হাত বাড়াতে যেও না, এখন লোডশেডিং, অন্ধকার। তেষ্টা পেলেও চেপে যাও। নইলে, কাচের ‘জাগ’, তো। বড় ঠুনকো, অভিমানী। বেমক্কা হাত ঠেকলেই কাত হয়ে কেঁদে কোট একসা হবে। কানাত ভাঙাও অসম্ভব নয়। তখন খালি ধারালো টুকরো, জল, জল, সারা ঘরময়।
তাই বলি নিরুপম, তেষ্টা পেলেও চুপচাপ থাকো। নিঝঝুম, ঘুমঘুম। ঘুম না থাক, ঘুমের ভাব। রাতটার মতো। দ্যাখো তো, দেখে শেখো রাতগুলোর অভ্যেস কী চমৎকার। ঘুম না এলেও এক-একটা রাত সমস্ত রাত জেগে থাকে, দু’একটা গাড়ির হুসহাস, সে শুধু ওদের কলেজ থেকে হঠাৎ-বেরোনো হাওয়া, দীর্ঘশ্বাস। আর? চোখের পাতা জ্বলে কিংবা পোড়ে। তাদের নাম জোনাকি কী তারা। মিটমিটে সাক্ষী রাতগুলোর রাত জাগার। নিরুপম মনে রেখো, সন্ধ্যা পার হয়ে গেছে কখন, তুমি নিজেও এখন নিমগ্ন, তুমি গভীর রাত।
সন্ধেবেলা কী হয়েছিল, ভোলো। অন্তত ভুলতে চেষ্টা করো। বাড়ি ফিরে কাউকে পাওনি? সিঁড়ি ভাঙতে হাঁপ ধরেছিল? অথচ মোটে বিশটা ধাপ তো মোটে। এক সময়ে দু’টো করে টপকে গিয়েছ একসঙ্গে। এখন কি সেই বয়স আছে? বয়স গেছে, ব্যামো ধরেছে। বুকের। জিরোতে হয়। হাঁটি হাঁটি পা-পা নতুন করে চলাত শেখা।
হ্যাঁ, সব রকমের চলা। বাড়ি ফিরে কাউকে না পেলেও টুঁ শব্দটি না করা। তা ছাড়া কাজের লোকটা ছিল তো। সে পিছু পিছু এসেওছিল। ওহ্ বাড়ির লোক কেউ ছিল না বলে আফসোস? কে কাজের লোক, কে বাড়ির লোক, এখনও আলাদা করে দ্যাখো তিনকাল গিয়ে এককালে ঠেকল, এখনও এই ভেদবুদ্ধি—ছিঃ।
ওই যে লোকটি, কী যেন নাম কী যেন, কী যে হয়েছে আজকাল! খুব জানা জিনিসও ফসকে ফসকে যায়, মগজে মনে পড়া-না-পড়ার লুকোচুরি। বেশি ভাবতে যেও না, লাভ নেই, ধরা যখন না দেবার তখন নামটাম কিছুতে ধরা দেবে না, খামোখা চোর-পুলিশ খেলার হয়রানি, মিছিমিছি কানামাছি। মাথার সেলগুলোই ভোঁ-ভোঁ হবে। আবার ওই নামটাই যখন ধরা দেবার ঠিক দেবে। জালে মাছ পড়ার মতো।
তখন মনে পড়বে লোকটির নাম লোকনাথ, বেশ বিশ্বাসী। যখন এসেছিল তখন বাচ্চা বললেই হয়, আর এখন? মাঝবয়সি। মাঝখানে অন্তত বছর কুড়ি, ওরও একটা দুটো চুলে পাক ধরতে শুরু হয়ে গিয়ে থাকতে পারে। অমোঘ কালের বিধি, একচুল এদিক-ওদিক হওয়ার জো কী?
তফাৎ এই যে, বিশ বছর আগে বলত চাকর, এখন বলো কাজের লোক। মানোন্নতি হোক বা না হোক, নামোন্নতি। সমাজতাত্ত্বিক প্রগতি।
যাক, লোকনাথ এসেছিল। জানালার একটা পাল্লা খুলল, একটা বন্ধই রাখল।
বউদি কোথায়?
এখনও ফেরেননি।
ফেরেননি, সে কি? অথচ তার আফিস তো সেই পাঁচটাতেই ছুটি।
কোথায় নেমন্তন্ন আছে, শুনেছি। বাড়িতে খাবেন না।
আর দাদাবাবু?
সেই এসেই বেরিয়ে গেলেন। ক্লাবে পার্টি। খাবার রাখতে মানা করে গেছেন তিনিও।
আর আমি? (স্বর কেন বাঁশ চিরে বাতাস বেরোনোর মতো হল নিরুপম? জানো না, ওদর সামনে মনের ভাব শীতকালে বুকের বোতামের মতো আলগা করতে নেই। পশমের মাফলারে ঢাকাঢুকি দিয়ে রাখতে হয়।)
একটু পরে ঢাকা দিয়ে যাচ্ছি।
লোকনাথর গলা একটু রুখা, ঘড়ঘডে, সেটা যদি টের পেয়েও থাকো, তবু কিছু বলতে যেও না। এক সময় ওই গলাই খুব মিহি-বিনয়ী শোনাত-সে সব পুরনো কাসুন্দি ঘেঁটে দরকার কী? তখন তোমার দেরাজ থেকেই ওর মাইন মিটিয়ে দেওয়া হত—তুমি রিটায়ার করার আগে অবধি। এখন দেয় অতনু। তুমি যা দিতে তার চেয়ে দড়গুণ বেশি। তা ছাড়া ওরা পাক্কা ধড়িবাজ। কোনটা কার দেরাজ, ঠিক চেনে।
মালিকের বদলাবদলি হয়ে গেছে। গলার স্বরেরও। এখন লোকনাথের ভাব ওজনদার বাটখারার মতো ভারিক্কি, ওই যেন মুরুব্বি। আর কোথায় গেল তোমার থমথমে স্বর? পুরুষালি বাজ এখন স্রেফ ফাঁকা, ফাঁপা আওয়াজ। ফ্যাশফেশে।
সোনা হেন মুখ করে চাপা দেওয়া খাবারটা খয়ে নিয়েছ। খাবার আর কী, খান দুই রুটি, না হয় দুধ আর খই। তাই সই। ওর বেশি সয় না। খানিক বাদেই বুকে চাপ চাপ, তারপর অম্বল। ঢেকুর উঠল তো বেঁচে গেলে, পাঁজরার ভিতর দিয়ে বাতাস বইল। এক-একটা দিন তো আবার পিত্তশূল। সে এক ছটফট যমযন্ত্রণা। তাই হালকা খাবারই ভাল, রাত্তিরে বিশেষ করে। গোনাগুনতি রুটি ছিঁড়ে ছিঁড়ে। তরকারি, দু’চুমুক ঠান্ডা দুধ। যমকে ঘুষ, আয়ু তাতে যদ্দিন, যতটুকু বা বাড়ে।
যেমন রোজ একটা হাঁটা, সকালে বিকেলে। দু’চক্করে ক্লান্ত হলে তো বেঞ্চ আছে।
এই যে মজুমদার মশাই, আজ যে আপনি খুব সকালে? ঘাসের ডগা থেকে শিশিরের ফোঁটা এখনও যে মিলিয়ে যায়নি মশাই।
দূর মশাই, আপনিও যেমন! শিশির চেনেন না? ওগুলো হল গতরাতের বিষ্টি।
তারপর কোন বছর কত রেইনফল, তার স্ট্যাটিসটিক্স। মজুমদারের সঙ্গে তর্ক কোরো না, করে জুত হবে না। উনি মিটিওরজিক্যাল আফিসে খাতা পিষেছেন, ত্রিশ বছর টানা। কোন সালে ক’ ইঞ্চি ধারাপাত, সব ওঁর নখদর্পপে। জানা। যা জ্ঞান জমিয়েছেন তিরিশ বছর জুড়ে, তা বিকেলবেলায় উগরে দেন বয়স্যদের আসরে।
আর কী-ই বা করা! শোনার কেউ নেই। বাড়িতে তো একদম না। নাতি দূরের কোনও শৌখিন স্কুলের বোর্ডিংয়ে গোকুলে বাড়ছে। তারা রূপকথা টুপকথা দূরে থাক, টাইটানিক ডুবি থেকে সেকেলে যুদ্ধটুদ্ধুর গল্পও শোনে না। ওদের ইন্টারেস্ট আলাদা। ওদের থ্রিলার আলাদা।
ক্রমে ক্রমে আরও দু’জন চারজন। গালগল্প জমে। ই, সি, জি; ই. ই. জি, ব্লাডটেস্ট। পোস্ট-প্র্যানডিয়াল শুগার কত? ফাস্টিং?
ঝোপে ঝাড়ে জোড়া জোড়া। ফিসফিস, খিলখিল, যত সব অসভ্য বেহায়া। ক্রৌঞ্চমিথুন? আরে দূর! বকবকম পায়রা, নয়তো সব ক’টা কাঠঠোকরা।
বিষ্টি এল তো সোজা গোলপাতার ঘরে। সুইমিং পুল, ডাইভিং পাটাতন, পুরুষ্টু উরু। জাঙ্গিয়া। নিদন্ত বা বাঁধানো দাঁতের মাড়ি চুঁইয়ে গাল বেয়ে গলা অবধি নেমে আসা লালা। সেখানেও চানাচুর, ঝালমুড়ি, ফুচকা, ভেলপুরি, ফিরিওলা। গন্ধ যদি বা নাকে সয়, চারধারের নোংরা আলাপ কানে সহ্য হয় না। কখনও কখনও অনেক দৃশ্য চোখেও না।
এই বয়সে অত কি খুঁতখুঁতে হাত আছে—ছিঃ। চোখ বন্ধ করে ফ্যালো। তা ছাড়া নিরুপম, তোমার চোখে তো পুরু লেন্সের চশমা, কাচও আবার বৃষ্টির জলের ছিটে লেগে ঝাপসা, বাইরে ভাব দেখাও আর ভিতরের মনকে বোঝাও যে, তুমি কিছু দ্যাখোনি। তা হলেই সব গোল চুকে যায়। আলোগুলোও নিবুনিবু, সেটা একটা বাড়তি সুবিধা। থামটার আড়ালে কোন ছোঁড়া একটা ছুঁড়ির বুকে কনুই দিয়ে ঢুঁ মারছে, তোমার ওদিকে নজর দিয়ে কাজ কী। মানা করার তো কথাই ওঠে না। তা হলে মান তো মান, জানও এই ফাটা সিমেন্টের চাতালে রক্তে কাদায় মাখামাখি হয়ে লুটিয়ে পড়বে। সুতরাং হুঁশিয়ার! আর, মেয়েটারও সায় আছে কি নেই, তুমি তো জানো না। একালের জেনানা যে। বাইরে বেরোতে হয়, খেটে খেতে হয়। একটু আধটু ছোঁয়াছুঁয়িতে ওদের খুব ছ্যাঁকা হয়তো লাগেও না।
আবার ধরো, ওর বিয়েই হয়নি কিংবা প্রেমিকও জোটেনি। সোমত্ত গতর, উপোসি। একটু চোরাই সুখ যদি উশুল হয়, তোমার তাতে কী?
জোলো হাওয়া। বিড়ির ধোঁয়ায় সব ধোঁয়াক্কার। বিড়ির না গাঁজার? আজকাল নাকি সব চলে। রাখঢাক নেই, প্রায় খোলাখুলি। পাশে খুকখুক কাশি। তোমারই মতো হাড়জিরজিরে আর-এক বুড়োর। এইবার তুমিই বরং ছোঁয়াচ বাঁচাও, নীচে নেমে যাও। বৃষ্টিটা ধরেছে।
তোমার আলাপী বন্ধুরাও একে একে জড়ো। প্রায় সবাই। মজুমদার, খাসনবিশ, বাঁড়ুজ্জে। মিস্টার মেহরা বাদে। ওর একটু নাক উঁচু। বয়ে গেছে। বয়স একটু কম, তাই ভোরবেলাতে এখনও জগিং করে। যা বেঢপ লাশ একখানা, শর্টস পরলে একেবারে বকচ্ছপ দেখতে। আর আসেনি রিটায়ার্ড সাবজজটি। আর্থ্রাইটিস। মনসুনের মাস ক’টাতে খুব বাড়ে।
আসেনি তো আসেনি। বাঁচা গেছে। সাহেবি আমলের ওমুক-তমুক আর হ্যানো-ত্যানো নিয়ে বড্ড বকবক করে। উঢ যেমন রসদ, ওরাও তেমনি দেদার স্মৃতি মজুত রাখে। শেষ বয়সের খোরাক।
স্মৃতির সঙ্গে কেচ্ছাও।
আজকালকার কাণ্ড তো সব ছিঁচকে ব্যাপার। হ্যাঁ, তখনকার সব কেস ছিল হোমরা চোমরার। এক কে-সি-আই-ইর কন্যা আর কেমব্রিজ ফেরত লিডার। কন্যাটির পতি, পিতা, পুত্র সব ছিল।
উপপতি ছিল না তো!
যা বলেছেন, হ্যা, হ্যা।
আর সেই সুন্দরী, এক শিল্পপতির সঙ্গে লটঘটি, যাকে বলতেন মামা।
সাউথ ইন্ডিয়াতে আটকায় না।
আটকায় না তো কিচ্ছু। কালে কালে সবই তো বিলকুল মঞ্জুর। তখন একটা কুমারী মেয়ের গর্ভপাত নিয়ে ঢিঢি পড়ে যেত, আর আজ? অ্যাবরশন জলভাত, ভ্রূণ যেন অ্যাপেনডিক্স।
বেজায় টক, বেজায় ঝাল। পেটের তলা থেকে বমি উথলে আসে। জল ধরেছে, রওনা দিতে হয়, তো এক্ষুনি। ফের কখন আসে ঠিক নেই। বিদুৎ তো চমকাচ্ছেই আষাঢ় মাসের এক-এক পশলা বৃষ্টি যেন ঝাঁকে ঝাঁকে ঘোড়সওয়ার।
ওই কোণে সুরেন বাঁডুজ্জে বক্তৃতা দিতেন না? সার সুরেন, না বিপিন পাল। তুমিও খালি কিংবদন্তি শুনেছ নিরুপম, নিজের কানে শোনোনি।
যাক, এই পার্কটা আছে, এই কপাল। খোলামেলা, সবুজ আর দিঘল পামগাছ। শ্বাস নেওয়ার অবকাশ, এই সন্ধেবেলায়।
এবার? বাড়ি, হ্যাঁ মিথ্যে আর মিষ্টি করে যাকে বাড়ি বলে থাকো, নইলে আসলে শ্মশান। খাঁ-খাঁ, শুকনো; চলতে ফিরতে পায়ের নীচে ভাঙা কলসির খোলামকুচি ফোটে—ঠিক কবে থেকে?
দু’জনার বিছানা, কিন্তু সেটাকে হঠাৎ একজনের করে দিয়ে প্রমিতা যখন ফ্রেমে বাঁধানো ফটো হয়ে ম্যানটেলপিসে উঠে গেল, তখন থেকেই কি? সেই কবে থেকে একটা শখের কিউরিওর পাশে ফ্রেমের প্রমিতা কাচের আড়াল থেকে কেমন মুখ টিপে হাসছে তো হাসছেই।
ফ্রেমে আঁটা কি না। লাইফে নেই, তবু ওই ফ্রেমটাই ওর লাইফ ইনসিওরেন্স। ছবিতে আঁকা সব নিয়েই মোনালিসা। বিশেষ করে চাপা, পাতলা ঠোঁট যদি বিঁধে থাকে কোণের ধারালো দাঁতে, তবে তো আর কথাই নেই। চোখে সদা-সর্বদাই গুনগুন মৌমাছির বাসা।
২
ষাট পেরোলে এমন কত কী যে। সরষে ফুলে ছাওয়া রাতের আকাশটা। ছুটছ আর ছুটছ, তবু মাঠের শেষ নেই, মুখে ফেনা উঠে গেল, তবু ক্যানালের পাড়ের সেই বাঁধটা? নেই। আসে না তো আসেই না। মনে হয়, খাটের নীচে অগুনতি ইঁদুর আর আরশোলা। ইঁদুর একটা বিছানাতেও কি? দূর, তা কেন। এখনও পার্কে যাচ্ছ, দুধ খই অম্বলের ওষুধ খেয়ে ঘুমকে ইশারায় ডাকছ; তুমি কি ইঁদুর? বিছানাতেই আসলে অগুনতি চোরকাঁটা।
ও কী করছ, নিরুপম, কেন উঠতে যাচ্ছ। তলপেট ভারী, তাই চেপে যাও চেপে যাও, যতক্ষণ পারো ততক্ষণ। বাথরুমের ছলছল পিছল ন্যাতা-ন্যাতা ন্যাকামিকে না-হয় দু’পায়ের হুঁশিয়ার পাতায় চেপে চেপে ফিরলে—ফিরতে পারলে। কিন্তু বুক! বুকটাও যে ভারী। সেটাকেও কি উগরে দিয়ে আসতে পারবে বাথরুমে। ওই ভারী পাথরটা নামিয়ে হলকা হওয়ার কী উপায়?
আমার কথায় কান না দিয়ে তবু উঠতে যাচ্ছ কেন। এতক্ষণ মিহিসুরে ইনিয়ে বিনিয়ে বলেছি, এবার তোমাকে আচ্ছাসে ধমকাব নিরুপম। মনে রেখো, তুমি আর রক্তমাংসের মানুষ নও—স্রেফ একটি চরিত্র। আর আমি লেখক। যা বলব, তাই বলবে, আমার কলমের ইঙ্গিতে; যা করার করবে ঠিক তাই। যা দেখাব, যা শোনাব, তার চেয়ে এতটকু বেশি দেখা বা শোনার অধিকার তোমার নেই। ভাবারও না। সব কনট্রোল্ড, নিয়ন্ত্রিত, শাসনাধীন। পুরোপুরি রেজিমেনটেশন। ক্লোজড্ সোসাইটির মতো লেখার এলাকাতেও ওই নিয়ম।
আর চরিত্র? নাগরিক বলো তো তারা নাগরিক। প্রজা বলো তো প্রজা। সুবোধ, বাধ্য; সুতোয় বাঁধা পুত্তলিকা। অনেক চরিত্র লেখকের নির্দেশকে তুড়ি মেরে মাঝে মাঝে যথেচ্ছবিহারী হতে চায়, শুনেছি। কিন্তু পারে কি? দড়ি ছেঁড়া গোরু সন্ধেবেলা ঠিক খুঁজে খুঁজে গোহালে ফিরে আসে। সব উড়ো পাখি বাসায় ফেরে। কাটা ঘুড়ি আবার গোত্তা খেয়ে মরে। তুমিও মরবে নিরুপম, আমার বারণ যদি না শোনো।
তবু সুইচে হাত দিতে যাচ্ছ কেন। বলেছি না, এখন লোডশেডিং। কারেন্ট যদি ফিরে এসেও থাকে, তা হলেও বাদলার দিন, সুইচটা একটু দুষ্টু চিমটি কেটে যদি ছেড়ে দেয়, তবে তো জোর বরাত। ‘শক’ও দিতে পারে। পুরনো স্মৃতি যেমন দেয়, থেকে থেকে।
ওই শোনো। পাশের ঘরে ফিসফিস।
বেশ করব, রাত করে ফিরব। নেমন্তন্ন বাড়ি। এত দেরি হল কেন, তোমাকে তার কৈফিয়ত দিতে হবে নাকি। আমিও ফ্রি, কেনা কিংবা বাঁধা নই মনে রেখো। দশটা পাঁচটা চাকরি করি, মাস গেলে তোমাদের এই সংসারের ভস্মে ঘি ঢালি। আমার টাকা ছাড়া শুধু তোমার রোজগারে হাই-ফাই স্টিরিওটা কি হত? শখ মিটত সেবার উটি-মাদুরা মিলিয়ে গোটা সাউথ চষে বেড়ানোর? কী? বললে কী? কার সঙ্গে পৌঁছেছি। বেশ, বলছি। শোনো। রাখঢাক আমার স্বভাবে নেই। প্রদোষের সঙ্গে, হ্যাঁ প্রদোষ। আমার বন্ধু। তোমারও ছিল। আগে ছিল, এখন আর নেই? বয়ে গেল। আমার আছে। বন্ধুর সঙ্গে বাড়ি ফিরলে বুঝি মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে গেল? আর তুমি যে ক্লাবে তাসের জুয়ায় সব খুইয়ে বাড়ি ফিরলে?
খুইয়েছি, বেশ করেছি। তাই বলে বাড়ি ফিরেও আরও খোয়াতে আমি রাজি নই। বুঝলে?
বুঝলাম। ভুরভুর গন্ধ বের হচ্ছে। গা থেকে। পাশ ফিরে শোও। নইলে আমি সটান নেমে ওই সোফাটাতে—। কী? আমিও তো খাই? শিখিয়েছ তো তুমিই। হাতে ধরে—আমার হাত ধরে তুমি নিয়ে চলো সখা, আমি যে পথো চিনি-ই না। তুমিই শিখিয়েছিলে, না? কী ভাবছ, তোমার গলা জড়িয়ে ধরব, আর সেই শেখানো গানটাই সুর করে ধরব ফের? অত আহ্লাদে কাজ নেই মশাই। বাড়াবাড়ি করলে ‘সিন’ করব। তার চেয়ে বেশি হলে—ডিভোর্স। কী বললে, আবার বলো। স্যুট ফাইল করবে তুমি? গ্রাউন্ড কী? মিসবিহেভিয়ার? প্রদোষের সঙ্গে টাক্সিতে বাড়ি ফিরেছি, সেইটেই মিসবিহেভিয়ার? আইন অত কাছাখোলা নয় মশাই, ধোপে টেকবে না।
দম ধরে শুনছ নিরুপম, গলাটা ঠিক মেছুনির? পাশ-করা মেয়ের লেখাপড়ার পলেস্তারা খসে পড়েছে? পড়বেই। সব প্রতিমারই রং ধুয়ে যায় জলে ডোবালে। এতগুলো বছর একসঙ্গে-সহবাসও—জলই তো। অনেক কিছুই ধুইয়ে দেয়। ভালবাসাও।
হ্যাঁ, ভাব-ভালবাসা বলতে যা বোঝায়, তা ওদের অনেক দিনই নেই। আছে খালি একটা সম্পর্ক। মাসমজ্জাস্নায়ুহীন একটা কঙ্কাল। আর বাচ্চা—একটাই মোটে। কোন বোর্ডিং স্কুলে দূরে। ছুটিতে ফিরলে সংসারে সে আউটসাইডার। যেমন তুমি। যেমন ওরা। প্রত্যেকেই। করও সঙ্গে কারও সাঁকো নেই (নাতির সঙ্গে তার ভাষায় কথা বলা তোমার এখনও রপ্ত হল না), অথচ মাথার উপরে একটাই ছাদ, এক বাড়ি।
জানান দেবে? ঘড়ঘড়ে গলাটা সাফ করে বলে উঠবে নাকি নিরুপম, কী হচ্ছে? সেই তখনকার মতন? খবরদার ওসব করতে যেও না। সেই জোর আর কি আছে তোমার? যেচে অপমান হতে যাবে কেন।
তার চেয়ে আর একটু, আর-একটু। পুবের আকাশ ফিকে হচ্ছে, একটু পরে মস্ত একটা রাঙাআলু আস্তে আস্তে বিপুল একটা ফুল হবে। ততক্ষণ। অল্পই তো সময়।
৩
ছি, ছি, কী করলে নিরুপম, পই পই করে মানা করলুম, তবু আমার কথায় কান দিলে না?
ওরা সকালে চায়ের টেবিলে বসে পেয়ালায় চুমুক দিচ্ছে, এক সঙ্গে, ঢুলুঢলু চোরা চাউনি চালাচালি হচ্ছে দু’জনাতে, এইটুকু সইতে পারলে না?
বুঝতে পারছি, যেটা তোমাকে বিঁধছিল, সেটা ওদের ভণ্ডামি। যেন এ ওকে ছাড়া জগতের আর কিছু জানে না। তোমার চোখ দু’টো লাল, সে না হয় রাত জেগে। মাথাতেও লাল রক্ত চেপে গেল কেন। বড় ভয়ানক শত্তুর ব্লাডপ্রেসার, কপালের দু’পাশের রগ ছিঁড়ে ফ্যালে। চেক করাও। ব্লাডপ্রেসার আর ব্লাড সুগার। পশুর মতো। পুষে রাখতে নেই। এই বয়সে শরীরটাও তো ঝড়ঝড়ে খাঁচাওয়ালা একটা চিড়িয়াখানা।
বাঁধানো দাঁত, না-সেঁকা রুটিতেও কামড় দিতে কষ্ট হচ্ছিল। তোমাকে টেবিলে রেখেই তোয়ালেতে মুখ মুছে ওরা উঠছিল।
হাত তুলে ইশারায় তুমি ওদের দাঁড়াতে বললে।
বউমা, তোমার সঙ্গে আমার একটু কথা আছে।
অতসীকে ঘাড় বেঁকিয়ে বলতে শুনছ, কী?
সকালে আজ ওষুধ পাইনি।
কেন, ক্যাপসুল তো যেখানে রাখার রেখে দিয়েছি
ওসব অ্যান্টিবায়োটিকে কাজ হয় না। বুকে শ্লেষ্মা। তুলসী পাতা, মকরধ্বজ, চ্যবনপ্রাশ আর মধু যদি—
ঠোঁট বেঁকিয়েছে অতসী। —ওসব সেকেলে টোটকা আমার জানা নেই। লোকনাথকে বলবেন।
গটগট করে অতসীকে বেরিয়ে যেতে দেখছ। অফিসের তাড়া। এখনও চান, প্রসাধন, সব বাকি। সেসবও তো এলাহি ব্যাপার, মহাভারতের উদ্যোগপর্ব।
তুমি যেও না, অতনু, তোমার সঙ্গেও কথা আছে।
(অতসী আর আতনু, বউ আর ছেলের নামের প্রথম দু’টি অক্ষরে মিল, এতদিন কি খেয়াল করে দেখেছ? এমনি ডাকো, অন্তত ডাকতে, খোকা বলে, এখন বলছ পোশাকি নাম অতনু—সে কি রাগ ফোটাতে, না ভারিক্কি ভাব ফোটাতে?)
কী?
কাল শেষ রাত্তিরে তোদের ঘরে হচ্ছিল কী?
তার মানে?
খুলে বলতে হবে? তোদের না বাধতে পারে, আমার টেস্টে বাধছে।
বাধছে যখন, চুপ করে থাকো। পরের ঘরের কথা আড়ি পেতে শোনাই বুঝি খুব সুরুচি?
পর? তোরা আমার পর?
দ্যাখো বাবা, বলতে চাইনি কিন্তু বলিয়ে নিচ্ছ তুমি। কাল থেকে থেকে তোমার খুক খুক কাশি শুনেছি। এখন বুঝতে পারছি, ওটা তৈরি করা। লুকিয়ে শুনছিলে, সামলাতে পারোনি।
মুখ সামলে অতনু!
বলব, বলব একশোবার বলব। আড়াল থেকে শোনাও তো একরকমের চুরি!
কী। আমাকে চোর বললি?
চোখমুখ ফেটে যেন রক্ত পড়ছে অতনুর, জবাব দিচ্ছে না। মরিয়া হয়ে তুমি তখন বলছ নিরুপম, তাই বলে ওই রকম ভাষা, যেন জেলে আর মেছুনি। মনে রেখো, এটা ভদ্দরলোকের বাড়ি।
আমরা রেখেছি। এখন তুমি রাখলেই বাঁচি।
তাই বলে ছেঁড়াছিঁড়ি, কামড়াকামড়ি!
সে যাই করি, নিজেদের মধ্যে করি। বাইরের মানুষ সেখানে উঁকি না দিলেই হল।
তোমার মুখ সাদা হয়ে গেছে নিরুপম, তুমি কাঁপছ। টেবিলের ধার ধরে টাল সামলাচ্ছ।
বাইরের লোক, আমি বাইরের লোক? বলতে পারলি? মনে রাখিস, এটা আমার বাড়ি।
বিচ্ছিরি একটা হাসি অতনুর মুখে। —ভাড়া বাড়ি!
সে ভাড়াটা তো আমিই গুনি!
চোখ টেরচা করে অতনু বলছে (নিরুপম, তুমি অবাক হচ্ছ, কী করে যে ওরা পারে!)—কোত্থেকে, শুনি?
কেন, জমানো টাকা নেই আমার?
হা-হা-হা, রিটায়ার করার সময় পেয়েছিলে যে ক’ হাজার? সে তো মায়ের শ্রাদ্ধেই প্রায় শেষ, বাকিটা তোমার আদরের মেয়ে বেলির বিয়েতে। সেটাকেও বিয়ের বদলে এখন শ্রাদ্ধ বললে খুব ভুল হয় না। বেলি তো বিয়ের শিকলি কেটে শুনি এখন হাওয়াই, না আলাস্কায়!
রাগে থরথর করে কাঁপছ, বলছ, এভাবে আমার সঙ্গে যদি কথা বলিস তবে বেরিয়ে যাবি এ বাড়ি ছেড়ে। বেয়াদপি বরদাস্ত করব না যদ্দিন বেঁচে আছি।
আর অতনু, তার কথা ঠান্ডা যেন এয়ারকুলার থেকে বেরিয়ে আসা বাতাস, আস্তে আস্তে বলছে, বুঝেসুঝে কথা বলো। আমরা যাব কেন? এই মডার্ন যত ফার্নিচার, এসব কাদের টাকায়? বাবা, নেহাত বলতে বাধ্য করছ, তাই বলি: ঠিকমতো যদি পোষ মানিয়ে থাকতে পারো, থাকো, লোকনাথ দেখাশোনা করবে তোমার। নইলে, তোমারই রাস্তা খোলা। ভুলে যেও না, ইউ আর আউঢ অ্যান্ড আউট আ আউঢসাইডার।
ফের সেই পার্কে, যার ন্যাড়া ডালে পাখির কিচিরমিচির সেই গাছটার তলায়। পাতা থাক চাই না থাক, তবু গুঁড়িটা তো। ঠেসান দেওয়া যায়।
এখন বিকেল। সারা দিন কী ঘোরাঘুরি, কত ঘাম, কত ধকল। কী একটা নেশা তোমাকে ভর করেছিল নিরুপম, একটার পর একটা বাড়ি খুঁজে খুঁজে। হানা দিয়েছ। কড়া নেড়েছ। ডোরবেল টেপাটেপি। নিশীথরঞ্জন? তোমার পরামর্শে স্বাধীন ব্যবসা খোলে। এখন রবরবা। এক্সপোর্ট-ইমপোর্ট। কার্ড নেই, চিরকুটে নাম পাঠালে। খুব ব্যস্ত। দেখা হল না। চিরকুটটাই বেয়ারা পি-এ’র বেড়া ডিঙিয়ে পৌঁছল কি না ঠিক নেই। হরষিতের বাড়ি কাছাকাছি। জল তেষ্টা পেয়েছিল। কিন্তু ওরা দু’ জনেই বেরুচ্ছিল, হরষিত আর নীলিমা। দেউড়িতে ট্যাক্সি। পেইন্টের টানে মুখের সব কটা ভাঁজ মিলিয়ে দেওয়া নীলিমা উজ্জ্বল চাউনি উপুড় করে দিয়ে বলল, সিনেমায় যাচ্ছি।
সিদ্ধেশ্বর। নেই। দিল্লিতে। কাজে। পলিটিক্সে ও আজকাল একজন চাঁই। অসিত? ক্লাসে সব চেয়ে প্রাণের বন্ধু সে? খবর পাঠাতে একটি মাথা-কামানো ছেলে বেরিয়ে এল।
বাবা? উনি তো নেই!
উপরের দিকে আঙুল তুলে দেখিয়ে দিল সে।
আজ ঠিক আঠারো দিন।
আশ্চর্য, অসিত মারা গেছে, মারা গেছে মানে হয়তো বেঁচেছে, কিন্তু সে একটা খবর পায়নি, কেউ তাকে জানানোর দরকারও বোধ করেনি পর্যন্ত।
মাথা হেঁট করে ফিরে এসেছ নিরুপম, শেষবার পুরনো অফিসে। হন্যে। কারণ নেই, তবু যদি। এক্সটেনশনের প্রশ্নই ওঠে না এতদিন পরে, কিন্তু। কোনও পিস জব কোনও আসাইনমেন্ট?
তোমার ট্যুর-বিলে যে সেবার ভুল ধরে, সেই মনসিজের সঙ্গেই মুখোমুখি। চুকলি কেটেছিল, লাগিয়েছিল ম্যানেজিং ডিরেক্টরের কাছে।
একগাল হেসে মনসিজ বলছে, ‘সার চেম্বারেই আছেন। যান না, যান। সবে লাঞ্চ সেরে ফিরেছেন, সাহেব এখন খোশ মেজাজে।’ কিন্তু তুমি তার কথায় কান দিলে না নিরুপম, কেঁচো-কেন্নোদের ছুঁতেও ঘেন্না, তাই সোজা সুইং ডোর ঠেলে—
সেক্রেটারি মিস মেরি সেই কাটা দরজাটা ঠেলেই বেরিয়ে আসছে। আর একটু হলেই ঠোকাঠুকি। হল না বলে অবিশ্যিই রিলিফ, আবার একটুখানি কি আফসোসও?
রিভলভিং চেয়ার ঘুরিয়ে পূর্ণচন্দ্রের মতো সহাস্য জ্যোৎস্না বিকিরণ করছেন মিস্টার স্যান্ডেল।
আরে, আসুন আসুন। এতদিন পরে কী মনে করে?
গলা তো নয়, যেন ভরা গাঙে জোয়ার। চোখে চশমা। অবিশ্যি সঙ্গে সঙ্গে তোমার মনে হয়েছে নিরুপম, চশমার দরকারই বা কী! ওঁরা আসলে তো দ্যাখেন কান দিয়ে।
সেই ট্যুরের কথা পাড়বে কি পাড়বে না, কীভাবে শুরু করা যায়, কোন কথা দিয়ে, ভেবে ভেবে অথৈ পাথারে যখন কূল পাচ্ছ না নিরুপম, তখন খামোখা বললে, সার, ওই ট্যুরটা আসলে—
পাকা হাতে সুইপ করে স্টিয়ারিংটা আলাদা গলিতে ঢুকিয়ে দিলেন স্যান্ডেল। টেবিলটা যেন কোনও নরম গাল, এমনি আদরে টোকা দিয়ে তাঁকে বলতে শোনা গেছে, ওসব কথা কে ভাবছে মশাই। পেটি টক, সব। আপনি এখানে একসময়ে ডিজাইনার ছিলেন না? ওয়েল, ডিজাইনার মানেও আর্টিস্টই তো! বরং আর্ট-টার্ট নিয়ে কিছু বলুন, শোনা যাক। নইলে বিজনেস, সে তো আছে। ইট’স লাইক থাম্বিং থ্রু দ্য পেজেস অব আ ইনফারনালি ড্রিয়ারি বুক।
একই সঙ্গে হাই আর হেঁচকি তোলার কসরত স্যান্ডেল যখন দেখাতে থাকলেন, তখন কী আর করবে তুমি নিরুপম, চোখের পাতা দুটো পিটপিট করা ছাড়া।
তারপরই লাইটারটার গ্যাস নেই দেখে স্যান্ডেল কি দুটো সিগারেটই দেশলাই জ্বেলে ধরালেন, তাঁর নিজের আর তোমার? প্রথমে ধোঁয়া, বুক ভরে টানলে তুমি, তারপরেই পোড়া গন্ধ।
যেন ওত পেতে ছিল। পোড়া ওই গন্ধটা। কিংবা সিগারেটের ছ্যাঁকাটাই। শুনলে, কোন কথাটার খেই ধরে স্যান্ডেলের মুখে কথাটা এসেছে মনে নেই, কিন্তু শুনতে পেলে। জানেন নিরুপমবাবু, এভরি ওয়ান হ্যাজ হিজ ডে, অ্যান্ড এভরিথিং ইটস। আমরা একটা ইলেকট্রনিক জমানার চৌকাঠে দাঁড়িয়ে ইউরেনাস বা প্লুটোকে কলোনি করতে কত দিন লাগবে সেই কথা যখন ভাবছি, তখন পুরনো ট্রিক-ফ্রিক সব অচল। আজকাল অঢেল সায়েন্স ফিকশান লেখা হয় বটে বাট সায়েন্স ইজ নো ফিকশান। অথবা ততটাই ফিকশান, যতটা আমি এখানে আর ওখানে আপনি। আই অ্যাম হেয়ার অ্যান্ড ইউ দেয়ার। অর—ইউ রিয়েলি? পারহ্যাপস ইউ ওয়্যার।
ইউ ওয়্যার। আপনি ছিলেন। মানে, এখন নেই।
মাথা ঝাঁ ঝা, বেরিয়ে এসেছ যখন, তখনও তাই। মগজে ভয়ংকর এক ভীমরুলের কামড়, মখমলের দস্তানার তলায় প্রাক্তন বসের বাঘ-নখ। বিদ্যে থাক বা না থাক, তোমার বুদ্ধি তো ঢের। সেই বুদ্ধির টর্চ জ্বলিয়েই টের পেয়েছ, যে, ‘ওয়্যার’ হয়ে গেছে। তার কিছু প্রাপ্য নেই। এর পরে নতুন খুচরো কোনও অ্যাসাইনমেন্টের কথা তোলা আহাম্মকি।
এমনি এসেছিলাম সার। পুরনো অফিস। নমস্কার।
তারপর? এই সাহারায় কোথায় একটা সবুজ পান্থপাদপ, সবুজ মরূদ্যান?
ঝোঁকের মাথায় বেরিয়ে এসেছ, দিনটা কেমন যাবে, সকালের কাগজে দেখে তো নাওনি। কাউকেই পাওয়া গেল না। নিশীথরঞ্জন, হরষিত, সিদ্ধেশ্বর, কেউ না। কোন একটা গানে আছে যেন, কুটিরে কুটিরে বন্ধ দ্বার? হাঁটতে হাঁটতে পাড়ার ডাক্তারখানায়। দু’মাস, তিনমাস পুরনো সচিত্র সাপ্তাহিকগুলোর পাতা উলটে উলটে ধৈর্য যখন নামতে নামতে পায়ের গোড়ালিতে, তখন ভিতর থেকে ডাক।
রাশভারী ডক্টর মহান্তি বললেন, আপনার রিপোর্ট রেডি। নাথিং টু ওয়ারি। ব্লাড শুগার অবিশ্যি একটু হাই। কিছু ফিল করেন? মাথা ঘোরে?
খুব ক্লান্ত লাগে, আর কিছু না। প্রসবের পরে মেয়েদের মতো অবসন্ন সাদা গলায় বলেছ—আর কেউ যে নেই, কিচ্ছুও না।
তবু নিজেকে নিজের মধো ধরে রাখতে পারলে অনেক দিন আয়ু। রাইট?
মনে মনে বলেছ নিরুপম, নিজেকে নিজের মধ্যে ধরে রাখা? দিঘির মতো? হ্রদের মতো? অত সোজা নয়। যেমন দিঘি আর হ্রদ, তেমনি নদী আর সমুদ্রও তো আছে ডাক্তার। দ্যাখেননি? কোনওটা দুলে ওঠে, কোনওটা ছুটে চলে, দুটোই কিন্তু নিজেকে ছাপিয়ে যেতে চায়।
যেহেতু বলা হল না, বলা গেল না, তাই কোনও দিন যা করোনি, এমন আরও ব্যাপার ঘটাতে গেলে। একটা হেস্তনেস্ত, শেষবারের বার।
ফুটপাথে চিৎকার শুনে থেমেছ। লটারির টিকিট। কিনলে। হরিয়ানা কি পাঞ্জাবের তো, তাই লাখ লাখ টাকার। একটা লোভ কোন গর্ত থেকে বেরিয়ে ফোঁস। সাপের মতো ফণা।
আর লাখ টাকা যেন পেয়েই গেছ এই কায়দায় শিস দিয়ে ট্যাক্সি ডেকেছ। কলকাতার ট্যাক্সি তো! সাড়া দিতে বয়ে গেছে নিজেকে যখন রক্তাল্প রোগীর মতো লাগল, তখন দুম করে লাফিয়ে একটা রিকশায়। রিকশাওয়ালা কি চমকায়! নিরুপম, যেই টের পেলে, রিকশাও যেতে নারাজ, অমনি গলায় গালিগালাজের স্বয়ংক্রিয় ফোয়ারা ছুটল। ইউ ব্লাডি উল্লু কা পাঠ্ঠে ফিরিঙ্গি ইংরিজি আর বাজারি হিন্দির খিচুড়ি।
রাগে হয়তো বা পরিপুষ্ট কোনও শীতের টোমাটোর মতো ফেটেই পড়তে, যদি না তখনই ওই রাস্তার শেডেই একটি স্ফীত বাহুমূল, বিস্ফারিত ফিনফিনে জামায় ঢাকা উদ্বেল গোটা দুই বেল নজরে পড়ত। হঠাৎ ঝর্ঝর এক পশলা বৃষ্টি। মুখ দেখা যাচ্ছে না মেয়েটার, কিন্তু ফুটপাতের ধারে এরই মধ্যে জল জমছে, কাপড়ের একটা কোণ সন্তর্পণে তুলতে নীরোম, সুঠাম দু’টি সাদা পা। এক ঝলক, এক ফালি খালি। আহা রে, শাড়ি বাঁচাতে হলে লজ্জা নামে ভূষণটার সবটা বাঁচানো যায় না।
হাতের পিঠে গাল মুছেছ। গালে লালা।
৪
তারপর?
তারপর তো বৃষ্টি একটু ধরতে চেনা এই পার্কে। সার কথা বোধে গাঁথা হয়ে যাচ্ছে, তোমাকে আর দরকার নেই পৃথিবীর। অথচ পৃথিবীকে তোমার যে আজও দরকার। খামচে ধরতে যাও, পিছলায়, ফসকায়। অ্যালোন, অ্যালোন অ্যান্ড অল অ্যালোন, অ্যালোন অন আ ওয়াইড, ওয়াইড সি—কলেজে পড়া কবিতার কলিটা মনে পড়ল আবার। মুখস্থ সব বিদ্যে ঠেলে বেরিয়ে আসতে চাইছে—মগজ থেকে না পাকস্থলী? দুঃখেস্বনুদ্বিগমনা সুখেষু বিগতস্পৃহঃ—গোলি মারো গীতা। তার চেয়ে ঢের সোজা ওই মোহমুদগরটা বোঝা—কা তব কান্তা, কস্তে পুত্রঃ। নাকি শ্মশানানলদগ্ধোহসি—শ্রাদ্ধের এই মন্ত্র? সিদ্ধেশ্বরটা গেল?
নিরুপম, ভাবছ নাকি যে, আমিও তো যাব। তার আগে আমার আমি-টা যদি যায়, মরে—একটু আরাম তবে।
নইলে অক্ষম, অথর্ব—এখন গালে শুধু লালা।
এখনও লালা। দিব্যি দেখতে পাচ্ছি নিরুপম, এখনও লালা কথাটা ঝিলিক দিতেই চমকে উঠলে। যায়নি, সব তো যায়নি, তা হলে। সারা দিনের ছবি, একটার পর একটা, চোখের সামনে খেলে যাচ্ছে। কবাটের পর কবাটে তালা ঝুলছে—ঠিক। সারা দুনিয়া পিঠ ফিরিয়ে? থাকলই বা। তবু তো চণ্ডালের মতো রাগ, ছেলে অতনু থেকে রিকশাওলার উপরে; লোভ, লটারির টিকিটটা। লাগে তুক তো না লাগে তাক, অতনুদের মুখের উপর জবাব ছুড়ে দেওয়া যাবে, হে মা লক্ষ্মী, পয়মন্ত নম্বরটা কপালের জোর একবার পেলে। কিংবা কাম, মেয়েটার পায়ের সুগোল গোছ, তোমার গালে গড়ানো লালা। সবাই যখন বিদায় নিয়েছে, নিয়ম-নিয়তিতে, তখনও যেতে-যেতে-চায়-ন-যেতে রিপুরাই থাকে। এই ন্যাড়া, হাড্ডি-সার গাছটা, যার তলায় জিরোচ্ছ, যার পাতাটাতা কিচ্ছু নেই, সব ঝরেছে সব মরেছে, তবু তার ডালে চিল, শকুন কি শালিক কি কাক হাঁড়িচাছা পাখি তো বসে। থেকে থেকে তারা ডেকেও উঠছে।
গাছটার থাকার প্রমাণ।
অতএব? ওই প্রত্যয়ে হৃষ্ট নিরুপম, শোনো, সটান বাড়ি ফেরো,—আমার শেষ আদেশ। তোমার হক আর সময়োচিত সহবত, দুটোকে মেলাও। ধিঙ্গি বেলাজ বউটা ড্যাংডাং করে চরে বেড়ায়—চরুক। মধু-মকরধবজ মেড়ে দেয় না—না দিক। টেবিলে খাবার ঢাকা? হোক। বিছানাটা তো পাতা! ঘুম হয়তো আসতেই চাইবে না, এলেও ভাঙবে শেষ রাত্তিরে। তেষ্টা পাবে। শিয়রে জাগটা, কাচের, ঠুনকো কানাতটা। তবু একটু তো জল! যেন থাকে।
শারদীয় দেশ ১৯৮৪