মানুষের শরীরে ক্ষুদ্র একটি ফুঁসকুড়ি হলে ভাবে সে অনেক কষ্টে আছে, কিন্তু যখন তার শরীরে ব্যথাদায়ক ফোঁড়া হয় তখন সে নিজেই বোঝে ফুঁসকুড়ির যন্ত্রণা কোনো যন্ত্রণা নয়। সে সামান্য দুঃখে, সামান্য অর্থকষ্টে ভারাক্রান্ত হলে ভাবে তারই জীবনে কেবল দুঃখ লেগে থাকে, কষ্ট লেগে থাকে; কিন্তু যখন সে বড়ো কোনো কষ্টে জর্জরিত হয় তখন সে নিজেই বোঝে সামান্য দুঃখ, কষ্ট জীবনের জন্য কিছুই নয়। সামান্য কষ্ট তাকে ভারাক্রান্ত করে, সামান্য দুঃখ জর্জরিত করে, সামান্য আঘাত রক্তাক্ত করে, সামান্য কথা ব্যথিত করে, সামান্য না পাওয়া ভাবনায় ফেলে; কিন্তু জীবনের ছোটো ছোটো সুখগুলো তাকে উদ্বেলিত করতে পারে না, সামান্য প্রাপ্তি তাকে সন্তুষ্ট করতে পারে না, সামান্য অর্জন বিশেষ তালিকায় স্থান পায় না।
অনেক প্রাপ্তির মাঝে থেকেও অসন্তুষ্ট থাকে নৌফা। প্রাপ্তির প্রতি নজর থাকে না, মন শুধু পড়ে থাকে না প্রাপ্তির প্রতি। অপ্রাপ্তির প্রতি কাতর মানুষ প্রাপ্তির দরদ জানে না। ঘরে সব থাকলেও ঘরে কোনো একটি কিছুর না থাকাতে ঘরে অসন্তোষ সৃষ্টি করা সহজাত প্রবৃত্তি। আর এই কারণে সুখের ঘরেও সুখের উল্লাস থাকে না। সারাদিন মধুময় কথা বলার পরও দিনের কোনো এক ক্ষণে কোনো কারণে তিক্ত কোনো কথা কানে গেলে তিক্ত কথায় মনে গেঁথে থাকে, মধুময় কথা মনেও থাকে না। মধুর ক্ষণেও ঐ তিক্ত কথায় কানের কাছে পুনর্বার উচ্চারণ করে করে মধুর ক্ষণকেও তিক্ত ক্ষণে রূপান্তর করে ছাড়ে। আর এ কারণেই স্বাদ নৌফা থেকে বেশ সাবধান, সাবধানে কথা বলে, সাবধানে কাজ করে। ভালোবাসা উজাড় করে ঢেলে দেয় না, বেশি ভালোবাসলে মানুষ ভালোবাসার মর্ম বোঝে না, ভালোবাসা মানুষ ভুলে যায়। সামান্য ব্যথা দিলে সারাক্ষণ ব্যথার জন্য কাতর হতে থাকে, অথচ অঢেল ভালোবাসা দিয়েও তৃপ্ত করা যায় না।
দুটি মন এক সুতোয় বাঁধা, কিন্তু দুটি মনের চাওয়া-পাওয়াতে কতই না মতানৈক্য। সুখের জন্য শপথ গ্রহণ করে, কিন্তু আলাপের সময় সুখের আলাপের স্থলে বৈষয়িক আলাপ, বিভিন্ন অলংকার প্রাপ্তির প্রার্থনাই থাকে, যা সময়কে বিষিয়ে তোলে, সুসময়কেও পচিয়ে দেয়।
বিবাহের পূর্বে নৌফা বলতো, তোমাকে পেয়ে গেলে আমার আর কিছু পাওয়া লাগবে না।
সেই সমধুর বাক্য শুনে স্বাদ তৃপ্ত হতো। অথচ আজ অমূল্য প্রাপ্তিকেও প্রাপ্তি মনে হয় না। পেয়ে গেলে পাওয়া, মানুষের আর গুরুত্ব থাকে না। অমূল্য না পাওয়া পর্যন্ত যত না কাঙ্ক্ষিত থাকে, পাওয়ার পর আর তার মূল্যই থাকে না। প্রিয় মানুষকে আপন করে পাওয়ার আনন্দ আর নেই। আগের সেই অমৃত কথা আর কানে আসে না। আগের সেই মুখ থেকে ঝরে না মধু। ঝরে শর। বিষ পান করা লাগে না। নৌফার কথায় বিষের স্বাদ পায় স্বাদ। বিবাহের পূর্বে নৌফা বলতো, আমার জন্য একটি বনফুল এনে দিও, আমি তাতেই সুখী হবো। অথচ আজ গোলাপ ফুল এনে দিলেও সে ছুড়ে ফেলে না দিলেও সন্তুষ্ট হয় না। গোলাপ ফুলে মন ভরে না, মন ভরাতে এখন লাগবে দামি দামি অলংকার। না দিলে পাশের বাসার ভাবির সাথে তুলনা করে করে জর্জরিত করে তোলে। অথচ এককালে সে স্বাদকে সাগরের সাথে তুলনা করতো। সাগরের বিশালতার সাথে তুলনা করতো। বলতো, মানুষের ভালোবাসা হওয়া উচিত মহাসাগরের মতো, যা কখনো শেষ হবে না। তোমার ভালোবাসাও মহাসাগরের মতো প্রকাণ্ড ও প্রচণ্ড।
সেই দিন নেই, সেই দিন গত হয়েছে। প্রকাণ্ড আর প্রচণ্ড ভালোবাসা চোখে পড়ে না; চোখে পড়ে স্বাদের দীনতা, অক্ষমতা, দরিদ্র্যতা। স্বাদও বদলে গিয়েছে, সে আর মানে না- পুরুষকে বেশি মানসিক শান্তি দেয় তার শখের নারী। সে এখন দৃঢ় বিশ্বাস করে, নারী পুরুষের সহযাত্রিনী না, শান্তিদায়িনী না; অশান্তির মূল কারণ।
একদিন তারা হাতে হাত রেখে কতই না ঘুরতো। আনন্দ ছিলো, তখন স্বাচ্ছন্দ্য ভাবনা মনে আসতো না। শান্তি ছিলো, সমৃদ্ধির চিন্তা ছিলো না। সুখ ছিলো, হাসি ছিলো, ছিলো না ইচ্ছাশীল পাওয়ার আকুলতা। ফুসকাতেই পরম তৃপ্তি ছিলো, এখন বিরিয়ানি পোলাও দরকার। দশদিক থেকে দশ আত্মীয় ফোন করে জিজ্ঞাসা করে, কী দিয়ে খেলি?
ভালো ভালো খাদ্য-খাবার খাওয়ার কথা না বলতে পারলে মাথা নিচু হয়ে যায়। এখন আর ঘুরতে যাওয়া হয় না। অথচ নৌফা বলতো, তোমার সাথে ঘোরার শখ কোনোদিন কমবে না আমার।
ঘোরা হয় না এখন। ঘুরতে একেকদিন এক এক শাড়ি পরতে হয় নাকি। এক এক দিন এক এক শাড়ি না পরলে নাকি প্রতিবেশিনীরা সমালোচনা করে। প্রতিবেশিনীদের বৈভব স্বাদকে লালায়িত করে না, কিন্তু প্রতিবেশিনীদের জাঁকালো জীবন নিজের সংসারকে প্রভাবিত করছে, যা সে কল্পনাতেও ভাবেনি। জীবন যদি জীবনকে না বোঝে জীবনে কি জীবন থাকে? জীবনই জীবনকে মায়ার জাল দিয়ে জাগিয়ে রাখবে, জাগাবে জীবনকে প্রাণ দিয়ে, মমতা দিয়ে। দুটি মনে যদি মিলের পবন থাকে, সুখ কি অধরা থাকে? যা আছে তা নিয়ে থাকায় তো সমীচীন। নিজেদের অশান্তি থাকলে অন্যরা কখনো শান্তির পরশ নিয়ে আসবে না, নিজের শান্তির উপন্যাস নিজেদেরই রচনা করতে হয়। স্বাদ একা একা ভাবে, সুখ-স্বপ্ন ভেসে গিয়েছে খড়কুটোর মতো।
সুখ-স্বপ্ন কেন ভেসে যাবে, সম্পত্তির জন্য সংগ্রাম লাগলেও, সুখের জন্য সংগ্রাম লাগে না। সুখের জন্য তৃপ্তিকর মন হলেই চলে। একজনের চোখে জল এলে অন্যজন যদি দুই হাত দিয়ে মুখটা তুলে ধরে তবে কি চোখে জল থাকে? আসতে পারে চোখে জল, সে জল কষ্টের না, সুখের জল। হোক সে অন্যের ছাদ, খোলা ছাদে গলাগলি করে থাকলে কি সুখের সংজ্ঞা পড়তে উইকিপিডিয়াতে যাওয়া লাগে? স্বপ্ন নিয়ে ঘর বাঁধা মধুর বিষয়, স্বপ্ন দেখার আড়ালে লোভ-লিপ্সা, মোহ থাকতে নেই। একজন আর একজনের জীবনে আসলে পরস্পর পরস্পরের সহযোগী হতে হয়। কখনো কাউকে খামখা জীবনে জড়াতে নেই; কাউকে জীবনে জড়ালে বা কারোর জীবনে যুক্ত হলে সেই জীবনে রঙিন জীবনের দামামা দিতে হয়।
একদিন নৌফার মুখে হাসি ফোটাতে স্বাদের আইসক্রিম কিনলেই চলতো। তখন নৌফার মুখে হাসি ফোটাতে স্বাদের বেগ পেতে হতো না। এখন নৌফার মুখের হাসি তার জন্য না, অন্য মানুষের জন্য। স্বাদ ব্যতিত আর সবার সাথে কথা বলতে তার ভালো লাগে। হৃদয়ের কোণজুড়ে যে থাকে সে কেন যেন উপেক্ষিত হয়। হৃদয়ের মানুষ কখনোই পরিপূর্ণ আদরটুকু পায় না। লজ্জামাখা মুখের কিঞ্চিৎ হাসি স্বাদ আর দেখতে পারে না। আর সে আনন্দ পায় না নৌফা থেকে। নৌফা বদলে গিয়েছে। এখন সে ভাসে দক্ষিণা পবনে, এখন সে ডোবায় স্বাদকে ঘূর্ণাবর্তে। স্বাদের সামর্থ্যে সে সন্তুষ্ট না। স্বাদের স্বাচ্ছন্দ্যে সে নিবেদিত না। স্বাদের সীমিত রোজগারে সে বীতশ্রদ্ধ। সামান্য সামর্থ্যে কি সুখ অধরা থাকে? সামান্য স্বাচ্ছন্দ্যে কি শান্তি দুর্লভ্য থাকে? নির্দিষ্ট রোজগারে কি অভুক্ত থাকতে হয়? যা আছে তা নিয়েই তৃপ্ত থাকায় আসল অনিন্দ্যতা। যা নেই তা নিয়ে আফসোস না করায় বুদ্ধিদীপ্ততা। সাজঘরে গিয়ে সাজলেই মানুষ সুন্দর হয় না। শ্রমের টাকায় কেনা একটি ক্ষুদ্র টিপেও সৌন্দর্য ফেরে, সেই সৌন্দর্য হাজার টাকায় কেনা বিদেশী ব্র্যান্ডের স্নো-পাউডারে ফেরে না- এই বোধ জাগ্রত হওয়াটাই এক ধরনের সৌন্দর্য।
মনের সাজঘরে সাজলে মনের ভেতর দিয়ে যে হিল্লোল বয়ে যায় তার তো তুলনা নেই। দেখানোর জন্য খরচ করা বোকামি। আর এই বোকামির কারণে আজকাল স্বাদের সাথে নৌফার কথা কাটাকাটি লাগে। এক সময় একজন একজনের কথা শুনবে বলে উদগ্রীব হয়ে থাকতো। আর আজ একজন আর একজনের কথা সহ্য করতে পারে না। নৌফা বলে, আর বলে বলে নিজেকে তৃপ্ত করে। স্বাদ শোনে, আর শুনে শুনে দগ্ধ হয়। নিজেরা নিজেদের মাঝের সুখকে বিতাড়িত করে, নিজেরাই নিজেদের মাঝে বিবাদ নিমন্ত্রণ করে। একজনের খারাপ পরিস্থিতি অন্যজনের কাছে তামাশা ছাড়া আর কিছু না। তাই নিজেদের মাঝের দ্বন্দ্ব নিজেদেরই দূর করতে হয়। নিজের মানুষকে কখনো কষ্ট দিতে নেই, দিলে নিজেদের মধ্যে কষ্টই আসে। যে আপন মানুষ সে আপন মানুষই থাকে, তা যেমনই পরিস্থিতি হোক। তাই আপন মানুষকে অতৃপ্তি দিতে নেই। তৃপ্ত করতে পারে আপন মানুষই। স্বাদের পরিশ্রম নৌফার চোখে পড়ে না। অথচ স্বাদের পরিশ্রম স্বাদের একা ভালো থাকার জন্য নয়, নৌফাকে ভালো রাখার জন্যও। যে মানুষটা দুই হাতকে ডানা করে আগলে রাখে তাকে বোঝে না নৌফা। নৌফা বলে, কিছুটা সময় পাশে থাকো, সবটা সময় পাশে থেকো না। একটু সময় সহ্য হলেও সবটা সময় তোমাকে সহ্য হয় না। সবটা সময়কে তুমি রাঙাতে পারো না।
শুনে স্বাদ চুপ থাকে। যে বোঝে না, তাকে বোঝানো যায় না। যে বুঝতে চায় না, তাকে বোঝানো যায় না। যে জানে না তাকে জানানো যায় না। কিন্তু সবটা সময় চুপ থাকা যায় না। তাই স্বাদ বলে, ভালো থাকতে রাজপ্রাসাদ নয়, ভরসা করার মতো মানুষ পেলেই হয়।
নৌফা ক্ষিপ্ত হয়ে বলে, বাণী বলবে না। বাণীতে মন গলে, জীবন চলতে পয়সা লাগে। তুমি একজন অসম্পূর্ণ মানুষ। তুমি শুধু অপূর্ণতাই দিয়েছো।
স্বাদ প্রতিউত্তরে বললো, আমার অসম্পূর্ণতা ও খারাপ দিক দেখেই মুগ্ধ হয়েছিলো। আমাকে খুঁজে নিয়েছিলে আর আমাকে ভালোবেসেছিলে। বলেছিলে, ভাল-ভাতে সন্তুষ্ট থাকবে। বলেছিলে, কাঁদা রাস্তা হেঁটে তুমি শাপলা কুড়াবে। এখন তবে কেন মোটরসাইকেলে চড়তে চাও।
নৌফা বলে, কল্পনায় ছিলাম আমি। কল্পনাবিভোর মানুষ বাস্তবতার কিছুই বোঝে না। কল্পনা আর বাস্তবতা বিপরীতার্থক। কল্পনা দিয়ে জীবন চলে না। প্রিয় মানুষ হতে অর্থনৈতিক যোগ্যতা লাগে। অর্থশূন্য মানুষ কখনো প্রিয় না।
মুখের কথা বুকে লাগলে মানুষ চুপ হয়ে যায়। স্বাদও চুপ হয়ে গেলো। স্বাদের আফসোস তার নিজেরই কিছুই নৌফার চোখে পড়ে না। অর্থনৈতিক সামর্থ্যবান মানুষ তার চাওয়া, যদি মানুষটা নেশাখোর হয় তবে কি সুখ পাবে? স্বাদ তো নেশাখোর না। অর্থনৈতিক সামর্থ্যযুক্ত মানুষ নৌফা চায়, যদি সেই মানুষটা কালোবাজারি হয়, তবে সে সুখী হতো? সে তো কালোবাজারি না। যদি অর্থনৈতিক ভাবে সামর্থ্য মানুষটা লম্পট হয়, তবে কি সে সুখী হতো? সে তো লম্পটও না, কামুকও না। মানুষ কেন অন্ধভাবে অঢেল চায়, মানুষ কেন চৌকসভাবে চিন্তা করে একজন সুন্দর মানুষের বুকে শান্ত থাকতে চায় না!
একজন অসৎ মানুষকে এক শব্দে উপস্থাপন করা যায়, কিন্তু একজন সৎ ও সুন্দর মনের মানুষকে এক লাইনে বর্ণনা করা সম্ভব না। চোখ তুলে সে নৌফাকে দেখে। যে মানুষটার চোখে চোখ রেখে কত না স্বপ্ন দেখতো, কত না সুখ পেতো, কত না সন্তুষ্ট হতো, তার চোখে এখন চোখ রাখা যায় না। পুরাতন হলে সব জিনিসেরই কদর কমে, হোক সে মানুষ, হোক তা ভালোবাসা। পুরাতন হলে সম্মাননীয় মানুষও সম্মান পায় না, কদর পায় না। তাছাড়া ভালো মানুষের কোথাও কদর নেই। মনে মনে আক্ষেপ করে সে বলে, খুব পছন্দের মানুষ কখনো নিজের হয় না। আবার ভাবে, নিজের ভালো থাকার দায়িত্ব নিজেকেই নিতে হবে, কারণ প্রিয়জন শুধু গল্পমাত্র।
নৌফা দ্রুত গতিতে হেঁটে এলো। রাগান্বিত খুব, কিছু একটা বলতে গিয়ে থেমে গেলো। স্বাদ নিষ্পলকে চেয়ে বললো, বিশ্বাস করো, আমার মনের মধ্যে ন্যূনতা ও দীনতা নেই। আমি নিজেকে পরিপূর্ণ বলবো না, তবে বলতে পারি আমি সত্য ও সুন্দরের ধারক। সত্যবান ও নিষ্ঠাবান।
নৌফা বললো, আমাকে আনন্দে রাখার দায়িত্ব নিয়েছিলে, আমাকে তবে দুঃখে রাখো কেন? কষ্টে রাখো কেন? আমার এত অপ্রাপ্তি কেন? আমার এত শূন্যতা কেন? আমার অলংকার নেই কেন? আমাদের ঘরে আসবাবপত্র নেই কেন? আমাদের ব্যাংক-বৈভব নেই কেন? এত কেন নেই নেই? মানুষের কেন এত আছে আছে?
স্বাদ বললো, এখন এসব বলো কেন? বৈভব তো মানুষ একদিনে গড়তে পারে না। বৈভব তো মানুষ এক প্রজন্মে করতে পারে না। তুমিই তো বলতে, তোমার ঐশ্বর্য দিয়ে আমি কী করবো, আমি চাই তোমার মনের মাধুর্য! কেন এখন হৃদয় বোঝো না, মন বোঝো না, আমাকে বোঝো না? তুমি কী আর দেখো না আমার মনের আকাশে চাঁদ উঠে না, তারা ফোটে না! তুমি কি এখন আমার শুকনো মুখটা দেখে বিচলিত হও না? আমার হৃদয়ক্ষত কি তোমাকে একটুও ভাবনায় ফেলে না? তোমাকে পেতে আমাকে কেন কষ্ট করতে হয়নি? তোমাকে বুঝতে কেন এখন আমার চোখ থেকে পানি ঝরে?
এভাবে দুইজনের মাঝে কথা কাটাকাটি লেগেই থাকে। লেগে থাকে মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব। নৌফার কথা বলার ধরন দেখে স্বাদ বোঝে তার কাছে নিজের অবস্থান। স্বাদ তাই বলে ফেলে, নৌফা, তুমি আমার উপর রাগ করবে আমি রাগ ভাঙাবো, তুমি আমার সাথে অভিমান করবে আমি অভিমান ভাঙাবো। তা না তুমি আমার সাথে দ্বন্দ্বলিপ্ত, তুমি আমাকে হেয় করো। আমায় ছোটো করবে, আমায় নিচু করবে, দীন ভাববে এমন তো কথা ছিলো না। তোমার রূপৈশ্বর্য দিয়ে আমায় মহিমান্বিত করবে, তা না করলে ধূলিলিপ্ত, করলে স্বপ্ন-স্বাধ ধূলিসাৎ।
নৌফা বলে, ঘোরে আমি তোমাকে দামি ভেবেছিলাম। তুমি দামি নও তা তুমি জানো না।
স্বাদ বলে, দামি মানুষের কাছে প্রায় সবাই-ই মূল্যহীন। যার কাছে তুমি দামি তাকে তুমি মূল্য দাও। সুস্থ আছি, এই তো অনেক। যা নেই তা নিয়ে কেন এত ভাবনা, যা আছে তা নিয়ে নেই কেন উচ্ছলতা? আমাদের জীবনও অনেক আনন্দে কাটবে, কেন তা বুঝতে চাও না। কত সংসারে কত বড়ো বড়ো বিপর্যয় তা থেকে তো আমরা অনেক ভালো।
নৌফা ক্ষিপ্ত হয়ে বললো, তোমার এই গুছিয়ে কথা বলতে জানার গুণে আমার সবচেয়ে বড়ো সর্বনাশ হয়েছে। নেই নেই মানুষের চাপায় জোর বেশি। অন্তঃসারশূন্য মানুষের কথায় সৌন্দর্য বেশি, কথায় গর্জনও বেশি।
স্বাদও বলে ফেলে, বদলে যাওয়া স্বভাব যাদের তাদের মায়া নেই, পাতা ঝরার আগে পাতার রং বদলে যায়, মানুষ বদলে যাওয়ার আগেও রং বদলে নেয়। স্বামীর সম্পদে স্ত্রী ভাগ্যবতী না, স্বামীর বিলাস-বৈভবে স্ত্রী ভাগ্যবতী না। নারী তখনই ভাগ্যবতী হয় যখন তার মনের মানুষ শুধু তাকেই চায়। বুদ্ধিমতীরাই ভাবে, জীবন যেমনই হোক কাউকেই বুঝতে দেওয়া যাবে না।
নৌফা বলে, যে জীবন গড়েছো মানুষ ব্লকই দেবে, সার্চ করবে না৷। এই বাড়িতে আমার দম বন্ধ হয়ে আসে, থাকার ইচ্ছা জাগে না।
স্বাদ বলে, থাকার মানুষ থেকেই যায় শত প্রতিকূলতা মোকাবেলা করেও, ছেড়ে যাওয়ার মানুষ ছেড়ে চলে যায় শত সুবিধা দিলেও। এখন বিশ্বাস করি, স্বার্থযুক্ত মানুষ বশীভূত হতে চায় না। স্বার্থ ছাড়া কেউ বশীভূত হতে চায় না।
নৌফা বললো, প্রজাপতির পেছনে দৌড়ালে সে উড়ে যাবে আরও দূরে, বাগান সাজালে প্রজাপতি নিজেই উড়ে আসে।
স্বাদ বললো, মানুষ মায়ার পেছনে ছোটে। মানুষ মায়ায় আটকায়, সম্পদে না। অস্বচ্ছলতায় স্বচ্ছলতা আনায় সৌন্দর্য। স্বচ্ছলতায় না, সংকটে পাশে থেকে যাওয়ায় কৃতিত্ব। জীবন সুন্দর, আমরা উপভোগ করতে ব্যর্থ।
স্বাদ আর কথা না বলে অফিসের উদ্দেশ্যে বের হয়ে যায়। নির্দিষ্ট আয়ের সংসার বলে খরচ সুনির্দিষ্ট। সঞ্চয় হয় না বলে বাড়তি চাহিদা পূরণ করা হয়ে উঠে না। সাফল্যের পাশে সবাই, বিফলের পাশে কেবল আব্বা-আম্মা। আব্বা, বলেন, পৃথিবীর কোনো বিজ্ঞানী লোভ নামের রোগের ওষুধ আবিষ্কার করতে পারেনি। পারবেও না। এটাই জীবন, এভাবেই জীবন চলে যাবে। ভাবিস না। ভালো মানুষ বেশি ভারাক্রান্ত হয়, তবে হারে না। ভালো মানুষ বেশি আওয়াজ তোলে না, সহ্য করে যায়। সহ্য করে যা।
স্বাদ বলে, অনেক স্বপ্ন দেখেছিলাম। জীবন স্বপ্নের মতো না, আব্বা। চাইলেই সুখী হওয়া যায় না। কিন্তু সীমিত সামর্থ্য দিয়ে সুখী হওয়া যাবে না কেন?
আব্বা বলেন, জীবনভর পরিশ্রম করেছি, আর জীবনভর তোর আম্মার বকা খেয়েছি। কেউ সাথে থাকলে ভালো থাকা যায়, ব্যাপারটা তেমন না। নিজের ভালো নিজেরই থাকতে হয়। নিজেকে ভালো নিজেকেই রাখতে হয়। তবেই ভালো থাকা যায়।
স্বাদ শুনে বলে, বিবাহ করে মানুষ সুখের জন্য, সংসারের জন্য; বাড়তি চাপের জন্য নয়, বাড়তি ঝঞ্ঝাটের জন্য নয়। খারাপ পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য; খারাপ পরিস্থিতিতে পড়ার জন্য নয়।
আব্বা বলেন, আমিও সংসারে প্রবেশ করেছিলাম একটা ভরসার হাত পাবো ভেবে, ভরসার হাত পাইনি। বোঝা বহন করতে করতেই জীবন শেষ।
স্বাদ নিজের ঘরে আসে। খুব স্বপ্ন ছিলো বাইরে থেকে এলে একটা হাসি মুখ তাকে বরণ করে নেবে। এমন প্রত্যাশা কেবল স্বপ্নেই সত্য হয়। কষ্ট সীমা ছাড়া হলে মানুষ আর কাঁদে না, আফসোস করে না; চুপ হয়ে যায়। স্বাদও চুপ থাকে। যার জীবনে তার গুরুত্ব নেই, তাকে সে ভুলেও যেতে পারে না। তার থেকে সরেও থাকতে পারে না, এই এক বিড়ম্বনা। অপমান সে সহ্য করে নিয়েছে হাসির আড়ালে। কথার তীক্ষ্ণ বাণ সে সহ্য করে সবার সম্মুখে থেকেও। কোনো কিছু পাওয়ার আশা আর তার নেই। নতুন কোনো স্বপ্নও আর তাকে বিভোর করে না। সে বুঝে গিয়েছে মায়া দেওয়ার মানুষটায় যখন সহ্য করতে পারে না, আর কেউ তাকে স্বপ্নে ভাসাতে পারবে না। আগের মতো উৎফুল্লতা আর মনে আসে না। সে বুঝে গিয়েছে স্বার্থ না থাকলে কোনো মানুষই কাছে আসে না, মন পেতে কেউ মায়া দেখায় না, মায়া দেখায় মূলত স্বাচ্ছন্দ্যে আর বিলাসিতায় থাকার লক্ষ্যে। পকেটে সক্ষমতা থাকলে পিঠে হাত রাখার মানুষের অভাব হয় না। কারো জীবনগল্পে সেরা হতে হলে উদার মনের মানুষ হলেই চলে না, সভ্য আর ভদ্র হলেই চলে না; ভীষণ রকমের আর্থিক সামর্থ্যবান হতে হয়।
নিষ্প্রাণ মানুষটাকে দেখেও নৌফা আর কাছে এসে মিষ্টি কথা বলে না। অথচ আগে মুখ গোমড়া থাকলেই মুখ গোমড়া কেন প্রশ্ন করতে করতে হয়রান করে তুলতো। সুশ্রবণীয় কথা বলে বলে মন রাঙাতো। আর এখন বলে, বালতি দিয়ে সেচে ফসল ফলানো যায় না, ফসল ফলাতে বর্ষণ লাগে। দুই টাকা সঞ্চয় করে করে ভবন হয় না, অঢেল অর্থ লাগে।
স্বাদ বলে, সুন্দর ব্যবহার অর্থের চেয়েও দামি।
নৌফা বলে, অর্থের চেয়ে দামি কিছুই নেই। উৎসব আর উপলক্ষ্য এলে আমি যে কত ছোটো হই, তুমি জানো না। সবার হাতে স্বর্ণের বালা, আমার হাতে ইমিটেশন।
স্বাদ বলে, এখন নারীরা স্বর্ণের বালা পরে না; স্মার্ট নারীরা ঘড়ি পরে। মাথা যদি উর্বর হয়, মাথা ভর্তি চুল দরকার হয় না। গলায় স্বর্ণের হার লাগবে কেন, আমিই তো তোমার সবচেয়ে বড়ো অলংকার। আমি না থাকলে তোমার কী হবে একদিন নীরবে বসে ভেবো। সবাই ঠোকর দেবে, কিন্তু কেউ বরণ করবে না।
নৌফা বলে, নিজেকে সস্তা করে তুলি না যে সবাই সস্তা ভেবে নেবে। শুধু তোমার অক্ষমতার কারণে আজ আমি সবার কাছে সস্তা হয়ে গিয়েছি। নিজেকে নিচে নামিয়ে তোমার পছন্দে পতিত হওয়া আমার ঠিক হয়নি।
স্বাদ বলে, গ্রাস করার গুণ থাকলে হয় না, আপন করার গুণও থাকতে হয়। ঐশ্বর্য নেই বলে ঐশ্বর্যের জন্য পাগল হওয়ার মতো বোকামি আর নেই।
নৌফা বলে, তল নেই, আছে কথার ফোয়ারা। বল নেই, আছে বাহারি কথার ফুলঝুরি। সক্ষমতা নেই, আছে শুধু কথার মাধুরর্যতা। সঞ্চয় নেই, আছে কথায় অনিন্দ্যতা।
স্বাদ আজ রেগে গেলো। আর বললো, হ্যাঁ, আমার কিছু নেই, কিন্তু সততা আছে, সৎ উপায়ে রোজগার আছে। আমি ঠক নই, আমি প্রতারক নই। আমি কাজে নিষ্ঠার প্রয়োগ রাখি, কথা দিলে কথার মর্যাদা রাখি। আমার টাকা নেই, কিন্তু আমি সস্তা নই। আমার মগজ আমি বিক্রয় করি না, আমি উৎকোচে বোল পাল্টাই না।
নৌফা বলে, এই জন্য কারো কোনো চাহিদা পূরণ করতে পারো না। কাউকে সাহায্য করতে পারো না। সম্মাননীয়, কিন্তু সম্মান নেই। মর্যাদাবান, কিন্তু মর্যাদা পাও না।
স্বাদ বলে, নিন্দা করার স্বভাব যাদের তারা নিন্দা করেই যাবে। কারো কথায় প্ররোচিত হয়ে কাছের মানুষকে অবিশ্বাস করতে নেই, কষ্ট দিতে নেই। মনে রেখো, কাউকে অপমান করতে যোগ্যতা লাগে না, কিন্তু সম্মান করতে যোগ্যতা লাগে।
নৌফা বলে, তুমি একটা ফুঁটো কলসি, বাজো বেশি। তোমার সম্পদ নেই, তুমি চুপ থাকবে।
স্বাদের রাগ বেড়ে গেলো। সে বললো, হ্যাঁ, আমার সম্পদ নেই। কখনোই বলিনি আমার অঢেল আছে। যখন জানো, যার কিছু নেই তার কাছে চাও কেন? আমি তো তোমার কাছে কিছুই চাই না, ভালোবাসা ছাড়া। কেন আমাকে কষ্ট দাও? পিঠা বানাতে গিয়ে পিঠা ভেঙে গিয়েছিলো বলে কেঁদে দিয়েছিলে, আর এখন মন ভেঙে দিয়েও কান্না করো না কেন? প্রকৃত জীবনসঙ্গিনী কখনোই জীবনসঙ্গীর জন্য ভারবোঝা হয় না। স্বামীই প্রত্যেক স্ত্রীর জীবনে শ্রেষ্ঠ নায়ক।
নৌফা শুনে বললো, অর্থহীন পুরুষ নাটক, উপন্যাসেই নায়ক।
স্বাদ বলে, অপমান করে কথা বলো না। আমার যত্ন তুমি বুঝবে না। ঘুষখোরের অর্থে ভালো চলতে পারতে। সামাজিক মর্যাদা পেতে, কিন্তু সুখ পেতে কিনা সন্দেহ, যত্ন পেতে কিনা সন্দেহ, গুরুত্ব পেতে কিনা সন্দেহ।
নৌফা রাগান্বিত হয়ে বলে, কর্মগুণ নেই কথার গুণ আছে। পরিশ্রম চেহারা খারাপ করে, কিন্তু ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল করে।
স্বাদ বলে, সামান্যতে সুখী মানুষ সমাজে নেই। কেউ সুখী না, কারণ সবাই অভাবী। যার ভেতর জাজ্বল্য দেখছো, সেও তার নিজের ভেতর ঔজ্জ্বল্য পাচ্ছে না। তুমিও তোমার প্রাপ্তিকে গুরুত্ব দিচ্ছো না, তাই প্রাপ্তির মাহাত্ম্য বুঝতে পারছো না। দুঃখ নেই, তাই বিলাসিতাকে দুঃখের কারণ করেছো। দুঃখ থাকলে বিলাসিতার কথা ভাবতে না।
নৌফা আর কথা না বলে ঘর থেকে বাইরে চলে গেলো। স্বাদও পেছন পেছন এলো, আর বললো, যে কখনো হারে না, সে কখনো জেতে না। এত জেদ কেন? এত ক্ষোভ কেন? হেরে যাও, জিতে যাবে। এই সমাজে কত কত মানুষ আছে যারা সুখী হওয়ার সামান্যটুকুও পায় না। আমি তোমাকে ছায়া দিই, মায়া দিই, চোখের আড়াল করি না। বর্তমান বাজার দরে এর মূল্যও কিন্তু কম না।
রাগে ফুসতে ফুসতে নৌফা বাইরে থেকে আবার ঘরে চলে গেলো। স্বাদ আর পিছু নিয়ে ঘরে এলো না। পড়ে থাকা মরা গাছটার উপর গিয়ে বসলো। অজস্র দুঃখ লুকানো যায়, কিন্তু কিছু কিছু দুঃখ লুকানো যায় না, সহ্য করা যায় না।
শক্তির পক্ষে সবাই, নরমের পক্ষে কেউ না। শক্তির পক্ষে সবাই, সত্যের পক্ষে কেউ না। অর্থ না থাকলে সততার দাম নেই। সততায় মমতা মেলে না। আন্তরিকতায় আদর মেলে না। লম্পটও আদর পায়, সমাদর পায় অর্থ-বিত্ত থাকলে। প্রিয় মানুষও অপ্রিয় হয়ে যায় আর্থিক অক্ষমতা থাকলে। সঙ্গিন পথের পথিক কেউ হতে চায় না, বরং সবাই সুখের পায়রা হতে চায়; সুখ না পেলে পায়রা অন্যত্র উড়ে যায়। সুখের কারণ হতে কেউ চায় না, বরং সুখ ভোগের কারণ হতে চায় সবাই। হাতে হাত রেখে সংগ্রাম করে কেউ সংসার দাঁড় করাতে চায় না। সাজানো বাগানে এসে উপভোগ করতে চায় সবাই। স্বাদ বুঝে গিয়েছে, প্রিয়জন বলতে কিছু নেই, প্রিয় বলতে কিছু নেই। প্রিয়জনই বুঝিয়ে দেয় প্রয়োজনে নই, আয়োজনে আছি।
মুড়াপাড়া, রূপগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ, বাংলাদেশ