সমীর কুমার পাঁজা, বিধায়ক, উদয়নারায়ণপুর
করোনা মোকাবিলায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় রাজ্যের ত্রাণ তহবিলে ৫ লক্ষ এবং জাতীয় ত্রাণ তহবিলে ৫ লক্ষ টাকা প্রদান করেছেন।
নিশ্চয়ই খবরটা শুনেছেন বা দেখেছেন।
না, এক্কেবারেই তাঁর বিধায়ক তহবিল থেকে নয়, বা তাঁর সাংসদ হিসাবে পাওয়া ভাতা থেকেও নয়। তাঁর গান-কবিতা ইত্যাদি থেকে যে রয়্যালিটি পান বা পাচ্ছেন সেই টাকা থেকেই তিনি তাঁর জীবন চালানোর বাকি দিনগুলির কথা না ভেবেই করোনা মোকাবিলায় দান করেছেন পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য আপদকালীন ত্রাণ তহবিল ও প্রধানমন্ত্রী ত্রাণ তহবিলে।

তাঁকে দেখে শেখার চেষ্টা করেছি, জেনেছি, বুঝেছি তাঁর কাছ থেকে যেন শেখার কোনও শেষ নেই……
বারেবারে আশ্চর্য হয়েছি! দেখেছি দিন দিন তাঁর চেহারার অবনতি ঘটছে। যে মানুষটি মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পরেও তাঁর টালির চালটি সরিয়ে ফেলে দিয়ে দোতলা তুলতে পারেননি, যে মানুষটি মুখ্যমন্ত্রী হয়েও বাংলার প্রশাসনিক ভবন নবান্ন ও বিধানসভায় যাওয়ার জন্য সরকারি গাড়ি ব্যবহার করেন না, যে মানুষটি তাঁর ৭ বারের সাংসদ হিসাবে প্রাপ্য বেতনের স্বাদ তো দূরের কথা, নয়-দশ বছরের বিধায়ক ও মুখ্যমন্ত্রীর বেতনও তিনি ছুঁয়ে দেখেন নি। যে মানুষটি মতের মিল না হওয়ায় মানুষের স্বার্থে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিত্বের মতো চেয়ারকে এক কথায় হেলায় ছেড়ে দিয়েছেন বহুবার। যে মানুষটি পর্যাপ্ত আরাম আয়েশের জীবন যাপন হাতের মুঠোয় পেয়েও সাধারণ একজন মধ্যবিত্তের মতো জীবন অতিবাহিত করেছেন।

যে মানুষটি ঝড় হোক বা বন্যা; রাত কাটিয়েছেন নবান্নের কন্ট্রোল রুমে, বাংলার পাহারাদার হিসেবে চোখ রেখেছেন দক্ষিণে সুন্দরবন থেকে উত্তরে দার্জিলিং। যে মানুষগুলো দুবেলা দু-মুঠো খেতে পেত না, বা পিঁপড়ের ডিম খেয়ে দিনের পর দিন কাটাতে হয়েছে সংশয়ে, তাঁদের পেট ভরে খাওয়ার সুযোগটুকু করে দিয়েছেন। করোনা মোকাবিলায় কোনোবার খাবার বিলি করা থেকে শুরু করে হাসপাতালগুলিতে নিজে গিয়ে ডাক্তারবাবুদের সুবিধা-অসুবিধা খতিয়ে দেখেছেন, আবার শহরের ওই নিষিদ্ধ পল্লীতে থাকা মায়েদের কথাও ভেবেছেন, কখনও বা ফুটপাথে রাত জাগা তারা গোনা সেই ভিখারি, ভবঘুরে মা-বাবাদের জন্যও মাথার উপরে ছাদের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। উপলব্ধি করেছি সেই মানুষটির সততা, স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে প্রত্যেক টি বিরোধী দল কয়েকটি পেটোয়া মিডিয়ার সাহায্যে কোমরে গামছা বেধে উদ্যত থেকেছে…..

মশাই, তাঁকে অনেকবারই তো দমিয়ে রাখার চেষ্টা করলেন, আর কেন? আর সততা তো গাছে ফলে না, বাজারে কিলো দরে কিনতেও পাওয়া যায় না। সততা অর্জন করতে হলে প্রকৃত মানুষ হতে হয়, মানুষের সুখ-দুঃখকে নিজের করে নিতে হয়, মানুষের আবেগ আর ভালোবাসাকে সম্মান জানিয়ে তাঁদের দু-হাত দিয়ে টেনে নিজের আঁচলে ঠাঁই দিতে হয়….। কিন্তু আপনারা দিনের পর দিন শুধু তাঁদের ব্যবহার করে গেছেন।

আর বলি, একটু শিখুন। এসি ঘরে বসে থেকে বিপ্লব করা যায় না। কিংবা যাঁরা গোমূত্রে করোনার ওষুধ খুঁজে পাচ্ছেন অথবা দুধে সোনা আবিষ্কার করে ফেলেছেন তাঁদের কথা তো ছেড়েই দিলাম, তাঁদের প্রধান মুখ যিনি; তিনিও শিখুক, বন্ধুর আগমনে দেওয়াল তুলে দিয়ে দেশের গরিবকে আড়াল করেছেন, বস্তিকে আড়াল করার চেষ্টা করেছেন, গরিবরাও দেখছে কিন্তু সব! ওরাও সব জানে! দিল্লিতে বসে বসে ভদ্রতার মুখোশ পরে শুধু টেলিভিশনে মিষ্টি মিষ্টি ভাষণ দিয়ে মানুষকে সাময়িকভাবে দেখানো ভালোবাসা যায়। কিন্তু রাস্তায় নেমে বিপর্যয়ের সময়ে নিজের জীবনকে তুচ্ছ করে বছর পঁয়ষট্টি-ছেষট্টির দোরগোড়ায় দাঁড়িয়েও তিনি একটার পর একটা সিদ্ধান্ত ও সবটুকু দিয়ে মানুষের সেবা করা নতুন আবেগেরও সঞ্চার করা যায়।

দিল্লির নেতারা হয়তো তা বুঝবে না! জানি, দিদিকে ধন্যবাদ বা সম্ভাষণ জানোর মতো কোনও শব্দই তাঁর যোগ্য নয়। তবুও তৃণমূল কংগ্রেস পরিবারের একজন কর্মী হিসাবে সর্বশক্তিমানের কাছে মিনতি করবো, এই ঘাম ঝরা, অক্লান্ত পরিশ্রম করা মাতৃসম মানুষটিকে একটু ভালো রাখে মানুষের স্বার্থে… বাংলার স্বার্থে । দেশের স্বার্থে তোমায় খুব প্রয়োজন দিদি ।