প্রথম দিনের কথা
হঠাৎ একদল অচেনা মানুষ একসাথে বেড়িয়ে পড়েছিলাম মনে অনেক ভয়ভীতি নিয়ে। বন্ধু শোভেনের তত্ত্বাবধানে এবং ওয়ান্ডারভোগেল ইন্ডিয়া (Wandervogel India)-র সহায়তায় আমরা ভিন্নরকম ১০ জন মানুষ কাকভোরে উঠে প্লেন ধরে সোজা মানেভঞ্জন পৌঁছালাম দুপুর ১টা নাগাদ। সেখান থেকে ১টি ল্যান্ডরোভার এবং ১টি বোলেরো করে গাইড সিরিন দাজুর সাথে সান্দাকফুর পথে পা বাড়ালাম। এত সময় সবাই বেশ জড়তায় ছিলাম, কিন্তু যত পথ এগোলাম তত মনের সব ভীতি দূরে গিয়ে শুধুই প্রকৃতির অপরূপ শোভাতে মাতোয়ারা হতে লাগলাম। সেই সঙ্গে ঠান্ডা বাড়তে লাগলো তালে তাল মিলিয়ে।

টুমলিং-এর পথে
পথে ‘চিত্রে’তে আমরা দুপুরের পেটপূজা সারতে দাঁড়ালাম। খোলা মাঠের মাঝে ছোট্ট খাবারের আস্তানা, সবাই মিলেমিশে একসাথে সুস্বাদু চাউমিন আর স্থানীয় চাটনি খেতে খেতে কখন যেন বন্ধুত্বের গন্ডিতে ঢুক পরলাম আমরা একে অপরে। আমার ছোট্ট ৭ বছরের মেয়ে সবার সাথে মিশেগেল। অভিষেক এবং শিবানী দু-জন অভিজ্ঞ ট্রেকার আমাদের সাথী। ওদের গল্প শুনতে শুনতে কখন যেন অবচেতনে আমাদের তিতিরেরও ওই পাহাড়ি রাস্তা নিজের পায়ে হাঁটার ইচ্ছে চাগাড় দিল। সে গল্প পরে হবে।
সুন্দর মায়াবী দুপুরের চিত্রকে পেছনে ফেলে আমরা পৌঁছালাম প্রথম দিনের ঠিকানায়—টুমলিং। ছোট্ট সাজানো পাহাড়ি জনপদ, উঠলাম ওখানের বিখ্যাত ‘শিখর লজ’-এ। সাজানো ঘরে নিজেদের বাক্স প্যাঁটরা রেখেই বিকেলের টুমলিং দেখতে বেড়োলাম।

সূর্যাস্ত,টুমলিং
সে মেয়েকে আর রাখে কে? পাহাড়ের ঢাল বেয়ে সে চলে যাচ্ছে উপরে… টংলু যাবে নাকি সে! এ দিকে একপাশে কাঞ্চনজঙ্ঘা… স্লিপিং বুদ্ধা… সব হাতছানি দিচ্ছে বিকেলের রোদে। আকাশের রঙ সাতরঙা, বাহারি। দূরে পাহাড়ি পথ বেয়ে গাড়ি আসছে এ রূপকথার দেশে… ঘুরতে ঘুরতে সূর্য ডোবার পালা এলো। কাঞ্চনজঙ্ঘার উপরে ডুবন্ত সূর্যের আভা… সে এক মায়াবী জগৎ। সন্ধ্যা নামতেই সবাই নিজ নিজ ঘরে… তারপর গল্পের আসর বসলো আর রাত ৮/৮.৩০ টায় একসাথে সবাই মিলে দারুণ রাতের খাবার খেতে খেতে একটা দিন কাটিয়ে দিলাম। সুন্দর পাহাড়ের ঢালে ছোট জায়গা টুমলিং এক নিমিষে মন কেড়ে নিলো। এবার আবার পরের দিনের অপেক্ষা, অনেক পথ পায়ে হেঁটে যে যেতে হবে!

টুমলিং এর আকাশ
দ্বিতীয় দিন : টুমলিং থেকে কালিপোখরি, পায়ে পায়ে পৌঁছে যাওয়া
সাত সকালে টুমলিং এ অপরূপ সূর্যোদয় দেখে আমরা সকালের খাবার খেয়ে বেড়িয়ে পড়েছিলাম সিঙ্গালিলা ন্যাশনাল পার্কের গেটে। ওখান থেকে গৈরিবাস পর্যন্ত ট্রেক করে যাওয়া ঠিক হয়েছিলো। রেড পান্ডার বসত সেখানে, সে শুনেই তিতির আমাদের আগে হাঁটা শুরু করলো।

সত্যি সে এক দারুণ অভিজ্ঞতা, সাথে বন্ধু শোভেনের মত অভিজ্ঞ মানুষ থাকায় অনেক অজানা তথ্য জানতে পারলাম। বাঁশগাছের রকমারি, নাম না জানা ফুলের সারি, রকমারি প্রজাপতি, সাথে গাছে গাছে এক অবিরাম ধ্বনি, সব মিলিয়ে ৭ কিমি পথ কখন যেন শেষ হলো। রাস্তা খুব কমই চড়াই এ পর্যন্ত। তাই হাঁটতে কম কষ্ট হয়েছে। তবু সাথের গাড়ি কিছু দূরে গিয়ে অপেক্ষা করেছে, আমাদের কারোর যদি প্রয়োজন হয়। কেউ কেউ অল্প হেঁটেই গাড়িতে, আবার তিতির তো দৃঢ়প্রতিজ্ঞ— সে পুরো পথ হাঁটবেই। গৈরিবাসে দুপুরে পৌঁছে পাহাড়ি ছোট দোকানে সুস্বাদু খাবার খেয়ে এবার চড়াই উতরাই রাস্তার দিকে চললাম সবাই। এই পথটা পুরোটাই নেপাল সীমান্তে।

কালিপোখরি
৩ কিমি দূরে কাইয়াকাটা নামে জায়গায় পৌঁছাতেই ঠান্ডা চেপে ধরলো খুব। রাস্তাও খুব খারাপ, কিন্তু সে তিতির, তার বাবা, শোভেন আঙ্কেল ওখান থেকে আবার পথ চলা শুরু করলো। আমরা গাড়িতে গেলাম আমাদের আজকের গন্তব্য— কালপোখরি পান্ডিম লজে।
খুবই ছোট জনপদ, নেপালী গ্রাম, বিকেলেই রাতের মত নিস্তব্ধতা, সাথে হাড়হিম করা ঠান্ডা। আমরা কয়জন যখন গরম চায়ে আমাদের মত করে একটু আয়েশ করছি, তখন তিতিররা পায়ে হেঁটে সন্ধ্যার আগে আগে কালপোখরিতে আসে।

সিঙ্গালিলা ন্যাশনাল পার্ক

আর আমাদের ট্রেকার বন্ধু দুজন… অনেক আগেই পায়ে হেঁটে ঐ ১৪ কিমি পথ পার করে লজে আমাদের সাথে যোগ দেয়। রাতে দারুণ মাংস রুটি খেয়ে, গল্পে মসগুল হয়ে আমরা এই দিনটাও কাটিয়ে দিলাম। পরের দিন— সান্দাকফু পৌঁছানোর অপেক্ষায় ঘুম দিলাম শীতের চাদর গায়ে জড়িয়ে।
তৃতীয় দিন : অবশেষে সান্দাকফুতে পদার্পণ
শীতের কাঁপুনিতে জমতে জমতে কালপোখরি থেকে আবার আমরা সকালে পায়ে পায়ে সান্দাকফুর দিকে এগোতে লাগলাম। প্রথম ২ কিমি বিকেভঞ্জন পর্যন্ত ধীরে ধীরে পাথুরে পথ অতিক্রম করা যায়। তাই সে চেষ্টা করলাম হেঁটে পৌঁছানোর। পথে চা বিরতি নিয়ে সবাই মিলে ফটোসেশানও হলো বেশ।

কালপোখরি থেকে সান্দাকফুর রাস্তা
বিকেভঞ্জন গিয়ে দেখলাম— রাস্তা খুব খাড়াই। এই পথটা ট্রেক করা খুব কষ্টসাধ্য। আমি তো অগ্রিম হাত উঠিয়ে গাড়িতে করে যাবো বলে প্রস্তুত। কিন্তু ঐ তিতির শুনলে তো— সে, তার বাবা, শোভেন আঙ্কেল পায়ে হাঁটা শুরু করলো। তাদের তো আরো বল ভরসা—সঙ্গে যে অভিজ্ঞ ট্রেকার দুজন, তিতিরের অভেষেক আঙ্কেল আর শিবানি আন্টি। আর আমরা সান্দাকফু থেকে ১ কিমি দূরে ‘ময়দান’ নামে জায়গায় গাড়িতে গিয়ে ওদের অপেক্ষা করতে লাগলাম। গাড়িতে যেতে যেতে দেখেছি— বেশ কয়েকজন ট্রেকার ঐ পথে ক্লান্ত হয়ে বিশ্রাম নিচ্ছেন। তিতিরের জন্য উদ্বেগ ছিল মনে অনেকটা, পরে শুনলাম সে বেশ আনন্দে ঐ পথ হেঁটেছে। রাস্তায় ওদের মত যারা ছিলেন, তারা ওকে বেশ বাহবাও দিয়েছেন। সে শুনে মেয়ে আরো বেশি খুশী।

এমন করে দুপুরবেলা মেঘের আড়াল ভেদ করে আমরা সান্দাকফুর হোটেল ‘শেরপা চার্লট’-এ পৌঁছালাম। খুব কম সংখ্যক হোটেল এখানে, সেই সঙ্গে তীব্র ঠান্ডা হাওয়াতে বেশ কষ্টদায়ক বাইরে থাকা। তবে হোটেলের রুম থেকেই পাহাড়ের সারিরা হাতছানি দেয়— এটা হল সবচেয়ে লোভনীয়। এখানের জীবনযাত্রা খুবই কঠিন, তাই খাবার জিনিসও খুব দামি। জলের ব্যবহারও খুব বুঝেশুনে করা হয়। বাথরুমে পাইপের জল পাওয়া যায় না, ড্রামে জল ভরা থাকে, সে জলই ভরসা— তবে সে তো হিমশীতল! যাই হোক, দুপুরে সবাই মিলে গরম খিচুড়ি খেতে খেতে মনে হলো যে অমৃত খাচ্ছি। সন্ধ্যায় একসাথে ১০ জন মিলে গল্পে মসগুল হয়ে অচেনা মানুষগুলো কখন যেন এক আত্মিক বন্ধনে আবদ্ধ হলাম। এমন করে আমাদের যাত্রাপথের আরেকটা দিনও শেষ হয়েছিল।

চতুর্থ দিন : সান্দাকফুর পথ পেরিয়ে ফালুট দর্শন
সান্দাকফু থেকে আমরা সকাল সকাল প্রাতরাশ করে ২১ কিমি দূরের ফালুটের দিকে রওনা দিয়েছিলাম। পাহাড়ি বোল্ডার বিছানো এবড়ো খেবড়ো রাস্তা ধরে ল্যান্ড রোভারে করে যাওয়া— সে যে কি কষ্টকর তা যারা যায় তারাই বোঝে। পথের মাঝে অনেকসময় কোনো গাছ পড়ে আছে কিংবা রাস্তা কিছুই নেই— এতটাই ভয়ংকর অবস্থা। তবে সবচেয়ে ভয়ংকর অন্যত্র— তা হলো— ফালুটের অপূর্ব রূপ। পাইনের সারি,নীল আকাশে সাদা মেঘের ভেলা, ছোট্ট পাহাড়ি টিলা, সবুজ গাছের ফাঁকে ঘাসের গালিচা…প্রকৃতি তার দুহাত দিয়ে সাজিয়ে রেখেছে। মার্চ-এপ্রিল মাসে এ পথ নাকি স্বর্গীয়… রডোডেনড্রনের রঙে এখানে বসন্ত বাহার বসে।

ফালুট
তবে প্রবল ঠান্ডা হাওয়ায় বেশি সময় এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকা মুসকিল ভীষণ। প্রায় ২ ঘন্টায় পৌঁছালাম নেপাল ভারতের এ সীমান্তে। ট্রেকারস হাটে পৌঁছে দুপুরের খাবার হিসেবে ওয়াই ওয়াই ম্যাগি খেয়ে ঘুরে ফিরে বসে আবার ফিরে আসলাম বিকেল বিকেল সান্দাকফুতে। পথে আমাদের দুজন ট্রেকার বন্ধুর সাথেও দেখা হলো, ওরা এ কঠিনপথ হেঁটে পার হচ্ছে। আরো দুই দিন ট্রেক করে ওরা ফিরবে অন্যপথে। তাই এখানেও বিদায়ের পালা একে অপরের সাথে। একটা দিন এমন করেই কেটে গেল বেশ। এই দিনটাই ছিল আমাদের একসাথে সেই পথ চলা অজানা বন্ধুদের সাথে কাটানো শেষ দিন। তাই দিনের শেষে মন খারাপও জমা হলো—এ কয়দিনে আমরা অজান্তেই এক পরিবার হয়ে গেছিলাম। এমন করেই এক একটা পথ শেষ হয়, নতুন সম্পর্ক তৈরি করে।

সান্দাকফু থেকে এমন sleeping buddha দেখা গেছে

পঞ্চম দিন : পাহাড়ী এক গ্রামে দিনযাপন
সান্দাকফুর অপরূপ শোভা দেখে ফিরে আসার পথে একটা দিন কাটিয়েছিলাম এক ঘরোয়া মনোরম পরিবেশে। সান্দাকফুর ঠান্ডাতে জমে গিয়ে ৩-৪ দিন একেবারে স্নান জল থেকে ব্রাত্য ছিলাম। শরীরেও ধকল পড়েছিলো এত পথ যাত্রা করার।

তাই মানেভঞ্জন নেমে গাড়ি করে মিরিকের পথ ধরেছিলাম। মিরিক রোডের উপরে অবস্থিত বুংকুলুং গ্রাম—রাস্তায় যেতে একেবারে উত্তরবঙ্গের পাহাড়ি গ্রামের সাথে পরিচয় হলো। ছোট্ট ছোট্ট বাড়ি, কি সুন্দর সাজানো গোছানো। প্রতিটা বাড়ির সামনে রঙ বেরঙের ফুল গাছের বাহার। আর গাঁদাফুলের সাজে এ গ্রাম এমন সেজেছে, কোনও বুঝি উৎসব লেগেছে এখানে। চা বাগানের ধাপ পেরিয়ে শিমুলবাড়ি টি-এস্টেটের মধ্যে প্রবেশ করে আমাদের নির্দিষ্টকৃত বাংকুলাং রিট্রেট ইকো হাটস-এ এসে পৌঁছালাম। খুব ছোট জনপদ, কয়েকটি পরিবারের বসবাস, কিন্তু কি ভীষণ শান্ত।
দুপুরে কটেজে গিয়ে প্রাণ ভরে স্নান সারলাম, এত বড় ঘর, সামনে বারান্দা, বাথরুমে আধুনিক সব ব্যবস্থা। গাছপালা ঘেরা বাগানের মাঝে পর পর ৫-৬ টা কটেজ ঘর। খাওয়ার জায়গা খুব পরিস্কার পরিচ্ছন্ন। সব থেকে বড় কথা ওনারা খুবই অতিথি বৎসল। প্রতি সময় সবার খাওয়ার দিকে নজর, ঠিক যেমনটি বাড়িতে খোঁজ নেয়, আর কি লাগবে এমনতর।

বিকেলে পায়ে হেঁটে ছোট গ্রাম আর তার সামনের ব্রিজ ঘুরে দেখলাম। এত শান্ত কলরবহীন পাহাড়ি জায়গা, এক নিমিষে মন ভালো করলো। সন্ধ্যায় চা-সহ পাকোরা আর গল্পে কাটলো বেশ।
পরের দিন সকালে ঘুম ভেঙে গরম চা-সহ সামনের বারান্দায় বসে নানা রঙা প্রজাপতি, পাখি আরো কত পতঙ্গের আনাগোনা দেখে সময় গেলো কেটে। বাগানের গাছের পরিচর্যাও বেশ করেন এরা। সেসব দেখতে দেখতে সব গুছিয়ে এবার ফেরার পালা। দুপুরের মুখরোচক খাবার খেয়ে বেড়িয়ে পড়লাম আবারও ঐ অপরূপ পথের শোভা দেখতে দেখতে।

গুগুলে বাংকুলাং রিট্রেট ইকো হাটস (bungkulung eco huts) বলে খুঁজলে সব পাওয়া যাবে। থাকা খাওয়া-সহ একদিনে আমাদের ৩ জনের মোট ৫০০০ টাকা মত পড়েছিলো।