সাংবাদিকরা কাগজ বা টিভি চ্যানেলের মালিকদের বেঁধে দেওয়া লাইন মেনেই কাজ করেন। আজকালকার দিনে সেই সাংবাদিকেরই কদর বা প্রমোশন হয় যিনি হাউস পলিসি মাথায় নিয়ে খবর সংগ্রহ করতে যান। সেই সাংবাদিকদেরই সমাজে কদর হয় যাঁদের সম্পদ ও বৈভব থাকে। স্বাধীনতার আগে সাংবাদিকতা ও সাংবাদিকদের একটা মিশন ছিল। কিছু সাংবাদিক ব্রিটিশ শাসকদের পক্ষে লিখতেন। কিছু স্বাধীনতা সংগ্রামের পক্ষে থাকতেন। হরিশচন্দ্র মুখোপাধ্যায়, সত্যেন্দ্রনারায়ণ মজুমদার প্রমুখরা ছিলেন দ্বিতীয় ধারার।
১৯৫০-৬০ দশকেও কিছু সাংবাদিক দেখা গেছে যাঁরা টাকার পেছনে না ছুটে সমাজ ও চলমান রাজনীতির অন্ধকার দিকটা পাঠকের সামনে তুলে ধরতে চাইতেন। বিবেকানন্দ মুখোপাধ্যায়, গৌরকিশোর ঘোষ, সমর সেন প্রমুখরা ছিলেন এই ধারার সাংবাদিক। সমরবাবু আবার মালিকদের কথামতো অন্যায় মেনে লিখতে চাইতেন না। চাকরি ছেড়ে দিতেন। স্টেটসম্যান, হিন্দুস্তান স্ট্যান্ডার্ড-এর মতো বড়ো কাগজের সহ-সম্পাদকের পদ হেলায় ছেড়ে দিয়েছেন। তার পর নিজের মনের মতো ছোটো একটা সাপ্তাহিক ফ্রন্টিয়ার প্রকাশ করতেন। খুবই কষ্টে সংসার চলতো। কিন্তু মালিকের কথামতো না চলে নিজের পছন্দের কাগজ করে জীবনের শেষ দিনটা পর্যন্ত আনন্দেই কাটিয়েছেন। বড়ো কাগজের মোটা মাইনের চাকরি ছেড়ে অভাবকে তিনি হাসিমুখে মেনে নিয়েছিলেন। একদিনের ঘটনা বললেই বোঝা যাবে। সমরবাবুর খবর পেয়ে তাঁর বাড়িতে ছুটে যান মহাশ্বেতা দেবী। মহাশ্বেতা দেবী সমর সেনকে গুরু বলে ডাকতেন। মৃতদেহের পায়ে প্রণাম করে মহাশ্বেতা দেবী দেখেন সমরবাবুর স্ত্রী সুলেখা সেনের চোখে চশমা নেই। জিজ্ঞেস করে জানতে পারলেন, চশমা সারাতে দেওয়া হয়েছে দোকানে। সুলেখা সেন বললেন, চশমার বিল ৬৭ টাকা। ঘরে টাকার অভাব।
সে এক সময় ছিল যখন, তীক্ষ্ণধী সমর সেনের শাণিত গদ্য ঝলসে উঠতো সাময়িকপত্রের পাতায়। মহাশ্বেতা দেবী লিখেছেন, ফ্রন্টিয়ার পত্রিকা (১৯৬৮ সাল থেকে সমর সেন সম্পাদনা করেছেন) সমরবাবুর স্বনির্বাচিত শেষ ও চূড়ান্ত ভূমিকা, এটা স্বীকার করলে ফ্রন্টিয়ার যেসব ব্যাপারের প্রতিনিধিত্ব করতে চেষ্টা করে সেই প্রতিবাদ আন্দোলন, প্রাতিষ্ঠানিক রাজনীতির আমূল কপটতা উন্মোচন এগুলিকেও স্বীকার করতে হয়— কিন্তু তাঁর সময়ের লোকেরা সেটা করতে পারতেন না।
হ্যাঁ, সমর সেন আজ সেই বিরলতম নামগুলির অন্যতম একটি যার সঙ্গে মিলিয়ে নেওয়ার চেষ্টা চূড়ান্ত ব্যর্থ হবে। আরেক বিখ্যাত সাংবাদিক এম জে আকবর বলেছিলেন, সাংবাদিকতার কাজকে অনেকেই তাচ্ছিল্য করে দেহব্যবসার সঙ্গে তুলনা করেন। কারণ, একটি ব্যবসায়িক হাউসের যাবতীয় নীতি ঘাড়ে নিয়েই সাংবাদিকদের চলতে হয়। স্পষ্ট যা দেখতে পাচ্ছেন তা সোজা কথায় সোজা করে বলার এতটুকু অবকাশ নেই। কিন্তু এসবের মধ্যেও স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে সমর সেনের নাম।
বাংলা কবিতার অন্যতম প্রধান বলিষ্ঠ কণ্ঠ কবি বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ‘তাঁর ভাতে পড়ল মাছি’ সমর সেন শীর্ষক কবিতায় লেখেন,—
‘সবাই যখন রাজবাড়িতে
বেচতে গেলেন দাঁতের মাজন
একা তিনি চৌরাস্তায়
দাঁড়িয়ে শোনেন শিবের গাজন
ঢ্যাম- কুড় কুড় ঢ্যাম-কুড় কুড়
দূর থেকে সেই বাদ্যি আসে
বাদ্যি ঘিরে নাচছে আগুন
আগুন যে তাঁর শ্রদ্ধাভাজন’।
সমরবাবুর জন্ম ১৯১৬ সালের ১০ অক্টোবর উত্তর কলকাতার বাগবাজারের বিশ্বেকোষ লেনে। তাঁর পিতামহ বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এক উজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক দীনেশচন্দ্র সেন। এই পরিবারের আদি নিবাস ঢাকার মানিকগঞ্জে। সমর সেনের বাবা অরুণচন্দ্র সেন, মা চন্দ্রমুখী সেন। তিনি জগদীশনাথ রায়ের দৌহিত্রী। বঙ্কিমচন্দ্র জগদীশ রায়কে তাঁর বৃষবৃক্ষ উপন্যাস উৎসর্গ করেছিলেন। খুব অল্প বয়সে মাকে হারান। পড়শোনা শুরু কাশিমবাজার পলিটেকনিক স্কুলে। ইংরেজি অনার্স নিয়ে স্কটিশ চার্চ কলেজ বিএ ও পরে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএ পাস করেন। বিএ ও এমএ-তে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হন। তখন থেকেই তাঁর ইংরেজি রচনার প্রসিদ্ধি। আর এর পাশাপাশি কবিতা লেখা। খুব অল্পবয়সেই কবির খ্যাতি। কবিতায় নাগরিক মেজাজের জন্য প্রথম থেকেই স্বতন্ত্র কণ্ঠ তাঁর।
১৯৩৮ সালে এমএ পাশ করেন এবং শান্তিনিকেতনে যান রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে দেখা করতে। এর পর বেশ কয়েক বছর বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় কবিতা, গদ্য এবং রিপোর্টাজ লেখা। ১৯৪৯ সালে দ্য স্টেটসম্যান পত্রিকায় সাব এডিটর হিসেবে যোগ দেন। ১৯৫৭ সালে মস্কোয় অনুবাদ বিভাগে কাজে যোগ দেন। বিদেশি ভাষা ও সাহিত্য প্রকাশনালয়ের চাকরি নেন। এর পাশাপাশি অধুনা ইকনমিক অ্যান্ড পলিটিকাল উইকলি, সে সময়ে দ্য ইকনমিক উইকলিতে সম্পাদক শচীন চৌধুরীর অনুরোধে মস্কো লেটারসের সূচনা করেন। বাংলা সাহিত্য পত্রিকায় রুশ থেকে অনুবাদ করা তাঁর বহু কবিতা, গল্প প্রকাশিত হয়। এক সময় ‘কবিতা’ পত্রিকার সহকারী সম্পাদক হিসেবে বুদ্ধদেব বসুর সঙ্গে কাজ করেছেন। ১৯৫৭-৫৮ সালে তলস্তয় ও চেকভ, আইভান বুনিন, ম্যাক্সিম গোর্কি প্রভৃতি বিখ্যাত রুশ লেখকদের লেখা বাংলায় অনুবাদ করে প্রকাশ করেন। ১৯৬১ সালে দেশে ফিরে একটি বিজ্ঞাপন সংস্থার কাজে যোগ দেন। ১৯৬২ সালে ইকনমিক উইকলিতে মস্কো লেটারসের পরবর্তী কিস্তি প্রকাশিত হয়। ওই বছরই হিন্দুস্থান স্ট্যান্ডার্ডের অ্যাসোসিয়েট এডিটর হিসেবে যোগ দান। তদানীন্তন রাষ্ট্রপতি ড. রাধাকৃষ্ণন এবং ব্রিটিশ সরকারের জোড়া আমন্ত্রণে রাষ্ট্রপতির বিদেশ সফরে সঙ্গী হন। ১৯৬৪ সালে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার ঘটনা ঘটে। সংবাদপত্র মালিক ‘জাতীয়তাবাদী’ দৃষ্টিভঙ্গি নেওয়ায় সমরবাবুর সঙ্গে তাঁর তীব্র মতবিরোধ হয়। সমর সেন এই বহুল প্রচারিত দৈনিক হিন্দুস্থান স্ট্যান্ডার্ডের যুগ্ম সম্পাদকের পদ ছেড়ে দেন। ওই বছরই তৎকালীন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী হুমায়ুন কবীরের ‘নাও’ পত্রিকা সম্পাদনার দায়িত্ব নেন। চার বছরের মাথায় নাও পত্রিকার সম্পাদকীয় নীতি নির্ধারণ নিয়ে ফের মতপার্থক্য দেখা যায়। পত্রিকার অন্যতম স্বত্বাধিকারী বলেন, এই পত্রিকার সম্পাদকীয় নীতি কমিউনিস্ট পার্টিঘেঁষা হয়ে যাচ্ছে। নাও-এর ১২ জানুয়ারি সংখ্যায় সমরবাবু লেখেন, প্রত্যেক পাঠককে জানাই এই পত্রিকায় আমার শেষ সম্পাদকীয়।
১৯৬৮ সালে এক্ষণ পত্রিকার বিখ্যাত কার্ল মার্কস সংখ্যা প্রকাশিত হয়। সমর সেনের অনুবাদে মার্কসের কবিতা প্রকাশিত হয় এই বিশেষ সংখ্যায়। এই বছরই অর্থাৎ ১৯৬৮ সালের ১৪ এপ্রিল ফ্রন্টিয়ারের যাত্রা শুরু। ইন্দিরা গান্ধী ঘোষিত জরুরি অবস্থার সময় প্রসঙ্গে সমরবাবু লিখছেন ১৯৭৫ সালের ২৫ জুন নতুন দিল্লির বাহাদুর শাহ জাফর মার্গ নিষ্প্রদীপ হয়ে গেল। ২৫ জুন সারারাত বিরোধী নেতাদের গ্রেফতার করা চললো। রাতে বহু সংবাদপত্র অফিসে বিদ্যুতের লাইন কেটে দেওয়া হলো। ২৬ জুন দিল্লি ও ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রান্তে সংবাদপত্র সকালে ঠিক সময় প্রকাশিত হয়নি। কিন্তু এই আক্রমণ আমাদের ওপর চলছিলই। ১৯৭২ সালে বিধানসভা নির্বাচনের আগে বলা হলো, বামপন্থা প্রভাবিত সংবাদপত্রগুলোর পাড়ায় পাড়ায় প্রচার বন্ধ করতে হবে। ১৯৭২ সালে শিয়ালদহ স্টেশনে সত্যযুগ, বাংলাদেশ এবং দর্পণ পত্রিকা পোড়ানো হয়। সাংসদ জ্যোতির্ময় বসু পোড়া কাগজ নিয়ে লোকসভার স্পিকারের টেবিলে হাজির হন। ১৯৭৫ সালের ১৪ জানুয়ারি তৎকালীন শাসকদলের ছাত্র ব্রিগেড দেশবন্দনার ধ্বনি তুলে দর্পণ পত্রিকা দফতর আক্রমণ করে আসবাবপত্র ভেঙে তছনছ করে দেওয়া হয়। একদল গুন্ডা কয়েকটি গাড়ি করে মঠ লেনের অফিসে আক্রমণ চালায়। জনৈক মন্ত্রী যিনি ছাত্র নেতাও বটে, দর্পণ সম্পাদক হীরেনবাবু সম্পর্কে বলেন, কাগজের দর বাড়ানোর জন্য হীরেনবাবু নিজেই নিজের দফতরে আক্রমণ সংগঠিত করেছেন। ১৯৭৫ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি এই ছাত্র ব্রিগেড বাংলাদেশ পত্রিকার অফিস লণ্ডভণ্ড করে। প্রেস ভেঙেচুরে দেয়। এই বাহিনীই খবরের কাগজের হকার ঠেঙিয়ে বিভিন্ন সময়ে হাত পাকিয়েছে। এবার এলো রাজনৈতিক ভাষ্যকারদের পালা। একের পর এক সাংবাদিক গ্রেফতার হন। সমরবাবু লড়াই চালিয়ে গেছেন। সাহিত্য বিষয়ক লেখা বা রাজনৈতিক প্রতিবেদন আপোসহীন মনোভাব নিয়ে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত কাজ করেছেন।
‘ঝড়’ কবিতায় সমর সেন লিখেছিলেন—
‘যদি ঝড় নেমে আসে
শব্দের তীব্র আঘাতে আকাশ চূর্ণ করে…
তাহলে হয়তো, হয়তো আমার মনে শান্তি আসবে’।
যে মধ্যবিত্ত সমাজের তিনি প্রতিনিধি সেই ‘মুমূর্ষ জীবনধাঁচ’-কে কীভাবে প্রত্যাখান করে? তাই যুক্তি, প্রতি যুক্তি দিয়ে বারবার এই সমাজকেই বিদ্ধ করেছেন সমর সেন। এক বিপ্রতীপের সম্ভাবনার খোঁজ চলেছে তাঁর কবিতায়, তাঁর শাণিত গদ্যে।
সংগ্রামী মা মাটি মানুষ পত্রিকা ২০১৬ পূজা সংখ্যায় প্রকাশিত