সমরেশ বসু আমাদের ঠিক এক দশক আগের লেখক। অর্থাৎ আমরা যখন সদ্য স্কুল ছাড়িয়ে তখন তিনি উদীয়মান তরুণ লেখক। ‘পরিচয়’ কিংবা ‘দেশ’ ছাড়াও অনেক ছোটখাটো পত্রিকায় তাঁর লেখা বেরুচ্ছে, যতদূর মনে পড়ে তার ‘অকালবৃষ্টি’ নামে একটি দুর্ধর্ষ ছোটগল্প কোনো ছোট পত্রিকাতেই প্রথম ছাপা হয়েছিল। আমরা তখন কবিতা নিয়ে মাতামাতি করছি, কবিতার পত্রিকা প্রকাশ করছি; কবিরা সাধারণত গদ্য রচনা বিশেষ পড়ে না, কিন্তু আমি সব পত্র-পত্রিকায় প্রতিটি রচনা তন্নতন্ন করে পড়তাম এবং সমরেশ বসুর অগ্রগতি লক্ষ করেছি।
দেশ পত্রিকায় কালকূট নামে ধারাবাহিক উপন্যাস ‘অমৃত কুম্ভের সন্ধানে’ প্রকাশের পরই তরুণ লেখক সমরেশ বসু হয়ে গেলেন প্রতিষ্ঠিত সাহিত্যিক। তখনকার খুব উচ্চাঙ্গ সাহিত্যের প্রকাশক সিগনেট প্রেসের দিলীপকুমার গুপ্ত ‘বি টি রোডের ধারে’ উপন্যাসের লেখককে সোনার কলম পুরস্কার দেবার কথা ঘোষণা করলেন, তারাশঙ্কর থেকে নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় পর্যন্ত খ্যাতনামা লেখকেরা সাদর অভ্যর্থনা জানালেন। আমাদের মতন কফিহাউসের ছেলে ছোকরারা তাঁকে বরণ করে নিয়েছি আরও আগেই।
কোনো লেখকের রচনা পড়ে মুগ্ধতা জাগলে সেই লেখকের ব্যাক্তিগত জীবন সম্পর্কেও জানতে ইচ্ছা করে। সমরেশ বসু সম্পর্কে তখন নানা ধরনের সত্য-মিথ্যা গল্প প্রচলিত ছিল। কফি হাউসের আড্ডায় তিনি বিশেষ আসতেন না কিন্তু কলেজস্ট্রীট পাড়ায় তাঁকে দেখা যেত প্রায়ই। দৈর্ঘ্যে কিছুটা খাটো কিন্তু অত্যন্ত রুপবান পুরুষ। মুখখানি সহাস্য। তাঁর প্রতিদিনের পোশাকই নজরে পড়ার মতন। যদিও তাঁর প্রথম যৌবন বেশ দারিদ্র্যের মধ্যে কেটেছে, সেই সময়েও তাঁর অবস্থা তেমন সচ্ছল নয়, কলকাতায় তাঁর কোনো বাসস্থান ছিল না, নৈহাটি থেকে ট্রেনে যাতায়াত করতেন, কিন্তু এক একজন মানুষই থাকে এরকম পোশাকের সুরুচি সম্পর্কে সজাগ। তাঁকে আমি কোনোদিনই ময়লা কিংবা ইস্ত্রি-নষ্ট জামাকাপড় পড়তে দেখিনি, সুদৃশ্য পোশাকে তাকে মানাতোও খুব।
১৯৬৫ সালে শারদীয় দেশ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়’ বিবর্’। সঠিক বছরটা মনে থাকার কারণ, পরের বছরই ঐ শারদীয় সংখ্যায় একটি উপন্যাস লিখে আমি অনধিকারীর মতন গদ্যের জগতে অনুপ্রবেশ করেছিলাম। ‘বিবর’ প্রকাশিত হবার পর সন্তোষকুমার ঘোষ একটা চিঠি লিখে সেই উপন্যাসের অজস্র প্রশংসা করে জানান যে, তাঁর মতে বিবর দশটি শ্রেষ্ঠ বাংলা উপন্যাসের অন্যতম। প্রায় সমসাময়িক কোনো লেখক সম্পর্কে অপর প্রতিষ্ঠিত কোনো লেখকের এরকম লিখিত উচ্ছ্বাস সাহিত্যের ইতিহাসে বিরল। তারপরেই ‘বিবর’ কে কেন্দ্র করে বিতর্কের ঝড় ওঠে। পরের বছর প্রজাপতি প্রকাশিত হলে সেই বিতর্ক অন্যদিকে মোড় নেয়। সাহিত্যে শ্লীল-অশ্লীল বিষয়ে আলোচনা-সভা বসে বহু জায়গায়, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, রবীন্দ্রভারতী, এবং অন্যত্র। কেন জানি না সেই সব সভাতে আমারও ডাক পড়তে লাগলো, সেই সূত্রেই তাঁর সঙ্গে আমার ব্যাক্তিগত পরিচয়টা জমে ওঠে। যদিও এর আগে তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ-পরিচয় হয়েছে কয়েকবার, সাগরময় ঘোষের দফতরে, সন্তোষময় ঘোষের ঘরের আড্ডায়। একবার সন্তোষকুমার আমাকে প্রায় জোর করেই সঙ্গে নিয়ে গেছিলেন নৈহাটিতে সমরেশ বসুর বাড়িতে, তাঁর প্রথমা স্ত্রী গৌরীদেবীর একটি সঙ্গীত প্রতিষ্ঠানের সেদিন বার্ষিক উত্সব, সাগরময় ঘোষ, সুচিত্রা মিত্র, প্রমুখ আরও অনেকে গিয়েছিলেন। প্রায় সারারাত খুব হৈ চৈ হয়েছিল।
শ্লীল-অশ্লীল আলোচনা-সভাগুলিতে সমরেশ বসু প্রতিপক্ষের আক্রমণের উত্তর দিতেন জোরালো যুক্তি দিয়ে, আমাদের দেশের নির্যাতিত নিরন্ন মানুষের পোশাক ও মুখের ভাষার উদাহরন তুলে ধরতেন প্রায়ই। আমি আমার বক্তব্য সেরে দিতাম অনেকটা ঠাট্টা ইয়ার্কি করে। আমার ধারণা, বাংলা ভাষায় এ পর্যন্ত যা লেখা হয়েছে তা নিয়ে অশ্লীলতার প্রসঙ্গই ওঠে না। ‘বিবর’ ‘প্রজাপতি’-কে অশ্লীল বলা হলে ‘ট্রপিক অফ ক্যানসার’ কে কী আখ্যা দেওয়া হবে? কিন্তু এইসব আলোচনা-সভা এক এক সময় বেশ উত্তপ্ত হয়ে উঠতো, রাজনীতিতে তখন একটা চরমপন্থী হাওয়া বইছে, বামপন্থী ও দক্ষিণপন্থী দু-দিকের রাজনীতিই চলে যাচ্ছে চরমপন্থার দিকে। এবং আশ্চর্যের ব্যাপার, সাহিত্য-সংস্কৃতির নীতিবাগীশতার ব্যাপারে দু-পক্ষই একমত। সমরেশ বসুকে কেউ কেউ শারীরিক আক্রমণেরও ভয় দেখিয়েছিল, কিন্তু তিনি অকুতোভয়, তিনি আবার লিখলেন স্বীকারোক্তি, পাতক।
সেই সভা সমিতি থেকে বেরিয়ে কোথাও কোথাও আমরা বসতাম একসঙ্গে। তাঁর চেনাশোনার পরিধি অনেক বড় হলেও তিনি আকৃষ্ট হলেন আমাদের আড্ডায়। মাঝে মাঝেই চলে আসতেন। একদিন তিনি বলেছিলেন, আপনাদের আড্ডায় পরনিন্দা-পরচর্চা বিশেষ হয় না, এটা একটা আশ্চর্য ব্যাপার!
আমাদের আড্ডায় রাজনৈতিক ভেদাভেদও ছিল না, বড় কাগজের লেখক বলে কোনো তফাত ছিল না, আমি নিজেই তখনো প্রধানত ছোট কাগজেরই লেখক এবং একটি ছোট পত্রিকার সম্পাদক। রাত্রের দিকে আমরা দল মিলে তাঁকে পৌঁছে দিতাম শিয়ালদা স্টেশনে, তিনি লাস্ট ট্রেনে নৈহাটি ফিরতেন।
কিছুদিন পর তিনি বালিগঞ্জ স্টেশান রোডে একটা ফ্ল্যাট নিলেন, সেটাই হলো কলকাতায় তার প্রথম আস্তানা। দ্বিতীয়া পত্নী ধরিত্রী অর্থাৎ টুনিকে নিয়ে তার ছোট্ট সংসার। সেই প্রথম দেখি একজন বড়ো মাপের লেখকের দৈনন্দিন সাহিত্যচর্চা। প্রত্যেকদিন সকালবেলা নিয়ম করে বসতেন, দুপুরে প্রচন্ড গরমের মধ্যেও খালি গায়ে বসে লিখে যাচ্ছেন, কোনো কোনো দিন আড্ডার ঝোঁকে দুপুরের দিকে চলে গেছি তাঁর ওখানে, তিনি খানিকটা অপ্রস্তুতভাবে হেসে বলতেন, এখন যে ভাই লিখছি! অর্থাৎ স্পষ্ট চলে যাবার ইঙ্গিত! লেখাটা যেন তার প্রতিদিনের সাধনা ও যারা অফিসে কাজ করেন, তাঁদের মধ্যে অনেকে কাজে ফাঁকি দেন, কারণ কাজটা তাদের নিজস্ব নয়। অন্য একজনও সে-কাজ করে দিতে পারে, কিন্তু লেখক-শিল্পী-বৈজ্ঞানিকদের কাজে ফাঁকি দেবার উপায় নেই।
অনেকের ধারণা, সাহিত্য রচনা বুঝি একটা প্রেরণার ব্যাপার। যখন তখন লিখতে বসলেই কি লেখা হয়? লেখা যখন মাথায় আসবে তখনই তো লিখতে বসা হবে। কিন্তু প্রেরণা জিনিসটা ভূতের মতন যখন তখন মাথায় এসে ভর করে না। সাদা পৃষ্ঠার সামনে বসে নিঃশব্দ বন্দনা করতে হয়। লেখকের কাছে যে-কোন রচনার সবচেয়ে প্রয়োজনীয় অংশ হলো প্রথম লাইনটা। কখনো কখনো পথ চলতে চলতে বিদ্যুৎ ঝলকের মত সেই লাইনটা মাথায় আসতে পারে বটে, আবার অনেক সময় হারিয়েও যায়। সাদা পৃষ্ঠাই সেই লাইনটি খুঁজে পাবার প্রধানতম প্রেরণা। সেইজন্যই, প্রতিদিনই লিখতে না পারলেও বড় লেখকেরা নিয়মিত লেখার টেবিলে বসেন, যেমন রবীন্দ্রনাথ লিখতে বসতেন প্রত্যেকদিন ভোরবেলা। সমরেশ বসুকে চোখের সামনে সেরকম একটি দৃষ্টান্ত হিসাবে দেখেছি।
তিনি ঠিকই করে ফেলেছিলেন যে সাহিত্যকেই সম্বল করে কাটিয়ে দেবেন সারাজীবন। কোনো চাকরি বাকরিতে সময় নষ্ট করবেন না। এই সিদ্ধান্ত সঠিক এবং দুঃসাহসিক। গান বাজনা, ছবি আঁকা, সাহিত্যচর্চা এগুলি চব্বিশ ঘন্টারই কাজ, একজন শিল্পীর পক্ষে চুপ করে বসে থাকা বা আপাত আলস্যও খুব প্রয়োজনীয়, কিংবা ভ্রমণ কিংবা অন্য কোনো সখের চর্চা কিন্তু দুঃখের বিষয়, নিছক শিল্প সাহিত্যের জন্য নিবেদিত হলে এদেশে জীবিকা অর্জন করা যায় না। চিত্রকর কে নিযুক্ত হতে হয় ওষুধ কম্পানিতে।
কবিকে সংবাদপত্র অফিসে কলম ক্ষইয়ে দিতে হয়, দেবব্রত বিশ্বাসের মতন গায়ককে আমি দেখেছি ইনসিয়রেন্স কম্পানির অফিসে হিসাবপত্তর দেখাশুনার চাকরিতে। পুরোপুরি সাংসারিক দ্বায়িত্ব নিয়েও শুধু বাংলা লিখে জীবনযাপনের ঝুঁকি নিয়েছিলেন একসময়ে মানিক বন্দোপাধ্যায়, আমাদের চোখে দেখা সময়ে সমরেশ বসু। আমাদের সঙ্গে যখন পরিচয়, তখনও সমরেশ দারিদ্র্যের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলেছেন। সেইজন্য তাঁকে লিখতে হয়েছে প্রচুর, স্বনামেই এবং কালকূট নামে ছাড়াও ভ্রমর ছদ্মনামেও তিনি লিখেছেন প্রচুর, সব লেখাই যে উৎকৃষ্ট হয়েছে তা বলা যায় না, এত লিখলে তা সম্ভবও নয়। আমাদের দেশে সমালোচকরা এমনই অদ্ভুত, একজন লেখকের দশটা লেখার মধ্যে যদি চারটে খুব ভালো হয়, তিনটে মাঝারি আর তিনটে নিরেশ, তা হলে সমালোচকরা প্রথম চারটি উপেক্ষা করে শেষের তিনটি নিয়েই হুল্লোড় করেন। সমরেশ এইসব সমালোচকদের কখনো গ্রাহ্য করেননি। তার চেয়েও বড় কথা, যাকে এত লিখতে হয়, সেই লেখকও প্রত্যেক বছরই বিষয়বস্তু ও আঙ্গিকে সম্পূর্ণ নতুন ধরনের কিছু লেখার জন্য প্রচুর পরিশ্রম করেছেন এবং সার্থক হয়েছেন।
জীবনযাপনের জন্য এত বেশী লিখতে হলেও তিনি কখনো দাঁতে দাঁত চেপে লেখেন নি। তাঁর কমিটমেন্ট ছিল নিজের কাছে, মহাকালের দিকে তিনি অবহেলার সঙ্গে টুসকি মেরেছেন। সারাদিন কঠোর পরিশ্রম করার পরে সন্ধ্যেবেলা তিনি অন্য মানুষ। আমি যতদূর জানি, পারতপক্ষে তিনি সন্ধ্যের পর কলম ধরতেন না। শুনেছি সম্পূর্ণ মহাভারতের বঙ্গানুবাদক এবং টীকাকার হরিদাস সিদ্ধান্তবাগীশ মশাইও সূর্যাস্তের পর মানুষের মেধাও ঢলে পড়ে মনে করে সন্ধ্যের পর কিছু লিখতেন না। নৈহাটির কায়স্থ ঔপন্যাসিকটিও এইদিক থেকে ছিলেন প্রাচীন ব্রাহ্মণদের অনুসারী। সন্ধ্যের পর সমরেশ বসু ছিলেন অন্য মানুষ। সেজেগুজে বেরুতেন, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দেবার জন্য তার প্রাণ আনচান করতো, আড্ডার সঙ্গে সঙ্গে হাসি-ঠাট্টা, তর্কাতর্কি, গান, কখনো কখনো নাচও। টপ্পা অঙ্গের পুরোনো বাংলা গান ও রবীন্দ্রসঙ্গীতে তিনি পারঙ্গম ছিলেন, খুব ফুর্তি হলে দু-একটা লৌকিকনৃত্যেও মেতে উঠতেন। কোনো সন্ধ্যায় উনি চুপচাপ বাড়ি বসে থাকলে ওঁর স্ত্রী টুনি ভয় পেয়ে যেতেন। তাহলে কি মানুষটার অসুখ বিসুখ হলো নাকি?
বাংলাদেশ যুদ্ধের বছরে আমরা সবাই উদ্দীপিত হয়ে উঠেছিলাম। সেই যুদ্ধের শেষের দিকে আমরা উত্তেজনার আতিশয্যে সংবাদপত্র অফিসে রাত্রি ভোর করেছি। সংবাদপত্রের সঙ্গে প্রত্যক্ষ যোগাযোগ না থাকলেও সমরেশ বসুও আসতেন, তাঁর জন্ম পূর্ববাংলা, শৈশব কেটেছে ঢাকা শহরে, বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধের ব্যাপারে তিনি দারুণ আগ্রহী ছিলেন। তারপর আমরা সদলবলে গেলাম স্বাধীন বাংলাদেশে, সেখানে পেয়েছি সমরেশ বসুর প্রবল যৌবনময় সান্নিধ্য। তখন বাংলা সাহিত্যে কোন রাজা-বাদশা নেই। সমরেশ বসুকেই মনে হত যুবরাজ। দু-দিকের বাংলা সাহিত্য অনুরাগীদেরই তিনি পরম প্রিয়। যিনি ‘কোথায় পাবো তারে’ লিখছেন, তিনিই লিখছেন গঙ্গা; ‘মানুষ রতন’ কিংবা ‘পাড়ি’-এর মতন গল্প তিনি অবহেলায় লিখে ফেলছেন একদিনে।
এর কয়েকবছর পর, আমরা যখন কবিতার ‘কৃত্তিবাস’ পত্রিকাটিকে সব-মেলানো মাসিক কবিতা-গদ্যের রূপ দেবার চেষ্টা করছি, তখন তিনি নিজেই স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে বললেন, আমি এই কাগজে ধারাবাহিক উপন্যাস লিখবো। আমাদের সেই অব্যবসায়ীক পত্রিকায় টাকা পয়সা দেবার কোনো প্রশ্ন ছিল না। আর সেই সময়ে সমরেশ বসু প্রত্যেক জনপ্রিয় পত্র-পত্রিকায় অতি আরাধনীয় লেখক, অনেকেই তাঁর লেখা সাধ্যসাধনা করেও পায় না, তবু তিনি কৃত্তিবাসে নিজের থেকে লিখতে চেয়েছিলেন এবং যথাসময়ে ইনস্টলমেন্ট দিতেন।
এইরকম একটা সময়েই তার প্রথম হৃদরোগ হয়। এমন কিছু গুরুতর আঘাত নয়, তবু কোনো অতিসাবধানী চিকিৎসক তাঁকে বলেছিলেন যে তাঁর পক্ষে সিঁড়ি ভাঙা একেবারেই উচিত নয়। কোনো একতলা বাড়িতে তার থাকা দরকার। ততদিনে তার কলকাতার সংসার বালিগঞ্জ স্টেশন রোডের আপার্টমেন্ট ছেড়ে উঠে এসেছিল সার্কাস রেঞ্জের দোতলা ফ্ল্যাটে।
হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর তাঁকে সেই দোতলা ফ্ল্যাটে ফিরে যেতে হবে; এ ব্যাপারে চিকিৎসকদের বোধহয় আপত্তি ছিল। কিন্তু তক্ষুনি একতলার ঘর পাওয়া যাবে কোথায়? কৃত্তিবাস পত্রিকা ও আমাদের বিশেষ শুভানুধ্যায়ী কল্যান চৌধুরী তখন যোধপুর পার্কে নতুন বাড়ি বানিয়েছেন, বাড়িটা ফাঁকা, ব্যাপারটা শুনে তিনি তৎক্ষণাৎ রাজি হলেন, তাঁর সেই বাড়ির একতলার একটি ঘরে সমরেশকে রাখা হলো। কিন্তু বাংলা সাহিত্যের যুবরাজ অসুস্থ সেজে সেরকম একটা ফাঁকা বাড়ির একতলার ঘরে থাকতে রাজি হবেন কেন? দু-চারদিনের মধ্যেই তিনি ফিরে গেলেন পার্ক সার্কাসের তার নিজস্ব লেখার টেবিলে।
যাঁর হৃদয় ছড়িয়ে আছে গোটা বাংলাদেশে তথা সারা পৃথিবীতে, তিনি সামান্য হৃদরোগে কাতর হবেন কেন? এরকমই সবাই ভেবেছিল। অচিরেই দেখা গেল, সমরেশ রোগের ব্যাপারটা সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করেছেন। তাঁর লেখায় সামান্য মালিন্যেও দেখা গেল না। জীবনযাপনে উদ্দামতা কিছুমাত্র কমলো না। শুধু সিগারেট ছেড়ে দেবার প্রচেষ্টায় তিনি প্রথম প্রথম আস্ত সিগারেট দু-টুকরো করে খেতেন, তারপর বিড়ি ধরলেন, তারপর তাও ছেড়ে অন্যের জ্বলন্ত সিগারেট থেকে এক-দু’ টান দিতেন। দার্জিলিঙে আরেকবার অসুস্থ হয়ে পড়ার পর তিনি ধূমপান একেবারেই ত্যাগ করেন। এইসব সময়েই তিনি লিখে যাচ্ছেন ‘শিকল ছেঁড়া হাতের খোঁজে’ ‘মহাকালের রথের ঘোড়া’ ও ‘টানাপোড়েন’- এর মতন উপন্যাস।
আশির দশকের গোড়ার দিকে আমরা বুধসন্ধ্যা নামে একটি ক্লাবের পত্তন করি। আমাদের মূল উদ্দেশ্য ছিল আড্ডা, হাসিঠাট্টা, গল্প-কবিতা পাঠ, পানাহার, প্রকাশ্যে পরচর্চা এবং সামান্য কিছু সামাজিক দায়িত্ব পালন। আমরা নাটক অভিনয়ের চ্যারিটি শো করে কোনো কোনো সমাজসেবামূলক প্রতিষ্ঠানকে যথাসাধ্য সাহায্য করতে চেয়েছিলাম। এই সংস্থার সভাপতি সাগরময় ঘোষ, সহ-সভাপতি সুবিনয় রায় এবং সমরেশ বসু সাগ্রহে হলেন কার্যকরী সমিতির সদস্য। আমাদের প্রথম নাটক রবীন্দ্রনাথের ‘মুক্তধারা’। নাটকের অভিনয়ের চেয়েও দীর্ঘকালীন মহড়া অনেক বেশি উপভোগ্য, আমরা মহড়াই দিয়েছিলাম প্রায় একবছর ধরে, সমরেশ নিয়েছিলেন মন্ত্রীর ভূমিকা, নিজের গরজে নিয়মিত আসতেন, বড় সুন্দর কেটেছিল সেই মহড়ার দিনগুলি। যাইহোক, শেষ পর্যন্ত রবীন্দ্রসদনে দু-রাত্তির অভিনয় হয়েছিল সেই নাটকের।
প্রথম রাত্রির অভিনয়ে সাগরময় ঘোষ যখন মঞ্চে সংলাপ বলছেন সেই সময় অন্তরাল থেকে অতুৎসাহী একজন নির্ধারিত সময়ের আগেই আগুন! আগুন! বলে চেঁচিয়ে উঠেছিল, সাগরময় ঘোষ তা শুনে সংলাপ বানিয়ে দিলেন, এ কী, এ সময় তো আগুন লাগার কথা নয়, কী হলো দেখি তো, বলে স্মার্টলি বেরিয়ে এলেন; নাটকের মূল চরিত্র ধনঞ্জয় বৈরাগীবেশী বুদ্ধদেব গুহ চমৎকার গান গাইতে গাইতে হঠাৎ একজায়গায় থেমে গিয়ে মাথা চুলকোতে লাগলেন এবং মন্ত্রীবেশী সমরেশ বসু পার্ট ভুলে গিয়ে দু-তিন পাতা ডিঙিয়ে সংলাপ বলে বিপদে ফেলে দিলেন তাঁর সহ-অভিনেতা জয়ন্ত সেনকে। দ্বিতীয় রাতে এসব কিছুই হয়নি, সবই একেবারে নিঁখুত। কিন্তু যাঁরা দু-বারের অনুষ্ঠানই দেখেছিলেন, তাঁদের মতে প্রথম রাতের সব কিছু মিলিয়েই অভিনয় হয়েছিল অনেকবেশী উপভোগ্য!
মঞ্চ অভিনয়ের সহজাত গুণ ছিল সমরেশ বসু-র। তাঁর প্রতিভা যে-কোনো দিকেই বিকশিত হতে পারতো। বুধসন্ধ্যার পরবর্তী নাটকগুলিতেও তাঁর অংশ নেবার ইচ্ছা ছিল খুবই, কিন্তু তাঁর শরীর তাঁর মনোবলের সঙ্গে আর তাল দিতে পারছিল না।
আমরা যখন বুধসন্ধ্যা নাটক নিয়ে হৈ চৈ করছি, সেই সময়েই তিনি তৈরী হচ্ছেন শিল্পী রামকিঙ্কর বেইজের জীবন নিয়ে কিছু লেখার জন্য। প্রথমে ঠিক করেছিলেন জীবনী লিখবেন। রামকিঙ্কর তখনও জীবিত, তাঁর সঙ্গে বারবার সাক্ষাৎকার হচ্ছে সমরেশ বসুর। রামকিঙ্করের জীবিতকালেই লেখাটি প্রকাশিত হবার কথা ছিল। কিন্তু তখন স্বয়ং লেখকেরই স্বাস্থ্যের অবস্থা ভালো নয়, সুতরাং তিনি বেশ খানিকটা না লিখে দেশ পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশের জন্য দেবার সাহস পাচ্ছিলেন না। তিনি লিখে চলেছেন, এরই মধ্যে রচনার নায়কের আকস্মিক মৃত্যু! পিজি হাসপাতালের গেটে রামকিঙ্করের মৃতদেহ যখন বার করা হচ্ছে, তখন সমরেশ বসুকে যেন ভেঙে পড়তে দেখেছি। এ যেন স্রষ্টা ও সৃষ্টির এক চিরন্তন সম্পর্কের ট্র্যাজেডি। রামকিঙ্করের এরকম সকৌতুক প্রস্থানে সমরেশ যেন প্রচন্ড অভিমান বোধ করেছিলেন।