ড. কাজি মোতাহার হোসেনের কন্যা, কাজি আনোয়ার হোসেনের বোন, ওয়াহিদুল হকের স্ত্রী সনজিদা খাতুন পা দিলেন নব্বুইতে। মৃত্যুস্পর্শী এই বয়েসে জরা আমাদের জড়িয়ে ধরে। সনজিদা খাতুনও হয়েছিলেন সেরিব্রাল স্ট্রোকের শিকার। তথাপি তিনি এখনও সক্রিয়, এখনও তিনি সবুজ সংসদের সদস্যা, এখনও তিনি লিখে চলেছেন, পরিচালনা করছেন ‘গানের নিবিড় পাঠ’। মফিদুল হক তাঁর একটি প্রবন্ধে সনজিদার ক্লান্তিহীন পথপরিক্রমার কথা বলতে গিয়ে রোঁমা রোঁলার একটি উদ্ধৃতি উল্লেখ করেছেন, I will not rest । এই যে বয়সগত, ব্যাধিগত প্রতিবন্ধকতাকে উপেক্ষা করার শক্তি, এ শক্তি সনজিদা পেয়েছেন রবীন্দ্রনাথের কাছ থেকে। তাঁর হাতে আছে রবীন্দ্র সংগীতের তরবারি।
সনজিদার ব্যক্তিত্বের বিচ্ছুরণ নানা দিকে। অনেক দিকেই তাঁর বিচরণ। শান্তিনিকেতন থেকে লাভ করেছেন স্নাতকোত্তর ডিগ্রি, গবেষণা করে পেয়েছেন পি এইচ ডি; ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের শিক্ষকতা করেছেন, ব্রতচারী সম্মেলন করেছেন, পরিচালনা করেছেন আবৃত্তিচর্চার সঙ্ঘ ‘কণ্ঠশীলন’, ভাষা আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেছেন, তৈরি করেছেন প্রবাদপ্রতিম সংগঠন ‘ছায়ানট’। লিখেছেন স্বাধীনতার অভিযাত্রা, ধ্বনি থেকে কবিতা, কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত, রবীন্দ্রনাথ : বিবিধ সন্ধান, সাহিত্যকথা সংস্কৃতি কথা, জননী জন্মভূমি, রবীন্দ্রনাথ এবং রবীন্দ্রনাথ ইত্যাদি ষোলখানি বই।
কিন্তু তাঁর সব পরিচয় ছাপিয়ে প্রধান হয়ে উঠেছে রবীন্দ্রচর্চা, বিশেষ করে রবীন্দ্রসংগীত চর্চার পরিচয়টি। হয়তো রবীন্দ্রানুরাগ তৈরি হয়েছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অনার্স পড়বার সময়ে। রবীন্দ্রনাথের ‘সঞ্চয়িতা’ পড়াতেন অধ্যাপক সৈয়দ আলি আহসান। সনজিদা লিখেছেন, ‘তিনি ভারি সুন্দর করে পড়াতেন। তাঁর পড়ানো থেকে রবীন্দ্রনাথের কবিতার এত ভক্ত হয়ে গেলাম। ঠিক তখনই মনে হল রবীন্দ্র সংগীত শিখব। ‘আর একটি প্রেরণা তাঁর বড়দি, যিনি প্রতিদিন বারান্দায় মাদুর পেতে গাইতেন রবীন্দ্রসংগীত; সনজিদার খুব প্রিয় ছিল ‘তৃষ্ণার জল এসো এসো হে’।
পাকিস্তানের সামরিক শাসকরা যখন পূর্ববাংলার ভাষা ও সংস্কৃতির এবং রবীন্দ্রনাথের (কেননা তাঁদের মতে রবীন্দ্রনাথ ‘হিন্দু কবি’, নজরুলের লেখা চুরি করে নোবেল পেয়েছেন, মুসলিম তমদ্দুনে তিনি স্বীকৃত হতে পারেন না) টুঁটি টিপে ধরতে চাইছিলেন তখন সনজিদার ‘ছায়নট’ রমনার বটবৃক্ষমূলে পালন করেছেন রবীন্দ্রনাথের জন্মতিথি। কার্জন হলের অনুষ্ঠানে শেখ মুজিবর রহমানের অনুরোধে তিনি গাইলেন ‘আমার সোনার বাংলা’। সনজিদা ও সমমনস্ক কিছু সাহসী মানুষের অদম্য চেষ্টায় পাকিস্তানবাদী সাহিত্যতত্ত্বের প্রচারকরা রবীন্দ্র সংগীতকে নিষিদ্ধ করতে পারেন নি।
সম্প্রতি সনজিদা খাতুন সম্মাননা স্মারক গ্রন্থ ‘বড় বিস্ময় লাগে হেরি তোমারে’ বইটি হাতে এল। এটি সম্পাদনা করেছেন আবুল আহসান চৌধুরী ও পিয়াস মজিদ। লিখেছেন শঙ্খ ঘোয, হাসান আজিজুল হক, সরদার ফজলুল করিম, সুধীর চক্রবর্তী, গোলাম মুরশিদ, হায়াৎ মামুদ, সেলিনা হোসেন, হুমায়ুন আজাদ প্রমুখেরা। এই বইতে শঙ্খ ঘোষ তাঁর নিবন্ধে সনজিদা খাতুন সম্বন্ধে লিখেছেন, ‘গান তাঁর জীবিকা নয়, গান তাঁর জীবন, চারপাশের মানুষজনের সঙ্গে মিশে যাওয়া জীবন। ধর্মতলা স্ট্রিটের প্রথম পরিচয়ে জেনেছিলাম যে দেশের আত্মপরিচয় তিনি খুঁজছেন রবীন্দ্রনাথের গানে, আর আজ জানি যে সে গানে তিনি খুঁজে বেড়াচ্ছেন নিজেরই আত্মপরিচয়।’
লেখক সিনিয়র ফেলোশিপপ্রাপ্ত গবেষক