‘সংবেদন’। একটি শব্দই আজ নবারুণ রূপে তার অস্তিত্বকে স্বপ্রকাশিত করেছে কালের নিয়মে, আভিজাত্যে, রাজার মতো। আসলে সব থেকে বড় রাজা —সময়। তাই ‘সংবেদন’ তার গায়ে প্রকাশনী বা পাবলিশার্সের মতো নিরাপদ ব্যবসায়ী শব্দকে না জুড়েই এক দশক সময় জুড়ে রাজত্ব করে এসেছে সাহিত্য প্রকাশনা সাম্রাজ্যের ভূমিতে। দশক জয়ী রাজত্বের নেপথ্য কর্মে সদ্য প্রয়াত কর্ণধার আশুতোষ বর্মনের মুক্ত হস্ত অবতীর্ণ হলেও মগজে ও উপদেশনায় প্রধান মহারথী বরেণ্য প্রাবন্ধিক ডঃ স্বপন কুমার মণ্ডল। এই সংবেদন’শীল মননের যুগলবন্দিতে গড়ে ওঠা প্লাটফর্মের নামই ‘সংবেদন’। যে প্লাটফর্মে প্রায় সার্ধশত দুরন্ত পাণ্ডুলিপি আশ্রয় নিয়ে কালোত্তীর্ণ গন্তব্যাভিমুখে যাত্রা করেছে।
‘সংবেদন’ একটি প্রবাহী গল্পের নাম। একটি ‘শিকড়’ এর রোল মডেল বৃক্ষ হয়ে ওঠার গল্প। প্রাবন্ধিক স্বপন কুমার মণ্ডল ‘এর লেখালেখির সূচনা এবং লেখা পড়ে বন্ধু আশুতোষ বর্মনের মননের তৃপ্তিবোধে শিল্পকে সকলের কাছে ডানা মেলানোর মুক্ত প্রয়াস ‘প্রচারক আশু’কে ক্রমেই ‘প্রকাশক’ করে তোলে। তবে প্রচারক আশুর প্রকাশক হয়ে ওঠার গল্প মোটেই সুখকর ছিলনা। প্রকাশক রূপে আত্মপ্রকাশের জন্য নামী প্রকাশনার দ্বারস্থ হওয়ার ঘটনা বই বিপণনের আড়ালে লুকিয়ে থাকা অসাধু-অশুভ দিককে চোখে আঙ্গুল দিয়ে স্পষ্ট করে। কলকাতার অসাধু প্রকাশকের ধূর্ততাকে সেদিন চিহ্নিত করে মালদার বুকে তৈরি করে ফেলেন প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান। নাম ‘সংবেদন’। প্রথম সন্তান ড. স্বপন কুমার মণ্ডলের বিখ্যাত গ্রন্থ ‘বাঙলা ও বাঙালি’। এরপর এক দশক সংবেদন সেই প্রবাহিনী শিকড়ের গল্প থেকে হয়ে ওঠে রোল মডেল। আন্তর্জাতিক সাহিত্য সম্মেলন মঞ্চে অর্জন করে ‘হিতেননাগ স্মৃতি পুরস্কার’ (২০১৮, ২৩ ফেব্রুয়ারি)। দশ বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে ‘সংবেদন’ এর সংবেদনশীল সাংস্কৃতিক শোভাযাত্রা থেকে দশ জন গুণী মানুষকে ‘সংবেদন সম্মাননা’ এযাবৎ কটি প্রকাশনা সংস্থা করতে পেরেছে সে নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়। আর একদশক বয়সী সংবেদন সমস্ত নির্মাণের সূচি এবং জড়িয়ে রাখা সৃষ্টিশীল ব্যক্তিবর্গের মনোভাব-অনুভূতিকে মলাটবন্দি করে তৈরি হওয়া ‘সংবেদন এর স্মৃতি মঞ্জুষায় প্রথম দশক’ গ্রন্থ হয়ে ওঠে বেকার যুবকের স্বনামধন্য হয়ে ওঠার স্মৃতিকথন। গ্রন্থ হয়ে থাকে তীর খুঁজে না পাওয়া তরীর ভাস্কো-দা-গামা হয়ে ওঠার জীবন্ত দলিল। আর যাঁর আলোকস্পর্শী মনন এবং উপদেশনায় ব্যক্তি আশুতোষ উজ্জ্বল হয়ে ওঠেন তিনিই এই স্মৃতি মঞ্জুষার সম্পাদক সিধো-কানহো-বীরসা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক স্বপন কুমার মণ্ডল।
‘সংবেদন এর স্মৃতি মঞ্জুষায় প্রথম দশক’ গ্রন্থ প্রকাশিত হয় ২০১৯, ২৩ শে ফেব্রুয়ারি। কিছুদিন পর ২৭ মে ২০১৯ মৃত্যু হয় সংবেদন এর কর্ণধার আশুতোষ বর্মনের। স্মৃতির মোমে তৈরি হয়ে যাওয়া মোমবাতি উজ্জ্বল আলোক প্রকাশের পর ফুরিয়ে গেলেও রেখে যায় নিখাঁদ মোম-মঞ্জুষাকে, রেখে যায় ছেঁকে রাখা জীবন জীবাশ্মকে। যার গায়ে লেখা থাকে ব্যক্তির প্রতিষ্ঠানএর সমার্থক হয়ে ওঠার ইতিহাস, রোল মডেল হয়ে ওঠার ইতিবৃত্ত। ইতিহাস আর ইতিবৃত্ত হারিয়ে দেয় মৃত্যুকে। তাই বলা যায় ‘‘সংবেদনএর স্মৃতি মঞ্জুষায় প্রথম দশক’’ শুধু স্মৃতির অ্যালবাম নয়; আর্থিক প্রতিষ্ঠা টপকে আত্মিক প্রতিষ্ঠানের বটগাছ হয়ে ওঠার এক চলমান উপাখ্যান।
‘সংবেদন’ সাহিত্য আকাশে যে প্রকৃত ‘তমসো মা জ্যোতির্গময়’ সুরে অবতীর্ণ তার আরেকটি বড় প্রমাণ উপেক্ষার অন্তরালে থাকা নীরব-নিভৃতচারী সাহিত্য সাধকদের প্রকাশের আলোতে এনে সার্থক সৃষ্টির রূপদান আনয়নে সচেষ্ট ভূমিকা পালনে। তাঁদের যথাযোগ্য মর্যাদা এবং ‘মুকুট’রূপ পুরস্কার প্রদানে ‘সংবেদন’ আপন গুণে নিজেই রাজা হয়ে ওঠে। অধীর চন্দ্র বর্মন এবং বিমলা বর্মন (আশুতোষ বাবুর বাবা ও মা) স্মৃতি পুরস্কার প্রদানের চিন্তক প্রাবন্ধিক স্বপন কুমার মণ্ডল সেদিন (২০১০) পেরেছিলেন সংবেদনকে উত্তরের পথ থেকে দক্ষিণের পথে যাত্রা করতে। তাই হয়তো আজকে অকাল প্রয়াণের পরও স্মৃতি স্মারকের অবলম্বন ছাড়াই সংবেদন এর সার্ধশত গ্রন্থের আম্লান সৃজনে লেখক-পাঠকের মধ্যে বেঁচে আছেন আশুতোষ। ড. মণ্ডলের সার্থকতা এখানেই। স্মৃতিমঞ্জুষায় প্রথম দশক’এর সার্থকতাও এখানেই।
‘সংবেদনএর স্মৃতিমঞ্জুষায় প্রথম দশক’-এর পাতায় ধরা পড়ে অমূল্য তিন পত্রিকার (বিনিময়, উত্তরবঙ্গ সাহিত্য সংস্কৃতি, মননবিশ্ব) বনেদি ইতিবৃত্ত। ‘সংবেদন’ প্রকাশিত এই তিন পত্রিকার (‘বিনিময়’ পত্রিকার সম্পাদক, বাকি দুটির উপদেশনা) সম্পাদক এবং প্রধান উপদেশক স্বপন কুমার মণ্ডলের লেখকসত্ত্বার গভীরে যে বহুরৈখিক চিত্ত জীবন্ত দ্বীপ হয়ে সদা জাগ্রত তার পরিচয় সহজেই পাওয়া যায়। ড. মণ্ডলের বহুরৈখিক চিত্তই প্রাবন্ধিক সত্তার হোমাগ্নিতে সেঁকে নেয় তাঁর ঔপ্যনাসিক ও কবি সত্তাকে। তাই তো সংবেদন প্রকাশিত তাঁর প্রবন্ধগ্রন্থগুলিতে ( বিভূতিভূষণের জীবন বিভূতি, বারো মাসে তেরো পার্বণ, অন্য জীবন, অনন্য জীবনী) প্রকাশিত হয় জীবনবোধ, খাঁটি মানবত্বের বিবেকরূপ। উত্তরবঙ্গ বিশারদ, অধ্যাপক ড. আনন্দগোপাল ঘোষ জানান ‘আমার প্রথম বই প্রকাশিত হয় ২০০৭ সালে। আটান্ন বছর বয়সে আমার প্রথম বই প্রকাশিত হয়। কিন্তু বর্তমানে ত্রিশটির উপর বই প্রকাশিত হয়েছে আমার। এখানেই স্বপন কুমার মণ্ডলের কৃতিত্ব। যিনি আমাকে দিয়ে লিখিয়ে নিয়ে সংবেদনের মাধ্যমে প্রকাশ করে ত্রিশখানা গ্রন্থের গ্রন্থকার হতে সাহায্য করেছেন’। আসলে সাহিত্যের অর্জুনরা এমনই হন। যিনি শুধু যুদ্ধসুলভ আত্ম-লিখনকেই রূপদান করে ক্ষান্ত থাকেন না, যুদ্ধনীতির পাশাপাশি মানবপালক নীতিতে সাহিত্য জগতে আঁধারে থাকা অপ্রকাশকে সেবা দানে রোদ্দুর করে তোলেন।
স্বপ্ন বাস্তবায়নের আর এক নাম স্বপন। তাই রামঅবতার শর্মা স্মৃতি মঞ্জুষায় বলেন — ‘স্বপন কুমার মণ্ডল পশ্চিমবঙ্গ সাহিত্য জগতের মধ্যমণি, তার সৃজনশীলতার অফুরন্ত ভাণ্ডারে সমৃদ্ধ লালিত পালিত সংবেদন’। গ্রন্থে শুভদীপ ব্যানার্জীর কলমে কর্ণধার আশুতোষ বর্মন হয়ে ওঠেন জহুরি, যিনি জহুরি চোখে বোঝেন পাণ্ডুলিপির সদূর গ্রহণযোগ্যতা, জহুরি চোখে তাই ব্যবসায়িক দৃষ্টির চেয়ে আত্মপ্রতিষ্ঠার জপই সংবেদন’এর প্রধান মন্ত্র হয়ে ওঠে। তা না হলে শিক্ষাবিদ ও প্রাবন্ধিক ড. গৌরমোহন রায় বলে উঠতেন কিভাবে প্রকাশকের লাভের থেকে ক্রেতার সুবিধার জন্য সংবেদনের বই এর দাম কম রাখার কথা। স্মৃতি মঞ্জুষায় কার্তিক কুমার মণ্ডল থেকে সমিত ঘোষ, অনিন্দ্য খাঁ থেকে শঙ্কর নাথ প্রামানিক প্রমুখ গুণিমানুষ জন তাদের স্মৃতিকথায় নিজেদের অভিজ্ঞতাকে তুলে ধরেছেন। গ্রন্থকে করে তুলেছেন বিচিত্র জীবন অভিজ্ঞতার সোপান।
‘প্রকাশনা’ আসলে মনোগ্রাহী দৃষ্টিতে লক্ষ্মী-সরস্বতীর মেলবন্ধন। কিন্তু লেখকের লেখা যেখানে সিদ্ধিদাতা গণেশের সিদ্ধি সমতূল, সেখানে পাণ্ডুলিপির সিদ্ধিস্তুপ পাওয়া প্রকাশকের ভূমিকা যে বারোয়ানা বীররূপী কার্তিক রূপে অবতীর্ণ হওয়া সেকথা অনেকেই ভুলে যান। তাই আশুতোষ বাবুরা মৃত্যুবরণ করেন না, ড. স্বপন কুমার মণ্ডলের মানবপুণ্য মনন হারতে যে শেখায়নি তাঁদের। সংবেদন’শীল মানিকজোড় ও তাঁদের ‘স্মৃতি মঞ্জুষায় প্রথম দশক’ অদম্য লড়াই এর শুভপাঠ্য হয়ে থাকবে পাঠক মনে একথা সর্বজন স্বীকার্য।
সংবেদনের স্মৃতি মঞ্জুষায় প্রথম দশক, সম্পাদনা : স্বপন কুমার মণ্ডল, সংবেদন, বিএস রোড, মালদা, বিনিময়-১৫০