আমাদের মানসিকতা প্রায়ই প্রতিভাদের বুঝতে না পেরে দু-ভাগে ভাগ করে ফেলে। যেমন গদ্যশিল্পী মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়; আদি মানিকবাবুকে আমরা ফ্রয়েডের অনুগামী ভাবি ও পরবর্তী মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়কে মার্কসবাদী। এরকম ভুল সলিল চৌধুরীর বিচারে প্রায়ই ঘটতে থাকে। একজন সলিল চৌধুরী—বিপ্লবী কমিউনিস্ট, পুলিশের পরোয়ানা ফাঁকি দিয়ে যাঁর সুর ও কথা জনসমুদ্রে ছড়িয়ে পড়ে ঢেউয়ের মতন। আর আরেক জন সলিল চৌধুরী যিনি হিন্দি ছবির ও রেকর্ডের—যাঁর ডাকে আমরা পথ হারাবো বলে বারে বারে পথে নেমে যাই। আমাদের সংগীত বিশেষজ্ঞরা ঠিক বুঝে উঠতে পারেন না, জঙ্গি গণসংগীতকারকে কী করে মায়াবী বাঁশিওয়ালার সঙ্গে মেলাবেন। আমাদের উদাসীনতা অথবা অযথা আবেগ বুঝতেই পারে না সলিল চৌধুরী এক ও অবিভাজ্য। যদি আমাদের সংগীতের ইতিহাস সত্যভাষী হয় তবে একদিন তাঁকে স্বীকার করতে হবেই, আধুনিক বাংলা গানের নির্বিকল্প শীর্ষ পুরুষ তিন জন—রামপ্রসাদ সেন, রবীন্দ্রনাথ ও সলিল চৌধুরী। গান ও সুর দু-দিক থেকেই, সরস্বতী এঁদের বাঁ-হাতে এমন বুড়ো আঙুল সাজিয়েছেন, যাঁর ছন্দ অমোঘ ও অব্যর্থ। বৈশাখের প্রখর চরাচর ও গাঢ় শ্রাবণ নিশীথে, দহনে ও প্লাবনে, শীতের কুয়াশায়, যেখানে মানবজমিন আবাদ করলে সোনা ফলে রামপ্রসাদের সৌজন্যে সেখানে, রবীন্দ্রনাথ যেমন গভীর রাতের জাগরণে, সলিলও তেমন অশ্রু ও উল্লাসে স্বাক্ষরিত।
রামপ্রসাদের গানে সরলতার আশ্চর্য আহ্লাদ আমরা বুঝি—কী করে যে তিনি লেখেন, ‘যে দেশে রজনী নাই এমন দেশের লোক পেয়েছি’! পথে চলে যেতে যেতে কী অচেনা কুসুমের গন্ধে রবীন্দ্রনাথের শব্দ চুম্বন করতে থাকে সুরের আরোহী ও অবরোহী ওষ্ঠদ্বয়, সলিলের তবে নিজস্ব সাম্রাজ্য কোথায়? তিনি কি শুধুই সুরের বাঁশিওয়ালা? তাহলে তো নজরুল বা দ্বিজেন্দ্রলালের সঙ্গে তাঁর তুলনাই সংগত ছিল।
আসলে সলিল চৌধুরী যেমন, নগরায়ন ও শিল্পায়নের সঙ্গে সঙ্গে সভ্যতা ভারতীয় গানের ভাষা, সুর, বাদ্য ও লয়ে যে বদল আনছিল তার ধারাবাহিক প্রকাশ, তেমনভাবেই তুমুল বিপ্লব। তিনি আমাদের গানে, যা সবে সূচিত হচ্ছিল, তার আগ্নেয় উন্মোচন ঘটালেন। তাঁর সংগীতের জগৎ ধারণ করে রইল যা কিছু আপাত অসম্ভব তাই—অনুভূতির সমান্তরাল স্তর; ভারতীয় রাগসংগীতের শরীরে তিনি সংযুক্ত করলেন পশ্চিমি ঘরানার বিপরীত মেরু—স্বর ও প্রতিস্বর। এ প্রসঙ্গে সত্যজিৎ রায়ের মতামত শুনলেই আমরা অনুমান করতে পারব সলিলের ভাষাপথ সন্ধান, সংগীত সৃজনে তাঁর অভিযান কত মৌলিক ও দুঃসাহসিক। সত্যজিৎ মনে করেন এই যে, আমরা বিটোফেনের সিম্ফনিতে আন্তর্জাতিক ভ্রাতৃত্ববোধ বা নিয়তির বিরুদ্ধে সংগ্রাম অথবা মানবিক যন্ত্রণার বিচ্ছুরণ শুনি তার একটি মলাট আছে। পশ্চিমি ধ্রুপদী সংগীত সোনাটা রূপ আবিষ্কারের সঙ্গে সঙ্গে মানবিকীকরণের একটি প্রক্রিয়া খুঁজে পেলো, যাতে পুরুষ প্রথম বিষয় ও নারী দ্বিতীয় বিষয়। তাদের ঘাত-প্রতিঘাতে অবশেষে গড়ে ওঠে ক্রমান্বয়িক-এক অনেক স্বর ও অনেক স্তরযুক্ত সাংগীতিক স্থাপত্য। কিন্তু ভারতীয় রাগসংগীতে এরকম পরিসর নেই। তা আলাপে শুরু হয়ে স্কেলের আরোহী পর্যায় ধরে এগিয়ে যায়। যে জন্য সত্যজিৎ মনে করেন, ভারতীয় রাগসংগীত চলচ্চিত্রীয় আখ্যানের খুব সহায়ক ফর্ম নয়। অর্থাৎ অঙ্কের পরিভাষা ব্যবহার করে একটু কঠিন করে বললে পাশ্চাত্য সংগীত যেখানে সমন্বয়ধর্মী, মূর্ত ও ইনটিগ্রাল সেখানে ভারতীয় গানের পরম্পরা বিশ্লেষণাত্মক, বিমূর্ত ও ডিফারেনশিয়াল।
আর এখানেই সলিল চৌধুরীর প্রতিভা ডানা মেলে দেয়। তিনি, মার্কসবাদী বলেই, সম্ভব করেন বিপরীতের ঐক্য : মাও সে তুঙ যাকে বলেন, ইউনিটি অব অপোজিটস এবং এলিয়ট বলেন, ইউনিফায়েড সেনসিবিলিটি। আমাদের যুগের সবচেয়ে বড়ো ছবি আঁকিয়ে পাবলো পিকাসো একবার বলেছিলেন, ছবি আঁকা হলো অন্ধদের শিল্প। আর সুরকার সলিল চৌধুরী একদা আমাদের জানালেন—সুর হলো মূলত দৃষ্টির। এক আশ্চর্য বিকেলে তাঁর কথাবার্তা শুনছিলাম আমি ও আমার বন্ধু প্রয়াত কবি অনন্য রায়। আজও ঋত্বিক ঘটকের ‘যুক্তি তক্কো গপ্পো’ ছবিতে নকশালপন্থী যুবকের ভূমিকায় অনন্যর অভিনয় লোকে ভুলতে পারে না। গল্পটা খুলেই বলি। তখন কিছুদিন সলিল অনন্যদের ১/১২ রোল্যান্ড রোডের বাড়িতে ভাড়া থাকতেন। একদিন লোডশেডিং-এর বিকেলে তিনি আমাদের লঘু আড্ডার মধ্যে জানালেন—‘যা…রে, যারে উড়ে যারে পাখি’ গানটির জন্মরহস্য। বম্বেতে বাড়ির বারান্দা থেকে পাখিদের উড়ে ওপরে ওঠা ও হঠাৎ ঝুপ করে নেমে আসার ছন্দে তিনি গানটি পেয়েছিলেন। গানে যদিও বলা হচ্ছে, ‘যা ফিরে আপন নীড়ে’, কিন্তু গান আর শিকড়ে, রুট কর্ড বা ‘সা’-তে ফিরছে না; অন্তর্বর্তী মুহূর্তটুকু রেখে আবার আকাশে চলে যাচ্ছে। ১৯৫৯ সালে লতা মঙ্গেশকর এই গান বাংলায় রেকর্ড করেন। আর দু-বছর বাদে ‘মায়া’ চলচ্চিত্রে হিন্দিতে লতাই আবার আকুল করে দেন তাঁর অনবদ্য কণ্ঠে—‘যারে, যারে উড় যারে পঞ্ছি, বাহারোঁকে দেশ যারে…।’
যাঁরা গানের তত্ত্ববিশ্বের খোঁজ রাখেন তাঁরা জানেন, বিটোফেন বিষয়ে তাঁর অসামান্য দার্শনিক বক্তব্য পেশ করবার সময় জার্মান পণ্ডিত ও ফ্রাঙ্কফুর্ট স্কুলের অন্যতম সারথি থিয়োডোর আডোর্নো তাঁরই সহকর্মী ওয়াল্টার বেঞ্জামিনকে উদ্ধৃত করে জানিয়েছিলেন, দৃশ্যকলা যেমন বস্তুকে উদ্ধার করে, এমন গানও আছে যা পাখিদের ভাষাকে নশ্বরতার হাত থেকে রক্ষা করে। সলিল চৌধুরীর মহত্ত্ব এখানেই যে তিনি উড়ন্ত পাখির যাত্রা-মুহূর্তকে গানে চিরদিনের করে রাখলেন। সলিল যখন আঙুলের সাহায্যে পাখিদের ওঠাপড়া দেখাচ্ছিলেন তখন নিজেদের ভাগ্যবান মনে হচ্ছিল। বুঝতে পারছিলাম ফরাসি কবি আপলিনেয়ারকে কেন জঁ ককতো জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানিয়েছিলেন একটি ছোট বাক্যে—পাখিটি তার আঙুল দিয়ে গান গায়। আমাদের স্মৃতিতে এই পাখিটি তো সলিল চৌধুরী।
আরেক বার সলিল আমাদের অবাক করে দিলেন, ‘আমি ঝড়ের কাছে রেখে গেলাম আমার ঠিকানা’ গানটির আঁতুড়ঘরে আলো ফেলে। যেটুকু জানতাম তা হলো, ১৯৬১-তে হেমন্ত মুখোপাধ্যায় এই গানটি পুজোর রেকর্ড হিসেবে গেয়েছিলেন। কিন্তু জানতাম না যে সলিল এই গানটি লিখেছিলেন তাঁর অভিন্নহৃদয় বন্ধু ঋত্বিক ঘটকের ‘কোমল গান্ধার’ ছবিটির জন্য। একদিন ঋত্বিক ঝড়ের মতো, সলিল চৌধুরীর কথায় ‘যেমন আসা ওঁর পক্ষে স্বাভাবিক’, সলিল চৌধুরীর মুম্বাইয়ের বাসায় এলেন সকালে। এসেই বললেন—কুইক, কুইক, একটা প্রেমের গান লিখে দে তো, আমায় এক্ষুনি কলকাতায় ফিরতে হবে’। সলিল একটু থতমত খেয়ে বললেন— ‘এক্ষুনি কী করে হবে? তাছাড়া প্রসঙ্গটা কী?’ ঋত্বিকের জবাব—‘একটা ছবি করছি। কোমল গান্ধার। তাতে এই গানটা লাগাবো। এই আমি তুই যেরকম প্রেম করেছি সেরকম গান—ন্যাকামির প্রেম নয়’। সেদিন সময় ছিল না। ঋত্বিক ফিরে গেলেন। সলিল লিখলেন, সুরও দিলেন। কিন্তু ‘কোমল গান্ধার’-এ সেই গান ব্যবহৃত হয়নি। সলিল আমাদের বলেছিলেন, ‘ছবিটা দেখে বুঝেছি ঋত্বিকের সুযোগও ছিল না। কিন্তু ওই ছবিতে ‘বিদ্রোহ চারিদিকে বিদ্রোহ আজ’ গানটা চমৎকার ব্যবহার করা হয়েছে— পরে হেমন্তদা গেয়ে গানটাকে জনপ্রিয় করে দিলেন’।
আজ যদি গানটিকে আবার পড়ি তবে দেখবো রূপক ছাড়িয়ে নিলে গানটি সলিল চৌধুরীর আত্মজীবনীর ছেঁড়া পাতা; হয়তো ঋত্বিকেরও। একদিন যাঁরা রক্তপতাকার গর্বে মথিত হয়েছিলেন, মিছিলের অরণ্যে হারিয়ে যেতে চেয়েছিলেন, তাঁরা পার্টির থেকে দূরে সরে গিয়ে যে অভিমান নিয়ে গোপনে কাঁদেন—এই গীত সেই কান্নার দলিল। এই গানে গল্পের আড়ালে যে গল্প তা ভারতীয় গণনাট্য সংঘের, যা আইপিটিএ নামেই পরিচিত, অন্দরমহলের গল্প। সত্যি কথা বলতে কী সলিল চৌধুরীর গানে শব্দের বা সাহিত্যের ভূমিকা নিয়ে আমরা তেমন করে কখনওই ভাবিনি। তিনি সেই কবি যিনি রবীন্দ্রনাথের দীর্ঘদিন বাদে আবার গানকে ইতিহাসের সমীপবর্তী করলেন। তিনি যখন ১৯৫২ সালে ‘শ্যামল বরণী ওগো কন্যা’ আর তার ঠিক দশ বছর বাদে ‘সাত ভাই চম্পা’ রচনা করেন, তখন বুঝতে হবে সলিল চৌধুরীর অন্বিষ্ট জাতীয় ব্যালাড রচনা, যা হয়ে উঠবে আমাদের রক্তস্রোতে জেগে থাকা রূপকথার গহন কেশপাশ। এরকম প্রয়াস রূপসী বাংলায় বেহুলার প্রতিমা রচনা করে জীবনানন্দ দাশ গেয়েছিলেন। বিষ্ণু দে ‘চম্পা তোমার মায়ার অন্ত নেই’ লিখেছিলেন। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ ছাড়া আর কোনও গীতিকার দৈনন্দিনতা থেকে ইতিহাসে চলাচলের জন্য কোনও নায়িকা রচনা করেননি। শিল্পী হিসেবে সলিল চৌধুরীর গান আন্তর্জাতিক মাত্রা পায় খানিকটা বিশ্বযুদ্ধকালীন ফরাসি প্রতিরোধের ভাষার সঙ্গে পা মিলিয়ে চলতে পারে বলেও। একদা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অবরুদ্ধ ফ্রান্সে কবি লুই আরাগঁ যখন লেখেন, ‘এলসার চোখ’ তখন কবির প্রেমিকা স্বাধীনতা ও স্বদেশের সঙ্গে এক হয়ে যেন দ্বিতীয় জোয়ান অফ আর্কের জন্ম দেন। সলিলের অহল্যা বা শ্যামবর্ণা নারীরা এরকমই— তারা লোকনায়িকা। তারা আরাগঁর নায়িকাদের মতোই কান্নার চাইতেও সুন্দর। আরাগঁ লেখেন—Look in her eyes how pensively she stares!
আর তেভাগা ও মন্বন্তরের স্মৃতির স্তূপ থেকে তাকিয়ে থাকে সলিল চৌধুরীর ‘গাঁয়ের বধূ’। কী এক অপব্যয়ী অক্লান্ত আগুনে পুড়তে পুড়তে শিল্পী সলিল চৌধুরী রচনা করেন সময়ের যুগপৎ প্রাচীন ও নবীন মলাট। তাঁর দুর্ভাগ্য যে তাঁর স্বদেশবাসী বুঝতেই চায় না যে, গীতিকার-সুরকার-অ্যারেঞ্জার ত্রি-মাত্রিক এই সম্পর্ক ছাড়িয়ে তিনি চলে যান অনেক দূরে যেখানে দর্শন এসে গানকে টেনে নেয় অমরতার সহবাসে।
এ কথা ঠিক যে ভাষাগত স্বাচ্ছন্দ্যের জন্য তিনি বাংলায় যতটা সাহসী শব্দের প্রয়োগ ঘটান, আটপৌরে হাটে-বাজারের ভাষাকে জুড়ে দেন তৎসম সাধুভাষার স্থাপত্যে, হিন্দি তাঁর ভাষা নয় বলেই সেখানে তিনি তত সাবলীল নন। বরং সেখানে অন্য গীতিকারেরা তাঁর স্বপ্নের প্রদেশ সবসময় ছুঁতেই পারেন না; তবু ‘মধুমতী’(১৯৫৮)-তে দেখা যায় যে-মুহূর্তে লতা মঙ্গেশকর গেয়ে ওঠেন সেই অবিস্মরণীয়—‘আ জা রে পরদেশি, ম্যায় তো কব সে খাড়ি ইস পার’ তখন সুরের একটি পৌরাণিক কুয়াশা এসে সেই স্বরকে সুদূর ও রহস্যময় করে তোলে। সমস্ত মধুমতী-র সংগীত যেভাবে নির্মিত হয়েছে তাতে স্পষ্ট যে এই অকিঞ্চিৎকর আখ্যানটিকে স্থানিক পর্যায় ছাড়িয়ে অতিকথার স্তরে নিয়ে যাওয়ায় সলিল চৌধুরীর অবদান অসামান্য। বিদেশে রয়্যাল ব্রাউন প্রমুখ সমালোচকেরা সিনেমায় গানের ভূমিকা নিয়ে যে সমস্ত কথা বলেন সেই পাঠক্রম মিলিয়ে পড়লে দেখা যায় বিমল রায়-সহ পঞ্চাশ ও ষাট দশকের হ্নিন্দি ছবির পরতে পরতে তিনি জুড়ে দিয়েছিলেন সুরের কারুকার্য। আবহসংগীত তাঁর প্রতিভার ছোঁয়ায় প্রায়ই একটি সোনোরাস এনভেলাপ বা সুরেলা খামে মুড়ে রাখে কাহিনিটিকে। সংগীত যে বিমূর্ত হওয়া সত্ত্বেও কীভাবে মূর্ত আখ্যানকে স্থায়িত্ব দিতে পারে তা সলিল পরেও ‘আনন্দ’ (১৯৭০) এবং ‘ছোটি সি বাত’ (১৯৭৫) জাতীয় ছবিতে প্রমাণ করেছেন। সলিলের এই কৃতিত্ব সম্ভব হয়েছে এইজন্যে যে—তিনি জানতেন অতিকথা পড়বার রীতি ঠিক স্বরলিপি পড়বার মতন। উত্থানপতনময় সমগ্রতা যেমন সুরকে তেমনই কিংবদন্তিকে জীবন্ত করে তোলে। মনে রাখতে হবে ইউরোপে যখন সংগীত কিংবদন্তিকে প্রতিস্থাপিত করছিল তখন যে কোনও সংগীত সে দায়িত্ব পায়নি। আঠারো ও উনিশ শতকে মোৎসার্ট ও বিটোফেনের আবির্ভাবে গানের মানবিকীকরণ পূর্ণতা পায়। সলিল চৌধুরী অকারণে পাশ্চাত্য সংগীতের আগ্রহী ছিলেন না বা অযথা মোৎসার্টের অনুরক্ত হয়ে পড়েননি। মনীষী লেভি স্ত্রাউসও খেয়াল করেছেন যে রেনেসাঁ ও সপ্তদশ শতকে যখন মিথিকাল চিন্তাকে সরিয়ে ক্রমশই যুক্তিবাদের পথ প্রশস্ত হচ্ছিল তখনই সংগীত তার প্রাচীন ভূমিকা ছেড়ে আবেগ ও সংবেদনার পরিসরে নিজেকে নতুন ভূমিকায় খুঁজে পেলো। যেমন বাখ, মোৎসার্ট, বিটোফেন ও ভাগনার। সুতরাং বুদ্ধি ও অনুভূতির অন্তর্বর্তী মায়াটুকু গানের।
এই যে অন্ধকার থেকে এসে নবসূর্যে জাগার মতন পশ্চিমি সুরতরঙ্গ তা সলিল চৌধুরীকে হাতছানি দেয় ইতিহাসের নির্দেশেই। এইজন্যেই নিজের সম্পাদিত গণনাট্য পত্রিকার প্রথম সংখ্যায় তিনি পঞ্চাশ দশকের শুরুতেই দাবি করেন— ‘আমাদের লোকসংগীতের ও রাগসংগীতের জনগণগ্রাহ্য আঙ্গিককে ভিত্তি করে ইউরোপীয় সংগীতের বৈচিত্র্যকে সার্থকভাবে ব্যবহার করা যেতে পারে।’ আর রক্ষণশীলদের তাঁর বিরুদ্ধে মস্ত অভিযোগ ঠিক এখানেই যে সলিল বর্ণসংকর দোষে দুষ্ট, সলিল গুরুচণ্ডালী মানেন না। আমাদের মার্গ সংগীতে স্থায়ী অন্তরায় একটি বিশেষ রাগের ক্ষেত্রে বাঁধা পর্দার মধ্যে দিয়ে যাতায়াত করতে হয়। কিন্ত ‘বিদ্রোহ চারিদিকে, বিদ্রোহ আজ’ এই গানের বিদ্রোহ শুধু বিষয় ও ভাষায় নয়; বিদ্রোহের অপ্রত্যাশিত বিস্তার বোঝাতে গিয়ে মাইনর কর্ড ও মেজর কর্ড-এর সীমানা কত পাতলা তা বোঝাতে হয়েছে। ‘দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ’—সুরে যে স্ক্যানিং তা কবিতায় নেই। ‘প্রত্যহ যারা’ কয়্যার ফর্মের মধ্যে দিয়ে আসছে, তারা ‘তাই তো চলেছি দিনপঞ্জিকা লিখে’,—ফিরে আসে আবার মাইনর কর্ড-এ। বা ধরা যাক বিখ্যাত ‘রানার’, এই হতভাগ্য মানুষটির যাত্রা যে অন্তহীন তা বোঝানোর জন্য শুধু ‘সা’ থেকে শুরু করে ছ-বার ষড়জ পরিবর্তন আছে। অর্থাৎ ‘সা’ বদলে যাচ্ছে, থামছে না রুট কর্ডে। মধুসূদন দত্ত ‘মেঘনাদবধ কাব্য’-এ নিরুপায় হয়েই অমিত্রাক্ষর ছন্দ ব্যবহার করেছিলেন। পয়ার তাঁর উচ্ছ্বাসের শিখরে পৌঁছোতে পারতো না। তেমনি সলিল টোনের অদলবদল করেন; মেজর কর্ডের দিগন্ত থেকে মাইনর কর্ডের দিগন্ত জুড়ে একটা ছবি ফুটিয়ে তুলতে চান, না হলে পুঁজিবাদী ব্যবস্থার ক্লান্তি ধরা পড়বে না। নতুন সভ্যতা নতুন সুর চায়, সে হিন্দু বিধবার হেঁশেলের ছোঁয়াছুঁয়ি, ব্যাকরণের কূটকচালি বরদাস্ত করবে না।
উনিশ শতকে আমাদের চেতনার অদলবদল কোনও রেনেসাঁ নয়, কিন্তু আমাদের সাংস্কৃতিক চেতনার মন্থরতা ঔপনিবেশিকদের উপস্থিতির জন্যই ভাঙতে শুরু করলো। ভারতীয় সংগীতেও একক স্বরের সঙ্গে সঙ্গে স্বরসংগতি প্রবেশ করলো। রবীন্দ্রনাথ, দ্বিজেন্দ্রলাল ও নজরুল ক্রমশই বিরোধী স্বর জুড়ে দেওয়ার প্রস্তুতি নিতে চাইছিলেন। ত্রিশ ও চল্লিশ দশকে আমাদের নাগরিক মানসিকতার চাপেই সম্ভবত সুরসাগর হিমাংশু দত্ত তৈরি করেন সেই অসামান্য গান—‘তোমারই পথ পানে চাহি’, যেখানে পাশ্চাত্য মেলোডিক স্ট্রাকচার ধরা পড়ে, যদিও প্রাথমিক স্তরে। আসলে আধুনিক বাংলা কাব্য তখন এলিয়ট-সহ পশ্চিমের কাব্যাদর্শ পরীক্ষা করছে; জীবনানন্দ দাশ, বিষ্ণু দে, সমর সেন, বুদ্ধদেব বসু আধুনিক কবিতায় নতুন রক্ত এনে দিচ্ছেন। ‘পুতুলনাচের ইতিকথা’ বাংলা উপন্যাসের জলবায়ু পালটে দিলো। বিজন ভট্টাচার্যের ‘নবান্ন’ প্রসেনিয়াম মঞ্চ প্রসঙ্গে ধারণায় আঘাত হানলো। ভারত ছাড়ো আন্দোলন, কমিউনিস্ট মতাদর্শ— একটি জাতির জীবন জটিল হয়ে পড়লে,—প্রতিভা-বলেই সলিল বুঝেছিলেন—এবার স্বর-প্রতিস্বরের সংঘাত প্রয়োজন। মার্কসবাদী দর্শনও তাঁকে থিসিস ও অ্যান্টিথিসিসের সংঘর্ষে সিনথেসিসের দিকে এগিয়ে যেতে পরামর্শ দেয়। লোকসংগীত থেকে ভাটিয়ালি হয়ে মোৎসার্ট—কিছুই তিনি অনধিকার চর্চা ভাবেন না। যেমন তাঁর বন্ধু ঋত্বিক ঘটক চলচ্চিত্রে একটি ‘বাস্তবধৃত বহুবিষয় সমন্বিত জটিল নকশা’ উপস্থিত করতে চাইছিলেন, গণ-আন্দোলন ও গ্রাম শহরের বদলে যাওয়া বাসনা তাঁকে বোঝাচ্ছিল পলিফোনি অর্থাৎ বহুস্বর ও কন্ট্রাপ্যুন্টাল অর্থাৎ বিরোধী স্বর সংযুক্তির অপার রূপকথা। যাঁরা সলিল চৌধুরীকে বিদেশি ভাবধারার দাসত্ব করতে দেখেন, তাঁরা বোঝেন না আয়ুর্বেদের দেশে বিজ্ঞানের নিজস্ব দাবিই অ্যান্টিবায়োটিক্স চালু করে দেবে। ধারাপাতের জগতে কম্পিউটার কি বিদেশি? সুতরাং সলিল চৌধুরী দাবি করতেই পারেন, আমাদের মার্গ সংগীতের হারমনি আছে। তিন বা তার বেশি স্বর বাজালেই কর্ড তৈরি হয় এবং সুর যখন কর্ড-এর পর্দার মধ্যে বিচরণ করে তখন যে হারমনি তৈরি হয়—তা থেকে রবীন্দ্রনাথের কোনও কোনও গানও তৈরি হয়, আবার চূড়ান্ত বিচারে ‘আলোর পথযাত্রী’ নামের পলিফোনিক কয়্যারও ডানা বিস্তার করে, আর ‘অযান্ত্রিক’ ছবিটির গাড়িটিকে যে যুক্তিতে ওঁরাও সম্প্রদায়ের মানুষ স্বাভাবিক বলেই ভেবেছিল, সলিল চৌধুরীর সাধারণ সুরের পরীক্ষানিরীক্ষাও জনসাধারণ নিজেদের বলেই মেনে নিয়েছে। যেমন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের গলায় ‘শোনো কোনও একদিন’ গানটি শুরু হয় ই-ফ্ল্যাট স্কেলে। দ্বিতীয় লাইন গাওয়ার পর পুরো টোন মডিউলেট করে তার পরে অন্তরার শেষে চলে যায় জি-স্কেলে। এই গানের তুমুল জনপ্রিয়তা তো আমাদের সুযোগই দেয় না স্বরলিপিকে সন্দেহ করবার। ছোটো করে বললে ভারতীয় সংগীত একরৈখিক ও একক স্বরের। সলিল চৌধুরী তাকে বহুমাত্রিক ও বহুস্বর সমন্বিত করতে চাইলেন। সলিল চৌধুরীর প্রতিভার সমস্যা ও সম্ভাবনা এই বিপরীতের আবর্তেই।
স্বয়ং হেমন্ত মুখোপাধ্যায় সিম্ফনির মতো কঠিন সুরে বাঁধা ‘রানার’ গানটি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন— ‘সলিল, এত কঠিন সুর, মানুষ কি নেবে? এ যে হারমোনিয়ামে তুলতে কষ্ট হচ্ছে’। আসলে ‘রানার’ গানে ‘সা’ পালটেছে অন্তত ছ-বার। কিন্তু এককভাবে দেখলে রানার-এর থেকে জনপ্রিয় বাংলা গান আর নেই আজ। পার্টিতে তখন চূড়ান্ত সংকীর্ণতা; যান্ত্রিকতার ঠুলি তাদের চোখে। কমিউনিস্ট পার্টি জানালো—‘আয় বৃষ্টি ঝেঁপে, ধান দেব মেপে’ প্রতিক্রিয়াশীল গান—সুতরাং গণনাট্য সংঘ এই গান গাইতে পারবে না, বরং এই ধরনের গীত রচনার জন্য নিন্দা প্রস্তাব গ্রহণ করতে হবে। ‘হায় বিধি বড়ই দারুণ’—এই বাক্যটি লিখে সলিল ঈশ্বর ও নিয়তির ভজনা করেছেন। কমিউনিস্ট পার্টিতে ভগবানে ভক্তি চলবে না।
এতদিন পরে আমরা স্তম্ভিত হই, ঋত্বিক ঘটক ও সলিল চৌধুরীর মতো আলোকস্তম্ভকে তাঁদের পার্টি বুঝতে পারেনি। ‘ভেঙে মোর ঘরের চাবি’-র মতো কীর্তনাঙ্গ রবীন্দ্রসংগীতকে ভেঙে তিনিই তো রচনা করেছিলেন বিদ্রোহচ্ছটা— ‘বিচারপতি তোমার বিচার করবে যারা আজ জেগেছে সেই জনতা।’ ১৯৪৬ সালে জুলাই মাসের বিকেলে বিখ্যাত রেল ও পোস্ট অফিস ধর্মঘট উপলক্ষে মনুমেন্ট ময়দানের জনসভায় যেদিন ‘ঢেউ উঠছে কারা টুটছে’ গাওয়া হলো—সেদিনই সে যুগের প্রখ্যাত গায়ক ও পরবর্তী যুগে বাংলা রেকর্ডিং-এর অন্যতম অভিভাবক সন্তোষ সেনগুপ্ত সে যুগের নবীন গায়ক হেমন্ত মুখোপাধ্যায়কে মৃদুকণ্ঠে জানিয়েছিলেন—‘এক নতুন সুরকারের জন্ম হলো’।
আমাদের চাঁদ ছিল। তারা ছিল। নারী ছিল। এবার একটি নক্ষত্রের জন্ম হয় যে মিছিলের মুখ দেখে ষাটের দশকে। আবার ‘ঘড়ি ঘড়ি মোরা দিল ধড়কে, হায় ধড়কে, কিঁউ ধড়কে’—জিজ্ঞেস করে এখন এই রোদে লাজুক কিশোরীটিকেও যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের আঙিনায় প্রেমে রাঙায়। সেদিনের তেভাগার সুরই তো দেখি আজও বিদ্বজ্জনেদের মোবাইলের রিং টোন, ‘হেই সামালো ভাই হো’, যে রাগ হংসধ্বনির মধ্য দিয়ে ‘মেঘে ঢাকা তারা’য় শঙ্কর বাড়ি ফিরেছিল সে তো আসলে সলিল চৌধুরী। যে একা ছিল সলিল তাঁকে বহু করলেন—তাঁর রাজনৈতিক মতাদর্শ, তাঁর সংগীতের দর্শন, সোলো থেকে অর্কেস্ট্রেশন—পথে ভৈরবী ও পুরবী, জীবন উজ্জীবন, রক্ত, অশ্রু। কিন্তু সলিল জানতেন, জীবনানন্দের মতোই জানতেন, বন্ধু ঋত্বিকের মতোই জানতেন, হয়তো একদিন ‘সমস্ত চরাচরের সমস্ত জীবের হৃদয়ে মৃত্যুহীন স্বর্ণগর্ভ ফসলের খেতে বুননের জন্য’ তাঁর ডাক পড়বে। আমাদের সুরের আকাশে যখন আগুন, তখন তো সলিল চৌধুরীই, এমনকী মাটিতে যখন রজনীগন্ধা, তখনও।
অসাধারণ ! শব্দ-মাধুর্যের অপূর্ব বুননের মধ্য দিয়ে
সলিল চৌধুরীকে জানলাম সুক্ষ্ম বোধে মগ্ন হয়ে। সঞ্জয়দার শব্দরাও জলতরঙ্গের নিপুণ ছন্দে শেষাবধি
বেজে গেল গভীর অনুভবে ।
Lot many unknown things are revealed here. Respect you Sanjoyda.
Great!