হিন্দু শাস্ত্র মতে ব্রহ্মপুরাণে শাঁখা-সিঁদুরের কথা উল্লেখিত আছে। পুরাণে আছে শঙ্খাসুর নামে এক অত্যাচারী অসুরের তান্ডবে দেবলোক অশান্ত হয়ে উঠেছিল। দেবতারা নারায়ণের দ্বারস্থ হলে স্বয়ং নারায়ণ শঙ্খাসুরকে বধ করে দেবতাদের রক্ষা করেন। এদিকে শঙ্খাসুরের ধর্মপরায়ণা সতী-লক্ষ্মী স্ত্রী তুলসী স্বামীকে ফিরে পাওয়ার আশায় প্রার্থনা শুরু করেন। স্বয়ং নারায়ণ তাঁর কাতর প্রার্থনায় সাড়া দিতেই শঙ্খাসুরের হাড় দিয়ে শাঁখা তৈরি করে তুলসীর স্বামীর প্রতি ভালোবাসাকে অমরত্ব প্রদান করেন। সেই থেকেই হিন্দু বিবাহিতা নারীর স্বামীর মঙ্গল কামনায় শাঁখা পরার রীতির প্রচলন শুরু হয়েছে বলে মনে করা হয়।
অপরদিকে লাল শক্তির প্রতীক। শাস্ত্র অনুযায়ী মানব শরীরের বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন দেবতা অবস্থান করেন। যেমন কপালে অধিষ্ঠান করেন স্বয়ং ব্রহ্মা। লাল রঙ ব্রহ্মাকে সন্তুষ্ট করার জন্য ব্যবহার করা হয়ে থাকে। আর সেই কারণেই প্রাচীনকাল থেকে বিবাহিতা হিন্দু নারীরা শক্তির প্রতীক হিসেবে এবং প্রসাধনী হিসেবে সিঁদুরের ব্যবহার করে আসছে। তবে সিন্ধু সভ্যতাতেও সিঁদুরের ব্যবহারের নিদর্শন পাওয়া যায়। তবে লিঙ্গ নির্বিশেষে সেখানে সিঁদুরের টিপ পরার প্রচলন ছিল। ইতিহাসের তথ্য ঘাটলে দেখা যায় এই রীতির প্রচলন শুরু হয়েছে বহু পূর্বে। এই রীতির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে লিঙ্গ বৈষম্য আর বর্বরতাও।
পূর্বে অন্যান্য পণ্যের মতো নারীদের পুরুষদের সম্পত্তি হিসেবেই চিহ্নিত করত সমাজ। অধিকারের চিহ্ন হিসেবে কপালে ধারালো অস্ত্র দিয়ে ক্ষত তৈরি করা হত। ‘অধিকৃত’ এর সূচক হিসেবে হাতে দেওয়া হতো লোহার বেড়ি আর কোমরে পরানো হতো শিকল। নারী অধিগ্রহণের এই চিহ্ন গুলোই পরবর্তী কালে সভ্যতা এগোনোর সাথে সাথে বদলে যায় শাঁখা-সিঁদুরে। লোহার বেড়ির আর এক অর্থ আয়স্ত আর তা ক্রমে আয়স্তী বা নোয়ায় রূপান্তরিত হয়েছে৷ কোমরের শিকলের গালভরা নাম হয়েছে কোমর বন্ধ৷ ঘরের স্ত্রীকে ছলে বলে কৌশলে হাতে লোহার বেড়ি আর কোমরে শিকল দিয়ে আটকে রাখার কৌশলই বিবর্তিত হয়ে এঁয়োস্ত্রীতে রূপান্তরিত হয়েছে৷
আধ্যাত্মিক কারণ হিসেবে দেখলে শাঁখার রং সাদা সত্ত্বগুণ, সিঁদুরের রঙ লাল রজঃগুণ, আর লোহার রঙ লাল তমো গুণের প্রতীক। প্রাচীনকাল থেকেই সংসার আগলে রাখতে নারীকে একদিকে যেমন চরিত্রে মনে সাত্ত্বিক হয়ে উঠতে হবে অন্যদিকে নারী রজঃ গুণ অনুযায়ী কামনা বাসনার বাইরে নয় আবার তমো গুণ অনুসারে ক্রোধ ধৈর্য্যর অধিকারিনী। এই তিনটি গুণের মাধ্যমেই নারীরা সংসারে প্রতিটি সদস্যদের সুখী করার জন্য নিজেদের নিয়োজিত করে এসেছে আবহমানকাল ধরে ৷
অনেকে বৈজ্ঞানিক কারণ হিসেবে দাবি করেন, রক্তের অন্যতম দুটি উপাদান শাঁখায় ক্যালসিয়াম, লোহায় আয়রণ রয়েছে। নারীদের মাসিক রজঃস্রাবের সাথে রক্তের এই উপাদান নির্গত হয়ে যায় ৷ শাঁখা- সিঁদুর নিয়মিত পরিধান রক্তের সেই ঘাটতি পূরণে সহায়তা করে। যদিও একটি ধর্মকে প্রাধান্য দিয়ে এবং শুধুমাত্র বিবাহিত নারীদের স্বাস্থ্য রক্ষার এই নিদানের বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।
সর্বোপরি প্রচলিত সামাজিক বিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে মঙ্গল চিহ্ন, সংসারের পবিত্রতা রক্ষা কিংবা স্বামীর আয়ুবর্ধক হিসেবে এই প্রথা মানার রীতি প্রাচীন কাল থেকে চলে আসলেও সমাজ বদলের সাথে সাথে ক্রমে তা পুরুষতান্ত্রিক সমাজের অধিকার বোধ এবং বীরত্বের ছদ্ম প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। শাঁখা-সিঁদুর, সোনায় মোড়া লোহা আজও সেই অধিকারবোধের সূচক। যা হিন্দু নারীরা স্বেচ্ছায় বা বাধ্য হয়ে ধারণ করে চলেছে ৷
একবিংশ শতাব্দীতে বিশ্বায়নের যুগে যখন সমগ্র বিশ্ব নারীর অধিকারের জন্য সরব হচ্ছে, সরকারের কথায় বার বার উঠে আসছে, ‘মহিলা ক্ষমতায়ন’-এর কথা। যেখানে এয়ার ফোর্স থেকে নেভিতে পর্যন্ত নারীরা নিজগুণের পারদর্শিতায় নিজেদের প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছে, উইমেন্স সাফরেজ মুভমেন্ট করে ভোটাধিকার প্রণয়ণের মাধ্যমে নিজেদের নাগরিক অধিকার সুনিশ্চিত করেছে, সেখানে আজও কেন আদিম বর্বর রীতিকে বহন করেই বেশীর ভাগ হিন্দু নারীকে তার নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে হবে? আজও কেন সিঁদুর দান না হলে আইনি বিবাহের শাংসাপত্র থাকা সত্ত্বেও দু’জনে একসঙ্গে থাকার জন্য যথেষ্ট নয়? অথবা স্বামীর সহায়তা ব্যতীত সন্তান মানুষ করলেও গ্রামে-গঞ্জে নিজেদের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে সিঁথিতে সিঁদুর পরে জীবন অতিবাহিত করতে হবে?
যদিও এবিষয়ে নারীদের মধ্যেও দ্বিমত লক্ষ্য করা যায়৷ কিছু তথাকথিত শিক্ষিতা অতি আধুনিকা নারী বিশেষ দিনে ফ্যাশনের তাগিদে আজও নিজেদের সিঁথি রঞ্জিত করে, তবে সামগ্রিক বিচারে বেশিরভাগ নারী বাধ্য হয় কুসংস্কারকে আঁকড়ে শুধুমাত্র নিজেদের নিরাপত্তাকে সুনিশ্চিত করতে।
সত্যি কি হিন্দু নারীদের শাঁখা-সিঁদুর ব্যতিরেকে সমাজ তথা রাষ্ট্র পারেনা নূন্যতম নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে? নাকি ইতিহাস জেনে, শিক্ষিত স্বনির্ভর হয়েও শুধুমাত্র প্রথা বহন করার তাগিদে আজও প্রাচীন প্রথা শুধু বিশ্বাসের উপর ভর করে মেনে চলতে হবে? এই সব প্রশ্নের উত্তর পাঠকদের খুঁজে বের করার অনুরোধ রইল।
একমাত্র শাঁখা, সিঁদুর-ই পারে একটি হিন্দু নারীকে তার পূর্ণ নারীত্বের রূপ প্রদান করতে।