পড়তে কেমন অদ্ভুত লাগছে, তাই না! স্বাভাবিক, এই বিস্মৃত ক্রিকেট সেইসব যুগের চলচ্চিত্র, যখন খেলাটা টিভিতে, মোবাইলে বা কম্পিউটারে বিজ্ঞাপনের ফাঁকতালে প্রচারিত স্রেফ কিছু বাণিজ্যিক বিনোদনে অধঃপতিত হয়নি।
এই ক্রিকেট দেখার একমাত্র পোর্টালই বলুন বা চ্যানেল…তা ছিল খেলার মাঠ। আর সেই খেলার সাথে উপরি পাওনা হিসেবে থাকত ম্যাচ ঘিরে গনগনে উত্তেজনা, তীব্র প্যাশন আর উথালপাথাল ভালবাসার রোম্যান্সে সেঁকে নেওয়া মনটা।
এবং ক্রিকেটের রোম্যান্টিসিজমের আপাদমস্তক ভক্ত এই আহাম্মকের দৃঢ় বিশ্বাস, শুধুমাত্র এই ত্রাহ্যস্পর্শেই জন্ম নিতে পারে মহত্ব, অমরত্ব; আর সমুদ্রমন্থনে উত্থিত সেই অমৃতের স্পর্শে সৃষ্ট হয় সাহিত্য।
শঙ্করীপ্রসাদ বসুর রচনা বর্তমান টি টোয়েন্টি যুগের তুলনায় নিঃসন্দেহে প্রাগৈতিহাসিক। তাঁর বর্ণনা, লিখনশৈলী ক্ষেত্রবিশেষে ভাবাবেগদুষ্ট, অতি অলঙ্করণের ভারে হয়তো বা কিঞ্চিৎ ন্যুব্জও। আর প্রেক্ষাপট, সে তো কবেই মুছে গিয়েছে প্রাসঙ্গিকতার মানসপট থেকে।
কিন্তু….একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য আজও সমান মাত্রায় তাঁর লেখায়— সাহিত্যসুষমা। আর এই বিরলতম গুণই তাঁর সৃষ্টিকে উন্নীত করেছে অমরত্বের সিংহাসনে।
বাংলা সাহিত্যের দুর্ভাগ্য, তার সাহিত্যভান্ডারের উপচীয়মান কোষাগারে খাঁটি ক্রীড়াসাহিত্যের বিরলতর উপস্থিতি। সেই ক্ষীয়মান ভান্ডারের অতি উজ্জ্বল উপস্থিতি সর্বার্থেই সার্থক এই ক্রিকেট-সাহিত্যের।

‘ইডেনে শীতের দুপুর’, ‘রমণীয় ক্রিকেট’, ‘বল পড়ে ব্যাট নড়ে’, ‘ক্রিকেট সুন্দর ক্রিকেট’, ‘নট আউট’, ‘সারাদিনের খেলা’, ‘লাল বল লারউড’—এই সাতটি বইয়ের কালেকশন ‘ক্রিকেট সমগ্র’। ক্রিকেটকে জড়িয়ে লেখকের যাবতীয় স্বপ্ন, প্রেম, আকর্ষণ ও হৃদয়নিঙড়ানো আবেগের সারাংশটুকু ধরা রয়েছে এই দুই মলাটের মাঝে। আর রয়েছে তাঁর চোখ দিয়ে দেখার সুযোগ সেই যুগের খেলা ও ইতিহাসকে…যা তিনি প্রত্যক্ষ করেছিলেন ও করিয়েছেন মাঠে বসে।
তাঁর বিশ্লেষণকে নিষ্পক্ষপাত নিরপেক্ষ বলা যায় না, সে দাবী তিনি করেনওনি। তাঁর লেখায় ছত্রে ছত্রে ফুটে উঠেছে পঙ্কজ রায় ও মুস্তাক আলির প্রতি পক্ষপাত, আর তাই হয়তো তাঁদের সমালোনায় লেখক কিঞ্চিৎ নিষ্করুণ, নিজে যথোচিত ক্ষতবিক্ষত হয়েও। কিন্তু সেই তিনিই কি অবর্ণনীয় শ্রদ্ধা ও চূড়ান্ত মমতায় ছবি এঁকেছেন কোনো এক বিজয় মার্চেন্ট, বিজয় হাজারে, ভিনু মানকডের। সাথে ব্র্যাডম্যান থেকে শুরু করে সমকালীন ও পরবর্তী বহু ক্রিকেটার এবং ক্রিকেট ম্যাচ তাঁর সরস মজলিশি ভাষ্যে পর্যবসিত হয়েছেন জীবন্ত, ফুটন্ত, প্রাণোচ্ছল চলচ্চিত্র চরিত্রে।
and boy, that is some picture he’s painted…
বর্তমানের চোখে স্বাধীনতা পূর্ব ও পরবর্তী সদ্যোজাত ভারতীয় ক্রিকেটকে দেখার শ্রেষ্ট উপায় এই দুই মলাটের মাঝে ডুব দেওয়া। আফটার অল, চোখের সামনে ভাসতে থাকা ম্যাচ শুধু নয়, তার পিছনে লুকানো ঘটনা, ইতিহাস, মনন ও সর্বোপরি বোতাম আঁটা জামার নিচের মানুষী প্রকৃতিটাকেও জলজ্যান্ত সমঝিয়ে না দিতে পারলে আর কিসের সার্থক সাহিত্য!
ক্রিকেট সাহিত্যের ইতিহাসের সর্বকালীন গোল্ড স্ট্যান্ডার্ড হিসেবে বিবেচিত হয়ে এসেছেন আরেক কালজয়ী – নেভিল কার্ডাস। কার্ডাসের লেখা ইতিপূর্বে বিক্ষিপ্তভাবে কিছু পড়ে থাকলেও, আজ মর্মে মর্মে মালুম হচ্ছে তাঁর রসাস্বাদনে নিঃসন্দেহে বড় ঘাটতি থেকে গিয়েছে। আর সেই কমতিই এক ক্রিকেট রোম্যান্টিকের তৃষ্ণার্ত মনের অতৃপ্তির জীয়নকাঠি।
নিজের লেখার ছবির মাধ্যমে পাঠককে সেই মাঠে বসে দেখা ক্রিকেটের অমরত্বের স্বাদ চাখিয়ে, এই অতৃপ্তিকে জাগিয়ে তুলতে পারাটাই সম্ভবত আজকের টি টোয়েন্টি যুগের চূড়ায় বসেও শঙ্করীপ্রসাদের সৃষ্টির সার্থকতা।
অতএব পরবর্তী অপেক্ষা কার্ডাসে, নিকট ভবিষ্যতে সে’ অতুষ্টির নিরসনের।
শঙ্করীপ্রসাদ বসুর ‘ক্রিকেট সমগ্র’ গ্রন্থ সম্পর্কে জনৈক পাঠকের মূল্যায়ন। শঙ্খ বসু লেখাটা পাঠিয়েছিলেন।