাফিয়ে উঠলে যে ঘাটের এক পাশে রাখা থালা-বাসনের স্তুপ একেবারে ঝন্ঝন্ শব্দে —। আর ছাতারদের সাত ভাই একেবারে এক এক উড়ানে সজনে গাছের এক একটা ডালে, আর হাঁসগুলিও যেন প্যাঁকপ্যাঁক শব্দে ‘কী হল, কী হল গো —’ বলতে বলতে একেবারে মাঝপুকুরের দিকে —।
বিয়ের পর তুমি শ্বশুরবাড়িতে আট রাত্রি কাটিয়ে যখন বরকে নিয়ে বাপের বাড়িতে অষ্টমঙ্গলায় ফিরলে যখন, তখন পাশের বাড়ির সই ইতুর সঙ্গে তুমি কী গল্প করেছ তা আমি কেন শুনব, ওসব গল্প তো আমার শোনার কথা নয়, ওগুলি তুমি আর এখন —, না, একেবারেই মনে আনবে না তুমি। আমি তো তোমার মনের মধ্যেই, আমি তো এখানে চড়ুই পাখির মতো ঘর করে বসে আছি। তোমার মা পরে তোমার সইয়ের কাছ থেকে কথাগুলি শুনে খুশি হল খুব। হ্যাঁ, তা-ই বা আমি শুনব কেন? তুমি বরং পরের কথাগুলি বললেও বলতে পারো আমাকে। মানে নিজের মনে ফের ভাবতেও পারো। তোমার মা সেই রান্নাঘরে বসে তোমাকে বলল, তেমন কিছু হলে ফোন করিস একবার, বা তোর শাশুড়িকে —। তুমি বললে, শাশুড়িমা ভাল নয় মা।
‘কেন? কী করেছে তোর?’
এবার তুমি ফের চুপ করতে থাকলে। তোমার মা বলল, কী করে বলবি তো? না বললে হবে কী করে। এবার তুমি বললে, আমাকে আর ওকে একসঙ্গে দেখলেই রেগে যাবে মা। কিছু না কিছু বলে ঠিক ডেকে পাঠাবে। ঠিক আলাদা করবে। ভোর হতে না-হতেই ধাক্কা মারবে দরজায়, বলবে, অনেক নাকি সকাল হয়ে গেছে। অথচ তখন আলোই ফোটেনি ঠিক করে। বলো, কী বলবে? সব কিছুতে আমার দোষ ধরবে মা। ওর সামনেই আমাদের অভাবের কথা বলে খোটা দেবে। একটা বাইক দেব বলেও দিতে পারেনি বাবা। বলবে, একটা নাতির মুখ দেখার জন্যই নাকি বউ করে নিয়ে গিয়েছে আমাকে।
‘জামাই?’
‘ও আবার শাশুড়িমাকে ভয় পায় খুব, বলবে মাকে খুশি রাখার চেষ্টা করবে।’ বলবে, ‘আমি তো থাকব না বেশিদিন, তখন তো তোমার নিজের বলতে ওই আমার মা-বাবা, ভাই, বোন। ওরাই তোমার আপন, ওরাই তোমার সব।’
একটা কথা বলি তোমাকে মা, তুমি যখন একেবারে একা, একেবারেই নিজের মনে, আমার তখন কিন্তু ভয় করে খুব তোমাকে নিয়ে। আমি তখন বসে থাকি চুপটি করে। ভাবি, তোমার মনে তখন তোমার সেই নিজের মা আসুক, তোমার ভাই, বোন, বাবা। তোমার সেই গ্রাম, পাড়া, স্কুল। মনসার মেলা, গাজন। তোমার ফ্রক পরা দিনগুলির খেলার বন্ধুরা। কিন্তু আমি চাইলেই বা কী? সেই কেরলে থাকা লোকটা ঠিক হাজির হবে এসে? সেই লোকটাকে নিয়েই খুব মশগুল থাকতে চাও তুমি। কেন? আমার কিন্তু একদম ভালো লাগে না লোকটাকে। না, ওই লোকটাকে নিয়ে তোমার ভাবনায় একদম থাকতে চাই না আমি। একদম না, লোকটা কেন বকবে তোমাকে? কেন বলবে, মাকে না বলে কেন আমাকে বলতে এলে? ‘মাকে জানাও আগে’ বলেই ফোন কেটে দেবে। কেন দেবে? তুমি যে সেই কতদূরের থেকে আসা ফোনের আওয়াজ পেয়ে এক ছুটে ঘরে ঢুকেই যে বলে উঠলে, ‘আমি না ঠিক এক্ষুনি তোমার কথাই—,’ লোকটা তোমার ওই পাগল-পাগল ছুটে যাওয়ার মূল্য দেবে না কেন কোনও? ওর কাছে তোমার খুশির চেয়েও ওর মাকে খুশি করার মূল্য বেশি হয়ে গেল? না, ওই লোকটার কথা তুমি মনেই আনবে না। ও মা —।
‘বউমা —।’
তুমি কেমন চমকে উঠলে না? আমিও। কী রাগের সেই ডাক, কী গম্ভীর, আর কী সামনে থেকে ভাবো। একেবারে চুপচাপ এই দুপুরে ঠিক তোমার দরজার বাইরে যে একটা লোক দাঁড়িয়ে — কে জানবে বলো?
‘তোমার এতবড় সাহস, আমাকে না জানিয়ে সেই কেরলে আমার ছেলেকে ফোন করতে গেলে?’
তোমাকে দেখে এবার আমি কিন্তু ভয় পেয়ে গিয়েছি খুব। মাথা নীচু করে তুমি দরজার পাট ধরে দাঁড়িয়ে আছ।
‘তো কী বলল, আমার ছেলে বলল কী শুনি?’
তোমার কথা শুনে ওর কিছুটা অন্তত রাগ যেন কমল মনে হল। বলল, ‘আমি তো পেটে ধরেছি তোমার স্বামীকে না কি— । আর তুমি দু’দিনের সোহাগ দিয়েই ভাবলে —।’
ওই যে ফোনের আওয়াজ শুনে দৌড় মারলে তুমি পুকুরঘাট থেকে, আর তোমার পায়ের ধাক্কায় সেই থালা-বাসনের ঝন্ঝন্ শব্দে —। জেগে গিয়েছে সবাই। শাশুড়ি ছাড়া ওই ঘরের তোমার শ্বশুর, পাশের বাড়ির বউ-ঝি সব। এর মধ্যেই ভাবো, ওই নিম গাছের পাতার কোন আড়ালে একটা বেনে বউ কেমন ডেকে উঠল হঠাৎ, কেমন বলে উঠল, ‘বউয়ের খোকা হোক, বউয়ের খোকা হোক —।’ আর সবাই কেমন চুপ করে গেল হঠাৎ, তোমার শ্বশুর কেমন ঘর থেকে বেরিয়ে বলে উঠল, ‘ঠিক আছে ঠিক আছে, কাল নিয়েই যাও ওকে সেন্টারে, কী বলে দেখ?’
তোমার শাশুড়ি বলে উঠল, ‘ফুল-চন্দন পড়ুক বেনে বউয়ের মুখে।’ আর সেই তক্ষুনি যেন আর একজন কেউ ঢুকে পড়ল তোমার মনে। আর একজন মানে — যে তোমার মা নয়, বাবা নয়, তোমার ভাইদের কেউ বা এই শ্বশুরবাড়িরও কেউ নয়, যেন আমারই মতো, যে এতদিন ছিলই না কোথাও এমন একজন যেন টুপ করে ঝরে পড়ল তোমার কোথাও।
কেরালার সেই লোকটা ফোন করল, না তোমাকে নয়, তোমার শাশুড়িমাকে। কড়াইয়ে ডাল চড়িয়েছ তখন। তুমি স্পষ্ট শুনলে, ‘তোর সোহাগের বউয়ের কাজ কী আর, ঘুম আর খাওয়া, আবার কী?’ শুনতে পাচ্ছ সেন্টারের ওই দিদির কথাগুলি কেমন বলে আচ্ছে, মানে সেই দিদি কী বলল তোমার পেট নিয়ে। কেউ নাকি এসে গেছে ওখানে। না, কেউ মানে — তাকে বুঝতে এখনও সময় লাগবে কিছু, কিন্তু আসছে। তোমার শাশুড়িমা বলছে, তোর যদি মনে হয় তোর বউকে কষ্ট দিচ্ছি, চলে আয় কেরালা থেকে, কোলে আগলে রাখ। না, এর পরেও কেরালার ওই লোক ফোন করল না তোমাকে। এরপর তুমি ডালের কড়াই নামিয়ে রাখছ উনুন থেকে। এরপর কড়াই থেকে সেই ডাল নামবে একটা ডেকচিতে। ভাত হয়ে গেছে অনেকক্ষণ, এবার মাছ হলেই হয়ে গেল। কিন্তু এই ফাঁকে গোরুর দাবনায় কিছু খড় মাখিয়ে দিয়ে আসতে হবে। শাশুড়িমা আবার মাছের তরকারির কথা আলাদা করে বলে দিয়ে গেছে, একেবারে টাটকা নদীর মাছ। পারশে, তোমার বাবা মানে শ্বশুর নাকি বলে গেছে গুচ্ছের ঝাল দিয়ে তরকারিটাকে নষ্ট না করে যেন।
কিন্তু কেরালার লোকটা? ও কি ভালবাসে তোমাকে? তুমি যে এই দিনভর লোকটার কথা —। আমি জানব না? তোমার মনের মধ্যে আমি তো একেবারে ঘর বানিয়ে —। কিন্তু আর একটা কে যেন ঢুকে পড়েছে তোমার মনে। ঠিক বুঝতে পারছি না মা। শরীর নেই যেন। মানে তুমি নিজেও তার কোনও শরীর এখনও বানাওনি। কে গো? তোমার শাশুড়ি সেদিন পইপই করে বারণ করেছে মনে আছে? বলেছে সন্ধের পর একদম বাইরে যাবে না। বলেছে নাতির মুখ দেখার আশায় তোমার শ্বশুর নাকি কী সব দেবে নাকি পঞ্চানন ঠাকুরের মন্দিরে। পঞ্চানন ঠাকুর কে গো মা, চেন?
কাল দুপুরে তুমি অমন ভয় পেলে কেন বলো তো? তোমার মা-ই তো। তোমার মায়ের ফোনই তো, কেন এত বকলে নিজের মাকে? তাও আবার একেবারে ফিসফিস করে। যেন আর কারও কানে না যায় কোনও কথা। বললে, ‘তুমি ফোন করলেই ফোনের রিং-এর আওয়াজে সন্দেহ করবে সবাই, ভাববে আমি কী না কী বলছি তোমাকে। একেবারে কান খাড়া করবে।’ বললে, ‘রাতের দিকে সবাই ঘুমিয়ে পড়লে আমিই —।’
ওই পুতুলটাকে কোথায় জোগার করলে তুমি? কে দিল? পাশের বাড়ির ছোট বউ? সেই ছোট বউ না দিলে তুমি আবার পাবে কোথায়? ওটাকেই জড়িয়ে ধরে তুমি ছবি আঁকছ আমার। একবার সবুজ ফিতে পড়াচ্ছ চুলে, একবার লাল। একবার বিছানায় শুইয়ে দিয়ে হাত বাড়াচ্ছ কোলে নেবে বলে। একবার জুতো পরিয়ে দিচ্ছ। কত কথাই না বলতে পারো তুমি। একবার বলছ, ‘আয়রে পাখি লেজঝোলা —।’ সেই লেজঝোলার ডাক মনে আছে তোমার? সেই যে শিরীষের ডালে লেজ ঝুলিয়ে দু’জন মিলে —। লালচে চোখ আর খয়েরি পিঠের সেই পাখি। সেই যে ক্কি-ক্কি-ক্কি-ক্কি-। না, এত কথা তো শুধুই মনে মনে তোমার। মনের বাইরে যাবেই বা কেন তুমি? তোমার ছোট্ট মেয়েটা তো শুধুই তোমার মনে। এই মনের বাইরে আসতে তো তখনও দেরি অনেক। তোমার পেটের মধ্যে গর্ভের সেই জলে সে একদিন আড়মোড়া ভাঙবে, সাঁতার কাটবে নিজের মতো। হাসবে তোমার কথা শুনে। পাশ ফিরে শোবে, তারপর একদিন —।
তোমার শাশুড়ি একেবারে তোমার গায়ে লেপ্টে থাকলেও আমার সঙ্গে বলতে থাকা তোমার কথাগুলি কিছুতেই শুনতে পাবে না মা। বা আমার কথাও। আমার রাগ, হাসি বা কেঁদে ওঠা — শুধু তোমার শাশুড়ি কেন, কারও কানেই যাবে না। ভাল কথা, আমাকে নিয়ে এত খুশির কী আছে মা, যেন তোমার শাশুড়িমা যতই গালমন্দ করুক, শুধু আমার আদর পেলেই আর কিচ্ছু লাগবে না তোমার। তোমার পেটের ওপর শুয়ে দুধে মুখ দেব। গালে চুমু খাব তোমার। তুমি বলবে, তোমার সেই ছোট্টবেলার মতোই সব কিছু করতে। সেই তুমি যেমন তোমার মায়ের সঙ্গে —। সেই সব কথা কী করে মনে পড়ল তোমার? বড় হয়ে সবার কি মনে থাকে সব কথা? সেই তোমার ছোটবেলায় তুমি যে একেবারে ছোট ছোট হাতে চিরুণী নিয়ে চুল বেঁধে দিতে তোমার মায়ের, তেল মাখিয়ে দিতে, আলতা পরিয়ে দিতে পায়ে — তোমার বাবা নাকি সহ্য করতে পারত না তোমাকে। বাইরে থেকে এসে মদ খেয়ে বেহুঁস সেই লোক নাকি মায়ের কোলে তোমাকে দেখেই জ্বলেপুরে উঠত। বাবারা এমন হয় কেন গো মা? তোমার সেই কেরালার লোকটির কথা ভাবো, সেই লোকটিও কেমন —। আমার কিন্তু একেবারেই ভাল লাগে না মা।
তোমার শ্বশুর নাকি পুজা দিতে যাবে। তোমার শাশুড়ি বলল চৌপুরির পঞ্চানন ঠাকুরের মন্দিরে নিয়ে যাবে তোমাকে। তুমি, তোমার বর আর তোমার শ্বশুর বা শাশুড়ি তো থাকবেই। কিন্তু নিজেদের জমির একেবারে নতুন তোলা ধানের ছড়া লাগবে। হ্যাঁ, ধান কাটারও সময় তো হয়ে গেছে। জানলাম তো সব। জানলাম তো তুমি জানলে বলেই। তোমার শাশুড়ি ফোন করছিল কেরালার সেই লোককে। বলল, পাঁচ-সাত দিনের মধ্যে ফিরতে হবে। ধান পেকে গিয়েছে জমির। রাখা যাবে না বেশি দিন। কী এক ঝড়ের কথা বলল। পঞ্চায়েত থেকে নাকি বলে গেছে, যত তাড়াতাড়ি হয় —।
তোমার কেরালার সেই লোক কি ভালবাসে না তোমাকে? তোমার মায়ের এক ডাকে কেমন সেই কোন দূরের কেরালা থেকে —। পুজো দিতে হবে চৌপুরির মন্দিরে। সবাই দেয় তো। প্রত্যেক মঙ্গলবার। পাশের বাড়ির ছোট বউও —। ওই পুজোতেই নাকি ফুটফুটে ছেলে হয়েছে একটা। মানত মানে বলতে হবে মনে মনে। বলতে হবে, ইচ্ছে পূরণ হলে একেবারে মাটির তৈরি জোড়া ঘোড়া দেব। ছাগল দেব। সত্যিকারের ছাগল। কিন্তু নাতির মুখ দেখাতে হবে।
না, আমাকে কেউই চায় না ওরা। তোমার সেই কেরালার লোক, তোমার শাশুড়ি, শ্বশুর — কেউই না। তাই না মা? শুধু তুমি। শুধু তুমি একা। কিন্তু একটা ঠাকুর কি ওদের ইচ্ছেমতো ছেলে দিতে পারে তোমার পেটে? তুমি না চাইলে তোমার পেটে কী করে অন্য কিছু দেবে? কী করে দেবে? তোমারই তো পেট।
উফ্, কী রকম ঠাকুর গো মা? গায়ের রঙ লাল, রক্ত-লাল তিন-তিনটি চোখ। মাথায় জট, আর কি বড় গোঁফ ভাবো, হাতে ত্রিশূল — কি রাগ! তোমার শাশুড়ি মানে আমার ঠাকুমার চেয়েও বেশি।
কেরালার সেই লোক তাহলে ঘরে ফিরল। কেমন হুড়মুড় করে এল ভাব। শুধু ট্রেনে ওঠার আগের রাতে ফোন করল তোমাকে, বলল, সেই কেরালা থেকে শাড়ি আনছে একটা তোমার জন্য। সাজার জিনিষ কিছু লাগবে কিনা জানতে চাইল, তাহলে শেয়ালদার রাস্তা থেকে — ।
ফেরার পরের দিনই মাঠ। যেন তোমার জন্য নয়, শুধু ওর মায়ের কথা শুনে জমির ধান নষ্ট না হওয়ার ভয়েই ঘরে ফিরল লোকটা। কেরালার সেই লোক একবার তোমাকে বারণ করল মাঠে নামতে। থাক, এই রোদে —। তোমার শাশুড়ির অমনি কি রাগ! বলে উঠল, ‘আমরা কি আর মা হইনি জীবনে? পেটে ধরিনি তোদের?’
নতুন কাটা ধানের শীষ হাতে তোমাকে কেমন তোমার বর — কেরালার সেই লোক আর তোমার শাশুড়ির সঙ্গে ভ্যানে উঠতে হল। এরপর নৌকা। আবার ভ্যান, আবার নৌকা। এবার হাঁটো ঢালাই রাস্তায়। দূর থেকেই কেমন মেলার মতো লাগছিল মন্দিরের উঠোনটাকে। তোমাদের মতো অনেকেই ধানের শীষ, ফল-মিষ্টি। কারও বা হাতের দড়িতে আটকে রাখা ছাগল। ওদের মনের ইচ্ছে তার মানে পূরণ হয়েছে ঠিক। রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে কেরালার সেই লোক কেমন তোমার কানের কাছে মুখ এনে হাসপাতলের ডাক্তারের মেসিনে তোলা ছবির কথা বলল। বলল, একেবারে ছেলেই তো লাগছে, তাই না? তোমার মনের মধ্যে অমনি সেই কবে ঢুকে যাওয়া আর একটা কেউ যেন উঠে দাঁড়াতে চাইল। কিন্তু না, কেরালার সেই লোক যতই আমাকে ঠেলে সরিয়ে দিতে চাইছে, তুমি তত আমাকে জোরে আঁকড়ে ধরে থাকতে চাইছ। তুমি কিন্তু মুখ ফুটে বললেই না কিছু, শুধু নিজের মনে আমাকে নিয়ে —। যেন আমাকে কোলে নিয়ে আবোল-তাবোল গল্প বলে, কেরালার সেই লোকের কথা যেন আমার কানে না যায় তার চেষ্টা করছ।
যাই বলো না মা তোমাদের আকাশের ওই চাঁদটাকে আমার ভাল লাগে খুব। কেরালার সেই লোক রাতে ঘরে না ফেরা পর্যন্ত ওই যে তুমি জানালার ধারে বসে থাক, ওই যে তুমি আকাশের দিকে তাকিয়ে, তোমার সেই ফেলে আসা ঘরের কথা ভাবতে থাক, ওই যে তুমি আমার সঙ্গে লুকোচুরি খেলতে থাক নিজের মনে — ওই সময়টাই, আমার মনে হতে থাকে এই একই আকাশ তো তোমার সেই ফেলে সেই ঘর, সেই পুকুরপাড়, তোমার মা —। সব কিছু ঠিকই আছে কোথাও। একেবারে এই আকাশের নীচেই তো! আর আমি যেন কখনও একেবারে তুমি হয়ে সেই পুকুরপাড়, পুকুরপাড়ের সেই ঘর, তোমার মায়ের পেছন পেছন হামাগুড়ি দিয়ে —, আর তোমার মা কেমন আমাকে দেখে বলে উঠবে, আরে তুই? আমি তাহলে কে মা? আমি কি তাহলে তুমি? তুমি কি আসলে আমিই? এই সব ভেবে যখন খুব অবাক হব আমি, ঠিক তক্ষুনি আকাশের চাঁদ একেবারে মেঘের আড়াল থেকে বেরিয়ে আসবে। যেন নিম বা শিরিষের ডাল-পাতাগুলির ফাঁক-ফোকর বেয়ে হলুদ আলো একেবারে গলে গলে পড়বে। একটা কোকিল ঠিক অমনি একটা সময়ে এই রাতের বেলাতেই কেমন ‘কু-উ-উ’ করেই ডেকে উঠবে ভাবো! কু-উ-উ-উ। পৃথিবীটা খুব সুন্দর তাই না মা?
তুমি ভেবেছিলে নাড়িভুঁড়ি। ভেবেছিলে তোমার পেটের নাড়িভুঁড়ি বের করে তারপর বের করবে আমাকে। তোমার তখন হালকা লাগছিল খুব। এমনকী আমার কথাও যেন মনে ছিল না আর। কিন্তু ওই যখন তোমার বুকের ওপর রেখে দেওয়া নাড়িভুঁড়ি তুলে নিয়ে চলে যাচ্ছে নার্স, কী মনে হল তোমার, আর ডেকে উঠলে, ‘নার্সদিদি —।’
মাসখানেক আগের সেই ঝড়ের কথা মনে আছে? ওই ঝড়ের কথা মনে করিয়েই কিন্তু তোমার শাশুড়িমা ডেকে পাঠাল কেরালার সেই লোকটিকে। এরপর মাঠে নামলে তুমিও। ভাগ্যিস তোমরা সবাই মিলে হাত লাগিয়ে —। নইলে নষ্ট হত সব। মানে মাঠের সব ধান। উড়েই যেত। উফ্, কেমন এলোমেলো সেই বাতাস। কী ঝাপট। ঝড়ের ধাক্কায় ইউক্যালিপট্যাসের মাথাগুলি নুয়ে একেবারে —। আর শোঁশোঁ শব্দের সঙ্গে আকাশ ভেঙে বৃষ্টি। যেন তোমাদের গ্রামের সব চিহ্নই তখন ভেসে যাবে কোথাও। যেন ঝড়ের পর তোমাদের কেউ কোথাও থাকবে না আর।
তোমার নার্সদিদি এবার তোমার ভাবনার সেই নাড়িভুঁড়ি কোলে তোমার সামনে দাঁড়াল এসে। তুমি দেখলে নাড়িভুঁড়ি কোথায়, এ তো —, আর কেঁদেও উঠল যেন কেউ তোমাকে দেখে। আর অমনি সেই ঝড়ের মতো কিছু একটা বা এক ঝাপটায় নিমেষেই —।
নার্সদিদি বলল, ছেলে, ছেলে হয়েছে তোমার।
কোথায় গেলে তুমি, ও মা। আমি কি তাহলে নেই? কোথাও নেই? তুমি? তুমি কোথায়? তুমি কি আছো কোথাও? না কি তুমি — তুমি কি ছিলে কোথাও? না কি তুমিও —।
সেই ধানমাঠের কথা মনে পড়ছে আমার। তোমার সেই তাকিয়ে থাকা। রাস্তা পার হয়ে ধানের সবুজ। বাতাসে বাতাসে ঢেউ, গোরুর দড়ি ছেড়ে তুমি দূরের মাঠ, গাছপালা আর আকাশ ছাড়িয়ে তুমি একমনে —। আমার সেই পুকুরের কথা মনে পড়ছে মা, সেই ছাতারের ঝাঁক, হাঁসগুলির প্যাঁক-প্যাঁক। লেজঝোলা পাখির ক্কি-ক্কি-ক্কি-। আমার সেই জানালার ফাঁক দিয়ে দেখা আকাশের কথা মনে পড়ছে মা। ও মা, শুনতে পাচ্ছ? সেই যে মেঘের ফাঁক গলে হলুদ চাঁদ, আর ডালপাতার ফাঁক গলে উঠোনের গায়ে গড়িয়ে পড়া —। পৃথিবীটা খুব সুন্দর কিন্তু মা। আমার কথা তুমি কি শুনতে পাচ্ছো? তুমি কি এই এখনও —।