স্বামীজীর যখন মহাসমাধি যায়, তখন ভগিনী নিবেদিতা মঠে উপস্থিত ছিলেন না। তাঁকে খবর পাঠান হল। তিনি খবর পেয়েই কাঁদতে কাঁদতে মঠভূমিতে এসে হাজির হন। স্বামীজীর দেবতনু দেহ চিতায় সাজান হয়, বর্তমানে স্বামীজীর যেখানে মন্দিরটি আছে। যখন সেই দেহতে অগ্নি সংযোগ করা হয় নিবেদিতা এগিয়ে এসে স্বামীজীকে প্রদক্ষিণ করতে লাগলেন। শরৎ মহারাজ কিছু দূরে দাঁড়িয়ে সেই দৃশ্য দেখছিলেন আর চোখের জল ফেলছিলেন।
বিহ্বল নিবেদিতাকে দেখে শর মহারাজ বিচলিত হয়ে ওঠেন। নিবেদিতাকে যদি স্বামীজীর চিতার কাছ থেকে সরানো না হয়, তাহলে তাঁর গাউনে যে কোন মুহূর্তে আগুন লেগে বড় ধরনের বিপদ হতে পারে। এই ভেবে তিনি নিবেদিতাকে একটি স্থানে বসিয়ে দিলেন।
স্বামীজীর দেহের ওপরের চাদরটি থেকে খানিক ত্রিকোনা মতন অংশ ঝুলছে। নিবেদিতা বসে ভাবতে লাগলেন, এই সময় ওলি বুল এখানে নেই, যদি স্বামীজীর এই চাদরের কিছু অংশ পাওয়া যেত, তাহলে হয়তো তাকে পাঠান যেত (স্বামীজীর গায়ে যে চাদরটি দেওয়া আছে সেটি নিবেদিতারই দেওয়া) … এই ভাবছেন আর অগ্নিশিখা লকলকে জিহ্বা বার করে ক্রমশ স্বামীজীর দেহকে গ্রাস করছে।
নিবেদিতার কথায়, “যদি একটি কাঁচি বা ছুরি পাওয়া যেত তাহলে ওই ঝোলা অংশ থেকে কিছুটা কাপড় কেটে নিতাম। এই ভাবতে ভাবতে হঠাৎ একটা দমকা হাওয়া এসে চাদরের যে অংশটা নেব ভাবছিলাম, আগুনে পুড়ে উড়ে এসে আমার পায়ের কাছে পড়ল, আর আমি এক মুহূর্ত সময় ব্যয় না করে ওটিকে নিজের গাউনে চেপে লুকিয়ে নিলাম, অবশ্যই সেই কাপড়টিতে আগুন ছিল না। পরে সময়মতো ওলি বুলকে স্বামীজীর পবিত্র কাপড়ের অংশটি পাঠিয়ে দিলাম।”
এই বলে শঙ্করীবাবু খানিক দম নিলেন। আবার বলা শুরু করলেন!
স্বামীজীর বই লেখার কাজ যখন শুরু করি, তখনই আমার হাতে অনেক স্বামীজীর হস্তাক্ষরের ও নিবেদিতার স্বামীজীকে লেখা চিঠি পত্র আসতে শুরু করে। কিন্তু কোথাও মিসেস ওলি বুলের ওই কাপড়ের অংশের প্রাপ্তি স্বীকারের কথা পাচ্ছি না, মনে মনে ভাবছি তাহলে কি উনি ওই বস্তুটি পান নি? যাই হোক, এমনিভাবেই দিনগুলি কেটে যাচ্ছিল স্বামীজীর কাজ নিয়ে। ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে ঘুরে বেড়াচ্ছি এই কাজের জন্য। একবার মাদ্রাজেও যেতে হল, ওখানেও স্বামীজীর অনেক কাজের স্মৃতি ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। ঘুরে ঘুরে সমস্ত তথ্য সংগ্রহ করছি।
খবর পেলাম মিসেস আয়েঙ্গার তখনও জীবিত আছেন এবং ওনার কাছে স্বামীজী সম্বন্ধীয় কয়েকটি চিঠি পত্র আছে, ছুটলাম তাঁর কাছে। খুব খুশি হলেন তিনি, এই কাজ করার জন্য বিশেষ ভাবে উৎসাহিত করলেন। এরপর সমস্ত অপ্রকাশিত চিঠি আমার সামনে এনে রাখলেন, আর আমিও সব একে একে দেখতে লাগলাম। কিন্তু কোথাও সেই কাপড়ের টুকরোর কথা পেলাম না। যাই হোক অনেক খবর নিয়ে যখন উঠব উঠব করছি, এমন সময় তিনি এসে বললেন, আপনার সব কাজ কি হয়ে গেছে। তাহলে কিছু কথা বলতাম। আমি কোনও আপত্তি না করে ওনাকে বলতে বললাম।
এইবার মিসেস আয়েঙ্গার বলতে শুরু করলেন। আমার বিয়ের পর শ্বাশুড়ি -মা যখন প্রথম মিসেস ওলি বুলের সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় করিয়ে দেন, কিছু সময় পরে উনি আমাকে কাছে ডেকে নিয়ে ব্যাগ থেকে কি একটা বের করে আমার মাথায় ও বুকে স্পর্শ করালেন, আবার ব্যাগের মধ্যেই রেখে দিলেন, কোনওরকম কথা না বলে। পরে যখন আমার স্বামী বাড়ী ফিরলেন, স্বামীকে সব জানালাম, স্বামী তখন মিসেস ওলি বুলকে খবর পাঠালেন, কি বস্তু উনি মাথায় স্পর্শ করিয়েছেন। তিনিও সেই স্পর্শ ভীষন ভাবে পেতে আগ্রহী।
মিসেস বুল আমার স্বামীকে জানালেন, তিনি যে বস্তুটি তাঁর স্ত্রীর মাথায় স্পর্শ করিয়েছেন, তা অতি পবিত্র—স্বামীজীর শেষ যাত্রার কাপড়ের অংশ—যা সর্বদা তার হাত ব্যাগের মধ্যে থাকত—It’s Swamijis Blessing। স্বামীজীর বস্ত্র খন্ডের কথা শুনে আনন্দে লাফিয়ে উঠলাম। যে পবিত্র বস্ত্রের খবরের জন্য হন্যে হয়ে খুঁজে বেড়িয়েছি তার খবর এইভাবে পেলাম, বেশ মনোযোগ সহকারে আরো গভীর ভাবে শুনতে লাগলাম তাঁর কথা, যেন সবটাই একেবারে গিলে নেওয়ার চেষ্টা করছি। মিসেস আয়াঙ্গার বলে যেতে লাগলেন— “ওলি বুল বললেন, এই বৃদ্ধা বয়সে যখনই শোক তাপ পেয়েছি, তখন কোন ফাঁকা স্থানে গিয়ে সেটির স্পর্শ মাথায় রাখতাম, আর ঠিক তখনই মন্ত্র মুগ্ধের মতন সমস্ত দেহ শীতল হয়ে যেত। যখন আমার কাউকে মন থেকে ভাল লাগত, আমি সেই পবিত্র বস্ত্র খন্ড স্পর্শ করাতাম। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত আমি সেটিকে হারিয়ে ফেলেছি, I lost the noble thing। হায় অদৃষ্ট!
তখন জাহাজে করে একজায়গায় যাচ্ছি, ডেকের মধ্যে দাঁড়িয়ে সমুদ্রের দৃশ্য দেখছিলাম হঠাৎ একটা ঝাঁকুনিতে আমার হাত থেকে হাতব্যাগটি ছিটকে সমুদ্রে পড়ে গেল, আমি হায় হায় করতে লাগলাম। কিন্তু ততক্ষণে সমুদ্র সেই পবিত্র বস্তুটিকে পেয়ে যেন আনন্দে জড়িয়ে কোথায় নিয়ে চলে গেল। আমার মনটা ভীষণ খারাপ হয়ে গেল। এতদিনের সঙ্গী সেই পবিত্র বস্ত্র খন্ডটি যা নিত্যদিন স্বামীজীর স্পর্শ অনুভব করিয়ে দিত। এ কি অঘটন হল আজ! কিন্তু পরমুহূর্তে এই ভেবে শোক থামালাম, আমি অতি ক্ষুদ্র আর স্বামীজী হচ্ছেন অনন্ত, তাই ক্ষুদ্রর পক্ষে অনন্তকে ধরে রাখার ক্ষমতা নেই, “অনন্ত অনন্তেই মিশে গেল”।
এই বলে শঙ্করীবাবুর চোখ দিয়ে টপটপ করে জল পড়তে লাগল, উপস্থিত সাধু সন্ন্যাসী ও শ্রোতৃবৃন্দের চোখে জল। সারা হলটি যেন এক ভাব জগতে প্রবেশ করেছে, নিস্তব্ধ, বোধহায় একটি পিন পড়লে তার আওয়াজ পাওয়া যাবে। সারা পরিবেশ স্বামীজীর এই ঘটনায় যেন ডুবে গেছে।
চারিদিকে একটি কথাই সবার কানে বেজে চলেছে “অনন্ত অনন্তেই মিশে গেল”।
শংকরী প্রসাদ বসুর বক্তৃতার একটি অংশ, সংগ্রাহক সুজাতা দেবী, ড. শঙ্খ বসুর অনুমতি নিয়ে প্রকাশ করা হলো।
????